শ্রীউপদেশ


(১৯) আমাদের একমাত্র উপায়

 

বৃন্দাবনের চুরাশী লাখের মধ্যে এক বন কাম্যবন নামে আছে । সে কাম্যবনে এক দেবশিশু (দেবতার শিশু) বাস করল । এক দিন সে হেলায়-ছলনায় দুর্ব্বাসা মুনির জটা কেটে দিয়েছে  ।

দুর্ব্বাসা মুনি তখন তাকে ক্রোধে অভিশাপ দিলেন, “তুই চার জন্ম কুমির হবি !”

দেবশিশু কাঁদতে কাঁদতে শুরু করল, “প্রভু, আমাকে ক্ষমা করুন ! কৃপা করুন !”

মুনি তখন বললেন, “অভিশাপটা আমি দিয়ে দিয়েছি আর প্রত্যাহার করতে এখন পারি না কিন্তু তুই উদ্ধার হয়ে যাবি । তিন জন্ম পরে, চার জন্ম যখন আসবে, নন্দের নন্দন শ্রীকৃষ্ণ তখন এই কলিযুগে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর রূপে আসবেন—তিনি নাম-কীর্ত্তন করতে করতে লেকের ধারে চলে যাবেন আর ওই হরিনাম করার ফলে তুই উদ্ধার হয়ে যাবি ।”

তখন মহাপ্রভু কলিযুগে এক দিন কীর্ত্তন করতে করতে ওই লেকের ধারে যেখানে দেবশিশু কুমির রূপে থাকত চলে এলেন ।

রাখালগণ প্রভুকে লেকটার কাছাকাছি দেখে বলল, “প্রভু, এই দিকে যাবেন না ! মামা, যাবেন না !”

মহাপ্রভু জিজ্ঞেস করলেন, “কেন ?”

“এই লেকের মধ্যে একটা কুমির আছে । আমরা ভয়ে ওখানে যাই না আর গরুগুলোও ওখানে জল পান করে না ।”

কিন্তু মহাপ্রভু সব জানেন—তিনি কীর্ত্তন করতে করতে ওখানে চলে গিয়েছেন আর তখন দেখলেন যে, লেকের জল থেকে একটা শিশু চলে এল । শিশুটা মহাপ্রভুর পায়ের নিচে পড়ল আর কাঁদতে শুরু করল…

মহাপ্রভু শিশুকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কাঁদছো কেন ?”

শিশুটা বলল, “প্রভু, আমি আগের জন্মে কুমির ছিলাম না, আমি দেবশিশু ছিলাম কিন্তু আমি খেলায় দুর্ব্বাসা মুনির জটা কেটে দিয়েছিলাম বলে তিনি আমাকে অভিশাপ দিলেন । আর আপনি এই হরিনাম করে আমাকে উদ্ধার করেছেন !”

এটা হচ্ছে নামের ফল ।

হরিনাম করতে হবে কিন্তু মনের মধ্যে কুটীনাটি দেখে নয়—সরল ভাবে । সরল ভাবে গোরা ভজনা করুন, তবে আপনারা ভগবানকে লাভ করতে পারবেন । কুটীনাটি বাদ দিয়ে সরল ভাবে বৈষ্ণবের সেবা যদি করেন, তাহলে দেখবেন আপনারা ভগবানকে লাভ করতে পারেন এবং কোন দিন আর এই জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি ভোগ করতে হবে না ।

কী হবে, বলুন ? কোথায় স্বর্গে থাকব ? কোথায় দেবতা হব ? কোথায় কীটপতঙ্গ হব ? কোথায় পশুপাখি হব ? কোথায় গাছফল হব ? কোথায় দেবশিশু হব ? কিন্তু সবাইকে ফিরে আসতে হবে, সবাইকে চলে যেতে হবে  । এই মনুষ্য জন্ম লাভ করে যদি আপনারা ভগবান লাভ না করেন, হরি ভজনা না করেন, তাহলে আপনাদের জীবনটা বৃথা চলে যাবে ! সেইজন্য, আপনাদের চরণেই প্রার্থনা যে, আপনারা সবসময় কৃষ্ণনাম করবেন । সবসময় ।

ভগবানের নাম ছাড়া কোন গতি নাই—এই কৃষ্ণনাম করলে অন্য কোন নামের ফল পাওয়া যায় : অন্য যে সব নাম আপনারা শুনতে পারছেন, এই সব নামের ফল একাই কৃষ্ণনামে আছে  । সেইজন্য, এই হরিনামের ফল, অন্য কিছুটা হয় না । আর বৈষ্ণবগণের সেবা করলে সমস্ত বন্ধন মুক্ত হয়ে যায় । আপনি গোহত্যা করছেন, ব্রাহ্মণহত্যা করছেন, স্ত্রীহত্যা করছেন, স্বামীহত্যা করছেন—এই সব হত্যার পাপ এক কৃষ্ণনামে চলে যায় । হরিনাম করলে সব পাওয়া যায়, নাম যদি হেলায় করেন তবুও মুক্তি পেয়ে যাবেন—নামের এটা প্রভাব ।

ডিসিটফুল ডিভোশন (কুটীনাটি) ছাড়তে হবে ।

“গোরার আমি, গোরার আমি” মুখে বলিলে নাহি চলে ।
গোরার আচার, গোরার বিচার লইলে ফল ফলে ॥
লোক দেখান গোরা ভজা তিলক মাত্র ধরি ।
গোপনেতে অত্যাচার গোরা ধরে চুরি ॥

(শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ৮/৬-৭)

গোরার আচার-বিচার নিতে হবে । এখানে তো অনেক সম্প্রদায় আসছেন—এখানেই সব নাম শুনছেন আবার বাড়ি গিয়ে সব ভুলে যাবেন । আমি কী বলছি ? এক মুহূর্তের জন্য ভগবানকে ভুলতে চলবে না ! কিন্তু মায়া খুব শক্তিশালী—মায়া আমাদের সময়টা নিয়ে নেয় । কী বলেন আপনারা ? “এখন সময় হয় নি, একটু পরে হরিনাম করব, একটু পরে ।” কিন্তু সময়টা নেই, কখন যে চলে যাব কেউই বলতে পারে না ।

 

— • • • —

 

 

← (১৮) মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ? (২০) পবিত্র জীবন →

 

সূচীপত্র:
সূচনা : আমাদের একমাত্র কৃত্য
১। ভক্তির অভাব
২। গৃহে আবদ্ধ
৩। মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
৪। জীবকে সত্য দয়া কি ?
৫। ভোগী নই ত্যাগীও নই
৬। শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
৭। ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
৮। ভগবানের চরণে পথ
৯। শান্তির গুপ্ত কথা
১০। শ্রীবামনদেবের কথা
১১। শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
১২। পূজনীয় বিসর্জন
১৩। ভক্ত ও নাপিত
১৪। চকচক করলেই সোনা হয় না
১৫। আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
১৬। দণ্ড মহৎসব
১৭। শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
১৮। মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
১৯। আমাদের একমাত্র উপায়
২০। পবিত্র জীবন
২১। শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
২২। আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥