![]() |
|||||||
| |||||||
|
|||||||
|
শ্রীউপদেশ (দ্বিতীয় খণ্ড) ১। ভাগবতধাম : পরমকল্যাণ ও সাধ্যবস্তু
‘কৃষ্ণনাম’ করে অপরাধের বিচার । (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, ১/৮/২৪) “কৃষ্ণ বলিলে অপরাধীর না হয় বিকার”—কারণটা কী ? জানেন ? এই কৃষ্ণনাম চেতনবস্তু আর এই চেতনবস্তু সবার মুখে আসে না । যারা নামে অপরাধী (কৃষ্ণনামের প্রতি অপরাধ করে) তাদের মুখে কখনও কৃষ্ণনাম আসতে পারে না । কিন্তু আপনারা নিশ্চয়ই কৃষ্ণনামে অপরাধী নন তাই আপনাদের মুখে কেন কৃষ্ণনাম আসবে না ? সবাইকে কৃষ্ণনাম করতে হবে । আমি কোন গায়ক নই, কোন পাঠক নই—আমি এসেছি আপনাদেরকে কৃষ্ণনাম করাতে, জীবকে দয়া ও সাহায্য করতে এসেছি । আপনারা এই কৃষ্ণনাম যদি করবেন, এ দিয়ে আমাদের কিছু মঙ্গল হবে, আপনাদেরও কিছু মঙ্গল হবে । এখন একদম কথা বলবেন না । কোন কথা নেই । কথাগুলা বললে আপনাদের অপরাধ হবে । আমাদের বৈষ্ণব-অপরাধ বা ভক্তির যেটা প্রতিকূল সেগুলা করা উচিৎ নয় । ভগবানের কথা শোনার সময় অন্য প্রজল্প করা উচিত নয় । আমি আগেও এটা বুঝিয়ে দিয়েছি আর কীর্ত্তনে আমরা প্রতিদিন গাই : “ছয় বেগ দমি’, ছয় দোষ শোধি, ছয় গুণ দেহ দাসে” । ছয় বেগ কী ? ছয় দোষ কী ? আর ছয় গুণ কী ? এই ছয় বেগটা আর ছয় দোষটা আমাদের বর্জ্জন করতে হবে । ছয় দোষের মধ্যে অত্যাহার, প্রয়াস, প্রজল্প, নিয়মাগ্রহ, জনসঙ্গ, লৌল্য আছে । ছয় বেগের মধ্যে বাক্যবেগ, মনবেগ, ক্রোধবেগ, জিহ্বাবেগ, উদরবেগ, উপস্থবেগ । আর ছয় গুণটা মানে উৎসাহ, নিশ্চয়, ধৈর্য্য, ভক্তিপোষক কর্ম্ম, সঙ্গত্যাগ আর সদ্বৃত্তি । সেইজন্য, প্রজল্প কখনও করবেন না । আপনারা এসেছেন কিছু হরিকথা শ্রবণ-কীর্ত্তন করবার জন্য, সেটাই মন দিযে শুনতে হবে । সেইটা মন দিয়ে শুনলে আপনাদের পরমকল্যাণ-বস্তু লাভ হবে । পরমকল্যাণ এবং সাধ্যবস্তু কী ? আমাদের এই শ্রবণ-কীর্ত্তন করার অর্থ কী ? রাধা-গোবিন্দের সেবায় নিজেকে অর্পণ করা, তাঁদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা । সেটা হচ্ছে আমাদের পরমাবস্থা । শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বলেছে যে, ভগবানকে যদি প্রীতি সহকারে নিত্য সেবা করা হয়, তখন কী হয় ? ভগবান্ নিজেই বলেছেন, “সে আমার কাছে চলে যায় ।” তারা বিরজা, ব্রহ্মলোক, বৈকুন্ঠ, পরব্যোম ভেদ করে গোবিন্দের চরণে গোলোক-বৃন্দাবনে তিনি জায়গা পায় । আপনারা এই জন্মে সুদুর্লভ দেহ পেয়েছেন, এই দুর্লভ বস্তু হেলায় হারিয়ে ফেলবেন না । হেলায় হারালে আবার গতাগতের অনুসারে আপনাদের বারবার এই সংসারে প্রবেশ করতে হবে । এইজন্য আপনাদের বুঝতে হবে : আমাদের সাধ্যবস্তু কী ? সাধ্যবস্তু কী করলে পাওয়া যাবে ? “‘সাধ্যবস্তু’ ‘সাধন’ বিনা কেহ নাহি পায়” (চৈঃ চঃ, ২/৮/১৯৬) এই সাধ্যবস্তু পাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে সাধন । এই সাধ্যবস্তু আপনাদের পেতে হলে বারবার যাতে এই সংসারে আসতে না হয়—তাই আপনাদের কৃষ্ণ-ভজন করতে হবে ।
‘শ্রদ্ধা’ শব্দে—বিস্বাস কহে সুদৃঢ় নিশ্চয় । (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, ২/২২/৬২) সর্ব্বকর্ম্ম কীরকম ? পিতৃঋণ, মাতৃঋণ, ঋষিঋণ, দেবঋণ, সব ঋণ শোধ হয়ে যায় যদি আমরা কৃষ্ণপূজা করি আর ভগবানের সেবা ও গুণ-কীর্ত্তন করি—তার দ্বারা আমরা ভাগবতধামে পৌঁছে যাব । এই চিন্তা-ভাবনার মধ্যে থাকতে হবে ।
চারি বর্ণাশ্রমী যদি কৃষ্ণ নাহি ভজে । (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, ২/২২/২৬) ‘রৌরব’ মানে নরকের চাইতে আরও কঠিন জায়গা—সেই অত্যন্ত কষ্টের জায়গা আপনাদের যেতে হবেই যদি আপনারা কৃষ্ণ-ভজন না করে বর্ণাশ্রম পালন করবেন । আপনারা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শুদ্র হতে পারেন বা ব্রহ্মচর্য, গৃহস্থজীবন বা বানপ্রস্থ-আশ্রম পালন করতে পারেন, কিন্তু এটা দ্বারা ভগবানকে পাওয়া যায় না । বানপ্রস্থ করে বিভিন্ন তীর্থ ভ্রমণ করতে পারেন কিন্তু শাস্ত্রে বলেছেন,
তীর্থযাত্রা পরিশ্রম, কেবল মনের ভ্রম, (শ্রীল নরোত্তমদাস ঠাকুর) সর্ব্বসিদ্ধি হবে কি করে ? গোবিন্দের চরণে আশ্রয় গ্রহণ করলে । এটা সব সময় আপনাদের মনে রাখতে হবে । এটা যদি ভুলে যান, তাহলে আপনাদের কিছু হবে না । আপনাদের সবসময় কৃষ্ণ-সেবায় নিজেকে নিযুক্ত থাকতে হবে । সেইজন্য আপনাদের ভক্তির অনুকূলটা স্বীকার করতে হবে আর ভক্তির প্রতিকূলটা বর্জন করতে হবে ।
— • • • —
|
|||||||