শ্রীভক্তিরক্ষক হরিকথামৃত


২ । জীবের চরম প্রাপ্তি

 

     জনৈক ভক্ত ঃ—দণ্ডবৎ প্রণাম মহারাজ ! অনেকদিন আপনার দর্শন পাই নাই । চারিদিকে বিপদ ও নানা সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছি । তাই সময় মত আসতে পারি না ।
     শ্রীল গুরুমহারাজ ঃ—এই জগতের প্রতি দুর্ব্বার আকর্ষণ, রাগ, দ্বেষ, অহঙ্কারই হল মূল বিপদ । সংস্কারাবদ্ধ আমাদের আসক্তিই এখন পথ-প্রদর্শক হয়ে দাঁড়িয়েছে । প্রকৃত পক্ষে তারই হাত হতে নিস্কৃতি পাওয়া দরকার । আত্মরক্ষা করা দরকার । শান্তিলাভের জন্য, আনন্দ লাভের জন্য, সুখলাভের জন্য আমরা সকলেই দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াচ্ছি । পারিপার্শ্বিকতাকে দোষ দিচ্ছি কিন্তু মূল বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দেবার সময় পাচ্ছি না । তাদের reform (সংস্কার) করতে চাই কিন্তু তা Impossible শান্তিলাভের চাবিকাঠি নিজেকে Control (সংযত) করা এবং পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে Adjust (সমন্বয়) করা । ভাল-মন্দ, লাভ-লোকসান, শীত-উষ্ণ, সুখ-দুঃখ সবই আগমাপায়ী । তুমি নিজের দিকে তাকাও । নিজের প্রতি সুবিচার কর । “আত্মৈব হ্যাত্মনো বন্ধুরাত্মৈব রিপুরাত্মনঃ ।” তোমার একমাত্র কর্ত্তব্য হল "সর্ব্বধর্ম্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ।" দায়িত্বটা নিজের কাঁধে না রেখে আমার ওপর ছেড়ে দাও । এই হল গীতার দান । একজন জার্ম্মান্ পণ্ডিত—নামটা মনে পড়ছে না (আমরা কলেজে পড়েছিলাম তাঁর সম্বন্ধে) । তিনি বলেছিলেন—গীতা হচ্ছে পৃথিবীর মধ্যে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম্মগ্রন্থ । কেননা গীতায় বলেছে environment (পরিবেশ) এর ওপর তোমার কোন হাত নাই । তুমি নিজেকে control (সংযত) করে তার সঙ্গে adjust (সমন্বয়) করে নাও শান্তি পাবে । যাইহোক শ্রীমদ্ভাগবত অবশ্য আরও উন্নত বিচারের এক স্টেপ্ এগিয়ে দিয়েছেন ।

তত্তেঽনুকম্পাং সুসমীক্ষমাণো, ভুঞ্জান এবাত্মকৃতং বিপাকম্ ।
হৃদ্বাগ্বপুর্ভির্বিদধন্নমস্তে, জীবেত যো মুক্তিপদে স দায়ভাক্ ।”

(ভাঃ, ১০/১৪/৮)

     অর্থাৎ সর্ব্বত্রই ভগবানের হাত রয়েছে । তিনি নিষ্ঠুরও নন অবিচারকও নন । যা কিছু আসছে তোমার কল্যাণের জন্য আসছে । তিনি মঙ্গলময় । এবং স্নেহময় । সম্পদ বিপদ পারিপার্শ্বিকতা সব কিছুর মূলে তাঁর ইচ্ছা কাজ করছে এবং সবটাই আমাদের মঙ্গলের জন্য । তাঁর Sanction (অনুমোদন) ছাড়া কিছুই ঘটতে পারে না । তিনি সজাগ দৃষ্টিতে সবকিছু দেখছেন । অতএব বন্ধুভাবে সব কিছুকে ফেস্ করতে হবে । ‘ভুঞ্জান এবত্ম-কৃতং বিপাকং ।’ দোষটা নিজের ঘাড়ে নাও । তাঁর রাজ্যে সবই সুন্দর । সেই সুন্দরের Influence (প্রভাব) এসে তোমাকেও সুন্দর করে দেবে । এই বিচারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই দেখবে তুমি সব ঝামেলা হতে মুক্তি লাভ করে স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছ । সুন্দরের দেশে প্রবেশ লাভ করেছ । সত্যম্ শিবম্ সুন্দরম্ । অখিল কল্যাণ গুণখনি তিনি । শুধু কর্ম্ম বা জ্ঞানমুক্তি নয়, মুক্ত স্বরূপে-তোমার Orginal (মূল) স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে । “মুক্তির্হিত্বান্যথারূপং স্বরূপেন ব্যবস্থিতিঃ ।” অর্থাৎ সেবাভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে । শ্রীমদ্ভাগবতের ঐ শ্লোকটী আমাদের অনেক আশা অনেক ভরসা দিয়ে আশ্রয় দিয়েছেন । শুধু Proper adjustment (যথাযথ সমন্বয়) দরকার ।
     পূর্ব্ব পূর্ব্ব কর্ম্মফলে যেখানে যেখানে ভেসে উঠছি, সেইখানে একটা করে ডিউটী পড়ে যাচ্ছে । এর আর শেষ নাই বা এভাবে একে শেষ করা যাবেও না । তুমি কত Demand (চাহিদা) মেটাবে, তাই ভগবান গীতায় যেন সোনার থালায় অমৃত পরিবেশন করে দিয়েছেন—

“সর্ব্বধর্ম্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ।
অহং ত্বাং সর্ব্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥”

(গীঃ ১৮।৬৬)

     Absolute call of life (জীবনে পরিপূর্ণের আহ্বান) ঐ দিকে লক্ষ্য রেখে এগিয়ে চল । ভগবান বলছেন—“আমি আছি কোন অসুবিধা হবে না । সব দায়িত্ব আমি নেব ।” আমি যখন মঠে এলাম, আমার গুরুদেবের কাছে, সেই সময়ের ঘটনা বলি । শ্রীমায়াপুর মন্দিরের প্রতিষ্ঠা হল, মন্দিরেতে ঠাকুর গেলেন । মহাপ্রভুর জন্মোৎসব পরিক্রমা শেষ হয়েছে । উৎসব শেষে যে যার বাড়ী যাচ্ছেন । শ্রীল প্রভুপাদ একটী ক্যানভাসের চেয়ারে বারান্দায় বসে আছেন । আমি শোনার আগ্রহ নিয়ে তাঁর পিছনে গিয়ে বসেছি, বাড়ী যাবার আগে ভক্তরা তাঁকে প্রণাম করতে এসেছেন । প্রভুপাদ তাঁদের বললেন—‘আপনারা আমাকে বঞ্চিত করবেন না ।’ আমি কানখাড়া করলাম । বঞ্চিত হবার কি আছে ? উৎসব সমাপ্ত হল, যে যার বাড়ী যাচ্ছেন—এতে বঞ্চনার কি হল ? প্রভুপাদ বলছেন—আপনারা আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন—আপনারা কৃষ্ণ-ভজন করবেন । আমিও সেই জন্যে আপনাদের সঙ্গে একটা সম্বন্ধেতে আবদ্ধ হয়েছি । এখন দু’চার দিনের জন্য এসে আবার ফিরে যাচ্ছেন—সেই আবার সংসারেই । তা হলে তো আমি বঞ্চিতই হয়ে গেলাম । যদি বলেন, না প্রভু ! বঞ্চনা করি নাই, এই দু’চারদিন একটু কাজ কর্ম্ম গুছিয়ে চুকিয়ে দিয়ে আমরা আবার ফিরে আসছি, এসে যা বলবেন তাই করবো । আমি বলবো তার কোন প্রয়োজন নাই । যদি কেহ বলেন যে ঘরে আগুন লেগেছে আগুনটা নিভিয়ে দিয়েই আসছি, আমি বলবো তারও প্রয়োজন নাই । আপনাদের, আমাদের সকলেরই একমাত্র স্বার্থগতি হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ । তাঁর সেবা ছাড়া জীবের আর কোন Duty (কর্ত্তব্য) নাই । সমগ্র দুনিয়া পুড়ে ছারখার হয়ে গেলেও আপনার কোন ক্ষতি হয় না । আপনি চিন্ময় জীবাত্মা । আপনি মরেন না, পোড়েন না, আপনি নিত্য সনাতন তত্ত্ব । একমাত্র কৃষ্ণসেবা ছাড়া আপনার আর কোন কর্ত্তব্য নাই । আপনার যাবতীয় প্রয়োজন সব কৃষ্ণপাদপদ্মে । সেই সময় আমি Finally Surrender (চুড়ান্তভাবে আত্মসমর্পণ) করলাম তাঁর চরণে । বুঝলাম সতিই তো আমরা সুখ চাচ্ছি, শান্তি চাচ্ছি, রস চাচ্ছি, যা কিছু চাচ্ছি তার ভেতর Unconsciously (অচেতনভাবে) তাঁকেই চাচ্ছি । কেননা তিনি অখিলরসামৃতমূর্ত্তি । রসই হল Medium (মাধ্যম) । যেমন টাকা পয়সা, পাউণ্ড, ডলার, রুবল প্রভৃতির মূল Standard (মানদণ্ড) হচ্ছে Gold (সোনা); সেই রকম আস্তিক হতে নাস্তিক পর্য্যন্ত সকলের—সব কিছুর মূল Standard (মানদণ্ড) হচ্ছে ‘রস । এজগতে সে জিনিষ কোথায় পাবে ? ঐ পরতত্ত্বে Absolutely Surrender (পূর্ণ সমর্পণ) ছাড়া আর কোথাও পাওয়ার সম্ভাবনা নাই, কেননা বেদান্ত বলছেন “রসো বৈ সঃ” তিনিই হলেন অখিল রসের মূর্ত্ত বিগ্রহ । “চৈতন্যোরসবিগ্রহ” Ecstasy সত্যম্ শিবম্ সুন্দরম্ । Reality the Beautiful (সত্য ও সুন্দর) তা সে কর্ম্ম, জ্ঞান, যোগ পন্থা—কোন পন্থাতেই তো পাবে না—ঐকান্তিক শরণাগতি ছাড়া সে জিনিস পাওয়ার আর কোন পথ নাই ।

“কর্ম্মবন্ধ জ্ঞানবন্ধ আবেশে মানব অন্ধ
তাতে কৃষ্ণকরুণা সাগর ।
পাদপদ্ম মধু দিয়া অন্ধভাব ঘুচাইয়া
চরণে করেন অনুচর ॥”

     শ্রীমন্মহাপ্রভু তাই যখন রাম রায়ের মুখে শুনলেন যে “জ্ঞানে প্রয়াসমুদপাস্য নমন্ত এব জীবন্তি” তখন বললেন, হ্যাঁ, “এহো হয় আগে কহ আর ॥” জ্ঞানশূন্যা ভক্তি । Super subjective এরিয়াতে যেতে হবে । জ্ঞানের চরম ভূমিকা হচ্ছে justice (ন্যায়) । কিন্তু justice (ন্যায়) এর উপর হল Mercy (দয়া) । জ্ঞান তা দিতে পারে না । স্নেহময় ভূমিকা, সেবাময় ভূমিকায় সেইটা পাওয়া সম্ভব । শ্রীমন্মহাপ্রভু সকলকে সেই দিকে টেনে নেবার জন্যই আবির্ভূত হয়েছেন । বাস্তব জীবনের একমাত্র Solution (সমাধান) হচ্ছে ব্রহ্ম পরমাত্মার অনেক ওপরে যে ভগবৎ ধাম, সেই ধামের মধ্যে জ্ঞানশূন্যাভক্তির যে বিভিন্ন উত্তমোত্তম প্রকোষ্ঠে ভগবানের সেবাবিলাস চলছে, কোনপ্রকারে সেইখানে একটু আশ্রয় করে নেওয়া । সেইটাই হল জীবের চরম প্রাপ্তি । একমাত্র সম্পদ ।

 


 

← ১. আত্মতত্ত্ব ও ভগবৎ-তত্ত্ব ৩. সমস্যা ও সমাধান →

 

সূচীপত্র:

শ্রীশ্রীগুরু-গৌরাঙ্গ-প্রণতি
নম্র নিবেদন
প্রণতি-দশকম্
শ্রীগুরু আরতি-স্তুতি
শ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ সম্পর্কে
১। আত্মতত্ত্ব ও ভগবৎ-তত্ত্ব
২। জীবের চরম প্রাপ্তি
৩। সমস্যা ও সমাধান
৪। পরমার্থ লাভের পন্থা
৫। বন্ধন মুক্তির উপায়
৬। বৈষ্ণব জীবনে আনুগত্য
৭ । ধর্ম্ম শিক্ষা ও বিশ্বাস
৮ । শ্রীশরণাগতি
৯ । বজীবের স্বাধীন ইচ্ছার নিশ্চয়াত্মক স্বার্থকতা
১০ । সর্ব্বাবস্থায় ভগবানের কৃপাদর্শনেই প্রকৃত সুখ লাভ
১১ । মানব জীবনের কর্ত্তব্য
১২ । ভগবানের সঙ্গে যোগাযোগের উপায়
১৩ । আগুন জ্বালো, বাতাস আপনি আসবে
১৪ । মা মুঞ্চ-পঞ্চ-দশকম্


PDF ডাউনলোড (26.7 Mb)
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥