শ্রীভক্তিরক্ষক হরিকথামৃত


৩ । সমস্যা ও সমাধান

 

     স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শ্রীজহরলাল নেহেরু বহির্ম্মুখ বিশ্বপরিস্থিতির প্রধান সমস্যাগুলি সমাধানের উপায়-স্বরূপ Peaceful Coexistence (শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান) এর কথা বলেছিলেন । সমরোন্মুখ জাতিসমূহের মত্ততায় বিশ্বশান্তি সম্পূর্ণরূপে ব্যাহত হবার সম্ভাবনা একথা সকলেই স্বীকার করেন । Peaceful Coexistence (শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান) নীতি To the point অনুঃসৃত হলে কোটী কোটী মুদ্রাব্যয়ের দ্বারা সমর-সম্ভার সংগ্রহ, সৈন্যবিভাগে বা দেশরক্ষা বিভাগে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়োগের কোন প্রয়োজনীয়তাই থাকে না ; অধিকন্তু সেই সমস্ত অর্থ নিজ দেশ উন্নয়ন কার্য্যে নিযুক্ত করলে, দেশ সমৃদ্ধিশালী হবে এবং দেশের জনসাধারণ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে । এই নীতি অধিকতর বিস্তৃতি লাভ করলে জনসাধারণের সুবিধার্থে নিযুক্ত পুলিশবাহিনীরও প্রয়োজন হ্রাস হবে,—এটি সত্য কথা । মানব-মেধায় এটি অসম্ভব মনে হলেও এটি শান্তির ও ভারতীয় রাজনীতির একটি সূত্র ।
     এখন দেখতে হবে এই নীতির মূল কোথায় ? নিরপেক্ষ সূক্ষ্মদর্শির চক্ষে সহজেই ধরা পড়ে—এটির মূল হচ্ছে অন্তর-জগৎ-সম্বন্ধ বা ঈশ্বর-বিশ্বাস । জীব অন্তর্ম্মুখী বৃত্তি বা ধর্ম্মজ্ঞানের দ্বারা চালিত না হলে Peaceful Coexistence (শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান) নীতির অনুসরণ করতে পারে না । অর্থাৎ Negative (অনিত্য) জগতে ততক্ষণ পর্য্যন্ত শান্তির সম্ভাবনাই হয় না—যতক্ষণ না Positive (নিত্য) জগতের সঙ্গে জীব সম্বন্ধযুক্ত হয় । আর Positive (নিত্য) জগতের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত হলে Negative (অনিত্য) জগতের ছোট-বড়, লাভ-লোকসান, সুখ-দুঃখ, জয়-পরাজয়—সমস্তই অকিঞ্চিৎকর বলে মনে হয়ে থাকে ।
     পারমার্থিক ইতিহাস পাঠে জানা যায়—তত্ত্বদর্শী মহাত্মাগণ এই নশ্বর জগতে বা বহির্জ্জগতে বস-বাসের পাকাপোক্ত ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ না দিয়ে, কিভাবে অন্তর জগতের বা নিত্যজগতের মেম্বারশিপ লাভ করা যায়, সেই দিকেই তাঁদের সমস্ত চেষ্টা নিয়োগ করতেন এবং সাফল্যলাভও করতেন । এজগতে যতটুকু বস্তু বা পদার্থ জীবন-যাত্রার জন্য সহজপ্রাপ্য—সেইটুকুই স্বীকার করতেন । যেখান হ’তে আজই হোক আর দু’দিন পরেই হোক বিদায় নিতেই হবে, সেই পান্থশালা সদৃশ জগতে পাকাপোক্ত বন্দোবস্ত করায় কোন স্থায়ী লাভের সম্ভাবনা নাই, পরন্তু দুঃখের মাত্রাই বৃদ্ধি করা হয় । এরূপ মহাত্মা চরিত্রও ইতিহাস প্রসিদ্ধ—যাঁরা বহুযুগ পরমায়ু লাভ করেও তা অসীমকালের তুলনায় ক্ষণকাল বোধে বৃক্ষতলে বাস করে নিত্যজগৎ-ভ্রমণের সোপান রচনা করতেন । আবার কোন মহাত্মা বস্ত্রাদি সংগ্রহ চেষ্টাকেও বৃথা কালক্ষেপ মনে করে দিগ্ বসনেই থাকতেন । ইহা সেই মহৎ সংস্কৃতির দেশ । অতএব দেখতে হবে আমাদের সমস্যা ও তার সমাধান কি ? Peaceful Coexistence (শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান) নীতির দ্বারা এই জগৎ-সমস্যার উগ্রতা তৎকালিক প্রশমিত হ’লেও তা যে চিরকালের জন্য নয়—ইহা বলাই বাহুল্য । কেননা সমস্যা যার দ্বারা রচিত বা গঠিত সেই বস্তুটী জ্ঞান, ইচ্ছা ও ক্রিয়াসত্ত্বা সম্পন্ন অর্থাৎ চেতন ।
     “ভাত কাপড়ের সমস্যা কিছু সমস্যাই নয়” । যে দেশে ভাত-কাপড় আছে, প্রচুর অর্থাদি আছে, তারাও সমস্যার হাত এড়াতে পারেন নাই । অশান্তি সেখানেও কম নয় । বর্ত্তমানে আমেরিকা সর্ব্বাপেক্ষা সমৃদ্ধশালী দেশ ; কিন্তু সেদিকে একটু দৃষ্টি দিলেই দেখবেন—সেখানকার সবচেয়ে যাঁরা ধনী বলে প্রসিদ্ধ তাঁদের মধ্যে যাঁরা সর্ব্বপ্রকার ভোগৈশ্বর্য্যে ডুবে আছেন, তাঁদের আত্মহত্যার সংখ্যা পৃথিবীর সব দেশের রেকর্ড ভঙ্গ করছে । অতএব দেখতে হবে গলদ কোথায় ? অন্নহীনের কাছে অন্নের আশা বা শান্তিহীনের কাছে শান্তির আশা যেমন অর্থহীন, সমস্যাগ্রস্ত জীবের কাছে সমস্যার সমাধানের আশাও তদ্রূপ অমূলক । কিন্তু সকল সমস্যার সমাধান প্রদান করেছেন সর্ব্বতত্ত্বজ্ঞ ভগবান্ বেদব্যাস—ঋষিনীতির সর্ব্বোচ্চ শৃঙ্গে অবস্থিত পুরাণসূর্য্য শ্রীমদ্ভাগবত বা শ্রীমদ্ভগবদগীতার মাধ্যমে ।
     শ্রীমদ্ভগবদগীতা বা শ্রীমদ্ভাগবত—সমস্যার চরম অবস্থার সমাধান প্রদানের জন্য আবির্ভূত । আমরা মহাত্মা ভীষ্ম-বাক্যে জানতে পারি, মহাবীর অর্জ্জুন—যিনি এক মূহুর্ত্তের মধ্যে অষ্টাদশ অক্ষৌহিনীপূর্ণ সমস্ত সমর-ক্ষেত্রের সমাধান এনে দিতে পারেন,—তিনি যখন সর্ব্ববল সম্পন্ন, নিগ্রহ অনুগ্রহ সমর্থ হয়েও নিজেই সমস্যার সমাধানে ব্যাকুল—তখনই শ্রীমদ্ভগবদগীতার আবির্ভাব । অপরপক্ষে যিনি দেশের সমস্ত সমাধানের মালিক, হর্ত্তা-কর্ত্তা, বিধাতা বলিয়া পূজিত, তিনি যখন বুঝতে পারলেন, সাতদিনের নোটীশে এ জগৎই ছেড়ে যেতে হবে—তখন তাঁর সমস্যার গুরুত্বের কথা ভেবে দেখুন ; দেখবেন—সমস্ত সমস্যার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে তাঁর সমস্যায় ; সেই সময় যিনি সুষ্ঠুরূপে সমাধান দিতে আবির্ভূত—তিনিই “শোকমোহভয়াপহা” শ্রীমদ্ভাগবত ।
     শ্রীমদ্ভাগবত বা শ্রীমদ্ভগবদগীতা কোন সাম্প্রদায়িক ভাবধারা পোষণ করেন নাই । সার্ব্বজনীন ভাবে আমাদের সমাধান প্রদান করেছেন । সর্ব্বপ্রকার সমস্যাগ্রস্ত হলেও যে বস্তু আমাদিগকে প্রকৃত শান্তি প্রদান করতে পারে, তাই প্রদান করেছেন । এইজন্য ঐ দুই সূর্য্য সর্ব্বদেশে সর্ব্বকালে এখনো সসম্মানে বিরাজিত ।
     শ্রীমদ্ভাগবতের কথাই ধরুন । পরীক্ষিত মহারাজ যখন চরম বিপদাবস্থা (?) প্রাপ্ত এবং বিভিন্ন মনীষী—ঋষিগণের বিভিন্ন মতবাদে কিংকর্ত্তব্যবিমূঢবস্থায় মহাচিন্তান্বিত হয়ে পড়েছেন, তখনই যদৃচ্ছাগত শুকদেবের আগমন । পরীক্ষিতের প্রশ্ন কিছু দল বিশেষের বা জাতি বিশেষের প্রশ্ন নয়—শুধু মানুষেরও নয়—সমস্ত জীব-চৈতন্যের প্রশ্ন । সেই চরম মূহুর্ত্তে তাঁর একমাত্র প্রশ্ন—কি প্রকার অনুষ্ঠানের দ্বারা এই অত্যল্প সময়ে পরমমঙ্গল—পরাশান্তি লাভ করতে পারা যায় । কিভাবে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ শ্রেয়ঃ-লাভ করা সম্ভব ?
     সমস্যাযুক্ত পরীক্ষিৎ—সমাধান প্রদাতা শুকদেব । একজন সমস্যার চরমবস্থায় উপনীত, অপর জন—সমাধানের চরমাবস্থালব্ধ । এ বিষয়ে শ্রীমদ্ভাগবতের আখ্যায়িকা পাঠ করলে আরও সবিশেষ জানতে পারবেন ।
     পরীক্ষিতের প্রশ্ন শুনে সন্তুষ্ট হয়ে আব্রহ্মস্তম্ভপূজিত আত্মারাম শ্রীশুকদেব বলেছেন, "হে রাজন ! আপনার এই প্রশ্ন শুধু আপনারই নয়, ইহা সমস্ত জগতের প্রশ্ন এবং ইহাই প্রকৃত প্রশ্ন ।"

“শ্রোতব্যাদীনি রাজেন্দ্র ! নৃণাং সন্তি সহস্রশঃ ।
অপশ্যতামাত্মতত্ত্বং গৃহেষু গৃহমেধিনাম্ ॥”

(শ্রীমদ্ভাগবত ২/১/২)

     এ জগতের পশু, পক্ষী, কীট, পতঙ্গ, হতে বিভিন্ন স্তরের মানব পর্য্যন্ত সকলেই নিজ প্রয়োজনে ব্যস্ত, আহার নিদ্রা ইন্দ্রিয়তর্পণ প্রভৃতিই এদের প্রয়োজন, আর প্রয়োজনের খাতিরেই যত সমস্যার উৎপত্তি । কিন্তু এরা সকলেই অনাত্মবিৎ । কেন না আত্মবিতের প্রোগ্রাম একটিই । যারা নিজেকে দেখতে পায়নি—যারা নিজের প্রয়োজন দেখতেই শেখেনি—তারাই স্বীকার করবে ঐগুলিকে প্রয়োজন বলে । কিন্তু যারা নিজেকে জানে, নিজের প্রয়োজন যথাযথ ভাবে জানে, তারা আপনার এই প্রশ্নকেই প্রকৃত প্রশ্ন বা একমাত্র প্রশ্ন বলে স্বীকার করবে । অনাত্মবিতের প্রোগ্রাম চিরদিনই আগের জন্য booked হয়ে থাকবেই, কেন না তারা—“গৃহেষু গৃহমেধিনাম ।"
     আত্মবিৎ-এর একমাত্র প্রোগ্রাম—অবিদ্যার হাত হতে উদ্ধার পাওয়া যে ব্যক্তি জলে ডুবে গেছে তার প্রোগ্রাম্—তার সমস্ত চেষ্টাই হবে কিভাবে বাঁচতে পারা যায় । এজগতের উন্নতির জন্য যত প্রকার বহির্ম্মুখী প্রচেষ্টাই চলুক্—সমস্ত প্রচেষ্টাই মৃত্যুর এপারে থেকে যাবে । “অজ্ঞানেনাবৃতম্ জ্ঞানং তেন মুহ্যন্তি জন্তবঃ ।” কেবল মোহগ্রস্ত হয়ে দেহ হতে দেহে ছুটাছুটি করা আর জ্বালা যন্ত্রণা ভোগ করা ছাড়া অনাত্মবিদের অন্য কোন ফলই লাভ হয় না । সমস্ত চেতনই অজ্ঞানের দ্বারা আবৃত হয়ে দেহাদ্যহং বুদ্ধি নিয়ে অনন্তকাল ধরে জন্ম মৄত্যুর অধীনে ঘুরে বেড়াচ্ছে । এই অবস্থার হাত হতে immediate relief (তাৎক্ষণিক মুক্তি) অর্থবল, জনবল, সমরোপকরণ যতই বাড়ুক্ না কেন তার দ্বারা পাওয়া যাবে না । বাড়ী-ঘর, ধন-দৌলত, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব—কিছুই আমার নয় । এমনকি দেহটাও নয় । এ দেহাদিতে ‘আমি’ বা ‘আমার’ বুদ্ধিই—পশুবুদ্ধি । যতদিন এই গুলিতে আমি বা আমার বুদ্ধি থাকবে, ততদিন আমার সমস্যাও থাকবেই । জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি—ততদিন আমাকে ভেল্কি লাগিয়ে দেহ হতে দেহান্তরে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াবে ; এবং তাদের হাত হতে রেহাই পাবার পথও ঐ ভাবে অনন্তকালেও আবিষ্কার করতে পারা যাবে না ।
     শ্রীমদ্ভাগবত বলেছেন—তোমরা ভাল করে সমস্যা দেখতেই শেখ নাই । সমস্যা দেখার পথ হচ্ছে—‘স্বপ্নে যথা শিরশ্ছেদঃ ।’ যে ব্যক্তি ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্নে ‘বাঘে ধরেছে’ বলে চিৎকার করে, তাকে জাগিয়ে দিলেই সমাধান হয়ে যায় ; জাগলেই সে দেখবে সবই ঠিক আছে । দেখবে যে জন্য দিবারাত্র relief-এর আশায় সহস্র প্রোগ্রামের মধ্যে ডুবে থাকতে হয়—সে গুলি কাহারও problem নয় । শুকদেব বলেছেন—‘ত্বন্তু রাজন্ মরিষ্যেতি পশুবুদ্ধি’—অর্থাৎ মরাটা animal conception তুমি মর না—won’t die, হাজার রকমের সমস্যা তোমার নাই । Back to God—আত্মস্থ হও । ‘মুক্তির্হিত্বান্যথারূপং স্বরূপেণ ব্যবস্থিতিঃ’—অন্যথারূপ পরিত্যাগ কর । তুমি চিদাকাশের মেম্বার । যেটিকে তুমি অমৃত বলে ভাবছো—সেটা বিষ । যেটিকে তুমি সুখ-দুঃখ আমার-তোমার বলে মনে করছ সেগুলি কিছুই নয় । সমস্তই অবিদ্যা । “অসতো মা সদ্গময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়”; অবিদ্যাকে পিছনে ফেলে আলোর দিকে এগিয়ে চল । জড় হতে চেতনের দিকে অভিযান কর—আবর্জ্জনার হাত হতে বাঁচবে,—‘To make the best of a bad bargain.’
      প্রাচ্য হ’তে পাশ্চাত্য জগতের সমস্ত আত্মানুভবকর্ত্তৃগণের মুখে ঐ এক কথা । সকলেই বলেন—চিলের পিছনে না ছুটে একবার কানে হাত দিয়ে দেখ । বেদাদিতে অবিদ্যাগ্রস্ত জীবগণকে—বিক্ষিপ্তমতি পাগলকে ‘self centre’ করার জন্য বহুপ্রকার সংস্কারের উল্লেখ রয়েছে । অসংস্কৃত জীবকে সেই সমস্ত সংস্কারের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করে আত্মজগতে উন্নীত করতে পারলেই সে তখন নিজের নিজত্ব উপলব্ধি করতে পারে । “যতো যতো নিশ্চলতি মনশ্চঞ্চলমস্থিরন্ । ততো ততো নিয়ম্যেতদাত্মন্যেব বশং নয়েৎ ॥” সর্ব্বপ্রকারের চেষ্টাই হচ্ছে—shadow (ছায়া) হতে substance (বস্তু)-এর দিকে—phenomena (দৃশ্য) হতে reality (বাস্তব)-এর দিকে—একমুখী অভিযান এবং একেই বলে প্রকৃত ভূতশুদ্ধি । ভূতশুদ্ধি হলেই সব সমাধান হয়ে যাবে ।
     ...শুদ্ধজ্ঞানে এখানকার অবস্থিতি নাকচ্ করতে পারলেও ভাবী জগতের সম্বন্ধে বা প্রাপ্তি বিষয়েও আবার সমস্যা এসে পড়ে । অতএব এখন সেই সম্বন্ধে যৎসামান্য বলে আমার বক্তব্যের উপসংহার করছি ।
     জড় হ’তে চেতনের দিকে অভিযান ব্যাপারে বিভিন্ন আচার্য্যগণের বিভিন্ন পন্থা দেখা যায় । কিন্তু মহাকাশের নক্ষত্র-সমূহ এখান হ’তে একই plane-এ দেখা গেলেও তাদের তফাৎ যেমন বহু সহস্র light-year তদ্রূপ আচার্য্যগণের দানেরও প্রচুর তারতম্য বিদ্যমান । আর সেইগুলি যথাযথ ভাবে বুঝতে পারলে তখন শ্রীচৈতন্যদেবের দানের বৈশিষ্ট্য আমাদের হৃদয়ঙ্গম হবে । শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের রামানন্দ সংবাদে আমি আমার এই সমস্ত বিষয়ের সমাধান সুন্দররূপে পেয়েছি । আপনারা সদনুগত হয়ে চরিতামৃতের অষ্টম অধ্যায়টি পাঠ করলেই পরিষ্কার বুঝতে পারবেন ।
     প্রাপ্তির স্তরভেদানুসারে প্রাপ্ত্যুপায়েরও স্তরভেদ রয়েছে । আচার্য্যগণও সে বিষয়ে নিজ নিজ অনুভূতি ও নিষ্ঠানুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন আলোক সম্পাতের দ্বারা জীবজগতের শুভাকাঙ্খা করেছেন । কিন্তু শ্রীচৈতন্যদেবের মহাবদান্যতার অপূর্ব্ব প্রভায় সমস্তই পরিপূর্ণ ম্লানতা প্রাপ্ত । অনাদিরাদি পরমেশ্বর সর্ব্বকারণ-কারণ সচ্চিদানন্দময় ভগবান নিজেকে নিঃশেষে বিতরণ করবার জন্য—সাধ্যের চরমপ্রাপ্তির উপায় যখন নিজমুখে কীর্ত্তন ও নিজে আচরণমুখে শিক্ষাপ্রদানপূর্ব্বক স্বরূপ প্রকট করেন, তখনই তাঁর কৃপায় তাঁকে ‘স্বভজন-বিভজন-প্রয়োজনাবতারী ভগবান’ রূপে অনুভব হয় এবং তখনই শ্রীরূপোক্ত প্রণাম মন্ত্রে—“নমো মহাবদান্যায় কৃষ্ণপ্রেম-প্রদায়তে । কৃষ্ণায় কৃষ্ণচৈতন্যনাম্নে গৌরত্বিষে নমঃ”—নিজেকে নিবেদন করে ধন্য হতে পারি । সেই শ্রীচৈতন্য শিক্ষামৃতের নির্য্যাসের উৎকর্ষতাই ধারাবাহিকরূপে আমরা রামানন্দ সংবাদে সংক্ষেপে দেখতে পাই ।
     নরলীল মহাপ্রভু বললেন—“পড় শ্লোক সাধ্যের নির্ণয় ।” কিসের জন্য জীবসকল নিজের সমস্ত চেষ্টাকে নিয়োজিত করবে, সেইটি তুমি ‘authority’ (শাস্ত্রযুক্তি) দ্বারা প্রমাণ কর । এই সাধ্যবিষয়ে প্রশ্নটুকু বহুজন্মের ভাগ্যফলে জীবের হৃদয়ে উদিত হয় । বেদান্তদর্শনের “অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা” এই প্রথম সূত্রের ভাষ্যপ্রসঙ্গে আচার্য্যগণ আমাদিগকে সেকথা বিশদ ও স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন । মহাপ্রভু এখানে সেই প্রশ্নের উত্তর খোলাখুলি ভাবে রামরায়ের কাছ হতে শুনতে চাচ্ছেন । কেন ? “স যৎপ্রমাণং কুরুতে লোকস্তদনুবর্ত্ততে ॥" আবার শুধু মুখের কথাতেই নয় শাস্ত্র যুক্তির দ্বারা authority-র দ্বারা প্রমাণ করতে বলছেন । রামানন্দ রায়ও মহাপ্রভুর কথার উওর প্রদানমুখে সেইরূপ গম্ভীর বিভিন্ন মতবাদের উত্থাপন ও সমাধান করতে করতে ক্রমশঃই চরমসাধ্যের শেষ সীমায় উপনীত হচ্ছেন ।
     “রায় কহে—স্বধর্ম্মাচরণে বিষ্ণুভক্তি হয় ।” স্বধর্ম্ম কি ?—বর্ণাশ্রম বিহিত নিজের কর্ত্তব্য পালন । সাধ্য—বিষ্ণুভক্তি । বিষ্ণু কে ? বিশ্বং ব্যাপ্নোতি । ক্ষেত্রের মধ্যে ক্ষেত্রজ্ঞ, শরীরের মধ্যে আত্মা—আর আত্মার আত্মা হচ্ছেন বিষ্ণু । তিনিই owner (মালিক), সমগ্র জগতের internal substance (আন্তর নির্য্যাস) । “অনোরণীয়ান্ মহতো মহীয়ান্ ।” তাঁকে পরিতুষ্ট করাই সাধ্যতত্ত্ব । রায় রামানন্দ এখানে নীতিবাদিগণের পক্ষ অবলম্বন করে বর্ণধর্ম্ম ও আশ্রম ধর্ম্ম পালনের দ্বারাই সেই বিষ্ণুভক্তি হয় বলে সাধ্যপ্রমাণ বললেন । কিন্তু বর্ণাশ্রমের মাধ্যমে সম্বন্ধোপলব্ধি ব্রহ্মাণ্ডান্তর্গত বলে মহাপ্রভু বললেন, “এহো বাহ্য আগে কহ আর ।” অর্থাৎ এগুলি অত্যন্ত বহির্ম্মুখদের জন্য । এটি ছ’মাসের রাস্তা ; অতএব direct approach (সরাসরি পাওয়া)-এর কথা বল । তখন "রায় কহে, 'কৃষ্ণে কর্ম্মার্পণ সাধ্য সার' ॥ প্রভু কহে, 'এহো বাহ্য আগে কহ আর ।' রায় কহে, 'স্বধর্ম্মত্যাগ এই সাধ্য সার ॥' প্রভু কহে, 'এহো বাহ্য আগে কহ আর ।' রায় কহে, 'জ্ঞানমিশ্রাভক্তি সাধ্যসার ॥'" ...কর্ম্মমিশ্রাভক্তি নৈষ্কর্ম্ম্য বা জ্ঞানমিশ্রাভক্তি ইহার কোনটাই প্রকৃত সাধ্য বা সাধন নহে । উত্তরোত্তর advance stage (উন্নতর স্তর)-এর কথা থাকলেও প্রত্যেকটিতেই নিজের বুঝ্দার বা মাপদার ভাব রয়েছে । প্রত্যেকটিতেই মায়ার স্পর্শ আছে । কিন্তু যখন "রায় কহে, 'জ্ঞানশূন্যাভক্তি সাধ্যসার ।’ তখন মহাপ্রভু বললেন—'এহো হয়'" অর্থাৎ এইবার প্রকৃতপথে আসা হয়েছে । জ্ঞানশূন্যাভক্তি থেকেই প্রকৃত ভক্তির আরম্ভ । বাইবেলেও দেখা যায়, জ্ঞানবৃক্ষের ফলই পতনের কারণ । সব জিনিষ আমার বোঝা চাই—এটা অগ্রাহ্য করতে হবে । যেহেতু মেপে নেওয়া বুদ্ধিই দুষ্ট বুদ্ধি । আমার এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের দ্বারা তাঁকে ত’ দূরের কথা, একটু অণু-পরমাণুকে মেপে শেষ করার ক্ষমতা নাই । এইজন্য ভাগবতের প্রমাণ দিয়ে বললেন—“জ্ঞানেপ্রয়াসমুদপাস্য নমন্ত এব জীবন্তি ।” তোমার বুঝে নেবার কতটুকুই বা ক্ষমতা আর কিই বা বোঝ । তোমার চেয়ে কোটীগুণ অনন্তগুণ তোমার মঙ্গল বুঝবার লোক আছে ; তুমি কেবল তোমার বুঝদার ভাবকে (উদপাস্য) ঘৃণাপূর্ব্বক পরিত্যাগ করে “নমন্ত এব জীবন্তি” এই পন্থা অবলম্বন কর । দেখবে—বিদ্যুদযানের মত লিফটের মত বৈকুণ্ঠ ভূমিকায় তুমি উন্নীত হয়ে যাবে । যেটি তোমার বাধক ছিল, দেখবে সেইটাই তোমার সাধক হয়েছে । আর কি “সম্মুখরিতাং ভবদীয় বার্ত্তাম্” । Submissive hearing (বিনম্র শ্রবণ) দিতে শিখলেই দেখবে, তোমার চুরাশী লক্ষ যোনি ভ্রমণ শেষ হয়ে গেছে । আর hearing (শ্রবণ) দিতে হবে ; কোথায় ? যিনি properly guide (যথাযথ মার্গদর্শন) করতে পারেন তাঁর কাছে । প্রকৃত পক্ষে proper guidence (পথ প্রদর্শন) দরকার । এটাই তোমায় বাঁচাবে । “স্থানে স্থিতাঃ” তুমি যে কোন অবস্থাতেই থাক, সেইখান হতেই attend (যোগ দাও) কর—দেখবে সব পরিষ্কার হয়ে গেছে । কেন না সাধুমুখ নিঃসৃত ভগবৎ কথাই একমাত্র বাঁচাতে পারে । যিনি এইভাবে চলেন, তাঁর দ্বারা ভগবান যতই দুর্ভেদ্য, দুর্ল্লভ, অজিততত্ত্ব হোন না কেন—জিত হন । ভগবদুক্তির সর্ব্বত্রই রয়েছে—“ভক্ত্যাহমেকয়াগ্রাহ্যঃ” । সাধুসঙ্গে জ্ঞানশূন্যা ভক্তির আশ্রয়ে অত্যন্ত সাধারণ লোকেরও ভগবৎপ্রাপ্তি হয়, অন্যথায় intellectual giant (বুদ্ধি পারঙ্গত)-ও পারে না । এইজন্য বলদেব বিদ্যাভূষণ বেদান্তের ভাষ্যে সাধুসঙ্গের কথা প্রমাণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন । সাধু হচ্ছেন living source (জীবন্ত উৎস) । কোন গুণ না থাকলেও সাধুসঙ্গের প্রভাবে “সর্ব্বৈগুণৈস্তত্রসমাসতে ।” সাধুসঙ্গের প্রভাবে অত্যন্ত ঘৃণ্যকেও ভগবৎ সেবোপকরণ করে তোলে । পূজ্য বা সেব্য-দর্শনই প্রকৃত বৈকুণ্ঠ-দর্শন । Miss Mayo প্রভৃতি অনেকেই এই পূজ্য জিনিষের কদর্য্যভাব প্রচার করলেও প্রকৃতপক্ষে তারা পূজার বাতাস পর্য্যন্ত পায় নাই ; পূজ্য তত্ত্ব হতে তারা চিরদিনই সহস্র সহস্র যোজন দূরে থাকবে । প্রকৃত পূজ্য বুদ্ধি নিয়ে যে approach করতে পারে, তার কোন ভয়ই থাকে না । ভয় নিজেই তাকে দেখে পালিয়ে যায় । যার আশ্রয়ে থাকলে সমস্ত কুৎসিৎ ভাব সমস্ত কুৎসিৎ বিচার প্রকৃষ্টরূপে ধ্বংস হয়ে যায়—সেই পূজ্যবুদ্ধিই মায়িক দর্শন হতে নিষ্কৃতি পাবার একমাত্র উপায় । ভাগবতের “বিক্রীড়িতং ব্রজবধূ” শ্লোকে আমরা সেই শিক্ষাই লাভ করি । তোমার কুদর্শন, তোমার ব্যাধি, তোমার heart disease (হৃদ রোগ) কাম—একবারে সেরে যাবে, যদি পূজ্য-বুদ্ধির আশ্রিত হতে পার । যাঁরা লিঙ্গপুরাণাদি রচনা করেছেন, তাঁদের কি তোমার মত এটুকু কাণ্ডজ্ঞানও ছিল না—না, তোমার চেয়ে তাঁদের বিদ্যা, বুদ্ধি কিছু কম ছিল ? কিন্তু তবুও তাঁরা লিখেছেন—তবুও তাঁরা শোক-মোহ দ্বন্দ্বাতীত ভুমিকা হতে আমাদের মঙ্গলের জন্যই লিখেছেন—কেন ? না আমাদের জুজুর ভয় হতে রেহাই দেবার জন্য—আমাদের ভোগ্যদর্শনের চির সমাধি দেবার জন্য—আমাদের প্রাকৃত বিচার নিরাশ করার জন্য । পাছে জীবের ভগবত্তত্ত্বে প্রাকৃত ভাব আসে, সেইজন্য ব্রহ্মজ্ঞ আত্মারাম শুকদেবগোস্বামী অত্রি, বশিষ্ঠ, চ্যবন, অগস্ত্য, প্রভৃতি প্রধান প্রধান ধর্ম্মনেতৃবর্গের মহান সভায় প্রথমেই নিজের পরিচয় প্রদানমুখে সাবধান করে দিচ্ছেন যে—নির্গুণে পরিনিষ্ঠিত আমার পরিচয় আপনারা সকলেই জানেন, অতএব মনে রাখবেন—আমার মত ব্যক্তিও যাঁর চরিতগাথায় মুগ্ধ হয়ে, আকৃষ্ট হয়ে সমস্ত ভুলেছে, তাহা প্রাকৃত পুরুষের কামময়ী চরিতগাথা বিশেষ বা সাধারণ কথা নহে । আমি এ দুনিয়ার কিছু বলি না বা বলবো না বা বলছি না । আমি সেই বস্তুর কথা আপনাদের পরিবেশন করছি যাঁর চরণে অর্পণ বিনা "তপস্বিনো দানপরা যশস্বিনো, মনস্বিনো মন্ত্রবিদঃ সুমঙ্গলাঃ” কোন মঙ্গলই লাভ করতে পারে না । এই বলে তিনি তুরীয় ভূমিকার অবতারণা করলেন । অতএব যারা প্রাকৃত বুদ্ধিতে কৃষ্ণকে বা তদীয় লীলাকে দর্শন করেন, তারা শুধু বঞ্চিতই হন না, পরন্তু মহা অপরাধ করেন এবং তাঁদের কাছে শ্রীচৈতন্যদর্শন চিরদিনই আত্মগোপন করে থাকেন ।
     ভগবান তুরীয় বস্তু । তাঁর সমস্তই “সত্যং শিবং সুন্দরম্” । শ্রীচৈতন্যদেব সর্ব্বতোভাবে সেই সুন্দরেরই আরাধনার কথা জগৎকে জানিয়েছেন, আর তাঁর আরাধনা প্রণালীও এরূপ সুন্দর যে, যে কোন ব্যক্তি শ্রীচৈতন্যপ্রদর্শিত পন্থায় “গোবিন্দাভিধমিন্দিরাশ্রিতপদং হস্তস্থরত্নাদিবৎ” লাভ করতে পারে । ভগবান তার ক্রীড়াপুত্তলী হয়ে যান । এবং সেইখানেই সর্ব্বতন্ত্র স্বতন্ত্র ভগবানের ভগবত্তার চরমপ্রকাশ । সেইজন্য কবিরাজ গোস্বামী বলেছেন—“কৃষ্ণের যতেক খেলা সর্ব্বোত্তম নরলীলা ।” ভগবৎ স্বরূপের fullest adjustment (পরিপূর্ণ সমন্বয়) হচ্ছে—‘সর্ব্বোত্তম নরলীলা’,—যেখানে তাঁকে “অতুলং শ্যামসুন্দরম্” রূপে ‘all accommodative’ রূপে পেয়ে ভক্তগণ আশ্রিতগণ নিত্যকাল পূর্ণ পঞ্চরসে সেবা করেন এবং তাহাই চরম প্রাপ্তিসীমা । “যং লব্ধ্বা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ ।” শ্রীচৈতন্যচন্দ্র সেই সুদুর্ল্লভ বস্তুকে—অসাধ্যধনকে অত্যন্ত সুলভ করে দিয়েছেন, এইজন্য তিনিই একমাত্র মহাবদান্য । এইজন্যই শ্রীল প্রবোধানন্দ সরস্বতীপাদ অত্যন্ত কাকুতি করে মিনতি করে জগৎ জীবকে তাঁর চরণে শরণাগতি বিধানের জন্য কাতর আহ্বান করে বলেছেন—

দন্তে নিধায় তৃণকং পদয়োর্নিপত্য
কৃত্বা চ কাকুশতমেতদহং ব্রবীমি ।
হে সাধবঃ ! সকলমেব বিহায় দূরাৎ
চৈতন্যচন্দ্রচরণে কুরুতানুরাগম্ ॥

 


 

← ২. জীবের চরম প্রাপ্তি ৪. পরমার্থ লাভের পন্থা →

 

সূচীপত্র:

শ্রীশ্রীগুরু-গৌরাঙ্গ-প্রণতি
নম্র নিবেদন
প্রণতি-দশকম্
শ্রীগুরু আরতি-স্তুতি
শ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ সম্পর্কে
১। আত্মতত্ত্ব ও ভগবৎ-তত্ত্ব
২। জীবের চরম প্রাপ্তি
৩। সমস্যা ও সমাধান
৪। পরমার্থ লাভের পন্থা
৫। বন্ধন মুক্তির উপায়
৬। বৈষ্ণব জীবনে আনুগত্য
৭ । ধর্ম্ম শিক্ষা ও বিশ্বাস
৮ । শ্রীশরণাগতি
৯ । বজীবের স্বাধীন ইচ্ছার নিশ্চয়াত্মক স্বার্থকতা
১০ । সর্ব্বাবস্থায় ভগবানের কৃপাদর্শনেই প্রকৃত সুখ লাভ
১১ । মানব জীবনের কর্ত্তব্য
১২ । ভগবানের সঙ্গে যোগাযোগের উপায়
১৩ । আগুন জ্বালো, বাতাস আপনি আসবে
১৪ । মা মুঞ্চ-পঞ্চ-দশকম্


PDF ডাউনলোড (26.7 Mb)
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥