আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি প্রণামী ENGLISH
 

শ্রীগুরুপাদপদ্মের শেষ-কথা

শ্রীগুরুপাদপদ্ম ওঁবিষ্ণুপাদ
শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের পদ্মমুখের হরিকথামৃত
কোলকাতা, ২ মে ২০২১

 

(১) নিজেদের দেখাশোনা করুন


হরি বল । দণ্ডবৎ ।

ওঁ বিষ্ণুপাদ জগৎগুরু শ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ কী জয় ।
বিশ্ববরেণ্য শ্রীল গুরু মহারাজ কী জয় ।
ওঁ বিষ্ণুপাদ জগৎগুরু শ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ কী জয় ।
ওঁ বিষ্ণুপাদ ভগবান্ শ্রী শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর প্রভুপাদ কী জয় ।
শ্রীরূপানুগ গুরুবর্গ কী জয় ।
নামাচার্য্য হরিদাস ঠাকুর কী জয় ।
বৃন্দা দেবী, তুলসী দেবী, শ্রী ভক্তি দেবী কী জয় ।
শ্রীশ্যাম-কুণ্ড, রাধা-কুণ্ড, শ্রীগিরিগোবর্দ্ধন কী জয় ।
শ্রীমায়াপুর ধাম, শ্রী নবদ্বীপ ধাম, শ্রী বৃন্দাবন, মাথুরা কী জয় ।
শ্রীপুরুষোত্তম ক্ষেত্র কী জয় ।
বলদেব সুভদ্রা জগন্নাথ জীউ কী জয় ।
আকর মঠরাজ শ্রী চৈতন্য মঠ কী জয় ।
মায়াপুর যোগপীঠ কী জয় ।
শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠ কী জয় ।
তদীয় শাখা মঠসমূহ কী জয় ।
শ্রী মঠের সেবকবৃন্দ, ভক্তবৃন্দ কী জয় ।
অনন্তকোটী বৈষ্ণববৃন্দ কী জয় ।
শ্রীগৌড়ীয় আচার্য্য বৃন্দ কী জয় ।
ত্রিদণ্ডীপাদগণ কী জয় ।
সপার্ষদ শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু কী জয় ।
সপার্ষদ শ্রীমন মহাপ্রভু কী জয় ।
ভক্তপ্রবর শ্রীপ্রহ্লাদ মহারাজ কী জয় ।
শুদ্ধভক্তি-বিঘ্ন-বিনাশকারী ভগবান শ্রীনৃসিংহদেব কী জয় ।
শ্রীল ভক্তি পাবন জনর্দান মহারাজ কী জয় ।
শ্রীল ভক্তি কুসুম আশ্রম মহারাজ কী জয় ।
সমবেত সন্ন্যাসীবৃন্দ কী জয় ।
শ্রীপাদ ভক্তি নন্দন সাধু মহারাজ কী জয় ।
সমস্ত বিশ্বব্যাপী ভক্তিবৃন্দ কী জয় ।
হরিনাম সংকীর্ত্তন কী জয় ।
নিতাই গৌর প্রেমানন্দে হরি বল ।

আমি সমস্ত ভক্তগণকে, সমস্ত ভালো মনের ভক্তগণকে দেখতে পাচ্ছি—আমি দেখছি যে, ওঁরা প্রোগ্রামটাকে চালিয়ে যাচ্ছেন, হরিভজন করা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং প্রতি সপ্তাহে আমাদের সাথে দেখা করবার জন্য আসেন । তার জন্য আমি খুব বড় আনন্দ পাচ্ছি ।

দণ্ডবৎ, শ্রীল আশ্রম মহারাজ । কেমন আছেন ? কৃপা করে আমার দণ্ডবৎ গ্রহণ করুন ।

শ্রীল আশ্রম মহারাজ : দণ্ডবৎ । আমিও আপনার শ্রীচরণে বিনীত দণ্ডবৎ প্রণাম জানাই । আমি ভালো আছি, মহারাজ । আপনি কেমন আছেন ? আপনার শারীর কেমন আছে ?

আজ আমি কিছু ক্লান্ত । জানি না, কী হয়েছে ।

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের ফলের জন্য চিন্তা করতে করতে গত রাত ঘুমাই নি, আর আজ খবর শুনেছি যে, নির্বাচনের ফলটা ভক্তগণের প্রতি অশুভ । হতে পারে সেই জন্য আমি আজ কিছু ক্লান্ত হয়ে পড়েছি । মমতা ব্যানার্জী আবার (তৃতীয় বার) পাঁচ বছরের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, আর উনি ভক্তগণের প্রতি উপকারিণী নন । সেই কারণে আমি কিছু চিন্তিত আর আজকে কিছু ক্লান্ত হয়ে পড়েছি । আমি নির্বাচনের ফলের জন্য খুব চিন্তা করলাম আর সারা রাত ঘুমাই নি কিন্তু আজ দুপুরে দেড় ঘন্টা বিশ্রাম নিয়েছি ।…

শ্রীপাদ প্রভু : মহারাজ, কিন্তু সেটা একই—এই দল জিতবে না ওই দল জিতবে, ওরা সব একই...

না, প্রভু… যারা কষ্ট পাচ্ছে, তারাই শুধুমাত্র সেটা বুঝতে পারে… আমাকে শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ থেকে বার করে দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র ওদের জন্য…

যাই হোক, আমি খুব আগ্রহী ভক্তগণের সঙ্গে দেখা করতে । সেটা আমার অগ্রাধিকার । বর্তমানে সমস্ত ভক্তগণ ভয় পাচ্ছেন—দিল্লী, বাংলা, গুজরাট, বোম্বে ও দক্ষিণ ভারতে অনেক ভক্তগণ covid-এর আক্রমণ করা হন । আমি ভগবানের কাছে, গুরুদেবের কাছে প্রার্থনা করি, “দয়া করে শক্তি ওঁদেরকে দাও যেন ওঁরা এই covid-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবেন ।” আমি অনেক বিভিন্না জায়গা থেকে খবর পাই যে, ভক্তিগণ covid-এর জন্য কষ্ট পাচ্ছেন । দিল্লীতে একজন ভক্ত এখনই চলে গেলেন, তাঁর সন্তান (৩৮ বছরের ছেলে) এখন ICU-তে রয়েছেন—covid-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন, oxygen পাচ্ছেন । সেটা আমাদের কাছে বড় দুঃখের কথা । তদুপরি আমাদের ভক্তগণের মধ্যে অনেকি ডাক্তারের কাজ করেন (কৃষ্ণকান্ত প্রভু, রামসুন্দর প্রভু, ইত্যাদি)—ওঁরা সবাই হাসপাতালে কাজ করেন, আমি ওঁদের জন্য খুব চিন্তিত । মধুমঙ্গল প্রভুও এখন বাড়িতে আলাদা থাকেন, ওঁর covid হয়েছে—ওঁর স্ত্রী (গর্ভবতী মহিলা) আছে, উনিও covid positive । আমি ওঁদের জন্য প্রার্থনা করছি । আজ ওঁর সঙ্গে কথা বলে ওঁকে বললাম, “চিন্তা করুন না,” উনিও বললেন, “না, মহারাজ, আমি চিন্তা করছি না ।” সেইজন্য, আমাদের সবাই এই অবস্থায় খুব সাবধানে থাকতে হবে । আসলে আমিও কিছু ঝুঁকি নিয়েছি—গৌর পূর্নিমার পর আমি বৃন্দাবনে গিয়েছি, শিলিগুড়িতে গিয়েছি, ওখানে পাঠ করেছি, আরও অনেক জায়গায় প্রচারে গিয়েছি । জানি, আমি অনেক ঝুঁকি নিয়েছি কিন্তু এখন আমি ঘরে বসে আছি । আমি এখানে দমদম পার্কে সমস্ত ভক্তগণকে বলে দিয়েছি, “দয়া করে নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করুন, বাহিরে যাবেন না । স্যানিটাইজার ও মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, সেটা অবশ্যকরণীয় ।”

এখন ভারতে করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ, সেটা খুবই বিপজ্জনক—খুব দ্রুত বিস্তার করছে । চার লক্ষাধিক লোক প্রতিদিন আক্রান্ত হয়ে পড়ে, প্রায় চার হাজার লোক মরে যায় (পশ্চিমবঙ্গে শতাধিক লোক মরে যায়) । আমি জানি, আমাকেও সাবধানে থাকতে হবে… ভক্তের চরিত্র হয় তৃণাদপি সুনীচেন, তরোরিব সহিষ্ণুনা, অমানিনা মানদেন—এই অবস্থায় আমাদের সহিষ্ণু হওয়া দরকার ।

আমি জানি যে, অনেক দেশে প্রায় এক বছর ধরে lockdown হয়েছে, এবং আর্থিক অবস্থা সারা পৃথিবীতে খুবই খারাপ, সবাই কষ্ট পাচ্ছেন, কিন্তু এরমধ্যে ভক্তগণ আমার জন্য চিন্তা করেন, গুরুদেবের জন্য চিন্তা করেন । আমি ওঁদেরকে শুধু ‘thank you’ বলছি না—‘thank you’ বলাই একটা তুচ্ছ জিনিস, কিন্তু আমি ওঁদেরকে বলছি যে, গুরুদেবের কৃপা, ভগবানের কৃপা সব সময় ওঁদের পাশে রয়েছে । যে যার ক্ষমতা আছে, ভক্তগণ সব সময় গুরুদেবের মঠ-মিশনে সাহায্য ও দেখাশোনা করেন আর যদি আমরা সবাই মিলে থাকব, তখন আমরা সব কিছু অতিক্রম করতে পারব ।

সমস্যাটা হচ্ছে যে, আমাদের সকলের অহংকার আছে । সেটাই হচ্ছে আমাদের পরমার্থিক জীবনের সমস্যা । অহংকারের জন্য আমরা সবাই মিলে থাকতে পারি না । আমরা ভক্তগণের প্রতি যথাযথ নজর রাখি না, ভক্তগণের প্রতি যথাযথ দেখাশোনা করি না । প্রচারের অভাবের জন্য এই ফলটা আসবেই আসবে । এই কলিযুগে হরিভজন করতে শুধুমাত্র কয়েক জন আসবে, আর যদিও কেউ আসবে, যার সুকৃতি বেশী নয়, সে এই পথে এগিয়ে যেতে পারবে না—হরিভজন ছেড়ে দিয়ে সে এই পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে । সেইজন্য আমাদের আরও বেশী হরিনাম করতে হবে, আরও বেশী প্রচার করতে হবে, আরও বেশী সাধন করতে হবে । সব সময় সব নিয়মগুলো পালন করবেন—যে গুরুদেবের কাছ থেকে আমরা শিক্ষা পেয়েছি, সেই শিক্ষাটা আমাদের অপরকে বিস্তার করতে হবে ।

আমি জানি সেটা খুবই কঠিন কাজ । আমরা বলি যে, আমাদের দৈন্য থাকতে হবে, সহিষ্ণু থাকতে হবে, অপরকে সম্মান দিতে হবে, সেটা বলা সহজ কিন্তু নিজের আচরণে আনা খুবই কঠিন । আমারও এত বেশী সহিষ্ণুতা নেয়, এত বেশী দৈন্যতা নেয়, আমিও অপরকে সম্মান দিতে পারি না—সেটা আমার খুব খারাপ গুণ কিন্তু গুরুদেব আমাকে তাঁর সেবকরূপে, তাঁর কুক্কুররূপে গ্রহণ করেছেন তাঁর ভক্তগণ ও মিশনটাকে রক্ষা করবার জন্য, তাই আমি শুধুমাত্র তার দিকে অপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি । যদি আমি কোন দিন সফল হব, সেটা শুধুমাত্র ভক্তগণ ও গুরুদেবের কৃপায় সম্ভব কারণ আমার কোন গুণ বা যোগ্যতা নেয়…

 

(২) সাধুর যুদ্ধ


সবাই টাকা-পয়সা দিচ্ছেন, সবাই সাহায্য করছেন কিন্তু শুধুমাত্র কয়েকজন লোক আছে যে তাঁদের ছেলে বা মেয়ে দেবেন মঠের full-time (পুরো সময়) সেবা করবার জন্য । সেটা এই জগতে খুব বিরল । এখানে ভারতেও অনেকে আশা করছেন যে, আমার ছেলে বড় হয়ে বিয়ে করবে, তারপর সন্তান উৎপাদন করবে । প্রতি বাবা-মা সেটা চায় কিন্তু যে ভক্ত চায় তাঁর সন্তান পরিবর্তে ভগবানের সেবা করবে, এমন ভক্ত খুবই বিরল । যেমন শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুরের মা তাঁর ছেলেকে পয়সা দিয়েছেন বৃন্দাবন যাওয়ার জন্য । শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর মায়ের কাছে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “মা, তুমি যদি আমাকে বৃন্দাবনে যেতে না দাও, আমি আত্মঘাত করব ! আমি মরে যাব !” তাঁর মা তাঁকে যেতে দিলেন, আর শুধু তা নয়, তিনি বৃন্দাবনে যাওয়ার জন্য তাঁকে পয়সাও দিয়েছিলেন । সেটা খুবই বরিল । শ্রী বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী ও শচী মাতাও নিজেদের জীবনে অনেক বিসর্জন করেছেন—যদি শ্রী বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী এই বিসর্জন না করতেন, আমরা নিমাইকে সন্ন্যাসীরূপে, প্রচারকরূপে পেতাম না…

…ভক্তগণকে ভাল করে রাখতে না পারলে, সেটা আমার প্রতি খুব বড় সমস্যা, সেটা আমাকে অনেক কষ্ট, অনেক ব্যথা দিচ্ছে । এক এক জন ভক্তরা (আমার গুরুভাইরা, আমার বন্ধুবান্ধব) সবাই চলে যাচ্ছেন… সেটা খুব দুঃখিত কথা । এক এক জন ভক্তরা covid দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন…

প্রশ্ন : যখন এই সব দুঃখজনক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, কলিযুগ অগ্রসর হয়ে যাচ্ছে, তারমধ্য আমি চিন্তা করছি কি করে আমি সাধন চালিয়ে যাব—যত চেষ্টা করি না কেন, তবুত্ত সেটা খুবই কঠিন…

সেটা ঠিক । সাধন বা ভজন করতে খুবই কঠিন কিন্তু আমাদের চেষ্টা করে থাকতে হবে । চেষ্টা করতে করতে হবে । এটা যুদ্ধক্ষেত্র । আমরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কখনও পালিয়ে যাব না—আমরা দাঁড়িয়ে থাকব আর মায়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব । যেকোনো অবস্থায় মায়া দেবী জীবকে সব সময় তাঁর কাছে টুলে নিচ্ছেন । মায়া দেবীর খুব বেশী শক্তি আছে কারণ তিনি ভগবানের কাছ থেকে ওই শক্তি পেয়েছেন । আপনারা সেটা জানেন ।

দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া ।
মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে ॥

“এই ত্রিগুণময়ী অলৌকিকী (বিমুখমোহিনী) আমার মায়াশক্তি অতীব দুরতিক্রমণীয়া, তথাপি যাঁহারা একমাত্র আমারই শরণাগত হন, তাঁহারাই এই দুস্তরা মায়াকে অতিক্রম করিতে পারেন ॥”

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, ৭/১৪)

ভগবানের কাছে শক্তি পেয়ে মায়া দেবী খুব শক্তিশালী । সেই জন্য, যেখানে ভক্তিগণ সবাই মিলে থাকেন, যেখানে সঙ্কীর্ত্তন চলিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সাধন বা হরিভজন চলিয়ে যাচ্ছে, সেখানে মায়া দেবী থাকতে পারবেন না । সেটা আমাদের মূল ভরসা । আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের আরও বেশী সাধন করতে হয় । আমি আপনাদেরকে বলেছি—আপনাদের সাধনের ছবিগুলো আমাকে পাঠাতে পারেন, ওই ছবিগুলো দেখে আমি আনন্দ পাচ্ছি । আমি তার নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চাই । আমি চেষ্টা করব আর একটা বই রচনা করবার জন্য (শ্রীউপদেশ, পঞ্চম খণ্ড) । আমি এই সেবার নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চাই কারণ pandemic-এর (অতিমারীর) জন্য আমরা প্রচারে বেরিয়ে যেতে পারি না, সরকারও তার নিয়ে কঠোর করা হচ্ছে । তাই সেবার নিয়ে ব্যস্ত থাকলে, সবার জন্য সেটা ভালই হবে । দয়া করে নিজেদের দেখাশোনা করুন । এই অবস্থায় সকলের নিজেই সাধন করতে হয়, নিরুৎসাহিত হন না ।

অতিমারীর পরিস্থিতির জন্য আপনারা চিন্তা করছেন, ভাবছেন, “কাজ না করলে, কী খাব ? কীভাবে পরিবার বজায় রাখব ?” আমি জানি, ভক্তগণের জীবনে খুব কঠিন সময় এখন, আমাদের ভক্তগণ অধিকাংশে ধনী লোক নন, তাঁরা নিজের কাজের উপরে নির্ভর করেন, সেই জন্য তাঁরা এখন কিছু উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন কিন্তু এই সময় আপনাদের শ্রীবাস পণ্ডিতের কথা স্মরণ করতে হবে । শ্রীবাস পণ্ডিতের কিছু ছিল না—কিন্তু মহাপ্রভু তাঁকে ভিক্ষা করতে বারণ করলেন । শ্রীবাস পণ্ডিত তাঁর কথা শুনলেন এবং আর ভিক্ষা করতে গেলেন না । তারপর কৃষ্ণ নিজেই তাঁর দেখাশোনা করতেন । ভগবান তাঁর ভক্তগণের দেখাশোনা করেন । সেটা নিত্য সত্য । আপনারা মহাভারত দেখতে পারেন, কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধ দেখতে পারেন, রামায়ণ দেখতে পারেন (যখন রামচন্দ্র রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন)—সর্বত্রই দেখতে পাবেন যে, অসুররা সব সময় সাধুর দ্বারা পরাজিত হন । যেদিকে সাধু, সেইদিকে সব সময় ওঁ থাকে । সেটাই আমাদের বিশ্বাস, সেটাই আমাদের আশা ।

 

(৩) অনন্যাভিলাষী ও অন্যাভিলাষিতা-শূন্য হউক


প্রশ্ন : আপনি সব সময় আমার পাশে আছেন, আমাকে রক্ষা করছেন, তারজন্য আমি আপনার কাছে খুব কৃতজ্ঞ । কিন্তু আমার ভিতরে অনেক ভক্তির প্রতিকূল জিনিস আছে, আমার মনে হয় যে, আমি অনেক উপায়ে অযোগ্য । এই অবস্থায় আমি কী করব ?

যে ভক্তির প্রতিকূল, সেটা হচ্ছে অনর্থ । আমাদের সব সময় অন্যাভিলাষিত শূন্য হতে হবে ।

অন্যাভিলাষিতা-শূন্যং জ্ঞান-কর্ম্মাদ্যনাবৃতম্ ।
আনুকূল্যেন কৃষ্ণানুশীলনং ভক্তিরুত্তমা ॥

(শ্রীভক্তিরসামৃতসিন্ধুঃ, ১/১/১১)

অর্থাৎ,

অন্য অভিলাষ ছাড়ি, জ্ঞান কর্ম্ম পরিহরি,
কায়মনে করিব ভজন ।
সাধুসঙ্গে কৃষ্ণসেবা, না পূজিব দেবী-দেবা,
এই ভক্তি পরম কারণ ॥

(শ্রীশ্রী প্রেমভক্তিচন্দ্রিক, ১৩, শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর)

আমরা অনন্যাভিলাষী হতে হবে, অন্যাভিলাষী নয় । শুধুমাত্র কৃষ্ণের চিন্তা করুন, মঠের চিন্তা করুন, ভক্তগণের চিন্তা করুন—সেটাই ভালো হবে । ভালো জিনিসের চিন্তা করলে, সমস্ত খারাপ জিনিস (সমস্ত অনর্থ) স্বাভাবিক ভাবে আপনাদের কাছ থেকে দূরীভূত হয়ে যাবে । তার জন্য বেশী চিন্তা করতে উচিত নয় । যখন আপনারা ভাবছেন যে, অনর্থ এসে যাচ্ছে, তখন আরও বেশী মনোযোগ দিয়ে সাধন করবেন—হরিভজন ও সাধনের দিকে মনোনিবেশ করুন ।

[একজন ভক্তকে লক্ষ্য করে :] আপনি কখন অবসর জীবন প্রবেশ করবেন ?

ভক্ত : শীঘ্রই, গুরুদেব, আপনার আশীর্বাদে ।

গুরুদেব আমাকে বললেন, “আপনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠে full-time (পুরো সময়) যোগদান করলে, আমি খুব কুশি হব ।” যখন গুরুদেব সেটা আমাকে বললেন, আমি রাজি হলাম আর চাকরি, ইত্যাদি সব কিছু ছেড়ে দিলাম । গুরুদেবের আশীর্বাদ মানে সেবা । যদি আপনি গুরুদেবের নির্দেশ পালন করেন, সেটাই আপনার আশীর্বাদ । যেন আপনার অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকবে না, সেটার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে ।

যাই হোক, আমি আপনাদের সকলের কাছে দণ্ডবৎ প্রণাম জানাই । সকলের কাছে প্রার্থনা করছি যেন আপনারা নিজেদের দেখাশোনা করবেন আর আমিও নিজের দেখাশোনা করব ।

জয় শ্রীলগুরু মহারাজ কী জয় ।

ওঁ বিষ্ণুপাদ জগৎগুরু শ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ কী জয় ।
বিশ্ববরেণ্য শ্রীল গুরু মহারাজ কী জয় ।
ওঁ বিষ্ণুপাদ জগৎগুরু শ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ কী জয় ।
ওঁ বিষ্ণুপাদ ভগবান্ শ্রী শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর প্রভুপাদ কী জয় ।
জয় সপরিকর শ্রী শ্রী গুরু গৌরাঙ্গ গান্ধর্ব্বা গোবিন্দসুন্দরজীউ কী জয় ।
শ্রীল ভক্তি পাবন জনর্দান মহারাজ কী জয় ।
শ্রীল ভক্তি কুসুম আশ্রম মহারাজ কী জয় ।
শ্রীল ভক্তি বিজয় ত্রিবিক্রম মহারাজ কী জয় ।
শ্রীপাদ ভক্তি বন্ধব পুরি মহারাজ কী জয় ।
শ্রীপাদ ভক্তি নিষ্কম শন্ত মহারাজ কী জয় ।
শ্রীপাদ ভক্তি বিঞান মুনি মহারাজ কী জয় ।
শ্রীপাদ ভক্তি নন্দন সাধু মহারাজ কী জয় ।
সমবেত ভক্তবৃন্দ কী জয় ।
সমস্ত বিশ্বব্যাপী ভক্তিবৃন্দ কী জয় ।
সমাগত শ্রীগৌর-ভক্তবৃন্দ কী জয় ।
নিতাই গৌর প্রেমানন্দে হরি বল ।

কৃপা করে আমার অপরাধ ক্ষমা করুন । দণ্ডবৎ । Thank you so much.

[একজন ভক্তকে লক্ষ্য করে :] যদি আপনি প্রচার করতে চান, প্রচার করতে পারেন । আগের মত প্রচান শুরু করুন । কিছু সমস্যা আসবে, আপনাকে তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে । যখন গুরুদেব আমাকে বললেন যে, আমাকে শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত পড়তে হবে, আমারও অনেক সমালোচনা শুনতে হল । ওরা বললেন যে, আমি শুধুমাত্র ছোট ছেলে, কোন সিদ্ধান্ত জানি না, ইত্যাদি । আমি সব কিছু শুনতাম এবং সহ্য করতাম । পরে, যখন গুরুদেব আমাকে এই position (স্থান) দিয়েছেন, তখনও আমি অনেক কিছু শুনেছি—ওরা বললেন যে, আমি গুরুদেবের অনুগামী নই, আমি শ্রীল রূপ গোস্বামীর ধারাকে কেটে দিয়েছি, ইত্যাদি । আমি সব কিছু শুনলাম এবং সহ্য করতাম । তাই যদি ওরা আপনাকে নিন্দা করবেন, তাহলে আপনাকে কিছু হজম করতে হবে, অসুবিধা কী ? আপনি দেখি নি কত আমি সহ্য করছি—আপনি দেখি নি কিসের বিপজ্জনক অবস্থা থেকে আমি এসেছি । যে সেটা বুঝতে পারছে, সে সহজে বুঝতে পারবে কী আমি বলছি…

জয় শ্রীল গুরু মহারাজ কী জয় ।

 


 

 

← গ্রন্থাগারে

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥