শ্রীগুরুভক্তি

 

 

      শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণাদি সকল শাস্ত্রেই গুরুভক্তি কথা স্পষ্টরূপে ঘোষণা করিয়াছেন । শাস্ত্রকারগণ বলেন—সেই 'শাস্ত্র'—শাস্ত্র নহে, যাহাতে ভগবৎভক্তি নাই এবং সেই ভগবদ্ভক্তি—ভক্তি শব্দবাচ্য নহে যদি তাহা গুর্ব্বানুগত্যময় না হয় ।

      উপনিষদে গুরুর লক্ষণ এরূপ বলেছেন, যথা—

"শ্রোত্রিয়ং ব্রহ্মনিষ্ঠম্" ॥

মুণ্ডক ১।২।১২

      শ্রীমদ্ভাগবতে গুরুর লক্ষণ এরূপ বর্ণন করেছেন যথা—শাব্দে পরে চ নিষ্ণাতং ব্রহ্মন্যুপসমাশ্রয়ম্ ।

      অর্থাৎ শ্রুতিশাস্ত্র—সিদ্ধান্তে নিপুণ ও পরব্রহ্মে নিষ্ণাত অর্থাৎ ভগবৎতত্ত্বজ্ঞ, তিনিই প্রকৃত গুরু ।

      কলিযুগপাবনাবতারী শ্রীমন্ গৌরসুন্দরের উপদেশ বাক্যে ও শ্রীল কবিরাজ গোস্বামীর লেখনীতেও গুরুর লক্ষণ এরূপ বর্ণিত আছে যথা—

কিবা বিপ্র কিবা ন্যাসী শূদ্র কেনে নয় ।
যেই কৃষ্ণ তত্ত্ববেত্তা সেই গুরু হয় ॥

চৈঃ চঃ ২।৮।১২৭

আপনে আচরি কেহ না করে প্রচার ।
প্রচার করেন কেহ না করেন আচার ॥
আচার প্রচার নামের করহ দুই কার্য্য ।
তুমি সর্ব্বগুরু তুমি জগতের আর্য্য ॥

চৈঃ চঃ ৩।৪।১০২-১০৩

      উপরিলিখিত লক্ষণ যুক্ত শ্রীগুরুপাদপদ্মের সেবা করিলে অধোক্ষজ শ্রীভগবান, ভক্তের হৃদয়ে অবরুদ্ধ হইয়া থাকেন । যেমন জহুরীর সাহায্য ব্যতীত জহরতের পরিচয় পাওয়া যায় না এবং প্রকৃত জহরৎ গ্রহণ করিতে হইলে প্রকৃত জহুরীর আশ্রয় গ্রহণ করিতে হয় এবং উপযুক্ত মূল্যাদির দ্বারা তাহা যেমন লাভ হয়, তদ্রূপ যদি কোন ব্যক্তির ভগবৎভক্তি লাভ করিবার পিপাসা হৃদয়ে থাকে তবে তিনি শাস্ত্রীয় লক্ষ্মণযুক্ত প্রকৃত সদ্গুরুপাদপদ্ম-আশ্রয় গ্রহণ করিবেন এবং নিষ্কপট গুরু-সেবাবৃত্তিরূপ মূল্যের দ্বারা ভগবৎ ভক্তি লাভ করিবেন ।

      সাধারণতঃ দুই প্রকারের ব্যক্তিগণ প্রকৃত গুরুভক্তি হইতে বঞ্চিত হইয়া ভগবদ্ভক্তি লাভ করিতে পারেন না ; প্রথম প্রকার ব্যক্তিগণ অনভিজ্ঞতা বশতঃ প্রকৃত সদ্গুরুর স্বরূপ নির্ণয় করিতে অসমর্থতাহেতু বঞ্চিত হন ; দ্বিতীয় প্রকার ব্যক্তিগণ অর্থাৎ যাঁহারা পূর্ব্ব পূর্ব্ব জন্মের পুঞ্জীভূত সুকৃতিফলে সৌভাগ্যক্রমে সদ্গুরু সেবাসুযোগ লাভ করিয়াছেন তাঁহারা অপ্রাকৃত শ্রীগুরুপাদপদ্মে মর্ত্ত্যবুদ্ধি বশতঃ অপ্রাকৃত শ্রীগুরুদেবকে দেখাইয়া নিজসেবার উপায়ন ও জড়ীয় প্রতিষ্ঠা সংগ্রহের দ্বারা প্রকৃত উদ্দেশ্য ও তত্ত্ববস্তু হইতে বঞ্চিত হইয়া থাকেন ।

      অতএব যাঁহারা প্রকৃত গুরুভক্তি পরায়ণ বা যাঁহারা গুরুভক্তির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করিয়াছেন বা করিবেন, তাঁহারা তথাকথিত গুরুসেবা বা প্রকৃত গুরুসেবার অভিনয়ে কপটতারূপ নিজসেবা অথবা অপস্বার্থ সংগ্রহ হইতে সত­র্ক হইবেন । প্রকৃত স্নিগ্ধ-শিষ্য ঐকাস্তিকী গুরুভক্তি দ্বারা ভগবজ্জ্ঞান লাভ করিয়া থাকেন । শ্রীগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে উপলক্ষ্য করিয়া জগতে গুরুসেবার আদর্শ স্থাপন করিয়াছেন । বলিয়াছেন "হে অর্জ্জুন ! তুমি প্রণিপাত পরিপ্রশ্ন ও সেবা-বৃত্তিত্রয় লইয়া তত্ত্বদর্শী ব্যক্তির নিকট শরণাগত হও, তিনি তোমায় তত্ত্বজ্ঞান প্রদান করিবেন ।" শ্রীমন্-গৌরাঙ্গসুন্দরের উপদেশ বাক্যে ও শ্রীল কবিরাজ গোস্বামী মহোদয়ের লেখনীতেও এইরূপ দেখা যায় যথা—

তা'তে কৃষ্ণ ভজে করে গুরুর সেবন ।
মায়া-জাল ছুটে পায় শ্রীকৃষ্ণচরণ ॥

      যাহার শ্রীভজবানে ভক্তি বর্ত্তমান এবং যেমন ভগবানে ভক্তি আছে তেমনি অপ্রাকৃত শ্রীগুরুপাদপদ্মেও শুদ্ধাভক্তি বর্ত্তমান, তাহার নিকট শ্রুতি শাস্ত্রাদির গূঢ় মর্ম্মার্থ সমূহ প্রকাশিত হইয়া থাকেন ।

      যাহার ঐকান্তিকী গুরুসেবা-প্রবৃত্তি আছে তিনিই প্রকৃত হরিসেবা করেন, তিনিই সর্ব্বগুণসম্পন্ন এবং তিনিই প্রকৃত বৈষ্ণব ।

      প্রাণহীন ব্যক্তিকে বহুমূল্য অলঙ্কারাদির দ্বারা সজ্জিত করিলে সে যেমন পরিবারবর্গের নকট সুখের পরিবর্ত্তে কেবল দুঃখই প্রদান করিয়া থাকে, তদ্রূপ যাহার গুরুভক্তি নাই, তাহার অলঙ্কারাদিরূপ জাগতিক অন্যান্য সদ্গুণ সমূহও কেবলমাত্র দুঃখপ্রদই হইয়া থাকে ।

      শ্রীগুরুভক্তিপরায়ণ ব্যক্তির যদি ভগবৎপ্রকাশ বিগ্রহ দিব্যজ্ঞানদাতা অপ্রাকৃত শ্রীগুরুপাদপদ্মে প্রাকৃত নরবুদ্ধি হয় শাস্ত্রে তাঁহাকে নারকী বলেছেন এবং তাঁহার শ্রবণাদিরূপ ভজনাঙ্গ সমূহ হস্তী-স্নানের ন্যায় বৃথা হইয়া যায় । অর্থাৎ হস্তী যেমন স্নানের পরক্ষণেই তাহার শুণ্ডের দ্বারা ধূলিকণাদি গ্রহণ করিয়া অপরিষ্কৃত হয়, তদ্রূপ শ্রীভকবানের পরম মঙ্গলময় শ্রবণাদিরূপ ভজনাঙ্গ সমূহ দ্বারা পবিত্রতা উপস্থিত হইলেও শ্রবণাদি আকর বিগ্রহ অপ্রাকৃত শ্রীগুরুপাদপদ্মে মর্ত্ত্যবুদ্ধি মাত্রই প্রাকৃত ভাবসমূহ পূর্ব্ব পবিত্রতাকে আবৃত ও মলিন করিয়া থাকে ।

      পরিশেষে শ্রীগুরুপাদপদ্মে কৃতাঞ্জিপুটে গলবস্ত্রে প্রার্থনা করি যে, গুরুভক্তির বাৎকস্বরূপ কপটতা এবং কপটতারূপ নিজসেবার উপায়াণ সংগ্রহ ও জড়ীয় প্রতিষ্ঠা সংগ্রহরূপ সমস্ত কন্টকরাশি হইতে নির্ম্মুক্ত করিয়া তাঁহার ভৃত্যানুভৃত্যকণের গণে গণনাপূর্বক নষ্কপট ভক্তি প্রদান করুন ।

 


শ্রীগৌড়ীয়-দর্শন, ১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা
৩০শে পুরুষোত্তম, ৩০শে ভাদ্র, ১৬ই সেপ্টেম্বর, শুক্রবার, গৌরাব্দ ৮৬৯, বঙ্গাব্দ ১৩৬২, ইং ১৯৫৫


 

 

← গ্রন্থাগারে ফিরে

HARE KRISHNA HARE KRISHNA KRISHNA KRISHNA HARE HARE | HARE RAMA HARE RAMA RAMA RAMA HARE HARE