শাশ্বত সুখনিকেতন


প্রথম অধ্যায়
শোষণ, ত্যাগ ও আত্মনিবেদন

 

আজকের এই বিষয়বস্তুটি অর্থাৎ আমি এখন যা বলতে যাচ্ছি তা খুব মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করার বিষয় । সমস্ত গতানুগতিক ধর্ম্মবিশ্বাস থেকে স্বতন্ত্র হয়ে আমরা খুব যুক্তিসম্মতভাবে এই বিষয়বস্তুকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব ।

সর্ব্বপ্রথমে আমাদের বুঝতে হবে যে এই জগতে জীবনধারণের তিনটি স্তর আছে । প্রথম স্তর হল জড় বিষয় ভোগের স্তর, দ্বিতীয় স্তর হল ত্যাগের স্তর আর তৃতীয় স্তর হল ভক্তি ও আত্মনিবেদনের স্তর । সাধারণতঃ কমবেশীভাবে আমরা এই জড়ভোগের স্তরেই বর্ত্তমানে আছি । জড়ভোগের অর্থই হল অপরকে শোষণ করা । অপরকে শোষণ না করে কেউ এই স্তরে বেঁচে থাকতে পারে না ।

অহস্তানি সহস্তানাং
অপদানি চতুষ্পদাম্ ।
লঘূনি তত্র মহতাং
জীবো জীবস্য জীবনম্ ॥

অর্থাৎ যাদের হাত আছে তারা যাদের হাত নেই তাদের শোষণ করে বেঁচে থাকে । চতুষ্পদ জীব যাদের হাত পা নেই তাদের অর্থাৎ গাছপালা, ঘাস, লতাপাতা খেয়ে বেঁচে থাকে । বৃহৎ জীব ক্ষুদ্র জীবকে আত্মসাৎ করে । সকল জীবই অন্য জীবের দ্বারা জীবনধারণ করে ।

গাছপালা ঘাস লতাপাতারও জীবন আছে । কিন্তু কেউই অপরকে শোষণ না করে এখানে বেঁচে থাকতে পারে না । সনাতন ধর্ম্ম থেকে আমরা জানি যে প্রত্যেক কর্ম্মের একটা প্রতিক্রিয়া বা কর্ম্মফল আছে । সুতরাৎ এই শোষণেরও একটা প্রতিক্রিয়া আছে । বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক নিউটনও তার "থার্ড্ ল" বা 'তৃতীয় নিয়মে' বলেছেন প্রত্যেক ত্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে । এই শোষণের প্রতিক্রিয়া হল এই যে অপরকে শোষণ করে আমরা ঋণগ্রস্ত হই আর সেই ঋণ শোধ করতে গিয়ে আমাদের অধোগতি হয় । এইভাবে এই শোষণের স্তরে যে কর্ম্ম ও কর্ম্মফল সৃষ্টি হচ্ছে তার ফলে বহু জীবাত্মা আত্মবিবর্ত্তনের পথে ক্রমাগত উঠছে ও নামছে । সমগ্র জীবজগৎ, সমগ্র সমাজ এক চরম শোষণের প্রচেষ্টায় আছে । অপরকে শোষণ করে, অপরকে কষ্ট দিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্ঠা এখানে সর্ব্বত্রই দেখা যায় । এই শোষণ ছাড়া এই স্তরে বেঁচে থাকাই অসম্ভব, কারণ এ হল শোষণেরই জগৎ বা স্তর ।

অনেকেই এই শোষণের স্তর থেকে বেরিয়ে গিয়ে এমন একটা পথে যেতে চান যেখানে তাঁরা এই শোষণের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে পারেন । বৌদ্ধরা, জৈনরা ও শঙ্করাচার্য্যের অনুগামীরা এবং আরও অনেকেই এই শোষণের স্তর থেকে বেরিয়ে গিয়ে এমন একটা জীবনযাত্রা অবলম্বন করতে চান যেখানে এইরকমের শোষণ, এইরকমের কর্ম্ম ও তার কর্ম্মফল থাকবে না । এই কর্ম্ম ও কর্ম্মফলের জাল এড়াবার জন্যে তাঁরা এমন একটা ত্যাগের জীবন খোঁজেন, যে জীবনযাত্রা বলতে গেলে একরকম সমাধি বা স্বপ্নহীন নিদ্রার মত ; এই জড়জগৎ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিয়ে একেবারে আত্মস্থ হয়ে থাকা । নিজেদের অনুভূতিকে এই নিম্নস্তরের জগতে আসতে না দিয়ে তাঁরা সেই আত্ম-কেন্দ্রিক জগতে বাস করেন, যাকে একরকমের সমাধিই বলা যায় ।

কিন্তু চৈষ্ণব সম্প্রদায়—যাঁরা শ্রীভগবানের সগুণ ও সাকার রূপের উপাসক ও সেই সগুণ ও সাকার শ্রীভগবানের সেবা করাই যাঁদের জীবনের উদ্দেশ্য—তাঁদের মতে এই ভোগের জগৎ ও ত্যাগের জগৎ—এই দুই জগতের বাইরে আর একটি জগৎ আছে । সেই জগৎ হল প্রেমভক্তি ও আত্মনিবেদনের জগৎ । সেই আত্মনিবেদন হল শোষণের সম্পূর্ণ বিপরীত জিনিস । এই বিষয়ভোগের জগতে প্রত্যেকেই ব্যক্তিগতভাবে বা সমষ্টিগতভাবে পারিপার্শ্বিককে শোষণ করছে কিন্তু সেই আত্মনিবেদনের জগতে প্রত্যেকেই ব্যক্তিগতভাবে বা সমষ্টিগতভাবে পারিপাশ্বির্কের সেবাই করছে । শুধু তাই নয়, যিনি সমকিছুর কেন্দ্রে আছেন সেই শ্রীভগবানের সেবা করাই সেই জগতের প্রত্যেকের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য । আমরা প্রত্যেকে এক চেতনময় পরিপূর্ণতার অংশ হয়ে বেঁচে আছি । সুতরাং প্রত্যেক জীবাত্মার বা অনুচেতনার কর্ত্তব্য হল যিনি এই চেতনময় জগতের কেন্দ্রে আছেন সেই পরিপূর্ণ চেতনার প্রতি বিশ্বস্ত থাকা অর্থাৎ পূর্ণব্রহ্ম শ্রীভগবানের কাছে আত্মসমর্পণ করা । শ্রীমদভাগবতে এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে ভগবানের কাছে জীবাত্মার আত্মসমর্পণকে গাছের গোড়ায় জল ঢালার সঙ্গে তুলনা করে ।

যথা তরোর্মূলনিষেচনেন তৃপ্যন্তি তৎস্কন্ধভূজোপশাখাঃ ।
প্রাণোপহারাচ্চ যথেন্দ্রিয়ানাং তথৈব সর্ব্বার্হনমচুতেজ্যা ॥

(শ্রীমদ্ভাগবত ৪/৩১/১৪)

অর্থাৎ যেমন বৃক্ষের মূলদেশে সুষ্ঠরূপে জল সেচন করলেই তার স্কন্ধ, শাখা, উপশাখা, পত্রপুষ্প সকলেই সঞ্জীবিত হয় (মূল ব্যতীত পৃথকভাবে বিভিন্ন স্থানে জল সেচন করলে সেরকম হয় না) প্রাণে (অর্থাৎ উদরে) আহার্য্য প্রদান করলে যেরকম সমস্ত ইন্দ্রিয়েরই তৃপ্তি সাধন হয় (কিন্তু ইন্দ্রিয় সমূহে পৃথক্ পৃথক্ ভাবে অন্নলেপন দ্বারা সেরকম হয় না) সেইরকম একমাত্র অচ্যুতের (শ্রীকৃষ্ণের) পূজাদ্বারাই নিখিল দেব-পিত্রাদির পূজা হয়ে যায় (তাঁদের আর পৃথক্ পৃথক্ পূজার প্রয়োজন হয় না) ।

বৈদিক দর্শনেও আমরা দেখি যে সেখানেও এই কথাই বলা হয়েছে যে যাকে জানলে সব জানা হয়ে যাবে তাঁকেই জানার চেষ্ঠা করা কত্তর্ব্য ।

যষ্মিন্ জ্ঞাতে সর্ব্বম্ ইদম্ বিজ্ঞাতং ভবতি
যাষ্মিন্ প্রাপ্তে সর্ব্বম্ ইদম্ প্রাপ্তম্ ভবতি
তৎ বিজিজ্ঞাসস্ব তদের ব্রহ্ম ॥

সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে একজন আছেন যাকে জানলে সব জানা হয়ে যায়, যাকে পেলে সব পাওয়া হয়ে যায় । সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে যে উপদেশ দিওয়া হয়েছে তার পরম তাৎপর্য্য হল এই যে এই কেন্দ্রবিন্দুকে, এই পূর্ণব্রহ্মকে আমাদের সন্ধান করতে হবে । সুতরাং সেই কেন্দ্রে যিনি আছেন তাঁর সন্ধানে আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে । প্রথমে কারোর মনে হতে পারে এ এক হাস্যকর উক্তি—"যাঁকে জানলে সব জানা হয়ে যায়, যাঁকে পেলে সব পাওয়া হয়ে যায়—এ কিরকম কথা ? এ কেবল পাগলের প্রলাপ !" তাই শ্রীমদভাগবতে একটি উপমা দিয়ে বলা হয়েছে যে যেমন গাছের গোড়ায় জল দিলে সমস্ত গাছটি তার খাদ্য পায়, যেমন উদরে আহার দিলে সমস্ত শরীরের পুষ্টি হয়, সেরকম সবকিছুর কেন্দ্রে যিনি আছেন সেই শ্রীভগবানের সেবা করলে সকলেরই সেবা করা হয় । সেটা খুবই সম্ভব ও যুক্তিসঙ্গত এবং সেটি করার জন্যে সেই আত্মনিবেদনের ভূমিতে প্রবেশ করতে হবে । শোষণের স্তরকে পরিত্যাগ করে এবং ত্যাগের স্তরকেও পরিত্যাগ করে সেই আত্মনিবেদনের ভূমিতে প্রবেশ করতে হবে । আমাদের যে প্রকৃত স্বরূপ, আমাদের আত্মা, সেই জগতেরই বাসিন্দা । সেই জগতই প্রকৃত জগৎ আর এই জগৎ হল তার বিকৃত প্রিবিম্ব ।

সেই জগতই প্রকৃত সত্যের জগৎ যেখানে প্রত্যেকেই ব্যক্তিগতভাবে বা সমষ্টিগতভাবে যিনি পরিপূর্ণ, যিনি সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন তাঁকে আত্মনিবেদন করে তাঁর সেবা করেন—যেমন সেই শরীরই সুস্থ যেখানে প্রত্যেক জীবকোষ সমস্ত শরীরের কল্যাণের জন্য কাজ করে । যদি কোন জীবকোষ শুধু নিজের জন্য কিছু করে, তবে পরিণতিতে সে এই দেহকে চরম শোষণ করবে । এইধরণের স্থানীয়, ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য যে কাজ তা নিঃসন্দেহে খারাপ । একটি দেহের মধ্যেও প্রত্যেক অঙ্গ, প্রত্যেক জীবকোষ সমস্ত দেহের কল্যাণের জন্য কাজ করে । সেইরকম এই সমগ্র জগতেরও একটি কেন্দ্র আছে এবং সেখান থেকে যে নির্দ্দেশ আসে, সেই নির্দ্দেশদ্বারাই এখানকার কাজ সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে ।

সেই কেন্দ্রে যিনি আছেন তাঁর অবস্থানটা কোথায় ? শ্রীমদ্­ভগবদ্­গীতায় বলা হয়েছে,

সর্ব্বধর্ম্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ

(শ্রীমদ্­ভগবদ্­গীতা ১৮/৬৬)

এখানে শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তাঁর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে নিয়েছেন—"সমস্ত রকমের ধর্ম্ম ও কর্ত্তব্য পরিত্যাগ করে শুধু আমার শরণাগত হও ।"

এই তত্ত্বটি আমরা এখন অন্য এক দৃষ্টিকোন থেকে দেখব ।

হেগেল একজন শ্রেষ্ঠ জার্ম্মান দার্শনিক ছিলেন এবং অনেকে তাঁর দর্শনকে পূর্ণতাবাদ (Perfectionism) বলে মনে করেছেন । তাঁর বিচার ছিল এই য়ে প্রত্যেক বস্তুর যিনি আদি কারণ, যিনি পরম সত্য, তাঁর অবশ্যই দুটি গুণ থাকবে । কি সেই দুটি গুণ ? যিনি পরমসত্য তিনি নিজেই নিজের কারণ আর তিনি নিজের জন্যই নিজে আছেন অর্থাৎ তাঁর ইচ্ছাই সবকিছুর উপরে ।

এই বিষয়টি খুব অভিনিবেশ দ্বারা চিন্তা করতে হবে । তিনি নিজেই নিজের কারণ অর্থাৎ তিনি নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছেন, অন্য কেউ তাঁকে সৃষ্টি করেনি । যদি অন্য কেউ তাঁকে সৃষ্টি করত তবে সেই সৃষ্টি কর্ত্তার স্থানই মুখ্য হত । সুতরাং যিনি পরমেশ্বর তিনি নিশ্চয়ই অনাদি, অনাদিকাল থেকেই তাঁর অস্তিত্ব আছে এবং অন্য কেউ তাঁকে সৃষ্টি করেনি । যিনি পরমেশ্বর তাঁর এই গুণটি অবশ্যই থাকবে ।

পরমেশ্বরের দ্বিতীয় গুণ হল এই যে তিনি নিজের জন্যই নিজে আছেন । তিনি নিজের অভিলাষ পূর্ণ করার জন্যেই আছেন, অন্য কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্যে নয় । যদি তাঁর অস্তিত্ব অন্য কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্যে হত, তবে তাঁর নিজের স্থান গৌণ হয়ে যেত আর যার সন্তুষ্টিবিধানের জন্য তিনি আছেন তাঁরই স্থান মুখ্য হত ।

সুতরাং পরমেশ্বরের এই দুটি গুণ অবশ্যই থাকবে । তিনি নিজেই নিজের কারণ এবং তিনি নিজেরই তুষ্টিবিধান করেন, নিজের অভিলাষ পূর্ণ করার জন্যে । যা কিছু ঘটে, যদি একটা ঘাস বা খড়কুটোও হাওয়ায় নড়ে, তবে তা শ্রীভগবানের অভিলাষ পূর্ণ করার জন্যেই ধটে । প্রত্যেকটি ঘটনা, যা কিছু ঘটেছে ও ঘটবে, সবই শ্রীভগবানের তুষ্টিবিধানের জন্যে । সুতরাং তাঁর ইচ্ছা, তাঁর লীলাই জগতের প্রকৃত জীবনতরঙ্গ । কিন্তু আমরা আমাদের ক্ষুদ্র স্বার্থ দ্বারা চালিত হচ্ছি ; পরিবারের স্বার্থ, দেশের স্বার্থ, সমাজের স্বার্থ অথবা মানুষের স্বার্থ ইত্যাদি । কিন্তু অনন্ত চেতনার মধ্যে এসব ক্ষুদ্র স্বার্থের স্থান আতি নগন্য । অথচ এই ক্ষুদ্র, স্বতন্ত্র স্বার্থ সাধনেই আমরা ব্যস্ত আছি । অসংখ্য রকমের স্বতন্ত্র স্বার্থের মধ্যে এক অবশ্যম্ভাবী সংঘাত সৃষ্টি হয় আর তাঁর থেকেই যত দুঃখকষ্টের সৃষ্টি হয় । কিন্তু এই তথাকথিত স্বতন্ত্র স্বার্থ সাধনের প্রয়াসকে আমাদের ত্যাগ করা উচিত ; এই ভুল ধারণার জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের চেষ্টা করা উচিত এমন এক সমষ্টি বা গোষ্ঠীর অংশ হওয়া যা এক পরিপূর্ণ সমষ্টির সাবা করছে ।

শ্রীভগবদ্­গীতার উপসংহারে কৃষ্ণ এই সিদ্ধান্তই দিয়েছেন যে "সর্ব্বধর্ম্মান্ পরিত্যজ্য"—সর্ব্বরকমের ধর্ম্ম ও সর্ব্বরকমের কর্ত্তব্য যা তুমি মনে কর তোমার পালন করা উচিত সে সব ত্যাগ কর এবং "মামেকং শরণং ব্রজ"—তুমি আমারই শরণাগত হও—

অহং ত্বাং সর্ব্বপাপেভ্যো
মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥

(শ্রীমদ্­ভগবদ্­গীতা ১৮/৬৬)

অর্থাৎ (যা কিছু তোমার ধারণায় আসে) সেসব পাপ বা কর্ম্মফল ও দঃখ থেকে আমি তোমাকে মুক্ত করব, তুমি শোক কোর না ।

অর্থাৎ অন্যভাবে বলতে গেলে যিনি সবকিছুর কেন্দ্রে আছেন তাঁর প্রতি আমাদের সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস থাকতে হবে । বর্ত্তমানে আমাদের সব কর্ত্তব্য কেবল স্থানীয়, ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্যে । কিন্তু এই স্থানীয়, ক্ষুদ্র স্বার্থের সঙ্গে একাত্মা হয়ে থাকার প্রয়াসকে ত্যাগ করে যিনি পরিপূর্ণ ও অনন্ত চেতনা, তাঁর অভিলাষ পূর্ণ করার কাজে আমাদের নিজেদের নিঃশেষে বিলীন করে দিতে হবে ।

এটাও আমরা দেখি যে যদি কোন পুলিশ অফিসার নিজের স্বার্থে কারোর কাছ থেকে সামান্য কটা টাকাও নেন, তবে তাঁর জন্যে তাঁর শাস্তি হতে পারে, কিন্তু তিনি যদি দেশের স্বার্থে বহু লোককে হত্যাও করেন, তবে তাঁর জন্যে হয়ত তাঁর পুরস্কার মিলবে । সেইরকম যিনি পরিপূর্ণ তাঁর সন্তুষ্টির জন্যে যা করা হয় সবই শুভ, কিন্তু নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্যে বা নিজের কোন স্থানীয় বন্ধুর স্বার্থের জন্যে যা করা হয় তার কর্ম্মফল পেতে হবে । কোন কারখানায় কারও নিজের স্বার্থে ঘুষ নেওয়ার অধিকার নেই আবার একই সঙ্গে ধর্ম্মঘট করে সকলের চাকরী খুইয়ে কারখানা বন্ধ করে দেওয়ারও অধিকার নেই, কারণ এতে সেই শিল্পবাণিজ্য একেবারে ধ্বংস হয়ে যারে ।

সুতরাং শোষণ বা ত্যাগ কোনটাতেই কাজ হবে না । শোষণ যে খারাপ সে তো পরিস্কার বোঝাই যায় । আর যেহেতু এই জগতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা ধর্ম্মঘট করারও কোন অধিকার আমাদের নেই, তাই ত্যাগের পথও অশুভ । বহু ক্ষুদ্র অংশের সমষ্টি নিয়েই এই সমগ্র জগৎ । তাই আমাদের সার্ব্বজনীন কল্যাণ তখনই হবে যখন আমরা এই জগতের কেন্দ্রে যিনি আছেন তাঁর কাছে আত্মনিবেদন করব, কারণ তাঁর মধ্যেই এই সমগ্র জগৎ রয়েছে । যখন আমরা পাকস্থলীতে খাদ্য পাঠাই, তখন পাকস্থলী সেই খাদ্য সমস্ত শরীরে যথাযথভাবে সরবরাহ করে, প্রত্যেক অংশ তার প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য পায় । এই রকমের জীবনযাত্রাই হল বৈষ্ণব জীবনযাত্রা । সমস্ত অংশের সমষ্টি নিয়ে যে পরিপূর্ণতা আমরা প্রত্যেকে তারই অংশ । আমাদের প্রত্যেকেরই নিজের নিজের বিশেষ সেবা বা কর্ত্তব্য আছে যা সেই পরিপূর্ণতার সঙ্গে, সেই কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্কিত আর সেই সেবার মাধ্যমেই আমরা সেই পরিপূর্ণতার কাছে নিজেদের উৎসর্গ করতে পারি । চোখে, নাকে বা কানে খাদ্য না দিয়ে আমরা পাকস্থলীতে খাদ্য পাঠাই, কারণ সেটাই সবচেয়ে কল্যাণকর—সেখান থেকেই শরীরের অন্য সব জায়গায় সুষ্ঠুভাবে সেই খাদ্য পরিবেশিত হবে, এবং সমগ্র দেহ তাতে পুষ্ঠ হবে । আমরা প্রত্যেকেই সমগ্র বিশ্বের অংশ এবং আমাদের কর্ত্তব্য হল এক পরিপূর্ণ জগতের সেবা করা আর তাই হল ভক্তি, আত্মনিবেদন ও শরণাগতি । কি করে আমরা এ বিষয়ে জানব ? আমাদের সাহায্য আসবে শাস্ত্র থেকে আর সাধুরাও আমাদের পথ দেখাবেন । আর যাঁরা শ্রীভগবানের বিশেষ প্রতিনিধি হয়ে সেই চিন্ময় স্তর থেকে আসছেন তাঁরা আমাদের জীবনে আনবেন সুসঙ্গতি, সামঞ্জস্য, এক চেতনময় মধুর ঐক্যতান ।

মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব আমাদের সেই ধর্ম্ম দিয়েছেন যে ধর্ম্মে সর্বোচ্চ সুসঙ্গতি আছে, যে ধর্ম্মে সর্বোচ্চ সমন্বয় সাধন করা হয়েছে । শ্রীমদভাগবতমকে সমস্ত শাস্ত্রের, বেদ-বেদান্তের সারমর্ম বা উপসংহার বলা হয়ে থাকে । আর সেই শ্রীমদভাগবতমের ভিত্তিতে তিনি তাঁর ভক্তিতত্ত্বকে ব্যাখ্যা করেছেন । এইভাবে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে শক্তি বা ক্ষমতাই সর্বোচ্চ বস্তু নয়, জ্ঞানের স্থান তাঁর উপরে । জ্ঞান ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে এবং তখন তাঁর একটা কল্যাণকর ফল হয় । কিন্তু আরও এগিয়ে গেলে আমরা দেখব যে জ্ঞানেরও উপরে কিছু আছে তা হল ভক্তি, প্রেম, প্রীতি এবং তারই স্থান সবার উপরে । জীবনের প্রকৃত আনন্দময় পরিপূর্ণতা জ্ঞান বা শক্তি থেকে আসতে পারে না, তা কেবল আসতে পারে প্রেমভক্তি থেকে, প্রীতি থেকে ।

করুণার স্থান হল ন্যায়বিচারের উপরে । যেখানে আইন কানুনের প্রয়োজন আছে কেবল সেখানেই ন্যায়বিচারের অস্তিত্ব থাকতে পারে । কিন্তু যিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র, সেই পরমেশ্বর, যিনি পরম মঙ্গলময়, তাঁর স্বধামে আইন কানুনের প্রয়োজন নেই আর তাই সেখানে ন্যায়বিচারেরও প্রয়োজন নেই, সেখানে আছে কেবল করুণা, প্রেম ও প্রীতি । কারণ তিনি পরম মঙ্গলময় ও পরম প্রেমময়, তাই তাঁর প্রেমময় শক্তিকে কোন আইনকানুন দিয়ে নিয়ন্ত্রন করার কোন প্রশ্ন উঠতে পারে না । পরম মঙ্গলময় শ্রীভগবান হলেন পরম প্রেম ও প্রীতির আধার, তিনি যেখানে আছেন সেখানেই আমাদের প্রকৃত বাসভূমি, আমাদের স্বধাম, আমাদের সুখনিকেতন । সেই প্রেমময় ভগবানের কাছে, সেই নিজের গৃহে আমাদের ফিরে যেতে হবে । খোতায় আমাদের সেই গৃহ ? যেখানে আমরা দেখব যে আমরা তাঁদের মাঝখানেই আছি যাঁরা আমাদের প্রকৃত ভালবাসেন, যাঁরা আমাদের প্রকৃত শুভাকাঙ্খী । সেখানে যদি আমরা নিজেদের মঙ্গলের জন্যে নাও চিন্তা করি তবু কতজন সেখানে আমাদের ভার নেবেন, আমাদের দেখাশোনা, লালনপালন করবেন । প্রকৃতপক্ষে সেখানে চারপাশের সকলেই, সমস্ত পারিপার্শ্বিকই আমাদের লালনপালন করবে । আর সেই হল আমাদের আপন গৃহ, আমাদের সুখনিকেতন । সেই হল পরমেশ্বরের রাজ্য আর সেখানে আমরা তাঁকে সেবা করার অধিকার পেয়েই আমাদের সর্বোচ্চ পরিণতি লাভ করতে পারি । সেখানে যে অচিন্ত্যনীয় প্রেমা, প্রীতি, স্নেহ, সৌন্দর্য্য, একতা ও সুখসঙ্গতি আছে তাও আমরা তখনই অনুভব করব । এইসব গুণের পরম্পরের মধ্যে সাদৃশ্য আছে আর যিনি পরম মঙ্গলময় অনাদি কারণ তিনি এইসব গুণেরই অনন্ত সমষ্টি । তাঁর স্বধামেই আমাদের যেতে হবে ।

কোন না কোন সময়ে, কোন না কোনভাবে আমাদের স্বাধীন ইচ্ছার অপব্যবহার করে আমাদের গন্তব্য থেকে আমরা দূরে চলে গেছি, বিপথগামী হয়েছি । কিন্তু এখন আবার আমাদের ডাক দেওয়া হচ্ছে, "চলে এসো তোমরা । শ্রীভগবানের কাছে ফিরে এসো, নিজের বাড়ীতে ফিরে এসো । সেই প্রেমের জগতে, যেখানে আছে তোমাদের সর্ব্বোচ্চ পরিণতি, সেখানে ফিরে এসো ।" ভজবৎগীতায় ও শ্রীমদ্­ভাগবতে যে কৃষ্ণভক্তির তত্ত্ব দেওয়া হয়েছে এই হল তাঁর সারমর্ম বা উপসংহার আর শ্রীমন মহাপ্রভুও আমাদের এই তত্ত্বটিই দিয়েছেন । এই তত্ত্বটিই আমি আপনাদের কাছে উপস্থাপিত করেছি । এই শ্রীচৈতন্যসারস্বতমঠ এবং সমগ্র গৌড়ীয় মঠ শুধু এই তত্ত্বটি পরিবেশন করার জন্যই প্রচারকার্য্য চালাচ্ছেন । "জীবনের কেন্দ্রে যিনি আছেন সেই ভগবানের দিকে এগিয়ে যাও । এই মানব জীবনকে সম্পূর্ণ উৎসর্গ করে দাও সেই ভগবানের সেবায়, যিনি আছেন ন্যায় বিচারের ঊর্দ্ধে—যিনি পরম করুণাময়, পরম প্রেমময়, পরম স্নেহময়, পরম সুন্দর ।"

এই হল বৈষ্ণব ধর্ম্মের, ভগবদ্­গীতার, শ্রীমদ্­ভাগবতের বৃহৎ পটভূমিকা । আর সমস্ত ধর্ম্মীয় তত্ত্বের সংক্ষিপ্ত মর্ম হল এই যে শোষণ, ত্যাগ ও আত্মনিবেদন হল জীবনের তিনটি স্তর কিন্তু জীবের প্রকৃত স্বরূপ যে আত্মা, সে সেই আত্মনিবেদনের ভূমিরই বাসিন্দা । সকলেরই অস্তিত্ব আত্মনিবেদনের জন্যে, কিন্তু কোনভাবে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বাধীনতার অপব্যবহার করে আমরা এই শোষণের জগতে প্রবেশ করেছি । যাঁরা এই শোষণের জগৎ থেকে এই কর্ম্ম ও কর্ম্মফলের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে যেতে চান, তাঁদের বৌদ্ধ, জৈন, বা পরেশনাথের আনুগামীরা আরও অনেকে সাহায্য করতে চান সম্পূর্ণ ত্যাগের ভূমিকায় নিয়ে যেতে । তারা মনে করেন যে এইরকমভাবে এই কর্ম্মফলের জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলে, এখান থেকে অবসর নিলে, আত্মা সুখে থাকতে পারে । তবুও তাঁর আবার কোন না কোন সময় এই জগতের বেড়াজালের ফাঁদে পড়ার সম্ভাবনা একটা থেকেই যায় । কিন্তু যেখানে সত্যিকারের মুক্তজীবরা বাস করেন সেখানে সকলেই আত্মনিবেদনের ভূমিকায় আছেন । আর যখন আমরা অনুসন্ধান করব যে কি আছে সেই আত্মনিবেদনের স্তরে যা তাঁদের সুসঙ্গতি, সামঞ্জস্যের মধ্যে রেখেছে, যা তাঁদের ভরণপোষণ, লালনপালন করছে তখন দেখব তাঁদের বিশেষত্ব হল এই যে তাঁরা সকলেই এক পরিপূর্ণতার সেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন আর সেই পরিপূর্ণতা আছে যিনি পরম মঙ্গলময়, তাঁরই মধ্যে । এই সবকিছুই আমাদের জানতে হবে, বুঝতে হবে আর তারই জন্যে এই মানবজীবন বড় মূল্যবান । সাধুসঙ্গ পেয়ে, শ্রীভগবানের প্রতিনিধিদের সঙ্গ পেয়ে আমরা যেন প্রাণপণ চেষ্টা করি এই বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে গিয়ে সেই প্রেম, প্রীতি ও আত্মনিবেদনের চিন্ময় ভূমিতে প্রবেশ করার জন্যে ।

ইতিমধ্যেই আমাদের মঠ থেকে বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে । এছাড়া অনেক প্রাচীন শাস্ত্রগ্রন্থও আছে যা এই সনাতন ধর্ম্মের নানাতত্ত্বকে বিশদভাবে বুঝতে সাহায্য করবে ।

 


 

← গ্রন্থাগারে ফিরে

"HUMILITY, TOLERANCE, GIVING HONOUR TO OTHERS | HUMILITY, TOLERANCE, GIVING HONOUR TO OTHERS"