শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত


২০। নাম-মহিমা

 

একদিন কৃষ্ণদাস কাশীমিশ্রের ঘরে ।

আপন গৌছারি কিছু কহিল প্রভুরে ॥১॥

“আজ্ঞা হয় শুনি কৃষ্ণনামের মহিমা ।

যে মহিমার ব্রহ্মা শিব নাহি জানে সীমা” ॥২॥

প্রভু বলে, “কৃষ্ণনামের মহিমা অপার ।

কৃষ্ণ নিজে নাহি জানে, কি জানিব জীব ছার ॥৩॥

শাস্ত্রে যাহা শুনিয়াছি কহিব তোমারে ।

বিশ্বাস করিয়া শুন যাবে ভবপারে ॥৪॥

সর্ব্বপাপপ্রশমক সর্ব্বব্যাধিনাশ ।

সর্ব্বদুঃখবিনাশন কলিবাধাহ্রাস ॥৫॥


নারকি-উদ্ধার আর প্রারব্ধখণ্ডন ।

সর্ব্ব-অপরাধ-ক্ষয় নামে সর্ব্বক্ষণ ॥৬॥

সর্ব্ব-সৎ-কর্ম্মের পূর্ত্তি নামের বিলাস ।

সর্ব্ববেদাধিক নামসূর্যে্যর প্রকাশ ॥৭॥

সর্ব্বতীর্থের অধিক নাম সর্ব্বশাস্ত্রে কয় ।

সকল সৎকর্ম্মাধিক্য নামেতে উদয় ॥৮॥

সর্ব্বার্থপ্রদাতা নাম, সর্ব্বশক্তিময় ।

জগৎ-আনন্দকারী নামের ধর্ম্ম হয় ॥৯॥

নাম লঞা জগদ্বন্দ্য হয় সর্ব্বজন ।

অগতির গতি নাম পতিতপাবন ॥১০॥

সর্ব্বত্র সর্ব্বদা সেব্য সর্ব্বমুক্তিদাতা ।

বৈকুণ্ঠপ্রাপক নাম হরিপ্রীতিদাতা ॥১১॥

নাম স্বয়ং পুরুষার্থ ভক্ত্যঙ্গপ্রধান ।

শ্রুতি-স্মৃতি-শাস্ত্রে আছে বহুত প্রমাণ ॥১২॥

নাম সর্ব্বপাপবিনাশক

সর্ব্বপাপ নাশ করা নামের একধর্ম্ম ।

প্রথমে তাহাই সপ্রমাণ শুন মর্ম্ম ॥১৩॥

পাপী অজামিল দেখ বিবশ হইয়া ।

হরিনাম উচ্চারিল ‘নারায়ণ’ বলিয়া ॥১৪॥


কোটি কোটি জন্মে পাপ করিয়াছে যত ।

সে সকল হইতে মুক্ত হইল সাম্প্রত ॥১৫॥

অয়ং হি কৃতনির্ব্বেশো জন্মকোট্যংহসামপি ।

যদ্ব্যাজহার বিবশো নাম স্বস্ত্যয়নং হরেঃ ॥১৬॥

স্ত্রী-রাজ-গো-ব্রাহ্মণ-ঘাতী মদ্যরত ।

গুরুপত্নীগামী মিত্রদ্রোহী চৌর্য্যব্রত ॥১৭॥


এ সবের পাপ আর অন্য পাপচয় ।

হরিনাম উচ্চারণে সব পরিষ্কৃত হয় ॥১৮॥

পাপ সুনিষ্কৃত হৈলে কৃষ্ণে হয় মতি ।

এইরূপে নামে জীবের হয় ত’ সদ্গতি ॥১৯॥

স্তেনঃ সুরাপো মিত্রধ্রুগ্ ব্রহ্মহা গুরুতল্পগঃ ।

স্ত্রীরাজপিতৃ গোহন্তা যে চ পাতকিনোঽপরে ॥২০॥

সর্ব্বেষামপ্যঘবতামিদমেব সুনিষ্কৃতমং ।

নামব্যাহরণং বিষ্ণোর্যতস্তদ্বিষয়া মতিঃ ॥২১॥

ব্রতাদি নামের নিকট তুচ্ছ

চান্দ্রায়ণব্রত-আদি শাস্ত্রোক্ত প্রকারে ।

পাপ হইতে পাপীকে নাহি সেরূপ নিস্তারে ॥২২॥


কৃষ্ণনাম একবার উচ্চারিত যবে ।

সর্ব্বপাপ হইতে পাপী মুক্ত হয় তবে ॥২৩॥

ন নিষ্কৃতৈরুদিতৈর্ব্রহ্মবাদিভিস্

তথা বিশুদ্ধ্যত্যঘবান্ ব্রতাদিভিঃ ।

যথা হরের্নামপদৈরুদাহৃতৈস্

তদুত্তমঃশ্লোকগুণোপলম্ভকম্ ॥২৪॥

সঙ্কেতে বা হেলায় নামগ্রহণ

সঙ্কেত বা পরিহাস স্তোভ হেলা করি’ ।

নামাভাসে কভু যদি বলে ‘কৃষ্ণ’ ‘হরি’ ॥২৫॥


অশেষপাতক তার দূরে যায় তবে ।

শ্রীবৈকুণ্ঠে নীত হয় যমদূতের পরাভবে ॥২৬॥

সাঙ্কেত্যং পারিহাস্যং বা স্তোভং হেলনমেব বা ।

বৈকুণ্ঠনাম-গ্রহণমশেষাঘহরং পরম্ ॥২৭॥

পড়ি’ খসি’ ভগ্ন দষ্ট দগ্ধ বা আহত ।

হইয়া বিবশে বলে, ‘আমি হৈনু হত’ ॥২৮॥


‘কৃষ্ণ’ ‘হরি’ ‘নারায়ণ’ নাম মুখে ডাকে ।

যাতনা কখন আশ্রয় না করে তাহাকে ॥২৯॥

পতিতঃ স্খলিতো ভগ্নঃ সংদষ্টস্তপ্ত আহতঃ ।

হরিরিত্যবশেনাহ পুমান্নার্হতি যাতনাঃ ॥৩০॥

জ্ঞানে বা অজ্ঞানে নাম

অজ্ঞানে বা জ্ঞানে কৃষ্ণনাম-সঙ্কীর্ত্তনে ।

সর্ব্বপাপ ভস্ম হয়, যথা কাষ্ঠ অগ্ন্যর্পণে ॥৩১॥

অজ্ঞানাদথবা জ্ঞানাদুত্তমঃশ্লোকনাম যৎ ।

সঙ্কীর্ত্তিতমঘং পুংসো দহেদেধো যথানলঃ ॥৩২॥

প্রারব্ধ অপ্রারব্ধ সমস্ত পাপনাশ

বর্ত্তমান পাপ আর পূর্ব্ব-জন্মার্জ্জিত ।

ভবিষ্যতে হবে যাহা সে সকল হত ॥৩৩॥


অনায়াসে হবে কৃষ্ণনাম-সঙ্কীর্ত্তনে ।

নাম বিনা বন্ধু নাহি জীবের জীবনে ॥৩৪॥

বর্ত্তমানস্তু যৎ পাপং যদ্ভূতং যদ্ভবিষ্যতি ।

তৎসর্ব্বং নির্দ্দহত্যাশু গোবিন্দ-কীর্ত্তনানলঃ ॥৩৫॥

দ্রোহকারীর মুক্তি

মহীতলে সজ্জনের প্রতি পাপাচারে ।

নামকীর্ত্তনেতে মুক্তি লভে সর্ব্ব নরে ॥৩৬॥

সদা দ্রোহপরো যস্তু সজ্জনানাং মহীতলে ।

জায়তে পাবনো ধন্যো হরের্নামানুকীর্ত্তনাৎ ॥৩৭॥

কোটি প্রায়শ্চিত্ত নামতুল্য নহে

শাস্ত্রে কোটি কোটি প্রায়শ্চিত্ত আছে কহে ।

কিন্তু কৃষ্ণকীর্ত্তনের তুল্য কেহ নহে ॥৩৮॥

বসন্তি যানি কোটিস্তু পাবনানি মহীতলে ।

ন তানি তত্তুল্যং যান্তি কৃষ্ণনামানুকীর্ত্তনে ॥৩৯॥

নামগ্রহণকারীর পাপ থাকে না

হরিনাম যত পাপ নির্হরণ করে ।

তত পাপ পাপী কভু করিতে না পারে ॥৪০॥

নাম্নোঽস্য যাবতী শক্তিঃ পাপ-নির্হরণে হরেঃ ।

তাবৎ কর্ত্তুং ন শক্নোতি পাতকং পাতকী জনঃ ॥৪১॥

মনোবাক্​কায়জ পাপ তত নাহি হয় ।

কলিতে গোবিন্দ-নামে নাহি হয় ক্ষয় ॥৪২॥

তন্নাস্তি কর্ম্মজং লোকে বাগ্​জং মানসমেব বা ।

যন্ন ক্ষপয়তে পাপং কলৌ গোবিন্দকীর্ত্তনম্ ॥৪৩॥

নামে সর্ব্বরোগনাশ

নামে সর্ব্বব্যাধিধ্বংস সর্ব্বশাস্ত্রে গায় ।

ওগো স্থানেশ্বরী ভক্ত বলিহে তোমায় ॥৪৪॥

সত্য সত্য বলি, ‘লহ বিশ্বাস করিয়া ।

‘অচ্যুতানন্দ’ ‘গোবিন্দ’ এই নাম উচ্চারিয়া ॥৪৫॥


কাঁদিয়া কাঁদিয়া ডাক শ্রীমধুসূদনে ।

সর্ব্বরোগ নাশ করে শ্রীনামকীর্ত্তনে ॥৪৬॥

অচ্যুতানন্দ-গোবিন্দ-নামোচ্চারণভীষিতাঃ ।

নশ্যন্তি সকলা রোগাঃ সত্যং সত্যং বদাম্যহম্ ॥৪৭॥

নামে মহাপাতকী পংক্তিপাবন হয়

মহাপাতকীও অহর্নিশ হরিগানে ।

শুদ্ধ হঞা গণ্য হয় সুপংক্তিপাবনে ॥৪৮॥

মহাপাতকযুক্তোঽপি কীর্ত্তয়ন্ননিশং হরিম্ ।

শুদ্ধান্তঃকরণো ভূত্বা জায়তে পংক্তিপাবনঃ ॥৪৯॥

ভয় ও দণ্ড নিবারণ

মহাব্যাধি-ভয়ও বা রাজদণ্ড-ভয় ।

নারায়ণ-সঙ্কীর্ত্তনে নিরাতঙ্ক হয় ॥৫০॥

মহাব্যাধি-সমাচ্ছন্নো রাজবাধোপপীড়িতঃ ।

নারায়ণেতি সঙ্কীর্ত্ত্য নিরাতঙ্কো ভবেন্নরঃ ॥৫১॥

সর্ব্বরোগ-সর্ব্বক্লেশ-উপদ্রব-সনে ।

অরিষ্টাদি-বিনাশ হয় হরি-উচ্চারণে ॥৫২॥

সর্ব্বরোগোপশমনং সর্ব্বোপদ্রবনাশনম্ ।

শান্তিদং সর্ব্বারিষ্টানাং হরের্নামানুকীর্ত্তনম্ ॥৫৩॥

যথা অতিবায়ুবলে মেঘ দূরে যায় ।

সূর্য্যোদয়ে তমো নাশ অবশ্যই পায় ॥৫৪॥


তথা সঙ্কীর্ত্তিত নাম জীবের ব্যসন ।

দূর করে স্বপ্রভাবে, এ ব্যাসবচন ॥৫৫॥

সঙ্কীর্ত্ত্যমানো ভগবাননন্তঃ
শ্রুতানুভাবো ব্যসনং হি পুংসাম্ ।

প্রবিশ্য চিত্তং বিধুনোত্যশেষং
যথা তমোঽর্কোঽভ্রমিবাতিবাতম্ ॥৫৬॥

আর্ত্ত বা বিষণ্ণ শিথিলমনা ভীত ।

ঘোরব্যাধিক্লেশে আর নাহি দেখে হিত ॥৫৭॥


‘নারায়ণ’ ‘হরি’ বলি’ করে সঙ্কীর্ত্তন ।

নিশ্চয় বিমুক্তদুঃখ সুখী সেই জন ॥৫৮॥

আর্ত্তা বিষণ্ণাঃ শিথিলাশ্চ ভীতা
ঘোরেষু চ ব্যাধিষু বর্ত্তমানাঃ ।

সঙ্কীর্ত্ত্য নারায়ণ-শব্দমেকং
বিমুক্তদুঃখাঃ সুখিনো ভবন্তি ॥৫৯॥

অসীম শক্তিমান্ বিষ্ণু, তাঁহার কীর্ত্তনে ।

যক্ষ-রক্ষ-বেতালাদি ভূতপ্রেতগণে ॥৬০॥


বিনায়ক-ডাকিন্যাদি হিংস্রক সমস্ত ।

পলায়ন করে সবে দুঃখ হয় অস্ত ॥৬১॥

সর্ব্বানর্থনাশী হরিনাম-সঙ্কীর্ত্তন ।

ক্ষুধা তৃষ্ণা স্খলিতাদি বিপদনাশন ॥৬২॥

ইহাতে সংশয় যথা, নিশ্চয় তথায় ।

নামের বিক্রম কভু না হয় উদয় ॥৬৩॥

বিশ্বাসে নামের কৃপা, অবিশ্বাসে নয় ।

এ এক রহস্য, ভক্ত জানহ নিশ্চয় ॥৬৪॥

কীর্ত্তনাদ্দেবদেবস্য বিষ্ণোর্মিততেজসঃ ।

যক্ষরাক্ষসবেতালভূতপ্রেতবিনায়কাঃ ॥৬৫॥

ডাকিন্যো বিদ্রবন্তি স্ম যে তথান্যে চ হিংসকাঃ ।

সর্ব্বানর্থহরং তস্য নামসঙ্কীর্ত্তনং স্মৃতম্ ॥৬৬॥

নামসঙ্কীর্ত্তনং কৃত্বা ক্ষুত্তৃট্ প্রস্খলিতাদিষু ।

বিয়োগং শীঘ্রমাপ্নোতি সর্ব্বানর্থৈর্ন সংশয়ঃ ॥৬৭॥

কলিকালকুসর্পের তীক্ষ্ণ দংষ্ট্রা হেরি’ ।

ভয় না করিও ভক্ত, শুন শ্রদ্ধা করি’ ॥৬৮॥

কৃষ্ণনাম-দাবানল প্রজ্জ্বলিত হঞা ।

সে সর্পের দংষ্ট্রা দগ্ধ করিবে ফেলিয়া ॥৬৯॥

কলিকালকুসর্পস্য তীক্ষ্ণদংষ্ট্রস্য মা ভয়ং ।

গোবিন্দনামদাবেন দগ্ধো যাস্যতি ভস্মতাং ॥৭০॥

এই ঘোর কলিযুগে হরিনামাশ্রয়ে ।

কৃতকৃত্য ভক্তগণ ত্যক্ত-অন্যাশ্রয়ে ॥৭১॥

হরে কেশব গোবিন্দ বাসুদেব জগন্ময় ।

এই নাম সঙ্কীর্ত্তনে বড় সুখোদয় ॥৭২॥

সদা যেই গায় নাম বিশ্বাস করিয়া ।

কলিবাধা নাহি তার সদা শুদ্ধ হিয়া ॥৭৩॥

হরিনামপরা যে চ ঘোরে কলিযুগে নরাঃ ।

তে এব কৃতকৃত্যাশ্চ ন কলির্ব্বাধতে হি তান্ ॥৭৪॥

হরে কেশব গোবিন্দ বাসুদেব জগন্ময় ।

ইতীরয়ন্তি যে নিত্যং ন হি তান্ বাধতে কলিঃ ॥৭৫॥

নারকী কীর্ত্তন করে ‘হরি’ ‘কৃষ্ণ’ বলি’ ।

হরিভক্ত হঞা যায় দিব্যধামে চলি’ ॥৭৬॥

যথা যথা হরের্নাম কীর্ত্তয়ন্তি স্ম নারকাঃ ।

তথা তথা হরৌ ভক্তিমুদ্বহন্তৌ দিবং যয়ুঃ ॥৭৭॥

প্রারব্ধখণ্ডন কেবল হরিনামে হয় ।

জ্ঞানকর্ম্মে সেই ফল কভু না মিলয় ॥৭৮॥

বিনা হরিকীর্ত্তন কভু কর্ম্মবন্ধ ।

খণ্ডন না হয়, মুমুক্ষুতা নহে লব্ধ ॥৭৯॥


যে মুক্তি লভিলে আর না হয় কর্ম্মসঙ্গ ।

রজস্তমোদোষহীন শূন্য মায়াসঙ্গ ॥৮০॥

নাতঃ পরং কর্ম্মনিবন্ধকৃন্তনং

মুমুক্ষতাং তীর্থপদানুকীর্ত্তনাৎ ।

ন যৎ পুনঃ কর্ম্মসু সজ্জতে মনো-

রজস্তমোভ্যাং কলিলং ততোঽন্যথা ॥৮১॥

ম্রিয়মাণ ক্লিষ্ট জন পড়িতে খসিতে ।

বিবশ হইয়া কৃষ্ণ বলে কোনমতে ॥৮২॥


কর্ম্মার্গলমুক্ত হঞা লভে পরা গতি ।

কলিকালে যাহা নাহি লভে অন্য মতি ॥৮৩॥

যন্নামধেয়ং ম্রিয়মাণ আতুরঃ

পতন্ স্খলন্ বা বিবশো গৃণন্ পুমান্ ।

বিমুক্তকর্ম্মার্গল উত্তমাং গতিং

প্রাপ্নোতি যক্ষ্যন্তি ন তং কলৌ জনাঃ ॥৮৪॥

শ্রদ্ধা করি’ নাম লইলে অপরাধকোটী ।

ক্ষমা করে কৃষ্ণ যদি না থাকে কুটিনাটী ॥৮৫॥

ইহাতে বিশ্বাস যার না হয় সে জন ।

বড়ই দুর্ভাগা তার নাহিক মোচন ॥৮৬॥

মম নামানি লোকেঽস্মিন্ শ্রদ্ধয়া যস্তু কীর্ত্তয়েৎ ।

তস্যাপরাধকোটিস্তু ক্ষমাম্যেবং ন সংশয়ঃ ॥৮৭॥

মন্ত্র-তন্ত্র-ছিদ্র দেশ-কাল-বস্তু-দোষ ।

নামসঙ্কীর্ত্তনে যায়, পায় পরম সন্তোষ ॥৮৮॥

সৎকর্ম্ম প্রধান নাম, তাহার আশ্রয়ে ।

অন্য সৎকর্ম্মের সিদ্ধি হইবে নিশ্চয়ে ॥৮৯॥

মন্ত্রতস্তন্ত্রতশ্ছিদ্রং দেশকালার্হবস্তুতঃ ।

সর্ব্বং করোতি নিশ্ছিদ্রং নামসঙ্কীর্ত্তনং তব ॥৯০॥

সর্ব্ববেদাধিক নাম, ইহাতে সংশয় ।

যে করে তাহার কভু মঙ্গল না হয় ॥৯১॥

প্রণব কৃষ্ণের নাম যাহা হৈতে বেদ ।

জন্মিল ব্রহ্মার মুখে বুঝ তত্ত্বভেদ ॥৯২॥


ঋক্-যজু-সামাথর্ব্ব সে কৈল পঠন ।

‘হরি’ ‘হরি’ যার মুখে শুনি’ অনুক্ষণ ॥৯৩॥

ঋগ্বেদো হি যজুর্ব্বেদঃ সামবেদোপ্যঽথর্ব্বণঃ ।

অধীতাস্তেন যেনোক্তং হরিরিত্যক্ষরদ্বয়ম্ ॥৯৪॥

ঋক্-যজু-সামাথর্ব্ব পঠ কি কারণ ? ।

‘গোবিন্দ’ ‘গোবিন্দ’ নাম করহ কীর্ত্তন ॥৯৫॥

মা ঋচো মা যজুস্তাত মা সাম পঠ কিঞ্চন ।

গোবিন্দেতি হরের্নাম গেয়ং গায়স্ব নিত্যশঃ ॥৯৬॥

বিষ্ণুর প্রত্যেক নাম সর্ব্ববেদাধিক ।

‘রাম’-নাম জান সহস্র নামের অধিক ॥৯৭॥

বিষ্ণোরেকৈকনামাপি সর্ব্ববেদাধিকং মতম্ ।

তাদৃক্ নামসহস্রেণ ‘রাম’-নামসমং স্মৃতম্ ॥৯৮॥

সহস্র নাম তিনবার আবৃত্তি করিলে ।

যেই ফল হয় তাহা এক কৃষ্ণ-নামে মিলে ॥৯৯॥

‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হে’ ।

এই নাম সর্ব্বক্ষণ ভক্ত সব কর হে ॥১০০॥

‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে ।

হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে’ ॥১০১॥


এই ষোল নামে সর্ব্বদিক্ বজায় রহিল হে ।

সর্ব্বফলসিদ্ধি লাভ এই ষোল নামে হইবে হে ॥১০২॥

সহস্রনাম্নাং পুণ্যানাং ত্রিরাবৃত্ত্যা তু যৎ ফলম্ ।

একাবৃত্ত্যা তু কৃষ্ণস্য নামৈকং তৎ প্রযচ্ছতি ॥১০৩॥

তীর্থযাত্রাপরিশ্রমে কিবা ফল হবে ।

‘হরে কৃষ্ণ’ নিত্য গানে সব ফল পাবে ॥১০৪॥

কিবা কুরুক্ষেত্র, কাশী, পুষ্কর-ভ্রমণে ।

জিহ্বাগ্রেতে হরিনাম যাঁর ক্ষণে ক্ষণে ॥১০৫॥

কুরুক্ষেত্রেণ কিং তস্য কিং কাশ্যা পুষ্করেণ বা ।

জিহ্বাগ্রে বসতি যস্য হরিরিত্যক্ষরদ্বয়ম্ ॥১০৬॥

কোটি শত কোটি সহস্র তীর্থে যাহা নয় ।

হরিনাম-কীর্ত্তনেতে সেই ফল হয় ॥১০৭॥

তীর্থকোটিসহস্রাণি তীর্থকোটিশতানি চ ।

তানি সর্ব্বাণ্যবাপ্নোতি বিষ্ণোর্নামানুকীর্ত্তনাৎ ॥১০৮॥

কুরুক্ষেত্রে বসি’ বিশ্বামিত্র ঋষি বলে ।

‘শুনিয়াছি বহু তীর্থনাম ধরাতলে ॥১০৯॥


হরিনাম-কীর্ত্তনের কোটি-অংশতুল্য ।

কোন তীর্থ নাহি’—এই বাক্য বহু মূল্য ॥১১০॥

বিশ্রুতানি বহুন্যেব তীর্থানি বহুধানি চ ।

কোট্যংশেনাপি তুল্যানি নামকীর্ত্তনতো হরেঃ ॥১১১॥

বেদাগম বহু শাস্ত্রে কিবা প্রয়োজন ।

কেন করে লোক বহুতীর্থাদি ভ্রমণ ॥১১২॥

আত্মমুক্তিবাঞ্ছা যার, সেই সর্ব্বক্ষণ ।

‘গোবিন্দ’ ‘গোবিন্দ’ বলি’ করুক কীর্ত্তন ॥১১৩॥

কিন্তাত বেদাগমশাস্ত্রবিস্তরৈস্
তীর্থৈরনেকৈরপি কিং প্রয়োজনম্ ।

যদ্যাত্মনো বাঞ্ছসি মুক্তিকারণং
গোবিন্দ গোবিন্দ ইতি স্ফুটং রট ॥১১৪॥

সর্ব্বসৎকর্ম্মাধিক নাম জানহ নিশ্চয় ।

এই কথা বিশ্বাসিলে সর্ব্বধর্ম্ম হয় ॥১১৫॥

সূর্য্য উপরাগে কোটি কোটি গরুদান ।

প্রয়াগেতে কল্পবাস মাঘেতে বিধান ॥১১৬॥


অযুত যজ্ঞাদি কর্ম্ম স্বর্গমেরুদান ।

শতাংশেতে হরিনামের না হয় সমান ॥১১৭॥

গোকোটিদানং গ্রহণে খগস্য
প্রয়াগগঙ্গোদকে-কল্পবাসঃ ।

যজ্ঞাযুতং মেরুসুবর্ণদানং
গোবিন্দকীর্ত্তের্ন সমং শতাংশৈঃ ॥১১৮॥

ইষ্টাপূর্ত্ত কর্ম্ম বহু বহু কৃত হৈলে ।

তথাপি সে সব ভবহেতু শাস্ত্রে বলে ॥১১৯॥

হরিনাম অনায়াসে ভবমুক্তিধর ।

কর্ম্মফল নামের কাছে অকিঞ্চিৎকর ॥১২০॥

ইষ্টাপূর্ত্তানি কর্ম্মাণি সুবহূনি কৃতান্যপি ।

ভবহেতূস্তান্যেব হরের্নামস্তু মুক্তিদম্ ॥১২১॥

সাঙ্খ্য-অষ্টাঙ্গাদি যোগে কিবা আশা ধর ।

মুক্তি চাও—গোবিন্দ-কীর্ত্তন সদা কর ॥১২২॥

মুক্তিও সামান্য ফল নামের নিকটে ।

হেলায় করিলে নাম জীবের মুক্তি ঘটে ॥১২৩॥

কিং করিষ্যতি সাঙ্খ্যেন কিং যোগৈর্নরনায়ক ।

মুক্তিমিচ্ছসি রাজেন্দ্র কুরু গোবিন্দকীর্ত্তনম্ ॥১২৪॥

শ্বপচ হইলেও দ্বিজশ্রেষ্ঠ বলি তারে ।

যাহার জিহ্বাগ্রে কৃষ্ণনাম নৃত্য করে ॥১২৫॥

সর্ব্বতপ কৈল সর্ব্বতীর্থে কৈল স্নান ।

সর্ব্ববেদ অধ্যয়নে আর্য্য মতিমান্ ॥১২৬॥


এই সব সাধনের বলে ভাগ্যবান্ ।

রসনায় সদা করে হরিনাম গান ॥১২৭॥

অহো বত শ্বপচোঽতো গরীয়ান্
যজ্জিহ্বাগ্রে বর্ত্ততে নাম তুভ্যম্ ।

তেপুস্তপস্তে জুহুবুঃ সস্নূরার্য্যা
ব্রহ্মান্নূচুর্নাম গৃণন্তি যে তে ॥১২৮॥

সর্ব্ব-অর্থ-দাতা হরিনাম মহামন্ত্র ।

ফুকারিয়া বলে যত বেদাগমতন্ত্র ॥১২৯॥

হরিনামবলে সর্ব্বষড়্​বর্গ-দমন ।

রিপুনিগ্রহণ আর অধ্যাত্ম-সাধন ॥১৩০॥

এতৎ ষড়্​বর্গহরণং রিপুনিগ্রহণং পরম্ ।

অধ্যাত্মমূলমেতদ্ধি বিষ্ণোর্নামানুকীর্ত্তনম্ ॥১৩১॥

গুণজ্ঞ সারভুক্ আর্য্য কলিকে সম্মানে ।

সর্ব্বস্বার্থ লভি’ কলৌ নাম-সঙ্কীর্ত্তনে ॥১৩২॥

কলিং সভাজয়ন্ত্যার্য্যা গুণজ্ঞাঃ সারভাগিনঃ ।

যত্র সঙ্কীর্ত্তনেনৈব সর্ব্বং স্বার্থোঽভিলভ্যতে ॥১৩৩॥

সর্ব্বশক্তিমান্ নাম কৃষ্ণের সমান ।

কৃষ্ণের সকল শক্তি নামে বর্ত্তমান ॥১৩৪॥

দানব্রতস্তপস্তীর্থে ছিল যত শক্তি ।

দেবগণে কর্ম্মকাণ্ডে হইয়া বিভক্তি ॥১৩৫॥


রাজসূয়ে অশ্বমেধে আধ্যাত্মিক জ্ঞানে ।

সব আকর্ষিয়া কৃষ্ণ নিল আপন নামে ॥১৩৬॥

দানব্রততপস্তীর্থক্ষেত্রাদীনাঞ্চ যাঃ স্থিতাঃ ।

শক্তয়ো দেবমহতাং সর্ব্বপাপহরাঃ শুভাঃ ॥১৩৭॥

রাজসূয়াশ্বমেধানাং জ্ঞানমধ্যাত্মবস্তুনঃ ।

আকৃষ্য হরিণা সর্ব্বাঃ স্থাপিতাঃ স্বেষু নামসু ॥১৩৮॥

দেবদেব শ্রীকৃষ্ণের সর্ব্ব অর্থ শক্তি ।

যুক্ত সব নাম, তঁহি মধ্যে যাতে আনুরক্তি ॥১৩৯॥


সেই নাম সর্ব্ব অর্থে যোজনা করিবে ।

সর্ব্ব অর্থ শক্তি হৈতে সকলই মিলিবে ॥১৪০॥

সর্ব্বার্থশক্তিযুক্তস্য দেবদেবস্য চক্রিণঃ ।

যচ্চাভিরুচিতং নাম তৎ সর্ব্বার্থেষু যোজয়েৎ ॥১৪১॥

হৃষীকেশ-সঙ্কীর্ত্তনে জগদানন্দিত ।

অনুরাগে হৃষ্টচিত্ত সর্ব্বদা সম্প্রীত ॥১৪২॥


দৈত্য রক্ষ ভীত হঞা পলাইয়া যায় ।

সিদ্ধসঙ্ঘ সদা প্রণমিত তাঁর পায় ॥১৪৩॥

যেই কৃষ্ণ সেই নাম, নামের প্রভাব ।

উপযুক্ত বটে তাতে না থাকে অভাব ॥১৪৪॥

স্থানে হৃষীকেশ তব প্রকীর্ত্ত্যা

জগৎ প্রহৃষ্যত্যনুরজ্যতে চ ।

রক্ষাংসি ভীতানি দিশো
দ্রবন্তি
সর্ব্বে নমস্যন্তি চ সিদ্ধসঙ্ঘাঃ ॥১৪৫॥

বর্ণাদি বিচার নাহি শ্রীনামসঙ্কীর্ত্তনে ।

দীক্ষাপুরশ্চর্য্যা বিধি বাধা নাই গণে ॥১৪৬॥

নারায়ণ জগন্নাথ বাসুদেব জনার্দ্দন ।

যার মুখে সদা শুনি, পূজ্য গুরু সেই জন ॥১৪৭॥

শয়নে স্বপনে আর চলিতে বসিতে ।

কৃষ্ণনাম করে যেই, পূজ্য সর্ব্ব মতে ॥১৪৮॥

নারায়ণ জগন্নাথ বাসুদেব জনার্দ্দন ।

ইতীরয়ন্তি যে নিত্যং তে বৈ সর্ব্বত্র বন্দিতাঃ ॥১৪৯॥


স্বপন্ ভুঞ্জন্ ব্রজংস্তিষ্ঠনুত্তিষ্ঠংশ্চ বদংস্তথা ।

যে বদন্তি হরের্নাম তেভ্যো নিত্যং নমো নমঃ ॥১৫০॥

স্ত্রী-শূদ্র-পুক্কশ-যবনাদি কেন নয় ।

কৃষ্ণনাম গায়, সেও গুরু পূজ্য হয় ॥১৫১॥

স্ত্রী শূদ্রঃ পুক্কশো বাপি যে চান্যে পাপযোনয়ঃ ।

কীর্ত্তয়ন্তি হরিং ভক্ত্যা তেভ্যোঽপীহ নমো নমঃ ॥১৫২॥

অন্যগতিশূন্য ভোগী পর-উপতাপী ।

ব্রহ্মচর্য্য-জ্ঞানবৈরাগ্যহীন পাপী ॥১৫৩॥


সর্ব্বধর্ম্মশূন্য নামজপী যদি হয় ।

তাহার যে সুগতি তাহা সর্ব্ব ধার্ম্মিকের নয় ॥১৫৪॥

অনন্যগতয়ো মর্ত্ত্যা ভোগিনোঽপি পরন্তপাঃ ।

জ্ঞানবৈরাগ্যরহিতা ব্রহ্মচর্য্যাদিবর্জ্জিতাঃ ॥১৫৫॥

সর্ব্বধর্ম্মোজ্​ঝিতা বিষ্ণোর্নামমাত্রৈকজল্পকাঃ ।

সুখেন যাং গতিং যান্তি ন তাং সর্ব্বেঽপি ধার্ম্মিকাঃ ॥১৫৬॥

হরিনামগ্রহণে দেশকালের নিয়ম নাই ।

উচ্ছিষ্ট অশৌচে বিধি নিষেধ না পাই ॥১৫৭॥

ন দেশনিয়মস্তস্মিন্ ন কালনিয়মস্তথা ।

নোচ্ছিষ্টাদৌ নিষেধোঽস্তি শ্রীহরের্নাম্নি লুব্ধকঃ ॥১৫৮॥

কৃষ্ণনাম সদা সর্ব্বত্র করহ কীর্ত্তন ।

অশৌচাদি নাহি মান, নাম স্বতন্ত্র পাবন ॥১৫৯॥

চক্রায়ুধস্য নামানি সদা সর্ব্বত্র কীর্ত্তয়েৎ ।

নাশৌচং কীর্ত্তনে তস্য স পবিত্রকরো যতঃ ॥১৬০॥

যজ্ঞে দানে স্নানে জপে আছে কালের নিয়ম ।

কৃষ্ণকীর্ত্তনে কালাকালচিন্তা মহাভ্রম ॥১৬১॥

দেশ-কাল-নিয়মাদি নামে কভু নাই ।

কৃষ্ণকীর্ত্তন সদা করহ সবাই ॥১৬২॥

ন দেশনিয়মো রাজন্ ন কালনিয়মস্তথা ।

বিদ্যতে নাত্র সন্দেহো বিষ্ণোর্নামানুকীর্ত্তনে ॥১৬৩॥

কালোঽস্তি দানে যজ্ঞে চ স্নানে কালোঽস্তি সজ্জপে ।

বিষ্ণুসঙ্কীর্ত্তনে কালো নাস্ত্যত্র পৃথিবীতলে ॥১৬৪॥

সংসারে নির্ব্বিণ্ণচিত্ত অভয়পদ চায় ।

হেন যোগীর জন্য নাম একমাত্র উপায় ॥১৬৫॥

এতন্নির্ব্বিদ্যমানানামিচ্ছতামকুতোভয়ম্ ।

যোগীনাং নৃপ নির্ণীতং হরের্নামানুকীর্ত্তনম্ ॥১৬৬॥

হরিনাম বিনা আর সহজ মুক্তিদাতা ।

কেহ নাহি ত্রিজগতে, নামই জীবের ত্রাতা ॥১৬৭॥

একবার মুখে বলে ‘হরি’ দু’অক্ষর ।

সেইজন মোক্ষপ্রতি বদ্ধপরিকর ॥১৬৮॥

সকৃদুচ্চারিতং যেন হরিরিত্যক্ষরদ্বয়ম্ ।

বদ্ধ পরিকরস্ তেন মোক্ষায় গমনং প্রতি ॥১৬৯॥

জিতনিদ্র হঞা একবার ‘নারায়ণ’ বলে ।

শুদ্ধ-চিত্ত হঞা সেই নির্ব্বাণপথে চলে ॥১৭০॥

সকৃদুচ্চারয়েদ্​যস্তু নারায়ণমতন্ব্রিতঃ ।

শুদ্ধান্তঃকরণো ভূত্বা নির্ব্বাণমধিগচ্ছতি ॥১৭১॥

এ ঘোর সংসারে বলে বিবশে ‘হরে হরে’ ।

সদ্যোমুক্ত হয়, ভয় তারে ভয় করে ॥১৭২॥

আপন্নঃ সংসৃতিং ঘোরাং যন্নাম বিবশো গৃণন্ ।

ততঃ সদ্যো বিমুচ্যেত যদ্বিভেতি স্বয়ং ভয়ম্ ॥১৭৩॥

মৃত্যুকালে বিবশে যে করে উচ্চারণ ।

তাঁর অবতার নাম লীলা বিড়ম্বন ॥১৭৪॥


বহুজন্মদুরিত সাহস ত্যাগ করি’ ।

যায় সে পরমপদে ভজে সেই হরি ॥১৭৫॥

যস্যাবতারগুণকর্ম্মবিড়ম্বনানি

নামানি যেঽসুবিগমে বিবশা গৃণন্তি ।

তেঽনেকজন্মশমলং সহসৈব হিত্বা

সংযান্ত্যপাবৃতামৃতং তমজং প্রপদ্যে ॥১৭৬॥

চলিতে বসিতে স্বপ্নে ভোজনে শয়নে ।

কলিদমন কৃষ্ণোচ্চারে বাক্যের পূরণে ॥১৭৭॥


হেলাতেও করি’ নাম নিজ স্বরূপ পাঞা ।

পরমপদ বৈকুণ্ঠে যায় নির্ভয় হইয়া ॥১৭৮॥

ব্রজংস্তিষ্ঠন্ স্বপন্নশ্নন্ শ্বসন্ বাক্যপ্রপূরণে ।

নামসঙ্কীর্ত্তনং বিষ্ণোর্হেলয়া কলিবর্ধনম্ ।

কৃত্বা স্বরূপতাং যাতি ভক্তিযুক্তঃ পরং ব্রজেৎ ॥১৭৯॥

যেন তেন প্রকারেতে লয় কৃষ্ণনাম ।

তাকে প্রীতি করে কৃষ্ণ করুণা-নিদান ॥১৮০॥

মদ্যপানে ভূতাবিষ্ট বায়ু-পীড়া-স্থলে ।

হরিনামোচ্চারে মুক্তি তাঁর করতলে ॥১৮১॥

বাসুদেবস্য সঙ্কীর্ত্ত্যা সুরাপো ব্যাধিতোঽপি বা ।

মুক্তো জায়েত নিয়তং মহাবিষ্ণুঃ প্রসীদতি ॥১৮২॥

হরিনাম স্বতঃ পরমপুরুষার্থ হয় ।

উপেয়-মাঙ্গল্য-তত্ত্ব পরংধনময় ॥১৮৩॥


জীবনের ফল বস্তু কাশীখণ্ডে বলে ।

পদ্মপুরাণেও তাহা কহে বহু স্থলে ॥১৮৪॥

ইদমেব হি মাঙ্গল্যং এতদেব ধনার্জ্জনম্ ।

জীবিতস্য ফলঞ্চৈতদ্ যদ্দামোদরকীর্ত্তনম্ ॥১৮৫॥

সর্ব্ব মঙ্গলের হয় পরম মঙ্গল ।

চিত্তত্ত্ব-স্বরূপ সর্ব্ববেদবল্লীফল ॥১৮৬॥

কৃষ্ণনাম লয় যেই শ্রদ্ধা বা হেলায় ।

নর-মাত্র ত্রাণ পায় সর্ব্ববেদে গায় ॥১৮৭॥

মধুরমধুরমেতন্মঙ্গলং মঙ্গলানাং

সকলনিগমবল্লী সৎফলং চিৎস্বরূপম্ ।

সকৃদপি পরিগীতং শ্রদ্ধয়া হেলয়া বা

ভৃগুবর নরমাত্রং তারয়েৎ কৃষ্ণনাম ॥১৮৮॥

ভক্তির প্রকার যত শাস্ত্রে দেখা যায় ।

তঁহি মধ্যে নামাশ্রয় শ্রেষ্ঠ বলি’ গায় ॥১৮৯॥

কষ্টেতে অষ্টাঙ্গ যোগে বিষ্ণুস্মৃতি সাধে ।

ওষ্ঠস্পন্দনেই শ্রেষ্ঠ কীর্ত্তন বিরাজে ॥১৯০॥

অঘচ্ছিৎ স্মরণং বিষ্ণোর্বহ্বায়াসেন সাধ্যতে ।

ওষ্ঠস্পন্দনমাত্রেণ কীর্ত্তনন্তু ততো বরম্ ॥১৯১॥

দীক্ষাপূর্ব্বক অর্চ্চন যদি শত জন্ম করে ।

তাহার জিহ্বায় নিত্য হরিনাম স্ফুরে ॥১৯২॥

যেন জন্মশতৈঃ পূর্ব্বং বাসুদেবঃ সমর্চ্চিতঃ ।

তন্মুখে হরিনামানি সদা তিষ্ঠন্তি ভারত ॥১৯৩॥

সত্যযুগে বহুকালে যাহা তপোধ্যানে ।

যজ্ঞাদি যজিয়া ত্রেতায় যেবা ফল টানে ॥১৯৪॥


দ্বাপরে অর্চ্চনাঙ্গেতে পায় যেবা ফল ।

কলিতে হরিনামে পায় সে সকল ॥১৯৫॥

ধ্যায়ন্ কৃতে যজন্ যজ্ঞৈস্ত্রেতায়াং দ্বাপরেঽর্চ্চয়ন্ ।

যদাপ্নোতি তদাপ্নোতি কলৌ সঙ্কীর্ত্ত্য কেশবম্ ॥১৯৬॥

কলিকালে মহাভাগবত বলি তারে ।

কীর্ত্তনে যে হরিভজে এভব সংসারে ॥১৯৭॥

মহাভাগবতা নিত্যং কলৌ কুর্ব্বন্তি কীর্ত্তনং ॥১৯৮॥

চিদাত্মক হরিনাম বারেক উচ্চারে ।

শিব-ব্রহ্মা-অনন্ত তার ফল কহিতে নারে ॥১৯৯॥

নামোচ্চারণ মাহাত্ম্য অদ্ভুত বলি’ গায় ।

উচ্চারণ মাত্রে নর পরমপদ পায় ॥২০০॥

সকৃদুচ্চারয়ন্ত্যেব হরের্নাম চিদাত্মকং ।

ফলং নাস্য ক্ষমো বক্তুং সহস্রবদনো বিধিঃ ॥২০১॥

নামোচ্চারণ মাহাত্ম্যং শ্রূয়তে মহদদ্ভুতং ।

যদুচ্চারণমাত্রেণ নরো যায়াৎ পরং পদম্ ॥২০২॥

কৃষ্ণ বলে, ‘শুন অর্জ্জুন ! বলিব তোমায় ।

শ্রদ্ধায় হেলায় জীব মম নাম গায় ॥২০৩॥


সেই নাম মম হৃদি সদা বর্ত্তমান ।

নামসম ব্রত নাই, নামসম জ্ঞান ॥২০৪॥


নামসম ধ্যান নাই, নামসম ফল ।

নামসম ত্যাগ নাই, নামসম বল ॥২০৫॥


নামসম পুণ্য নাই, নামসম গতি ।

নামের শক্তিগানে বেদের নাহিক শকতি ॥২০৬॥

নামই পরমা মুক্তি, নামই পরমা গতি ।

নামই পরমা শান্তি, নামই পরমা স্থিতি ॥২০৭॥


নামই পরমা ভক্তি, নামই পরমা মতি ।

নামই পরমা প্রীতি, নামই পরমা স্মৃতি ॥২০৮॥


জীবের কারণ নাম, নামই জীবের প্রভু ।

পরম আরাধ্য নাম, নামই গুরু প্রভু’ ॥২০৯॥

শ্রদ্ধয়া হেলয়া নাম রটন্তি মম জন্তবঃ ।

তেষাং নাম সদা পার্থ বর্ত্ততে হৃদয়ে মম ॥২১০॥

ন নামসদৃশং জ্ঞানং, ন নামসদৃশং ব্রতম্ ।

ন নামসদৃশং ধ্যানং, ন নামসদৃশং ফলম্ ॥২১১॥

ন নামসদৃশস্ত্যাগো, ন নামসদৃশঃ শমঃ ।

ন নামসদৃশং পুণ্যং, ন নামসদৃশী গতিঃ ॥২১২॥
নামৈব পরমা মুক্তির্নামৈব পরমা গতিঃ ।

নামৈব পরমা শান্তির্নামৈব পরমা স্থিতিঃ ॥২১৩॥

নামৈব পরমা ভক্তির্নামৈব পরমা মতিঃ ।

নামৈব পরমা প্রীতির্নামৈব পরমা স্মৃতিঃ ॥২১৪॥

নামৈব কারণং জন্তোর্নামৈব প্রভুরেব চ ।

নামৈব পরমারাধ্যং নামৈব পরমো গুরুঃ ॥২১৫॥

হরিনাম-মাহাত্ম্যের কভু নাহি পার ।

যে নাম শ্রবণে সদ্য পুক্কশ উদ্ধার ॥২১৬॥

যন্নাম সকৃচ্ছ্র বণাৎ পুক্কশোঽপি বিমুচ্যতে সাক্ষাৎ ॥২১৭॥

স্বপনে জাগ্রতে যেবা জল্পে কৃষ্ণনাম ।

কলিতে সে কৃষ্ণরূপী, কৃষ্ণের বিধান ॥২১৮॥

কৃষ্ণ কৃষ্ণেতি কৃষ্ণেতি স্বপন্ জাগ্রদ্ ব্রজংস্তথা ।

যো জল্পতি কলৌ নিত্যং কৃষ্ণরূপী ভবেদ্ধি সঃ ॥২১৯॥

কৃষ্ণ বলি’ নিত্য স্মরে সংসার-সাগরে ।

জলোত্থিত পদ্ম যেন নরকে উদ্ধরে ॥২২০॥

কৃষ্ণ কৃষ্ণেতি কৃষ্ণেতি যো মাং স্মরতি নিত্যশঃ ।

জলং হিত্বং যথা পদ্মং নরকাদুদ্ধরাম্যহম্ ॥২২১॥

কৃষ্ণনাম সর্ব্বমুখ্য জীবের আশ্রয় ।

অশেষ পাপ হরে, সদ্য পাপমুক্তিকর ॥২২২॥

নাম্নাং মুখ্যতরং নাম কৃষ্ণাখ্যং মে পরন্তপ ।

প্রায়শ্চিত্তমশেষাণাং পাপানাং মোচকং পরম্ ॥২২৩॥

নাম চিন্তামণি, কৃষ্ণ, চৈতন্য-স্বরূপ ।

পূর্ণ, শুদ্ধ, নিত্যমুক্ত, নামনামী একরূপ ॥২২৪॥

নাম চিন্তামণিঃ কৃষ্ণশ্চৈতন্যরসবিগ্রহঃ ।

পূর্ণঃ শুদ্ধো নিত্যমুক্তোঽভিন্নত্বান্নামনামিনোঃ ॥২২৫॥

বিষ্ণুনাম বিষ্ণুশক্তি যেই জন জানে ।

সুমতি প্রার্থনা করে অপ্রাকৃত জ্ঞানে ॥২২৬॥

ওঁ আস্য জানন্ত নাম চিদ্বিবক্তন ।

মহস্তে বিষ্ণো সুমতিং ভজামহে” ॥২২৭॥

স্থানেশ্বরী কৃষ্ণদাস যোড় করি’ কর ।

বলে, “প্রভু, এক বস্তু প্রার্থনা হামার ॥২২৮॥

এরূপ মাহাত্ম্য নামের শুনিনু শ্রবণে ।

সর্ব্বত্র সমান ফল নাহি হোয় কেনে” ॥২২৯॥

প্রভু বলে, “শ্রদ্ধা-বিশ্বাস সকলের মূল ।

বিশ্বাস-অভাবে কেহ নাহি লভে ফল” ॥২৩০॥

প্রভু বলে, “অন্তর্য্যমী নাম ভগবান্ ।

বিশ্বাসানুসারে ফল করেন প্রদান ॥২৩১॥

নামের মহিমা পূর্ণ বিশ্বাস না করে ।

নামের ফল নাহি পায়, নাম-অপরাধে মরে ॥২৩২॥

অর্থবাদ করে ফলে বিশ্বাস ত্যজিয়া ।

ফল নাহি পায়, থাকে নরকে পড়িয়া” ॥২৩৩॥

অর্থবাদং হরের্নাম্নি সম্ভাবয়তি যো নরঃ ।

স পাপিষ্ঠো মনুষ্যাণাং নিরয়ে পতিত স্ফুটম্ ॥২৩৪॥

যন্নামকীর্ত্তনফলং বিবিধং নিশম্য
ন
শ্রদ্দধাতি মনুতে যদুতার্থবাদম্ ।

যো মানুষস্তমিহ দুঃখচয়ে ক্ষিপামি

সংসার-ঘোর-বিবিধার্ত্তিনিপীড়িতাঙ্গম্ ॥২৩৫॥

শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত সমাপ্ত

 


 

← ১৯। নামরহস্যপটল গ্রন্থাগারে ফিরে →

 

সূচীপত্র:
১। মঙ্গলাচরণ
২। গ্রন্থরচনা
৩। প্রথম প্রণাম
৪। গৌরস্য গুরুতা
৫। বিবর্ত্তবিলাসসেবা
৬। জীব-গতি
৭। সকলের পক্ষে নাম
৮। কুটীনাটি ছাড়
৯। যুক্তবৈরাগ্য
১০। জাতিকুল
১১। নবদ্বীপ-দীপক
১২। বৈষ্ণব-মহিমা
১৩। শ্রীগৌরদর্শনের ব্যাকুলতা
১৪। বিপরীত বিবর্ত্ত
১৫। শ্রীনবদ্বীপে পূর্ব্বাহ্ণ-লীলা
১৬। পীরিতি কিরূপ ?
১৭। ভক্তভেদে আচারভেদ
১৮। শ্রীএকাদশী
১৯। নামরহস্যপটল
২০। নাম-মহিমা
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥