শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত


১২। বৈষ্ণব-মহিমা

 

১ । কৃষ্ণভক্তি ও তীর্থ

জলময় তীর্থ মৃৎশিলাময় মূর্ত্তি ।

বহুকালে দেয় জীবহৃদে ধর্ম্মস্ফূর্ত্তির্ ॥১॥

কৃষ্ণভক্ত দেখি’ দূরে যায় সর্ব্বানর্থ ।

কৃষ্ণভক্তি সমুদিত হয় পরমার্থ ॥২॥

২ । সাধুসঙ্গের ফল

সংসার ভ্রমিতে ভব ক্ষয়োন্মুখ যবে ।

সাধুসঙ্গ-সংঘটন ভাগ্যক্রমে হবে ॥৩॥

সাধুসঙ্গফলে কৃষ্ণে সর্ব্বেশ্বরেশ্বরে ।

ভাবোদয় হয় ভাই জীবের অন্তরে ॥৪॥

৩। প্রাকৃত বা কনিষ্ঠ ভক্ত

সেই ত’ প্রাকৃত ভক্ত দীক্ষিত হইয়া ।

কৃষ্ণার্চ্চন করে বিধিমার্গেতে বসিয়া ॥৫॥

উত্তম মধ্যম ভক্ত না করে বিচার ।

শুদ্ধভক্তে সমাদর না হয় তাহার ॥৬॥

৪। মধ্যম ভক্ত

কৃষ্ণে প্রেম, ভক্তে মৈত্রী, মূঢ়ে কৃপা আর ।

শুদ্ধভক্তদ্বেষী জনে উপেক্ষা যাঁহার ॥৭॥


তিহোঁ ত’ প্রকৃত ভক্তিসাধক মধ্যম ।

অতি শীঘ্র কৃষ্ণ-বলে হইবে উত্তম ॥৮॥

৫। উত্তম ভক্ত

সর্ব্বভূতে শ্রীকৃষ্ণের ভাব সন্দর্শন ।

ভগবানে সর্ব্বভূতে করেন দর্শন ॥৯॥


শত্রু-মিত্র-বিষয়েতে নাহি রাগদ্বেষ ।

তিহোঁ ভাগবতোত্তম এই গৌর-উপদেশ ॥১০॥

৬। উত্তম ভক্তের বিষয়-স্বীকার

বিষয় ইন্দ্রিয়দ্বারে করিয়া স্বীকার ।

রাগদ্বেষহীন ভক্তি জীবনে যাঁহার ॥১১॥


সমস্ত জগৎ দেখি’ বিষ্ণুমায়াময় ।

ভাগবতগণোত্তম সেই মহাশয় ॥১২॥

৭। তাঁহার ইন্দ্রিয় বৃত্তি পরিচালন

দেহেন্দ্রিয়-প্রাণ-মন-বুদ্ধি-যুক্ত-সবে ।

জন্ম নাশ ক্ষুধা তৃষ্ণা ভয় উপদ্রবে ॥১৩॥


অনিত্য সংসার-ধর্ম্মে হঞা মোহহীন ।

কৃষ্ণ স্মরি’ কাল কাটে ভক্ত সমীচীন ॥১৪॥

৮। তাঁহার কর্ম্ম দেহযাত্রার্থে মাত্র—কামের জন্য নহে

যাঁর চিত্তে নিরন্তর যশোদানন্দন ।

দেহযাত্রামাত্র কামকর্ম্মের গ্রহণ ॥১৫॥

কামকর্ম্মবীজরূপ বাসনা তাঁহার ।

চিত্তে নাহি জন্মে এই ভক্তিতত্ত্বসার ॥১৬॥

৯। হরিজন দেহাত্মবুদ্ধিহীন

জ্ঞান-কর্ম্ম-বর্ণাশ্রম দেহের স্বভাব ।

তাহে সঙ্গদ্বারা হয় ‘অহং-মম’-ভাব ॥১৭॥

দেহসত্ত্বে ‘অহং-মম’-ভাব নাহি যাঁর ।

হরিপ্রিয়জন তিহোঁ, করহ বিচার ॥১৮॥

১০। সর্ব্বভূতে সমবুদ্ধিসম্পন্ন

বিত্তসত্ত্বে তাহে ছাড়ি’ স্ব-পরভাবনা ।

‘তুমি’ ‘আমি’-সত্ত্বভেদে মিত্রারি-কল্পনা ॥১৯॥

সর্ব্বভূতে সমবুদ্ধি শান্ত যেই জন ।

ভাগবতোত্তম বলি’ তাঁহার গণন ॥২০॥

১১

কৃষ্ণপাদপদ্মে সেই সুরমৃগ্য ধন ।

ভুবনবৈভব লাগি’ না ছাড়ে যে জন ॥২১॥

কৃষ্ণপদস্মৃতি নিমেষার্দ্ধ নাহি ত্যজে ।

বৈষ্ণব-অগ্রণী তিহোঁ পরানন্দে মজে ॥২২॥

১২। ভক্ত ত্রিতাপমুক্ত

কৃষ্ণপদশাখানখমণিচন্দ্রিকায় ।

নিরস্ত সকল তাপ যাঁহার হিয়ায় ॥২৩॥

সে কেন বিষয়সূর্য্যতাপ অন্বেষিবে ।

হৃদয় শীতল তার সর্ব্বদা রহিবে ॥২৪॥

১৩। উত্তম ভক্তের অন্যান্য লক্ষণ

যে বেঁধেছে প্রেমছাঁদে কৃষ্ণাঙ্ঘ্রিকমল ।

নাহি ছাড়ে হরি তার হৃদয় সরল ॥২৫॥

অবশেও যদি মুখে স্ফুরে কৃষ্ণনাম ।

ভাগবতোত্তম সেই, পূর্ণ সর্ব্ব কাম ॥২৬॥

১৪

স্বধর্ম্মের গুণদোষ বুঝিয়া যে জন ।

সর্ব্ব ধর্ম্ম ছাড়ি’ ভজে কৃষ্ণের চরণ ॥২৭॥


সেই ত’ উত্তম ভক্ত কেহ তার সম ।

না আছে জগতে আর ভাগবতোত্তম ॥২৮॥

১৫

কৃষ্ণের স্বরূপ আর নামের স্বরূপ ।

ভক্তের স্বরূপ আর ভক্তির স্বরূপ ॥২৯॥


জানিয়া ভজন করে যেই মহাজন ।

তার তুল্য নাহি কেহ বৈষ্ণব সুজন ॥৩০॥

১৬

স্বরূপ না জানে তবু অনন্যভাবেতে ।

শ্রীকৃষ্ণে সাক্ষাৎ ভজে নামস্বরূপেতে ॥৩১॥


তিহোঁ ভক্তোত্তম বলি’ জানিবেরে ভাই ।

এই আজ্ঞা দিয়াছেন চৈতন্য গোসাঞি ॥৩২॥

 


 

← ১১। নবদ্বীপ-দীপক ১৩। শ্রীগৌরদর্শনের ব্যাকুলতা →

 

সূচীপত্র:
১। মঙ্গলাচরণ
২। গ্রন্থরচনা
৩। প্রথম প্রণাম
৪। গৌরস্য গুরুতা
৫। বিবর্ত্তবিলাসসেবা
৬। জীব-গতি
৭। সকলের পক্ষে নাম
৮। কুটীনাটি ছাড়
৯। যুক্তবৈরাগ্য
১০। জাতিকুল
১১। নবদ্বীপ-দীপক
১২। বৈষ্ণব-মহিমা
১৩। শ্রীগৌরদর্শনের ব্যাকুলতা
১৪। বিপরীত বিবর্ত্ত
১৫। শ্রীনবদ্বীপে পূর্ব্বাহ্ণ-লীলা
১৬। পীরিতি কিরূপ ?
১৭। ভক্তভেদে আচারভেদ
১৮। শ্রীএকাদশী
১৯। নামরহস্যপটল
২০। নাম-মহিমা
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥