শ্রীশ্রীপ্রপন্নজীবনামৃতম্


চতুর্থোঽধ্যায়ঃ

শ্রীভক্তবচনামৃতম্
প্রাতিকূল্য-বিবর্জ্জনম্

 

 

ভগবদ্ভক্তয়োর্ভক্তেঃ প্রপত্তেঃ প্রতিকূলকে ।
বর্জ্জ্যত্বে নিশ্চয়ঃ প্রাতিকূল্যবর্জ্জনমুচ্যতে ॥১॥

শ্রীভগবান্ ও তাঁহার ভক্তের সেবার এবং প্রপত্তিভাবের প্রতিকূল বিষয় বর্জ্জনীয় বলিয়া নিয়মকে ‘প্রাতিকূল্য বিবর্জ্জন’ কহে ॥১॥

প্রাতিকূল্যবর্জ্জনসঙ্কল্পাদর্শঃ—
ন ধনং ন জনং ন সুন্দরীং
কবিতাং বা জগদীশ কাময়ে ।
মম জন্মনি জন্মনীশ্বরে
ভবতাদ্ভক্তিরহৈতুকী ত্বয়ি ॥২॥
শ্রীশ্রীভগবতশ্চৈতন্যচন্দ্রস্য
প্রতিকূল ত্যাগের সঙ্কল্পের আদর্শ—
“হে জগদীশ, আমি ধন, জন বা সুন্দরী কবিতা কামনা করি না ; আমি মনে এই কামনা করি যে, জন্মে জন্মে আপনাতেই আমার অহৈতুকী ভক্তি হউক” ॥২॥
অত্রাপি তথৈব—
নাস্থা ধর্ম্মে ন বসুনিচয়ে নৈব কামোপভোগে
যদ্­যদ্ভব্যং ভবতু ভগবন্ পূর্ব্বকর্ম্মানুরূপম্ ।
এতৎ প্রার্থ্যং মম বহুমতং জন্ম-জন্মান্তরেঽপি
ত্বৎপাদাম্ভোরুহযুগগতা নিশ্চলা ভক্তিরস্তু ॥৩॥
শ্রীকিলশেখরস্য
এখানেও তাহাই—
হে ভগবন্, ধর্ম্ম, অর্থ ও কাম উপভোগে আমার কোন আস্থা নাই । পূর্ব্বকর্ম্মানুসারে যাহা ঘটিবার ঘটুক, কিন্তু আমার সাদর প্রার্থনা এই যে, জন্মে জন্মে আপনার পাদপদ্মযুগলে নিশ্চলা ভক্তি হউক ॥৩॥
হরিসম্বন্ধহীনং সর্ব্বমেব বর্জ্জনীয়ম্—
ন যত্র বৈকুণ্ঠকথা সুধাপগা
ন সাধবো ভাগবতাস্তদাশ্রয়াঃ ।
ন যত্র যজ্ঞেশমখা মহোৎসবাঃ
সুরেশলোকোঽপি ন বৈ স সেব্যতাম্ ॥৪॥
দেবস্তুতৌ
হরিসম্বন্ধহীন মাত্রই বর্জ্জনীয়—
“যেখানে কৃষ্ণকথাসুধাসরিৎ নাই, যেখানে কৃষ্ণাশ্রিত সাধুলোক নাই, যেখানে কৃষ্ণকীর্ত্তনরূপ মহোৎসব হয় না, সে স্থান যদিও সুরেশলোক হয়, সেখানে বাস করিবে না” ॥৪॥
ব্যবহারিক-গুর্ব্বাদয়োঽপি প্রতিকূলং চেদ্ বর্জ্জনীয়া এব—
গুরুর্ন স স্যাৎ স্বজনো ন স স্যাৎ
পিতা ন স স্যাজ্জননী ন সা স্যাৎ ।
দৈবং ন তৎ স্যান্ন পতিশ্চ স স্যা-
ন্ন মোচয়েদ্ যঃ সমুপেতমৃত্যুম্ ॥৫॥
শ্রীঋষভস্য
ব্যবহারিক গুরু প্রভৃতিত্ত প্রতিকূল হইলে অবশ্যই পরিত্যাজ্য—
“ভক্তিপথের উপদেশ দ্বারা যিনি সমুপস্থিত মৃত্যুরূপ সংসার হইতে মোচন করিতে না পারেন, সেই গুরু ‘গুরু’ নহেন, সেই স্বজন ‘স্বজন’-শব্দবাচ্য নহেন, সেই পিতা ‘পিতা’ নহেন অর্থাৎ তাঁহার পুত্রোৎপত্তিবিষয়ে যত্ন করা উচিত নহে, সেই জননী ‘জননী’ নহেন অর্থাৎ সেই জননীর গর্ভধারণ কর্ত্তব্য নহে, সেই দেবতা ‘দেবতা’ নহেন অর্থাৎ যে সকল দেবতা জীবের সংসার মোচনে অসমর্থ, তাঁহাদিগের মানবের নিকট পূজা গ্রহণ করা উচিত নহে, আর সেই পতি ‘পতি’ নহেন অর্থাৎ তাঁহার পাণিগ্রহণ করা উচিত নহে” ॥৫॥
সর্ব্বেন্দ্রিয়ৈরেব প্রতিকূলবর্জ্জনে সঙ্কল্পঃ—
মা দ্রাক্ষং ক্ষীণপুণ্যান্ ক্ষণমপি ভবতো ভক্তিহীনান্ পদাব্জে
মা শ্রৌষং শ্রাব্যবন্ধং তব চরিতমপাস্যান্যদাখ্যানজাতম্ ।
মা স্প্রাক্ষং মাধব ! ত্বামপি ভুবনপতে ! চেতসাপহ্ণবানান্
মা ভূবং ত্বৎসপর্য্যাপরিকররহিতো জন্মজন্মান্তরেঽপি ॥৬॥
শ্রীকুলশেখরস্য
সর্ব্বেন্দ্রিয়ে প্রতিকূলত্যাগ-সঙ্কল্প—
হে মাধব, তোমার পাদপদ্মে ভক্তিহীন ক্ষীণপুণ্য ব্যক্তিগণের দর্শন আমার কদাপি না ঘটুক, তোমার চরিত-সম্বন্ধ-ব্যতীত অন্য আখ্যানসমূহ আমাকে শুনিতে না হউক । হে ভুবনপতে, তোমাতে অশ্রদ্ধ-ব্যক্তিগণের কোন সংস্পর্শ যেন আমার না হয় এবং জন্মজন্মান্তরেও তোমার সেবাতৎপর পার্ষদের সঙ্গহীন কখনও আমাকে না হইতে হয় ॥৬॥
ব্যবহারিকাদরণীয়ান্যপি তুচ্ছবৎ ত্যাজ্যানি—
ত্বদ্ভক্তঃ সরিতাং পতিং চুলুকবৎ খদ্যোতবদ্ভাস্করং
মেরুং পশ্যতি লোষ্ট্রবৎ কিমপরং ভূমেঃ পতিং ভৃত্যবৎ ।
চিন্তারত্নচয়ং শিলাশকলবৎ কল্পদ্রুমং কাষ্ঠবৎ
সংসারং তৃণরাশিবৎ কিমপরং দেহং নিজং ভারবৎ ॥৭॥
সর্ব্বজ্ঞস্য
ব্যবহারিক আদরণীয় বস্তুসমূহও তুচ্ছবৎ পরিত্যাজ্য—
হে ভগবন্, তোমার ভক্ত সাগরকে গণ্ডূষ, ভাস্করকে খদ্যোতবৎ, সুমেরুকে লোষ্ট্রবৎ, ভূপালকে ভৃত্যবৎ, চিন্তামণিসমূহকে শীলাখণ্ডবৎ, কল্পতরুকে কাষ্ঠবৎ, সংসার-বাসনাকে তৃণরাশিবৎ, এমন কি, নিজ দেহকেও ভারবৎ তুচ্ছ দর্শন করেন অর্থাৎ প্রতিকূলবিষয় সমূহকে এই প্রকার তুচ্ছবোধ করেন ॥৭॥
হরিবিমুখসঙ্গফলস্য অনুভূতি-স্বরূপম্—
বরং হুতবহজ্বালা-পঞ্জরান্তর্ব্যবস্থিতিঃ ।
ন শৌরিচিন্তাবিমুখজনসম্বাস বৈশসম্ ॥৮॥
কাত্যায়নস্য
হরিবিমুখজনের সঙ্গফলের কিঞ্চিৎ অনুভূতি—
“অগ্নির জ্বালার মধ্যে পিঞ্জর-বন্ধন হইতে যে ক্লেশ হয়, তাহা বরং সহ্য করা উচিত, তথাপি কৃষ্ণচিন্তা-বহির্ম্মুখজনের কষ্টকর সঙ্গ কখনই করিবে না” ॥৮॥
অন্যদেবোপাসকানাং স্বরূপ-পরিচয়ঃ—
আলিঙ্গনং বরং মন্যে ব্যালব্যাঘ্রজলৌকসাম্ ।
ন সঙ্গঃ শল্যযুক্তানাং নানাদেবৈকসেবিনাম্ ॥৯॥
কেষাঞ্চিৎ
অন্যদেবের উপাসকগণের স্বরূপ পরিচয়—
বরং সর্প, ব্যাঘ্র ও কুম্ভীরের আলিঙ্গন ঘটুক, কিন্তু নানাদেবোপাসনা-কণ্টকযুক্ত ব্যক্তিগণের সঙ্গ কদাপি না হউক ॥৯॥
ভক্তিবাধকা দোষাস্ত্যাজ্যাঃ—
অত্যাহারঃ প্রয়াসশ্চ প্রজল্পো নিয়মাগ্রহঃ ।
জনসঙ্গশ্চ লৌল্যঞ্চ যড়্­ভির্ভক্তির্বিনশ্যতি ॥১০॥
শ্রীরূপপাদানাং
ভক্তিবাধক দোষগুলি পরিত্যাজ্য—
“অত্যন্ত সংগ্রহে যার সদা চিত্ত ধায় ।
অত্যাহারী ভক্তিহীন সেই সংজ্ঞা পায় ॥

প্রাকৃত বস্তুর আশে ভোগে যার মন ।
প্রয়াসী তাহার নাম ভক্তিহীন জন ॥

কৃষ্ণকথা ছাড়ি’ জিহ্বা আন কথা কহে ।
প্রজল্পী তাহার নাম বৃথা বাক্য কহে ॥

ভজনেতে উদাসীন কর্ম্মেতে প্রবীণ ।
বহ্বারম্ভী সে নিয়মাগ্রহী অতি দীন ॥

কৃষ্ণভক্তসঙ্গ বিনা অন্যসঙ্গে রত ।
জনসঙ্গী কুবিষয়-বিলাসে বিব্রত ॥

নানাস্থানে ভ্রমে যেই নিজ স্বার্থতরে ।
লৌল্যপর ভক্তিহীন সংজ্ঞা দেয় নরে ॥

এই ছয় নহে কভু ভক্তি অধিকারী ।
ভক্তিহীন লক্ষ্যভ্রষ্ট বিষয়ী সংসারী” ॥১০॥
যোষিৎসঙ্গস্য প্রাতিকূল্যম্—
নিষ্কিঞ্চনস্য ভগবদ্ভজনোন্মুখস্য
পারং পরং জিগমিষোর্ভবসাগরস্য ।
সন্দর্শনং বিষয়িণামথ যোষিতাঞ্চ
হা হন্ত হন্ত বিষভক্ষণতোঽপ্যসাধু ॥১১॥
শ্রীশ্রীভগবতশ্চৈতন্যচন্দ্রস্য
যোষিৎসঙ্গের তীব্র প্রাতিকূল্য—
“হায়, ভব-সাগর সম্পূর্ণরূপে পার হইবার যাঁহাদের ইচ্ছা, এরূপ ভগবদ্ভজনোন্মুখ নিষ্কিঞ্চন ব্যক্তির পক্ষে বিষয়ী ও স্ত্রী-সন্দর্শন বিষ ভক্ষণ অপেক্ষাও অসাধু” ॥১১॥
হরিবিমুখস্য বংশাদিষ্বাদরো ভক্তিপ্রতিকূলঃ—
ধিগ্ জন্ম নস্ত্রিবৃদ্­যত্তদ্ধিগ্­ব্রতং ধিগ্বহুজ্ঞতাম্ ।
ধিক্ কুলং ধিক্ ত্রিয়াদাক্ষ্যং বিমুখা যে ত্বধোক্ষজে ॥১২॥
যাজ্ঞিক-বিপ্রাণাং
হরিবিমুখের উত্তম কুলাদিতে আদর ভক্তিপ্রতিকূল—
“আমরা অধোক্ষজ ভগবানের প্রতি বিমুখ হইয়াছি, অতএব আমাদের শৌক্র, সাবিত্র্য এবং দৈক্ষ্য এই ত্রিবিধ জন্ম, ব্রত, বহু শাস্ত্র জ্ঞান, কুল এবং কর্ম্মনৈপুণ্য—সমস্তেই ধিক” ॥১২॥
জড়ে চিদ্­বুদ্ধির্ব্বর্জ্জনীয়া—
যস্যাত্মবুদ্ধিঃ কুণপে ত্রিধাতুকে
স্বধীঃ কলত্রাদিষু ভৌম ইজ্যধীঃ ।
যত্তীর্থবুদ্ধিঃ সলিলে ন কর্হিচি-
জ্জনেষ্বভিজ্ঞেষু স এব গোখরঃ ॥১৩॥
শ্রীশ্রীভগবতঃ
জড়বস্তুতে চৈতন্যবুদ্ধিমাত্রই প্রতিকূল—
“যিনি এই স্থূল শরীরে আত্মবুদ্ধি, স্ত্রী ও পরিবারাদিতে মমত্ববুদ্ধি, মৃণ্ময়াদি জড়বস্তুতে ঈশ্বরবুদ্ধি এবং জলাদিতে তীর্থবুদ্ধি করেন, কিন্তু ভগবদ্ভক্তে আত্মবুদ্ধি, মমতা, পূজ্যবুদ্ধি ও তীর্থবুদ্ধির মধ্যে কোনটীই করেন না, তিনি গরুদিগের মধ্যে গাধা অর্থাৎ অতিশয় নির্ব্বোধ” ॥১৩॥
চিত্তত্ত্বে জড়বুদ্ধির্জড়াধীনবুদ্ধির্বা অপরাধত্বেন পরিবর্জ্জনীয়া—
অর্চ্চ্যে বিষ্ণৌ শিলাধীর্গুরুষু নরমতির্বৈষ্ণবে জাতিবুদ্ধি-
র্বিষ্ণোর্বা বৈষ্ণবানাং কলিমলমথনে পাদতীর্থেঽস্বুবুদ্ধিঃ ।
শ্রীবিষ্ণোর্নাম্নি মন্ত্রে সকলকলুষহে শব্দসামান্যবুদ্ধি-
র্বিষ্ণৌ সর্ব্বেশ্বরেশে তদিতরসমধীর্যস্য বা নারকী সঃ ॥১৪॥
শ্রীব্যাসপাদানাং
পূজ্য চিন্ময়বস্তুতে জড়ধারণা বা জড়াধীন ধারণারূপ অপরাধ বর্জ্জনীয়—
“যে ব্যক্তি পূজার বিগ্রহে শিলাবুদ্ধি, বৈষ্ণবগুরুতে মরণশীল মানববুদ্ধি, বৈষ্ণবে জাতিবুদ্ধি, বিষ্ণু-বৈষ্ণব-পাদোদকে জলবুদ্ধি, সকল কল্মষবিনাশী বিষ্ণু-নাম-মন্ত্রে শব্দসামান্যবুদ্ধি এবং সর্ব্বেশ্বর বিষ্ণুকে অপর দেবতার সহ সমবুদ্ধি করে, সে নারকী” ॥১৪॥
তপঃপ্রভৃতীনাং প্রাতিকূল্যম্—
রহূগণৈতত্তপসা ন যাতি
ন চেজ্যয়া নির্ব্বপণাদ্ গৃহাদ্বা ।
ন চ্ছন্দসা নৈব জলাগ্নিসূর্য্যৈ-
র্বিনা মহৎপাদরজোঽভিষেকম্ ॥১৫॥
শ্রীজড়ভরতস্য
তপঃ প্রভৃতির প্রতিকূলতা—
“হে রহূগণ, মহাজনের পদরজে অভিষেক বিনা ভগবদ্ভক্তি তপস্যা দ্বারা, বৈদিক অর্চ্চনাদি দ্বারা, সন্ন্যাস পালন দ্বারা, গার্হস্থ্য ধর্ম্ম পালন দ্বারা, বেদ পাঠ দ্বারা অথবা জলাগ্নি সুর্য্য দ্বারা কখনই লব্ধ হয় না” ॥১৫॥
অচ্যুতসম্বন্ধহীন-জ্ঞানকর্ম্মাদেরপি প্রাতিকূল্যম্—
নৈষ্কর্ম্ম্যমপ্যচ্যুতভাববর্জ্জিতং
ন শোভতে জ্ঞানমলং নিরঞ্জনম্ ।
কুতঃ পুনঃ শশ্বদভদ্রমীশ্বরে
ন চার্পিতং কর্ম্ম যদপ্যকারণম্ ॥১৬॥
শ্রীনারদস্য
হরিসম্বন্ধশূন্য জ্ঞানকর্ম্মাদির প্রতিকূলতা—
“নৈষ্কর্ম্ম্যরূপ নির্ম্মল জ্ঞানই যখন অচ্যুতভাব বর্জ্জিত হইলে শোভা পায় না, তখন সর্ব্বদা অভদ্র-স্বভাব ঈশ্বরে অর্পিত না হইলে নিষ্কাম হইলেও কিরূপে শোভা পাইবে” ॥১৬॥
যমাদি-যোগসাধনস্য বর্জ্জনীয়তা—
যমাদিভির্যোগপথৈঃ কামলোভহতো মুহুঃ ।
মুকুন্দসেবয়া যদ্বৎ তথাদ্ধাত্মা ন শাম্যতি ॥১৭॥
শ্রনারদস্য
যমাদি যোগপন্থার অকৃতকার্য্যতা—
“মুকুন্দ সেবা দ্বারা, সদা কামলোভাদি-রিপু-বশীভূত অশান্ত মন যমন সাক্ষাৎ নিগৃহীত হয়, যম-নিয়মাদি অষ্টাঙ্গ যোগমার্গ অবলম্বন দ্বারা তাহা তেমন নিরুদ্ধ বা শান্ত হয় না” ॥১৭॥
ব্রহ্মসুখাগ্রহঃ প্রতিকূল এব—
ত্বৎসাক্ষাৎকরণাহ্লাদবিশুদ্ধাব্ধিস্থিতস্য মে ।
সুখানি গোষ্পদায়ন্তে ব্রাহ্মাণ্যপি জগদ্­গুরো ॥১৮॥
শ্রীপ্রহ্লাদস্য
ব্রহ্মসুখে আগ্রহ প্রতিকূল জানিতে হইবে—
“হে জগদ্­গুরো, আমি তোমার স্বরূপের সাক্ষাৎকার লাভ করিয়া আহ্লাদরূপ-বিশুদ্ধ সমুদ্রে অবস্থিতি করিতেছি, আর সমস্ত সুখ আমার নিকট গোষ্পদস্বরূপ বোধ হইতেছে । ব্রহ্মলয়ে যে সুখ, তাহাও গোষ্পদস্বরূপ । গোষ্পদে অর্থাৎ গরুর পদচিহ্ণে যে গর্ত্ত হয়, তাহাতে যে জল থাকে, তাহা সমুদ্রের তুলনায় অতিক্ষুদ্র” ॥১৮॥
মুক্তিস্পৃহায়াঃ প্রাতিকূল্যম্—
ভববন্ধচ্ছিদে তস্মৈ স্পৃহয়ামি ন মুক্তয়ে ।
ভবান্ প্রভুরহং দাস ইতি যত্র বিলুপ্যতে ॥১৯॥
শ্রীশ্রীহনুমতঃ
মুক্তিস্পৃহা বিশেষ প্রতিকূল—
ভববন্ধন ছেদন জন্য সেই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা করি না, যাহাতে ‘আপনি প্রভু ও আমি দাস’—এই সম্বন্ধ বিলুপ্ত হইয়া যায় ॥১৯॥
সাযুজ্যমুক্তিস্পৃহা ঔদ্ধত্যমেব—
ভক্তিঃ সেবা ভগবতো মুক্তিস্তৎপদলঙ্ঘনম্ ।
কো মূঢ়ো দাসতাং প্রাপ্য প্রাভবং পদমিচ্ছতি ॥২০॥
শিরমৌলিনাং
সাযুজ্যমুক্তির আকাঙ্ক্ষা ঔদ্ধত্যমাত্র—
ভক্তি—শ্রীভগবানের সেবা, আর মুক্তি—সেই সেবা-লঙ্ঘন, কোন্ মূঢ় ব্যক্তি ভগবৎ-দাস্য ছাড়িয়া মুক্তি-পদ অভিলাষ করে ? ২০॥
আত্যন্তিক-লয়স্পৃহা বিবেকহীনতৈব—
হন্ত চিত্রীয়তে মিত্র স্মৃত্বা তান্ মম মানসম্ ।
বিবেকিনোঽপি যে কুর্য্যুস্তৃষ্ণামাত্যন্তিকে লয়ে ॥২১॥
কেষাঞ্চিৎ
আত্যন্তিক লয়বাঞ্ছা বিস্ময়কর বিবেকহীনতা—
হায় ! যে সকল বিবেকী ব্যক্তি আত্যন্তিক লয়ে আকাঙ্ক্ষা করেন, হে মিত্র, তাঁহাদিগকে স্মরণ করিয়া আমার মন বড়ই বিস্ময়বোধ করিতেছে ॥২১॥
মুক্তের্ভক্তিদাস্যবাঞ্ছা ভক্তেশ্চ তৎসঙ্গান্মালিন্যাশঙ্কা—
কা ত্বং মুক্তিরুপাগতাস্মি ভবতী কস্মাদকস্মাদিহ
শ্রীকৃষ্ণস্মরণেন দেব ভবতো দাসীপদং প্রাপিতা ।
দূরে তিষ্ঠ মনাগনাগসি কথং কুর্য্যাদনার্য্যং ময়ি
ত্বন্নাম্না নিজনামচন্দনরসালেপস্য লোপো ভবেৎ ॥২২॥
কস্যচিৎ
মুক্তির ভক্তিদাসীত্ব প্রার্থনা ও ভক্তির মুক্তিসঙ্গে মলিনতাশঙ্কা—
তুমি কে ? আমি মুক্তি আসিয়াছি । আপনি কি জন্য হঠাৎ এখানে ? হে দেব, আপনার শ্রীকৃষ্ণস্মরণ-দ্বারা আমি দাসী-পদ পাইয়াছি । একটু দূরে থাক । এই নিরপরাধ ব্যক্তির প্রতি অভদ্রাচরণ করিতেছ কেন ? তোমার নামে আমার ভগবৎ-দাস-নাম-রূপ চন্দন-লেপ লুপ্ত হইয়া যাইবে ॥২২॥
বহির্ম্মুখ-ব্রহ্মজন্মনোঽপি প্রতিকূলতা—
তব দাস্যসুখৈকসঙ্গিনাং ভবনেষ্বস্ত্বপি কীটজন্ম মে ।
ইতরাবসথেষু মাস্মভূদপি জন্ম চতুর্ম্মুখাত্মনা ॥২৩॥
শ্রীযামুনাচার্য্যস্য
বহির্ম্মুখ ব্রহ্মজন্মেরও প্রতিকূলতা—
“দেববিধি অনুসারে,কর্ম্ম করি’ এ সংসারে,
জীব পুনঃপুনঃ জন্ম পায় ।
পূর্ব্বকৃত কর্ম্মফলে,তোমার বা ইচ্ছাবলে,
জন্ম যদি লভি পুনরায় ॥
তবে এক কথা মম,শুনহে পরুষোত্তম,
তব দাসসঙ্গীজন ধরে ।
কীট-জন্ম যদি হয়,তাহাতেও দয়াময়,
রহিব হে সন্তুষ্ট অন্তরে ॥
তব দাসসঙ্গহীন,যে গৃহস্থ অর্ব্বাচীন,
তার গৃহে চতুর্ম্মুখভূতি ।
না চাই কখন হরি,করদ্বয় জোড় করি’,
করে তব কিঙ্কর মিনতি” ॥২৩॥
গৌরভক্তিরসজ্ঞস্য অন্যত্র চিদ্রসেঽপি প্রাতিকূল্যানুভূতিঃ—
বাসো মে বরমস্তু ঘোরদহনজ্বালাবলীপঞ্জরে
শ্রীচৈতন্যপদারবিন্দবিমুখৈর্মা কুত্রচিৎ সঙ্গমঃ ।
বৈকুণ্ঠাদিপদং স্বয়ঞ্চ মিলিতং নো মে মনো লিপ্সতে
পাদাম্ভোজরজশ্ছটা যদি মনাগ্ গৌরস্য নো রস্যতে ॥২৪॥
শ্রীপ্রবোধানন্দপাদানাং
পরমনির্ম্মল-গৌরভক্তিরসজ্ঞের অন্য বিদ্রসচর্য্যায়ও প্রতিকূল বিচারে অশ্রদ্ধা—
ঘোর অগ্নিজ্বালা-পিঞ্জর মধ্যে বরং আমার বাস হউক, তথাপি শ্রীচৈতন্যপাদপদ্ম-বিমুখজনের সঙ্গ কোথায়ও না হয় । যদি শ্রীগৌরপাদপদ্মের পরাগ-কণার কিঞ্চিৎ মাত্রও রস না পায়, তবে স্বয়মাগত বৈকুণ্ঠাদি-পদও আমার চিত্ত ইচ্ছা করে না ॥২৪॥
ঐকান্তিক-ভক্তস্য ক্ষয়াবশিষ্টদোষদর্শনাগ্রহো বর্জ্জনীয়ঃ—
দৃষ্টৈঃ স্বভাবজনিতৈর্বপুষশ্চ দোষৈ-
র্ন প্রাকৃতত্বমিহ ভক্তজনস্য পশ্যেৎ ।
গঙ্গাম্ভসাং ন খলু বুদ্বুদফেনপঙ্কৈ-
র্ব্রহ্মদ্রবত্বমপগচ্ছতি নীরধর্ম্মৈঃ ॥২৫॥
শ্রীরূপপাদানাং
ঐকান্তিক ভক্তের ক্ষয়াবশিষ্ট দোষদর্শনে আগ্রহ পরিত্যাজ্য—
“স্বভাব জনিত আর বপুদোষে ক্ষণে ।
অনাদর নাহি কর শুদ্ধ ভক্তজনে ॥

পঙ্কাদি জলীয় দোষে কভু গঙ্গাজলে ।
চিন্ময়ত্ব লোপ নহে সর্ব্বশাস্ত্রে বলে ॥

অপ্রাকৃত ভক্তজন পাপ নাহি করে ।
অবশিষ্ট পাপ যায় কিছুদিন পরে” ॥২৫॥
পরদোষানুশীলনং বর্জ্জনীয়ম্—
পরস্বভাবকর্ম্মাণি যঃ প্রশংসতি নিন্দতি ।
স আশু ভ্রশ্যতে স্বার্থাদসত্যাভিনিবেশতঃ ॥২৬॥
শ্রীশ্রীভগবতঃ
পরদোষনুশীলন পরিত্যাজ্য—
“পরচর্চ্চা অকারণে করা দোষ, অতএব বর্জ্জনীয় । কৃষ্ণ কহিলেন, হে উদ্ধব, পরের স্বভাব ও কর্ম্মসমূহের প্রশংসা বা নিন্দা করিবে না । তাহা করিলে অসদ্ধিষয়ে অভিনিবেশ হইবে এবং স্বার্থ হইতে ভ্রষ্ট হইবে” ॥২৬॥
ব্রজরসাশ্রিতানাং ভুক্তিমুক্তিস্পৃহা তথা ঐশ্বর্য্যমিশ্রা বৈকুণ্ঠপতি-সেবাপি ত্যাজ্যত্বেন গণ্যাঃ—
অসদ্বার্ত্তা বেশ্যা বিসৃজ মতিসর্ব্বস্বহরণীঃ
কথা মুক্তিব্যাঘ্র্যা ন শৃণু কিল সর্ব্বাত্মগিলনীঃ ।
অপি ত্যক্ত্বা লক্ষ্মীপতিরতিমিতো ব্যোমনয়নীং
ব্রজে রাধাকৃষ্ণৌ স্বরতিমণিদৌ ত্বং ভজ মনঃ ॥২৭॥
শ্রীরঘুনাথপাদানাং
শুদ্ধ ব্রজরসাশ্রিতজনের ভুক্তিমুক্তিস্পৃহার ন্যায় ঐশ্বর্য্যপর নারায়ণের সেবাও প্রতিকূলগণনা—
“কৃষ্ণবার্ত্তা বিনা আন,আসদ্ধার্ত্তা’ বলি’ জান,
সেই বেশ্যা অতি ভয়ঙ্করী ।
শ্রীকৃষ্ণবিষয় মতি,জীবের দুর্ল্লভ অতি,
সেই বেশ্যা মতি লয় হরি ॥
শুন মন, বলি হে তোমায় ।
মুক্তি-নামে শার্দ্দুলিনী,তার কথা যদি শুনি,
সর্ব্বাত্মসম্পত্তি গিলি’ খায় ॥
তদুভয় ত্যাগ কর,মুক্তিকথা পরিহর,
লক্ষ্মীপতিরতি রাখ দূরে ।
সে রতি প্রবল হ’লে,পরব্যোমে দেয় ফেলে,
নাহি দেয় বাস ব্রজপুরে ॥
ব্রজে রাধাকৃষ্ণ-রতি,অমূল্য ধনদ অতি,
তাই তুমি ভজ চিরদিন ।
রূপ-রঘুনাথ-পায়,সেই রতি প্রার্থনায়,
এ ভক্তিবিনোদ দীনহীন” ॥২৭॥

ইতি শ্রীপ্রপন্নজীবনামৃতে শ্রীভক্তবচনামৃতান্তর্গতঃ
প্রাতিকূল্য-বিবর্জ্জনং নাম চতুর্থোঽধ্যায়ঃ ।

 

 

← ৩ আনুকূল্যস্য সঙ্কল্পঃ ৫ রক্ষিষ্যতীতি বিশ্বাসঃ →

 

সূচিপত্র:
প্রকাশকের নিবেদন
নিবেদন
১ উপক্রমামৃতম্
২ শ্রীশাস্ত্রবচনামৃতম্
শ্রীভক্তবচনামৃতম্—
৩ আনুকূল্যস্য সঙ্কল্পঃ
৪ প্রাতিকূল্য-বিবর্জ্জনম্
৫ রক্ষিষ্যতীতি বিশ্বাসঃ
৬ গোপ্তৃত্বে-বরণম্
৭ আত্মনিক্ষেপঃ
৮ কার্পণ্যম্
৯ শ্রীশ্রীভগবদ্বচনামৃতম্
১০ অবশেষামৃতম্
গ্রন্থকারের রচিত কতিপয় স্তব-রত্ন
শ্রীশ্রীপ্রভুপাদপদ্ম-স্তবকঃ
শ্রীমদ্ভক্তিবিনোদবিরহদশকম্
শ্রীশ্রীমদ্­গৌরকিশোরনমস্কারদশকম্
শ্রীশ্রীদয়িতদাসদশকম্
শ্রীমদ্রূপপদরজঃ-প্রার্থনা-দশকম্
শ্রীদয়িত-দাস-প্রণতি-পঞ্চকম্
প্রণতি-দশকম্
শ্রীগুরু আরতি-স্তুতি
প্রণাম-মন্ত্রম্

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥