শ্রীশ্রীপ্রপন্নজীবনামৃতম্


নবমোঽধ্যায়ঃ

শ্রীশ্রীভগবদ্বচনামৃতম্

 

 

শ্রীকৃষ্ণাঙ্ঘ্রিপ্রপন্নানাং কৃষ্ণপ্রেমৈককাঙ্ক্ষিণাম্ ।
সর্ব্বার্ত্ত্যজ্ঞানহৃৎসর্ব্বাভীষ্টসেবাসুখপ্রদম্ ॥১॥
প্রাণসঞ্জীবনং সাক্ষাদ্ভগবদ্বচনামৃতম্ ।
শ্রীভাগবতগীতাদি-শাস্ত্রাচ্ছংগৃহ্যতেঽত্র হি ॥২॥

শ্রীকৃষ্ণচরণে প্রপন্নগণের ও একমাত্র কৃষ্ণের প্রীতিবাঞ্ছাকারিগণের সমস্ত আর্ত্তি ও অজ্ঞান-হরণকারী এবং সমগ্র অভীষ্ট সেবাসুখপ্রদানকারী ভক্তপ্রাণসঞ্জীবক সাক্ষাৎ শ্রীভগবানের শ্রীমুখবাক্যামৃত শ্রীমদ্ভাগবত ও গীতা প্রভৃতি শাস্ত্র হইতে এখানে সংগৃহীত হইয়াছে ॥১-২॥

শ্রীভগবতঃ প্রপন্ন-ক্লেশহারিত্বম্—
ত্বাং প্রপন্নোঽস্মি শরণং দেবদেবং জনার্দ্দনম্ ।
ইতি যঃ শরণং প্রাপ্তস্তং ক্লেশাদুদ্ধরাম্যহম্ ॥৩॥
শ্রীনারসিংহে
শ্রীভগবান্ প্রপন্ন ব্যক্তির কষ্ট বিদূরিত করেন—
“হে দেবদেব জনার্দ্দন, হে শরণ ! তোমাতে প্রপন্ন হইলাম” এই বলিয়া যে ব্যাক্তি শরণ গ্রহণ করে, তাহাকে আমি ক্লেশ হইতে উদ্ধার করি ॥৩॥
তস্য সকৃদেব প্রপন্নায় সদাভয়দাতৃত্বম্—
সকৃদেব প্রপন্নো যস্তবাস্মীতি চ যাচতে ।
অভয়ং সর্ব্বদা তস্মৈ দদাম্যেতদ্ব্রতং মম ॥৪॥
শ্রীরামায়ণে
একবারমাত্র প্রপন্ন হইলে তিনি সর্ব্বকালের জন্য অভয়দানকারী—
“আমার ব্রত এই যে, যদি কেহ প্রকৃত প্রস্তাবে প্রপন্ন হইয়া একবারও ‘তোমার আমি’ এই কথা বলিয়া আমার অভয় যাচ্ঞা করে, তাহা হইলে আমি তাহাকে তাহা সর্ব্বদা দিয়া থাকি” ॥৪॥
স চ সাধূনাং পরিত্রাণকর্ত্তা—
পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্ ।
ধর্ম্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥৫॥
শ্রীগীতায়াম্
তিনি সাদুগণের পরিত্রাণকারী—
“সাধুদিগের পরিত্রাণ, দুষ্কৃতদিগের বিনাশ এবং ধর্ম্ম-সংস্থাপনের জন্য আমি প্রতিযুগে প্রকাশিত হই” ॥৫॥
তস্য প্রার্থনানুরূপ-ফলদাতৃত্বং—
যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্ ।
মম বর্ত্মানুবর্ত্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্ব্বশঃ ॥৬॥
তত্রৈব
প্রার্থনানুরূপ ফলদানকারী—
“হে পার্থ, যিনি আমাকে যে ভাবে উপাসনা করেন, আমি তাঁহার নিকট সেই ভাবে প্রাপ্য হই ; সকল মানবই আমার বর্ত্ম অর্থাৎ মৎপ্রদর্শিত পথের অনুগামী” ॥৬॥
বহুদেবযাজিনাং শ্রীকৃষ্ণেতরদেবতা-প্রপত্তির্ভোগাভিসন্ধিমূলৈব—
কামৈস্তৈস্তৈর্হৃতজ্ঞানাঃ প্রপদ্যন্তেঽন্যদেবতাঃ ।
তং তং নিয়মমাস্থায় প্রকৃত্যা নিয়তাঃ স্বয়া ॥৭॥
তত্রৈব
বহুদেবতাযাজিগণের শ্রীকৃষ্ণ ব্যতীত অন্য দেবতার প্রপত্তি কেবল ভোগাভিসন্ধিমূলা—
তৎ তদ্­বাসনা দ্বারা হৃতজ্ঞান ব্যক্তিগণ স্ব-স্ব-ভাবের বশীভূত হইয়া তৎ তন্নিয়ম অবলম্বন পূর্ব্বক অন্য দেবতাগণের ভজনা করে ॥৭॥
তৎসর্ব্বেশ্বরেশ্বরত্বাজ্ঞানমেব কর্ম্মিণাং বহুদেবযজনে কারণম্—
অহং হি সর্ব্বযজ্ঞানাং ভোক্তা চ প্রভুরেব চ ।
ন তু মামভিজানন্তি তত্ত্বেনাতশ্চ্যবন্তি তে ॥৮॥
তত্রৈব
শ্রীকৃষ্ণের সর্ব্বেশ্বরেশ্বরত্বের জ্ঞানাভাবই কর্ম্মিগণের বহুদেবতা যাজনের কারণ—
“আমিই সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা ও প্রভু । যাহারা অন্য দেবতাকে আমা হইতে স্বতন্ত্র জ্ঞান করিয়া উপাসনা করে, তাহাদিগকে ‘প্রতীকোপাসক’ বলা যায় ; তাহারা আমার তত্ত্ব অবগত নয়, অতএব অতাত্ত্বিকী উপাসনা বশতঃ তাহারা তত্ত্ব হইতে চ্যুত হয় । সূর্য্যাদি দেবতাকে আমার বিভূতি বলিয়া উপাসনা করিলে শেষে মঙ্গল হইতে পারে” ॥৮॥
তত্র দুর্ম্মতিদুষ্কৃতিমূঢ়তারূপো মায়াপ্রভাব এব কারণম্—
ন মাং দুষ্কৃতিনো মূঢ়াঃ প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ ।
মায়য়াপহৃতজ্ঞানা আসুরং ভাবমাশ্রিতাঃ ॥৯॥
তত্রৈব
সেখানে দুর্ব্বুদ্ধি, দুষ্কৃতি ও মূঢ়তারূপ মায়ার প্রভাব মাত্র—
দুষ্কৃতিপরায়ণ মূর্খ নরাধমগণ মায়ামুগ্ধ হইয়া আসুরবৃত্তির আশ্রয়ে আমাতে প্রপত্তি স্বীকার করে না ॥৯॥
দ্বন্দ্বাতীতঃ সুকৃতিমানেব শ্রীকৃষ্ণভজনাধিকারী—
যেষাং ত্বন্তগতং পাপং জনানাং পুণ্যকর্ম্মণাম্ ।
তে দ্বন্দ্বমোহনির্ম্মুক্তা ভজন্তে মাং দৃঢ়ব্রতাঃ ॥১০॥
তত্রৈব
জড় সুখদুঃখ-অগ্রাহ্যকারী সুকৃতিমান্ ব্যক্তি কৃষ্ণ-ভজনাধিকারী—
যে সমস্ত সুকৃতিমান্ জনের পাপরাশি বিনষ্ট হইয়াছে, তাঁহারা সুখদুঃখের মোহমুক্ত হইয়া স্থিরবিত্তে আমার ভজনা করেন ॥১০॥
শ্রীকৃষ্ণপ্রপত্তিরেব মায়াতরণোপায়ো নান্যঃ—
দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া ।
মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে ॥১১॥
তত্রৈব
শ্রীকৃষ্ণপ্রপত্তিই মায়াতরণোপায়—
“এই ত্রিগুণময়ী মদীয়া মায়া অত্যন্ত কষ্টে পার হওয়া যায় ; আমাকে যিনি প্রপত্তি করেন, তিনিই কেবল এই মায়া পার হইতে পারেন” ॥১১॥
শ্রীকৃষ্ণ-প্রপত্তিরেব শুদ্ধজ্ঞান-ফলমিত্যনুভবিতুর্মহাত্মনঃ সুদুর্ল্লভত্বম্—
বহূনাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্ মাং প্রপদ্যতে ।
বাসুদেবঃ সর্ব্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্ল্লভঃ ॥১২॥
তত্রৈব
শ্রীকৃষ্ণপদপ্রপত্তিই জ্ঞানের ফল,—ইহা অনুভবকারী মহাত্মা সুদুর্ল্লভ—
“জীব অনেক জন্ম সাধন করিতে করিতে সৎসঙ্গপ্রভাবে আমার স্বরূপ জ্ঞান লাভ করিয়া আমার শরণাগত হয়, পরে আমাকে লাভ করে । তখন সে যাবতীয় বস্তুই বাসুদেব-সম্বন্ধযুক্ত, অতএব সমস্তই বাসুদেবময়—এইরূপ উপলব্ধি করে । তাদৃশ মহাত্মা অত্যন্ত দুর্ল্লভ” ॥১২॥
লব্ধচিৎস্বরূপস্যৈব শ্রীকৃষ্ণে পরা ভক্তিঃ, অতঃ সা নির্গুণা এব—
ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা
ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি ।
সমঃ সর্ব্বেষু ভূতেষু
মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্ ॥১৩॥
তত্রৈব
চিৎস্বরূপপ্রাপ্ত ব্যক্তিরই শ্রীকৃষ্ণপদে পরা ভক্তি হয়, সুতরাং তাহা নির্গুণ—
“অভেদব্রহ্মবাদরূপ জ্ঞানচর্চ্চা দ্বারা স্বয়ং প্রসন্নাত্মা, শোক ও বাঞ্ছারহিত ও সর্ব্বভূতে সমভাবযুক্ত ব্রহ্মতা লাভ করিয়া পরে আমার পরাভক্তি প্রাপ্ত হয়” ॥১৩॥
অখিলরসামৃতমূর্ত্তি শ্রীকৃষ্ণ এব জ্ঞানিগণমৃগ্য-তুরীয়-ব্রহ্মণো মূলাশ্রয়ঃ—
ব্রহ্মণো হি প্রতিষ্ঠাহমমৃতস্যাব্যয়স্য চ ।
শাশ্বতস্য চ ধর্ম্মস্য সুখস্যৈকান্তিকস্য চ ॥১৪॥
তত্রৈব
অখিলরসামৃতমূর্ত্তি শ্রীকৃষ্ণই জ্ঞানিগণমৃগ্য তুরীয় ব্রহ্মের মূল আশ্রয়—
“বস্তুতঃ নির্গুণ সবিশেষ তত্ত্ব আমিই জ্ঞানীদিগের চরম গতি ব্রহ্মের প্রতিষ্ঠা বা আশ্রয় । অমৃতত্ব, অব্যয়ত্ব, নিত্যত্ব, নিত্যধর্ম্মরূপ প্রেম ও ঐকান্তিক সুখরূপ ব্রজরস, সমুদয়ই এই নির্গুণ সবিশেষ তত্ত্বরূপ কৃষ্ণ-স্বরূপকে আশ্রয় করিয়া থাকে” ॥১৪॥
ঔপনিষৎপুরুষস্য শ্রীকৃষ্ণস্যৈব যোগিজনমৃগ্যং নিখিল-চিদচিন্নিয়ন্তৃত্বম্—
সর্ব্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো মত্তঃ স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনঞ্চ ।
বেদৈশ্চ সর্ব্বৈরহমেব বেদ্যো বেদান্তকৃদ্বেদবিদেব চাহম্ ॥১৫॥
তত্রৈব
ঔপনিষৎ পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ হইতেই সমষ্টি ব্যষ্টিগত সমস্ত চিদচিৎ-নিয়ন্ত্রণ-ব্যাপার সস্পাদিত হয়,—যাহা যোগিগণের অনুসন্ধেয়—
“আমিই সর্ব্বজীবের হৃদয়ে ঈশ্বর-রূপে অবস্থিত, আমা হইতেই জীবের কর্ম্মফলানুসারে স্মৃতি, জ্ঞান এবং স্মৃতিজ্ঞানের অপগতি ঘটিয়া থাকে । অতএব আমি কেবল জগদ্ব্যাপী ব্রহ্মমাত্র নই ; কিন্তু জীবহৃদয়স্থিত কর্ম্মফলদাতা পরমাত্মাও বটে । কেবল ব্রহ্ম বা পরমাত্মরূপেই জীবের উপাস্য নই ; কিন্তু জীবের নিত্য মঙ্গল-বিধাতৃস্বরূপ জীবের উপদেষ্টা আমি সর্ব্ববেদবেদ্য ভগবান্, সমস্ত বেদান্তকর্ত্তা এবং বেদান্তবিৎ” ॥১৫॥
তদ্­বিষ্ণোঃ পরমং পদমেব গন্তব্যং, তচ্চ জ্ঞানিনামনাবৃত্তিকারকং যোগিনামাদিচৈতন্যস্বরূপং কর্ম্মণাঞ্চ কর্ম্মফল-বিধায়কম্—
ততঃ পদং তৎপরিমার্গিতব্যং যস্মিন্ গতা ন নিবর্ত্তন্তি ভূয়ঃ ।
তমেব চাদ্যং পুরুষং প্রপদ্যে যতঃ প্রবৃত্তিঃ প্রসৃতা পুরাণী ॥১৬॥
তত্রৈব
বিষ্ণুর পরম পদই গন্তব্যস্থান, যাহা জ্ঞানিগণের অনাবৃত্তিকারক, যোগিগণের পরম পুরুষ এবং কর্ম্মগণের কর্ম্মফল বিধানকারী—
অনন্তর বিষ্ণুর সেই পরমপদ অন্বেষণীয় ; সেখানে গমন করিলে আর প্রত্যাবর্ত্তন করিতে হয় না । যাঁহা হইতে অনাদি সংসার বিস্তৃত হইয়াছে, সেই আদি পুরুষের শরণ গ্রহণ করি ॥১৬॥
অবিদ্যানির্ম্মুক্তাঃ সম্পূর্ণজ্ঞা এব লীলাপুরুষোত্তমং শ্রীকৃষ্ণমেব নিখিলভাবৈর্ভজন্তে—
যো মামেবমসংমূঢ়ো জানাতি পুরুষোত্তমম্ ।
স সর্ব্ববিদ্ভজতি মাং সর্ব্বভাবেন ভারত ॥১৭॥
তত্রৈব
অবিদ্যামুক্ত পরিপূর্ণ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিগণই লীলাপুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের মাধুর্য্যাদি-নিখিল-রসে ভজনকারী—
হে ভারত, যে ব্যক্তি মোহনির্ম্মুক্ত হইয়া আমাকে এইরূপ পরুষোত্তমরূপে জনেন, সেই সর্ব্বজ্ঞ সর্ব্বতোভাবে আমার সেবা করিয়া থাকেন ॥১৭॥
কর্ম্মজ্ঞানধ্যানযোগিনামপি (তত্তদ্ভাবং ত্যক্ত্বা) যে মচ্চিচ্ছক্তিগত-শ্রদ্ধামাশ্রিত্য ভজন্তে ত এব সর্ব্বশ্রেষ্ঠাঃ—
যোগিনামপি সর্ব্বোষাং মদ্গতেনান্তরাত্মনা ।
শ্রদ্ধাবান্ ভজতে যো মাং স মে যুক্ততমো মতঃ ॥১৮॥
তত্রৈব
কর্ম্মযোগী, জ্ঞানযোগী, ধ্যানযোগী প্রভৃতির মধ্যে যাঁহারা (সেই সেই ভাব ত্যাগ করিয়া) আমার স্বরূপশক্তিগত শ্রদ্ধাবৃত্তি অবলম্বন করিয়া আমার ভজন করেন, তাঁহারাই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ—
সর্ব্বপ্রকার যোগিগণের মধ্যে যিনি মদ্গতবিত্তে আন্তরিক শ্রদ্ধা সহকারে আমার সেবা করিয়া থাকেন, তিনিই আমার মতে সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ যোগী ॥১৮॥
নিরবচ্ছিন্নপ্রেমভক্তিযাজিনো মৎপার্ষদা এব পরমশ্রেষ্ঠাঃ—
ময্যাবেশ্য মনো যে মাং নিত্যযুক্তা উপাসতে ।
শ্রদ্ধয়া পরয়োপেতাস্তে মে যুক্ততমা মতাঃ ॥১৯॥
তত্রৈব
নিরবচ্ছিন্ন প্রেমভক্তি সহকারে সেবনকারী আমার পার্ষদগণই পরমশ্রেষ্ঠ—
“নির্গুণ-শ্রদ্ধা-সহকারে সমস্ত জীবনকে ভক্তিময় করিয়া যিনি আমাতে মনোনিবেশ করেন, সেই ভক্তই সকল যোগী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ” ॥১৯॥
শ্রীকৃষ্ণে স্বয়ংরূপত্বং সর্ব্বাংশিত্বং সর্ব্বাশ্রয়ত্বং চিদ্বিলাসময়ত্বঞ্চ—
মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয় ।
ময়ি সর্ব্বমিদং প্রোতং সূত্রে মণিগণা ইব ॥২০॥
তত্রৈব
স্বয়ংরূপ শ্রীকৃষ্ণই সর্ব্বাংশী, সর্ব্বাশ্রয় ও চিদ্বিলাসী—
“হে ধনঞ্জয় ! আমা হইতে আর কেহ শ্রেষ্ঠ নাই । সূত্রে যেমত মণিগণ গাঁথা থাকে, সমস্ত বিশ্বই তদ্রূপ বিষ্ণুরূপী আমাতে প্রোতরূপে অবস্থান করে” ॥২০॥
স্বয়ংরূপস্য স্বরূপশক্তিপ্রবর্ত্তনামাশ্রিত্য রাজভজনমেব পরমপাণ্ডিত্যম্—
অহং সর্ব্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্ব্বং প্রবর্ত্ততে ।
ইতি মত্বা ভজন্তে মাং বুধা ভাবসমন্বিতাঃ ॥২১॥
তত্রৈব
স্বয়ংরূপের স্বরূপশক্তির প্রবর্ত্তনা অবলম্বন করিয়া রাগভজনই (রাধাদাস্যাদিই) শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমত্তা—
“অপ্রাকৃত ও প্রাকৃত, সমস্ত বস্তুরই উৎপত্তি স্থান বলিয়া আমাকে জানিও ;—এইরূপ অবগত হইয়া ভাব অর্থাৎ শুদ্ধ-ভক্তি-সহকারে যাঁহারা আমাকে ভজন করেন, তাঁহারাই পণ্ডিত ।” (ভাব ভজনে প্রবৃত্তজন যে কালে নিখিল ভজনপ্রবাহেরও মূল উৎসরূপে স্বয়ংরূপকে দর্শন করেন, তখন মধুর রসে পূর্ণ-ভজন-প্রবর্ত্তনারূপ স্বরূপশক্তির বা মহাভাব-স্বরূপার আনুগত্যের আবশ্যকতায় শ্রীরাধাদাস্য লাভ করিয়া থাকেন অর্থাৎ ভজনপ্রবর্ত্তনাও শ্রীকৃষ্ণশক্তি—এইরূপ নিত্য বিচার বা ভাবের আশ্রয়ে ভজনই গৌড়ীয়ের গুরুদাস্য বা মধুর রসে শ্রীরাধাদাস্য) ॥২১॥
মদর্পিতপ্রাণা মদাশ্রিতাঃ পরস্পরং সাহায্যেন মদালাপন-প্রসাদ-রমণাদিসুখং নিত্যমেব লভন্তে—
মচ্চিত্তা মদ্গতপ্রাণা বোধয়ন্তঃ পরস্পরম্ ।
কথয়ন্তশ্চ মাং নিত্যং তুষ্যন্তি চ রমন্তি চ ॥২২॥
তত্রৈব
আমাতে সমর্পিতপ্রাণ, আমার আশ্রিত সেবকসেবিকাগণ পরম্পর সাহচর্য্যে যথাযথভাবে মৎসম্বন্ধীয় আলাপ, প্রদাস ও রমণাদি সুখ লাভ করিয়া থাকের—
“এতাদৃশ অনন্যভক্তদিগের চরিত্র এইরূপ :—তাঁহারা বিত্ত ও প্রাণকে আমাতে সম্যক্ অর্পণ করতঃ পরস্পর ভাববিনিময় ও হরিকথার কথোপকথন করিয়া থাকেন ; সেইরূপ শ্রবণ-কীর্ত্তন দ্বারা সাধনাবস্থায় ভক্তিসুখ ও সাধ্যাবস্থায় অর্থাৎ লব্ধপ্রেম-অবস্থায় আমার সহিত রাগমার্গ ব্রজরসান্তর্গত মধুর রস পর্য্যন্ত সম্ভোগপূর্ব্বক রমণসুখ লাভ করিয়া থাকেন” ॥২২॥
*ভাবসেবৈব ভগবদ্বশীকরণে সমর্থা—
পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি ।
তদহং ভক্ত্যুপহৃতমশ্নামি প্রযতাত্মনঃ ॥২৩॥
তত্রৈব
ভাবসেবাই ভগবদ্বশীকরণে সমর্থা—
“প্রযতাত্মা ভক্তসকল আমাকে ভক্তি পূর্ব্বক পত্র, পুষ্প, ফল, জলাদি যাহা যাহা দেন, তাহাই আমি অত্যন্ত স্নেহ পূর্ব্বক স্বীকার করি” ॥২৩॥
কৃষ্ণৈকভজনশীলস্য তৎপ্রভাবেন বিধূয়মানান্যভদ্রাণি দুরাচার-বদ্দৃষ্টান্যপি দুরভিসন্ধিমূলকবন্ন গর্হণীয়ান্যপি চ স্বরূপতস্তদেক-ভজনস্য পরমাদ্ভুতমাহাত্ম্যাৎ সঃ সাধুরেব—
অপি চেৎ সুদুরাচারো ভজতে মামনন্যভাক্ ।
সাধুরেব স মন্তব্যঃ সম্যগ্ব্যবসিতো হি সঃ ॥২৪॥
তত্রৈব
অনন্যভাবে কৃষ্ণভজনকারীর ভজনপ্রভাবে বিধূয়মান অভদ্রসমূহ দুরাচারবৎ দৃষ্ট হইলেও উহা দুরভিসন্ধিজাতের ন্যায় গর্হণীয় নহে ; পরন্তু তাঁহার অনন্যভজনের স্বাভাবিক পরমাদ্ভুত মাহাত্ম্যহেতু তিনি সাধুই—
“যিনি আমাকে অনন্যচিত্ত হইয়া ভজন করেন, তিনি সুদুরাচার হইলেও তাঁহাকে ‘সাধু’ বলিয়া মানিবে ; যেহেতু তাঁহার ব্যবসায় সর্ব্বপ্রকারে সুন্দর” ॥২৪॥
শোধনপ্রক্রিয়াজাত-মলনিঃসারণস্য, মলিনবস্তুনঃ স্বাভাবিক-মল-বিচ্ছুরণের সহ ন কদাপ্যেকত্বম্ ; তাদৃগ্ ভক্তঃ ক্ষিপ্রং শুধ্যতি, ন কদাপি নশ্যতীতি পরমাশ্বাসপ্রদত্বম্—
ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্ম্মাত্মা শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি ।
কৌন্তেয় প্রতিজানীহি ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি ॥২৫॥
তত্রৈব
শোধনপ্রক্রিয়াজাত-মলনিঃসারণ এবং মলিন বস্তুর স্বাভাবিক-মলবিচ্ছুরণ—ইহারা কখনও এক নহে । তাদৃশ ভক্ত শীঘ্র শুদ্ধ হয়, কখনও নষ্ট হয় না, ইহা পরমাশ্বাসপ্রদ—
“হে কৌন্তেয় ! আমার প্রতিজ্ঞা এই যে, আমার অনন্যভক্তিপথারূঢ় জীব কখনই নষ্ট হইবে না । তাঁহার অধর্ম্মাদি প্রথম অবস্থায় নিসর্গ ও ঘটনা বশতঃ থাকিলেও ঐ অধর্ম্মাদি শীঘ্রই ভজনপ্রাতিকূল্যবাধক অনুতাপরূপ হরিস্মৃতি দ্বারা বিদূরিত হইবে । তিনি জীবের নিত্য-ধর্ম্মরূপ স্বরূপগত-আচারনিষ্ঠ হইয়া ভক্তিজনিত পাপ-পুণ্য-বন্ধন হইতে পরমা শান্তি লাভ করিবেন” ॥২৫॥
ঘনীভূতবিশুদ্ধসত্ত্বমূর্ত্তিমাশ্রিত্য তামসপ্রকৃতয়োঽপি পরমাং গতিং লভন্তে—
মাং হি পার্থ ব্যপাশ্রিত্য যেঽপি স্যুঃ পাপযোনয়ঃ ।
স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রাস্তেঽপি যান্তি পরাং গতিম্ ॥২৬॥
তত্রৈব
ঘনীভূত বিশুদ্ধসত্ত্বমূর্ত্তি শ্রীকৃষ্ণের আশ্রয়ে তামস প্রকৃতি জীবগণও পরমগতি লাভ করে—
“হে পার্থ ! অন্ত্যজ ম্লেচ্ছগণ ও বেশ্যাদি পতিতা স্ত্রীসকল, তথা বৈশ্য-শূদ্র প্রভৃতি নীচবর্ণস্থ নরগণ আমার অনন্য-ভক্তিকে বিশিষ্টরূপে আশ্রয় করিলে অবিলম্বে পরাগতি লাভ করে । আমার ভক্তিমার্গাশ্রিত ব্যক্তিদিগের প্রতিবন্ধক নাই” ॥২৬॥
বদ্ধজীবানাং প্রকৃতিযন্ত্রিতত্বং ঈশ্বরস্যোভয়নিয়ামকত্বঞ্চ—
ঈশ্বরঃ সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেঽর্জ্জুন তিষ্ঠতি ।
ভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া ॥২৭॥
তত্রৈব
বদ্ধজীবসমূহ প্রকৃতির অধীন, কিন্তু ঈশ্বর উভয়েরই নিয়ামক—
“সর্ব্বজীবের হৃদয়ে পরমাত্মারূপে আমিই অবস্থিত ; পরমাত্মাই সর্ব্বজীবের নিয়ন্তা ও ঈশ্বর । জীবসকল যে যে সর্ম্ম করেন, ঈশ্বর তদনুরূপ ফল দান করেন । যন্ত্রারূঢ় বস্তু যেমত ভ্রামিত হয়, জীবসকলও তদ্রূপ ঈশ্বরের সর্ব্ব-নিয়ন্তৃত্ব-ধর্ম্ম হইতে জগরে ভ্রামিত হন । ঈশ্বর-প্রেরণা-দ্বারাই পূর্ব্বকর্ম্মানুসারে তোমার প্রবৃত্তি সহজে কার্য্য করিতে থাকিবে” ॥২৭॥
শুদ্ধজীবানামণুচৈতন্যস্বরূপত্বাং সসীমস্বতন্ত্রতায়াঃ সদ্ব্যবহারেণ পরেশাশ্রয়ে পরাশান্তিঃ—
তমেব শরণং গচ্ছ
সর্ব্বভাবেন ভারত ।
তৎপ্রসাদাৎ পরাং শান্তিং
স্থানং প্রাপ্স্যসি শাশ্বতম্ ॥২৮॥
তত্রৈব
শুদ্ধজীবগণ অণুচৈতন্য-স্বরূপহেতু সসীম স্বতন্ত্রতাপ্রাপ্ত, ঐ স্বতন্ত্রতার সদ্ব্যবহার দ্বারা পরমেশ্বরের আশ্রয় গ্রহণ করিলে পরাশান্তি লাভ করে—
“হে ভারত, তুমি সর্ব্বভাবে সেই ঈশ্বরের শরণাগত হও ; তাঁহার প্রসাদেই পরা শান্তি লাভ করিবে এবং নিত্যধাম প্রাপ্ত হইবে” ॥২৮॥
ভক্তবান্ধবস্য ভগবতঃ পরমমর্ম্মোপদেশঃ—
সর্ব্বগুহ্যতমং ভূয়ঃ শৃণু মে পরমং বচঃ ।
ইষ্টোঽসি মে দৃঢ়মিতি ততো বক্ষ্যামি তে হিতম্ ॥২৯॥
তত্রৈব
ভক্তবান্ধব শ্রীভগবানের পরম মর্ম্মোপদেশ—
“গুহ্য ‘ব্রহ্মজ্ঞান’ ও গুহ্যতর ‘ঐশ্বরজ্ঞান’ তোমাকে বলিলাম ; এক্ষণে গুহ্যতম ভগবজ্জ্ঞান উপদেশ করিতেছি, শ্রবণ কর । আমি এই গীতাশাস্ত্রের মধ্যে যত উপদেশ দিয়াছি, সে সমুদয় অপেক্ষা ইহা শ্রেষ্ঠ । তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয়, অতএব তোমার হিতের জন্যই আমি বলিতেছি” ॥২৯॥
পরমমাধুর্য্যমূর্ত্তেঃ কামদেবস্য কাম-সেবানুশীলনমেব নিশ্চিতং সর্ব্বোত্তমফলপ্রাপ্তিঃ—
মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্­যাজী মাং নমস্কুরু ।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োঽসি মে ॥৩০॥
তত্রৈব
পরমমাধুর্য্যমূর্ত্তি শ্রীকামদেবের প্রেম-ভজনই (অপ্রাকৃত কামময়) নিশ্চিত সর্ব্বোত্তম ফলপ্রাপ্তি—
“ভগবদ্ভক্ত হইয়া তুমি আমাকে চিত্ত অর্পণ কর ; কর্ম্মযোগী, জ্ঞানযোগী ও ধ্যানযোগিগণ যেরূপ চিন্তা করেন, সেরূপ করিবে না ; সমস্ত কর্ম্মেই আমার ভগবৎস্বরূপের যজন কর; আমার প্রতিজ্ঞা এই যে, তাহা হইলেই তুমি আমার এই সচ্চিদানন্দ স্বরূপের নিত্য সেবকত্ব লাভ করিবে । তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয় বলিয়া এই নির্গুণ-ভক্তির উপদেশ করিতেছি” ॥৩০॥
নিখিলধর্ম্মাধর্ম্মবিচারপরিত্যাগেনাদ্বয়জ্ঞানস্বরূপস্য শ্রীব্রজেন্দ্রনন্দনৈকবিগ্রহস্য পাদপদ্মশরণাদেব সর্ব্বাপচ্ছান্তিপূর্ব্বক সর্ব্বসম্পৎপ্রাপ্তিঃ—
সর্ব্বধর্ম্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ।
অহং ত্বাং সর্ব্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥৩১॥
তত্রৈব
সমস্ত ধর্ম্মাধর্ম্মবিচার পরিত্যাগপূর্ব্বক অদ্বয়জ্ঞানস্বরূপ একমাত্র শ্রীব্রজেন্দ্রনন্দনবিগ্রহ শ্রীকৃষ্ণচন্দ্রের পাদপদ্মে শরণ গ্রহণ দ্বারাই সর্ব্বাপচ্ছান্তি ও সর্ব্ব-সম্পৎপ্রাপ্তি হয়—
“ব্রহ্মজ্ঞান ও ঐশ্বরজ্ঞান-লাভের উপদেশ-স্থলে বর্ণাশ্রমাদি ধর্ম্ম, যতি-ধর্ম্ম, বৈরাগ্য, শমদমাদি ধর্ম্ম, ধ্যানযোগ, ঈশ্বরের ঈশিতার বশীভূততা প্রভৃতি যত প্রকার ধর্ম্ম বলিয়াছি, সে সমুদায় পরিত্যাগ পূর্ব্বক ভগবৎস্বরূপ আমার একমাত্র শরণাপত্তি অঙ্গীকার কর ; তাহা হইলেই আমি তোমাকে সংসার-দশার সমস্ত পাপ তথা পূর্ব্বোক্ত ধর্ম্ম-পরিত্যাগের যে সকল পাপ, সে সমুদায় হইতে উদ্ধার করিব । তুমি অকৃতকর্ম্মা বলিয়া শোক করিবে না” ॥৩১॥
শ্রীহরেরেব সর্ব্বসদসজ্জগৎকারণত্বম্—
অহমেবাসমেবাগ্রে নান্যদ্­যৎ সদসৎপরম্ ।
পশ্চাদহং যদেতচ্চ যোঽবশিষ্যেত মোঽস্ম্যহম্ ॥৩১॥
শ্রীমদ্ভাগবতে
শ্রীহরিই সদসৎ নিখিল জগতের কারণস্বরূপ—
“এই জগৎ সৃষ্টির পূর্ব্বে কেবল আমি ছিলাম । সৎ, অসৎ এবং অনির্ব্বচনীয় নির্ব্বিশেষ ব্রহ্ম পর্য্যন্ত অন্য কিছুই আমা হইতে পৃথক্­রূপে ছিল না । সৃষ্টি হইলে পর এ সমুদয়-স্বরূপে আমিই আছি এবং সৃষ্টি লয় হইলে একমাত্র আমিই অবশিষ্ট থাকিব” ॥৩২॥
নিখিল-সম্বন্ধাভিধেয়প্রয়োজনাত্মক-বেদজ্ঞানং তস্মাদেব—
জ্ঞানং মে পরমং গুহ্যং যদ্বিজ্ঞানসমন্বিতম্ ।
সরহস্যং তদঙ্গঞ্চ গৃহাণ গদিতং ময়া ॥৩৩॥
তত্রৈব
সম্বন্ধ, অভিধেয় ও প্রয়োজনাত্মক সমস্ত বেদ-জ্ঞান তাঁহা হইতেই আগত—
“বিজ্ঞানসমন্বিত রহস্য ও তদঙ্গযুক্ত আমার পরমগুহ্য জ্ঞান তোমাকে কৃপা করিয়া আমি বলিতেছি, তাহা তুমি গ্রহণ কর” ॥৩৩॥
শ্রীকৃষ্ণাত্মকধর্ম্মময়মেব বেদজ্ঞানং তস্মাদ্ব্রহ্মণাধিগতম্—
কালেন নষ্টা প্রলয়ে বাণীয়ং বেদমংজ্ঞিতা ।
ময়াদৌ ব্রহ্মণে প্রোক্তা ধর্ম্মো যস্যাং মদাত্মকঃ ॥৩৪॥
তত্রৈব
শ্রীকৃষ্ণাত্মক ধর্ম্মজ্ঞানই তাঁহা হইতে ব্রহ্মা পাইলেন—
“বেদবাণীতে মদীয় স্বরূপভূত যে ধর্ম্ম বর্ণিত রহিয়াছে, তাহা কালধর্ম্মে প্রলয়-সময়ে অন্তর্হিত হইলে সৃষ্টির আদিতে আমি ব্রহ্মাকে উহা উপদেশ করিয়াছিলাম” ॥৩৪॥
পরমানন্দস্বরূপ-শ্রীকৃষ্ণাপ্তিরেব সর্ব্বশ্রেষ্ঠ-সুখপ্রাপ্তিঃ—
ময্যর্পিতাত্মনঃ সভ্য নিরপেক্ষস্য সর্ব্বতঃ ।
ময়াত্মনা সুখং যত্তৎ কুতঃ স্যাদ্বিষয়াত্মনাম্ ॥৩৫॥
তত্রৈব
পরমানন্দস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণসেবা-প্রাপ্তিই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ সুখলাভ—
“হে সভ্য, যিনি আমাতে সমর্পিতাত্ম হইয়া অপর সমস্ত বিষয়ে নিরপেক্ষ হইয়াছেন, তাঁহার হৃদয়ে পরমানন্দস্বরূপ আমি যে সুখ প্রদান করি, বিষয়িগণ তাহা কোথায় পাইবে ?” ৩৫॥
কর্ম্মযোগাদিলভ্যং ফলং বাঞ্ছতি চেৎ প্রাপ্নোত্যেব কৃষ্ণভক্তঃ—
যৎ কর্ম্মভির্যত্তপসা জ্ঞানবৈরাগ্যতশ্চ যৎ ।
যোগেন দানধর্ম্মেণ শ্রেয়োভিরিতরৈরপি ॥৩৬॥ সর্ব্বং মদ্ভক্তিযোগেন মদ্ভক্তো লভতেঽঞ্জসা ।
স্বর্গাপবর্গং মদ্ধাম কথঞ্চিদ্­যদি বাঞ্ছতি ॥৩৭॥
তত্রৈব
কর্ম্মজ্ঞানযোগাদিলভ্য বিষয় আকাঙ্ক্ষা করিলে ভক্ত সমস্তই প্রাপ্ত হন—
“কর্ম্ম, তপস্যা, জ্ঞান, বৈরাগ্য, যোগ, দান, ধর্ম্ম বা অন্যান্য শ্রেয়ঃ-সাধনসমূহ দ্বারা জগতে যাহা কিছু লব্ধ হয়, মদীয় ভক্ত ভক্তিযোগ দ্বারা অনায়াসেই তৎসমুদায় প্রাপ্ত হইয়া থাকেন এবং যদি কখনও প্রার্থনা করেন, তাহা হইলে স্বর্গ, অপবর্গ, এমন কি, বৈকুণ্ঠলোকও লাভ করিয়া থাকেন” ॥৩৬-৩৭॥
ঐকান্তিকা দীয়মানমপি কৈবল্যাদিকং ন বাঞ্ছন্তি—
ন কিঞ্চিৎ সাধবো ধীরা ভক্তা হ্যেকান্তিনো মম ।
বাঞ্ছন্ত্যপি ময়া দত্তং কৈবল্যমপুনর্ভবম্ ॥৩৮॥
তত্রৈব
ঐকান্তিক ভক্তগণ দীয়মান কৈবল্যাদিও ইচ্ছা করেন না—
ধীর ও সাধুপ্রকৃতি আমার ঐকান্তিক ভক্তগণ, আমি দিতে চাহিলেও, আত্যন্তিক কিছুই গ্রহণ করেন না ॥৩৮॥
কৈবল্যাচ্ছ্রেয়ঃ সালোক্যাদিকমপি নেচ্ছন্তি—
মৎসেবয়া প্রতীতং তে সালোক্যাদিচতুষ্টয়ম্ ।
নেচ্ছন্তি সেবয়া পূর্ণাঃ কুতোঽন্যৎ কালবিপ্লুতম্ ॥৩৯॥
তত্রৈব
কৈবল্য হইতে শ্রেষ্ঠ সালোক্যাদিও ইচ্ছা করেন না—
“আমার সেবা দ্বারা সালোক্যাদি-মুক্তিচতুষ্টয় স্বয়ং আগত হইলেও আমার সেবাতে পূর্ণমনা হইয়া শুদ্ধভক্ত যখন সে সমুদয় গ্রহণ করেন না, তখন মায়িক ভোগ ও সাযুজ্য মুক্তি,—যাহা কালের দ্বারা অতি সত্বরে নষ্ট হয়, তাহা কেন ইচ্ছা করিবেন ? সাযুজ্য-মুক্তি দ্বারা জীবের সত্তা কাল-কবলে পতিত হয় । অতএব ভুক্তি ও সাযুজ্য-মুকতি ইহাদের স্থায়িত্ব নাই” ॥৩৯॥
প্রবলা ভক্তিরেব ভগবদ্বশীকরণসমর্থা, ন হি যোগজ্ঞানাদয়ঃ—
ন সাধয়তি মাং যোগো ন সাংখ্যং ধর্ম্ম উদ্ধব ।
ন স্বাধ্যায়স্তপস্ত্যাগো যথা ভক্তির্মমোর্জ্জিতা ॥৪০॥
তত্রৈব
প্রবলা ভক্তিই ভগবান্­কে বশীকরণে সমর্থ, যোগ-জ্ঞানাদি নহে—
“হে উদ্ধব, আমার প্রতি প্রবলা ভক্তি যেরূপ আমাকে বাধ্য করিতে পারে, অষ্টাঙ্গ-যোগ, অভেদ-ব্রহ্মবাদরূপ সাংখ্যজ্ঞান, ব্রাহ্মণের স্ব-শাখা-অধ্যয়নরূপ স্বাধ্যায়, সর্ব্ববিধ তপস্যা ও ত্যাগরূপ সন্ন্যাসাদি দ্বারা আমি সেরূপ বাধ্য হই না” ॥৪০॥
কৃষ্ণভক্তিঃ শ্বপাকানপি জন্মদোষাৎ পুনাতি—
ভক্ত্যাহমেকয়া গ্রাহ্যঃ শ্রদ্ধয়াত্মা প্রিয়ঃ সতাম্ ।
ভক্তিঃ পুনাতি মন্নিষ্ঠা শ্বপাকানপি সম্ভবাৎ ॥৪১॥
তত্রৈব
কৃষ্ণভক্তি চণ্ডালকেও জন্মদোষ হইতে পরিত্রাণ করে—
“সাধুদিগের প্রিয় আমি, অনন্যশ্রদ্ধাজনিত ভক্তি দ্বারাই প্রাপ্য হই । ভক্তিই মন্নিষ্ঠ-চণ্ডালকেও জন্মদোষ হইতে পরিত্রাণ করে” ॥৪১॥
প্রবলা ভক্তিরজিতেন্দ্রিয়ানপি বিষয়ভোগাদুদ্ধরতি—
বাধ্যমানোঽপি মদ্ভক্তো বিষয়ৈরজিতেন্দ্রিয়ঃ ।
প্রায়ঃ প্রগল্­ভয়া ভক্ত্যা বিষয়ৈর্নাভিভূয়তে ॥৪২॥
তত্রৈব
প্রবলাভক্তি অজিতেন্দ্রিয়গণকেও বিষয়ভোগ হইতে উদ্ধার করেন—
“ভক্ত্যাশ্রিত ব্যক্তির পূর্ব্বাভ্যস্ত অজিতেন্দ্রিয় মন কিছুদিন বিষয়ে থাকিতে বাধ্য হয় । ভক্তি অনুশীলন করিতে করিতে ভক্তি-প্রাগল্­ভ্য যত বৃদ্ধি হয়, ততই অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি ভক্তিপ্রবলতাক্রমে বিষয়ে অভিভূত হন না । ভবে যে কেহ কেহ পতিত হয়, সে কেবল কপটতার ফল” ॥৪২॥
লব্ধ-শুদ্ধভক্তি-বীজস্য নির্ব্বিণ্ণস্যানুভূতদুঃখাত্মককাম-স্বরূপস্যাপি তৎ-ত্যাগাসামর্থ্যগর্হণশীলস্য তত্র নিষ্কপট-নিষ্ঠাপূর্ব্বক-যাজিত-ভক্ত্যঙ্গস্য ভক্তস্য শনৈর্ভগবান্ হৃদয়োদিতঃ সন্ নিখিলা-বিদ্যাতৎ কার্য্যাণি চ বিধ্বংসয়ন্নিরবচ্ছিন্ন-নিজ-চিন্ময়-বিলাস-ধামৈবাবিষ্করোতি—
জাতশ্রদ্ধো মৎকথাসু নির্ব্বিণ্ণঃ সর্ব্বকর্ম্মসু ।
বেদ দুঃখাত্মকান্ কামান্ পরিত্যাগেঽপ্যনীশ্বরঃ ॥৪৩॥
ততো ভজেত মাং প্রীতঃ শ্রদ্ধালুর্দৃঢ়নিশ্চয়ঃ ।
জুষমাণশ্চ তান্ কামান্ দুঃখোদর্কাংশ্চ গর্হয়ন্ ॥৪৪॥
প্রোক্তেন ভক্তিযোগেন ভজতো মাঽসকৃন্মুনেঃ ।
কামা হৃদয্যা নশ্যন্তি সর্ব্বে ময়ি হৃদি স্থিতে ॥৪৫॥
ভিদ্যতে হৃদয়গ্রন্থিশ্ছিদ্যন্তে সর্ব্বসংশয়াঃ ।
ক্ষীয়ন্তে চাস্য কর্ম্মাণি ময়ি দৃষ্টেঽখিলাত্মনি ॥৪৬॥
তত্রৈব
শুদ্ধভক্তিবীজপ্রাপ্ত, নির্ব্বিণ্ণ, কামসমূহের দুঃখময়স্বরূপ অনুভব করিয়াও উহা পরিত্যাগে নিজ অসামর্থ্যের নিন্দন করিতে করিতে নিষ্কপট নিষ্ঠাপূর্ব্বক ভক্ত্যঙ্গসমূহ যাজনকারী ভক্তের হৃদয়ে উদিত হইয়া ভগবান্ তাঁহার সমুদায় অবিদ্যা ও তাঁহার ফলসমূহ ধ্বংস করিয়া নিজ চিদ্­বিলাস-স্বরূপ প্রকাশ করেন—
“আমার কথায় জাতশ্রদ্ধ ব্যক্তিসকল কর্ম্মফল-নির্ব্বিণ্ণ হইয়া জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ করিবেন । কাম পরিত্যাগে অশক্ত, তথাপি কামকে চরমে দুঃখাত্মক জানিয়া তাহাকে ক্রমশঃ সঙ্কোচ করিবেন” ॥৪৩॥
“শ্রদ্ধাবান্ ব্যক্তি দৃঢ়নিশ্চয় হইয়া আমাকে ভজন করিতে থাকিবেন । দুঃখই ইহার উদর্ক অর্থাৎ চরম ফল,—এরূপ জানিয়া সেই কামকে নিন্দ করিতে করিতে স্বীকার করিবেন, এই কার্য্য নিষ্কপট হইলে আমি কৃপা করি” ॥৪৪॥
“পূর্ব্বোক্ত ভক্তিযোগের দ্বারা আমাকে নিরন্তর ভজন করিতে করিতে আমি ভক্তের হৃদয়ে অবস্থিত হইয়া হৃদিজাত কামসকলকে সমূলে নাশ করি” ॥৪৫॥
“তখন সাধকের অবিদ্যাময় হৃদয়গ্রন্থি ভেদ হয়, সকল সংশয় ছেদ হয় এবং আমাকে অখিলাত্মা বলিয়া দৃষ্টি হইলে সমুদয় কর্ম্মক্ষয় হয়” ॥৪৬॥
জ্ঞানবৈরাগ্যাদীনাং কদাচিৎ শুদ্ধভক্তিবাধকত্বমতো ন ভক্ত্যঙ্গত্বম্—
তস্মান্মদ্ভক্তিযুক্তস্য
যোগিনো বৈ মদাত্মনঃ ।
ন জ্ঞানং ন চ বৈরাগ্যং
প্রায়ঃ শ্রেয়ো ভবেদিহ ॥৪৭॥
তত্রৈব
জ্ঞান-বৈরাগ্যাদি কখন কখন শুদ্ধভক্তির বাধাকারী, সুতরাং ভক্তির অঙ্গ নহে—
সাধনভক্তদিগের জ্ঞান-বৈরাগ্য-চেষ্টার প্রয়োজন নাই, আমাকে আত্মভাবে আমার ভক্তিযুক্ত যোগী-ব্যক্তি ভজন করেন । তাহাতে জ্ঞান বা বৈরাগ্যচেষ্টা দ্বারা প্রায় শ্রেয়ঃ হয় না ॥৪৭॥
শ্রদ্ধায়া এব কেবলভক্ত্যধিকারদাতৃত্বং ন জাত্যাদেঃ—
কেবলেন হি ভাবেন
গোপ্যো গাবো নগা মৃগাঃ ।
যেঽন্যে মূঢ়ধিয়ো নাগাঃ
সিদ্ধা মামীয়ুরঞ্জসা ॥৪৮॥
তত্রৈব
শ্রদ্ধাই কেবলা ভক্তিতে অধিকার দেন, জাতি প্রভৃতি নহে—
“হে উদ্ধব ! কেবল ভাবের দ্বারাই গোপীগণ, গাভীগণ, নগ-মৃগগণ ও মূঢ়বুদ্ধি নাগগণ সিদ্ধ হইয়া শীঘ্রই আমাকে লাভ করিয়াছে । (এখানে সাধনসিদ্ধা গোপী প্রভৃতির কথাই উক্ত হইয়াছে)” ॥৪৮॥
শাস্ত্রবিহিতস্বধর্ম্মত্যাগেনাপি ভগবদ্ভজনমেব কর্ত্তব্যম্—
আজ্ঞায়ৈবং গুণান্ দোষান্
ময়াদিষ্টানপি স্বকান্ ।
ধর্ম্মান্ সংত্যজ্য যঃ সর্ব্বান্
মাং ভজেৎ স চ সত্তমঃ ॥৪৯॥
তত্রৈব
শাস্ত্রবিহিত স্বধর্ম্মত্যাগ করিয়াও হরিভজনই কর্ত্তব্য—
“ধর্ম্মশাস্ত্রে আমি ভগবান্ যাহা ‘ধর্ম্ম’ বলিয়া আদেশ করিয়াছি, তাহার গুণদোষ বিচার পূর্ব্বক সেই সকল ধর্ম্মপ্রবৃত্তি ছাড়িয়া যিনি আমাকে ভজন করেন, তিনি সর্ব্বোৎকৃষ্ট (সাধু)” ॥৪৯॥
সর্ব্বজীবাবতারাণামপ্যাত্মস্বরূপঃ স্বয়ংরূপো ব্রজকিশোর এব সকলস্বরূপবৃত্তি-রস-সমাহার-মধুরভাবেন শ্রুতি-স্মৃতি-বিহিত-পতিদেবতাদিনিষ্ঠাপরিত্যাগেনৈব তৎক্রীড়া-পুত্তলিকৈরিব জীবৈঃ কাম-রূপানুগত্যেন ভজনীয়ঃ । নিখিল-ক্লেশদুষ্টাসুরসমাজপতিপুত্ত্রাদি-ভয়াৎ স রক্ষিষ্যত্যেব—
তস্মাৎ ত্বমুদ্ধবোৎসৃজ্য
চোদনাং প্রতিচোদনাম্ ।
প্রবৃত্তিঞ্চ নিবৃত্তিঞ্চ
শ্রোতব্যং শ্রুতমেব চ ॥৫০॥
মামেকমেব শরণ-
মাত্মানং সর্ব্বদেহিনাম্ ।
যাহি সর্ব্বাত্মভাবেন
ময়া স্যা হ্যকুতোভয়ঃ ॥৫১॥
তত্রৈব
সমস্ত জীব ও অবতারগণেরও আত্মস্বরূপ স্বয়ংরূপ ব্রজ-কিশোরেরই বেদাদি-শাস্ত্রবিহিত পতি ও দেবতাদির প্রতি নিষ্ঠা পরিত্যাগ করিয়াই আত্মবৃত্তিরূপ রসসমূহের সমাহারস্বরূপ মধুররসে কামরূপানুগত হইয়া তাঁহার ক্রীড়াপুত্তলিকার ন্যায় ভজন করিতে হইবে । সমস্ত ক্লেশ, অসুর, সমাজ ও পতিপুত্ত্রাদিভয় হইতে তিনি নিশ্চিত রক্ষা করেন—
“হে উদ্ধব ! তুমি বেদের প্রেরণা-বাক্য ও স্মৃতির প্রতি-প্রেরণা পরিত্যাগ করতঃ প্রবৃত্তি, নিবৃত্তি, শ্রোতব্য ও শ্রুত সমস্ত ত্যাগ করিয়া সর্ব্বদেহিগণের আত্মা-স্বরূপ আমার অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণস্বরূপের অনন্য-শরণাপত্তি কর । সর্ব্বতোভাবে তাহা করিতে পারিলে আমাতে অবস্থিত হইয়া অকুতোভয় হইবে ॥৫০-৫১॥
জীবানাং ত্যক্তভুক্তিমুক্তিদেবতান্তরাপ্তিস্পৃহানাং গৃহীত-শ্রীকৃষ্ণানুগত্যময়জীবনানামেব নিত্যস্বরূপসিদ্ধিস্তদন্তরঙ্গ-শ্রীরূপানুগভজন-পরিকরত্বঞ্চ সম্পদ্যতে—
মর্ত্ত্যো যদা ত্যক্তসমস্তকর্ম্মা
নিবেদিতাত্মা বিচিকীর্ষিতো মে ।
তদামৃতত্বং প্রতিপদ্যমানো
মমাত্মভূয়ায় চ কল্পতে বৈ ॥৫২॥
তত্রৈব
ভুক্তি, মুক্তি ও দেবতান্তর-প্রাপ্তিস্পৃহা পরিত্যাগ করিয়া শ্রীকৃষ্ণসেবাবরণকারী জীবসমূহেরই নিত্যস্বরূপ লাভ ও শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গ শ্রীরূপানুগ কৈঙ্কর্য্যসিদ্ধি—
“মরণশীল জীব যখন সমস্ত কর্ম্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক আপনাকে আমার (ভগবানের) প্রতি সম্পূর্ণরূপে নিবেদন করিয়া আমার ইচ্ছায় ক্রিয়া করিয়া থাকেন, তখন অমৃতত্ব লাভ করিয়া আমার সহিত একযোগে চিৎস্বরূপ রসভোগে কল্পিত অর্থাৎ যোগ্য হন” ॥৫২॥
স্ব-প্রিয়পরিকরেণ বিনা শ্রীভগবতোঽপ্যাত্মসত্তায়ামপ্যনভিলাষঃ—
নাহমাত্মানমাশাসে মদ্ভক্তৈঃ সাধুভির্বিনা ।
শ্রিয়ঞ্চাত্যন্তিকীং ব্রহ্মন্ যেষাং গতিরহং পরা ॥৫৩॥
তত্রৈব
ভগবান্ও নিজপ্রিয়পরিকরশূন্য জীবন আকাঙ্ক্ষা করেন না—
“হে ব্রাহ্মণবর ! যাঁহাদেব আমিই একমাত্র আশ্রয়, সেই সাধুগণ ব্যতীত আমি নিজ স্বরূপগত আনন্দ ও নিত্যা ষড়ৈশ্বর্য্যসম্পত্তির অভিলাষ করি না” ॥৫৩॥
অনন্যভজনমেব শ্রীভগবতো ভক্তানাঞ্চ পরস্পরং ত্যাগাসহনে কারণম্—
যে দারাগারপুত্ত্রাপ্ত-
প্রাণান্ বিত্তমিমং পরম্ ।
হিত্বা মাং শরণং যাতাঃ
কথং তাংস্ত্যক্তুমুৎসহে ॥৫৪॥
তত্রৈব
অনন্যভজনই শ্রীভগবান্ ও তদ্ভক্তগণের পরম্পর ত্যাগ-অসহনের কারণ—
যাহারা গৃহ, পুত্ত্র, কলত্র, আত্মীয়-স্বজন, ধন, প্রাণ, ইহলোক, পরলোক পরিত্যাগ করিয়া আমার শরণ লইয়াছে, তাহাদিগকে পরিত্যাগ করিতে আমার উৎসাহ কিরূপে হইবে ? ৫৪॥
মধুর-রসস্যৈব শ্রীহরিবশীকরণে মুখ্যত্বং তত্রাধিষ্ঠিতস্য দর্শনমেব সম্পূর্ণ-দর্শনম্—
ময়ি নির্ব্বন্ধহৃদয়াঃ
সাধবঃ সমদর্শনাঃ ।
বশে কুর্ব্বন্তি মাং ভক্ত্যা
সৎস্ত্রিয়ঃ সৎপতিং যথা ॥৫৫॥
তত্রৈব
মধুর রসই শ্রীহরিবশীকরণে মুখ্য ও তদাশ্রিতের দর্শনই সম্পূর্ণ দর্শন—
সুশীলা ভার্য্যা যেরূপ সৎ পতিকে বশীভূত করিয়া থাকেন, তদ্রূপ আমাতে সমাসক্তচিত্ত সমদর্শী সাধুগণও ভক্তিপ্রভাবে আমাকে বশীভূত করেন ॥৫৫॥
শ্রীলীলাপুরুষোত্তমস্য স্বেচ্ছাকৃত-স্বাশ্রয়-বিগ্রহগণানুগত্যময়-নিজ-নিত্য-ব্রজ-বাস্তব-মূল-পরিচয়- প্রকাশে প্রীতিতত্ত্বস্যৈব মৌলিকত্বাৎ, ন্যায়াদ্যস্য তদাশ্রিতত্বং তদধীনত্বঞ্চ, দ্বিজস্য হরিভক্তবশ্যত্বঞ্চ প্রকাশিতম্—
অহং ভক্তপরাধীনো হ্যস্বতন্ত্র ইব দ্বিজ ।
সাধুভির্গ্রস্তহৃদয়ো ভক্তৈর্ভক্তজনপ্রিয়ঃ ॥৫৬॥
তত্রৈব
লীলা-পুরুষোত্তম স্বয়ংভগবান্ ব্রজেন্দ্রনন্দনের স্বেচ্ছাকৃত নিজ আশ্রয়-বিগ্রহগণের আনুগত্যময় নিজ নিত্য বাস্তব মূল পরিচয়ের প্রকাশে প্রীতিতত্ত্বেরই মৌলিকত্ব-হেতু ন্যায়াদির তদাশ্রিত-স্বরূপ-হেতু প্রেমাধীনত্ব ও দ্বিজের হরিভক্তবশ্যতা প্রকাশিত হইল—
হে দ্বিজ ! আমি ভক্তাধীন, অতএব অস্বতন্ত্রের ন্যায়, সাধু ভক্তগণ আমার হৃদয়কে গ্রাস করিয়াছে ; ভক্তের কথা কি, ভক্তের অনুগত জনও আমার প্রিয় ॥৫৬॥
শ্রীকৃষ্ণপ্রপন্নেষু ত্যক্তাখিলস্বজনস্বধর্ম্মেষু তৎপাদৈক-রতেষু তদ্বি রহকাতরেষু শ্রীভগবতো নিজ-নাম-প্রেম-পরিকর-বিগ্রহ-লীলারসপ্রদানেন পরমাত্মীয়বৎ পরিপালন-প্রতিশ্রুতিরূপা পরমাশ্বাসবাণী—
তমাহ ভগবান্ প্রেষ্ঠং
প্রপন্নার্ত্তিহরো হরিঃ ।
যে ভ্যক্তলোকধর্ম্মাশ্চ
মদর্থে তান্ বিভর্ম্ম্যহম্ ॥৫৭॥
তত্রৈব
শ্রীকৃষ্ণপদে প্রপন্ন, তাঁহার জন্য সমস্ত স্বজন ও স্বধর্ম্ম-পরিত্যাগকারী, তাঁহার সেবানিরত বিরহকাতর ভক্তগণের সন্বন্ধে শ্রীভগবানের নিজ নাম, প্রেম, পরিকর, দেহ, লীলারস প্রদানের দ্বারা পরমাত্মীয়ের ন্যায় প্রতিপালন-প্রতিশ্রুতিরূপ পরম আশ্বাসবাণী—
প্রপন্নজনের আর্ত্তিহরণকারী ভগবান্ শ্রীহরি সেই প্রিয়তমকে (দূতরূপী উদ্ধবকে) কহিলেন—
“যাঁহারা আমার জন্য ধর্ম্ম ও সমাজ পরিত্যাগ করিয়াছেন, আমি তাঁহাদিগকে বিশেষরূপে পালন করিয়া থাকি” ॥৫৭॥

ইতি শ্রীপ্রপন্নজীবনামৃতে শ্রীভগবদ্বচনামৃতং নাম নবমোঽধ্যায়ঃ ।

 

 

← ৮ কার্পণ্যম্ ১০ অবশেষামৃতম্ →

 

সূচিপত্র:
প্রকাশকের নিবেদন
নিবেদন
১ উপক্রমামৃতম্
২ শ্রীশাস্ত্রবচনামৃতম্
শ্রীভক্তবচনামৃতম্—
৩ আনুকূল্যস্য সঙ্কল্পঃ
৪ প্রাতিকূল্য-বিবর্জ্জনম্
৫ রক্ষিষ্যতীতি বিশ্বাসঃ
৬ গোপ্তৃত্বে-বরণম্
৭ আত্মনিক্ষেপঃ
৮ কার্পণ্যম্
৯ শ্রীশ্রীভগবদ্বচনামৃতম্
১০ অবশেষামৃতম্
গ্রন্থকারের রচিত কতিপয় স্তব-রত্ন
শ্রীশ্রীপ্রভুপাদপদ্ম-স্তবকঃ
শ্রীমদ্ভক্তিবিনোদবিরহদশকম্
শ্রীশ্রীমদ্­গৌরকিশোরনমস্কারদশকম্
শ্রীশ্রীদয়িতদাসদশকম্
শ্রীমদ্রূপপদরজঃ-প্রার্থনা-দশকম্
শ্রীদয়িত-দাস-প্রণতি-পঞ্চকম্
প্রণতি-দশকম্
শ্রীগুরু আরতি-স্তুতি
প্রণাম-মন্ত্রম্

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥