![]() |
|||||||
| |||||||
|
|||||||
|
শ্রীউপদেশ (দ্বিতীয় খণ্ড) ৩। কসাধ্যবস্তুর মূল : ছয় বেগ
প্রতি বছর ধাম-পরিক্রমায় যারা আসেন, তাঁদেরকে আমি পঞ্জিকা দিয়ে দেই । তার মধ্যে সুন্দর সুন্দর ভাবে কথাগুলা আমি লিখে দিয়েছি—এগুলা আচরণ করলে আপনাদেরই পরমকল্যাণ লাভ হবে । কীর্ত্তনে আমরা প্রত্যেক দিন গাই, “ছয় বেগ দমি’, ছয় দোষ শোধি, ছয় গুণ দেহ দাসে” । ছয় বেগটা কী ? বাক্যবেগ মানে এমন কোন কথা কাউকে বলবেন যে লোকটা আপনাদের কথা দ্বারা কষ্ট পাবে । এইরকম কথা ছেড়ে দিতে হবে । মনবেগ মানে নানাবিধ মনের চাঞ্চল্য, মনের বদমাশি । মনটা এদিক সেদিক, খারাপ দিকে যায়—এই থেকে মনটাকে কন্ট্রোল (দমন) করতে হবে । বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে হবে । আমি যখন কিছু কাজ করতে যাচ্ছি, তখন আগে বিচার করে দিতে হবে, “আমার মন এটা করতে বলছে কিন্তু সেটা কী ভাল না খারাপ ?” ক্রোধবেগ মানে রূঢ়বাক্য, খারাপ ভাষা ব্যবহার করা, লোককে গালাগাল দেওয়া, লোককে নিন্দা করা, রাগ করে কিছু বলা । জিহ্বাবেগ মানে আমরা বিভিন্ন ধরনের জিনিস খেতে চাই—টক খেতে চাই, লবণ খেতে চাই, মিষ্টি খেতে চাই । বিভিন্ন খাবার জিহ্বা সব সময় চায় । বাহিরের জগতের লোকই এই রকম কিন্তু সাধুরা এত দয়াশীল । আমি এটা বারবার বলি, মন দিয়ে শুনুন । আপনাদের যদি শরীর খারাপ হয়, আপনারা ডাক্তার দেখাতে কলকাতায় চলে যান । সেখানে ভাল ডাক্তার দেখাতে হলে কিছু দিন আগে আসতে হয় । লিস্টে নাম লিখিয়ে অমুক দিন ডেট করে সেই ডেটে গিয়ে আপনাদেরকে ঘন্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হবে । অবশেষে সে ডাক্তার ঔষধ দেন আর ঔষধটা খেলে তবে আপনাদের রোগটা সারে । তেমন সাধুগণ হচ্ছেন ভবরোগের ডাক্তার । এঁরা কত দয়ালু । আমাদের বাড়িতে এসে প্রেসক্রিপশন করে ঔষধ দিয়ে দেন । কিন্তু সেই ঔষধ আমরা ঠিক মত গ্রহণ করি না বলে মায়া থেকে উদ্ধার পেতে পারি না । এক্ষুনি আমরা কীর্ত্তন করলাম, “শক্তিবুদ্ধিহীন আমি অতি দীন, কর মোরে আত্মসাথ” । ‘আত্মসাথ’ মানে হাইজ্যাক (ছিনতাই) করা । সাধুরা কী কোন বাড়িতে টাকা-পয়সা ধন-দৌলত গাড়ি-বাড়ি হাইজ্যাক করতে আসেন ? সাধুরা হাইজ্যাক করতে আসেন আপনাদেরকে । আপনাদেরকে হাইজ্যাক করলে সব পাওয়া হয়ে যায় । আপনাদেরকে কি করে হাইজ্যাক করা হয় ? হাইজ্যাকটা মানে কী ? এই মায়াবদ্ধ জীবকে মায়ার জগৎ থেকে ভগবানের সেবায় নিয়োজিত করা মানে আত্মসাথ । এই বাড়ি তিনটি লোক বাস করেন আর ঠাকুর (রাধা-গোবিন্দ ও মহাপ্রভু) আছেন । তিনজন আর তিনজন হচ্ছে ছয়জন, তাই ছয়জন আছে এই বাড়িতে । এই বাড়ির লোক কী করছেন ? নিত্য ভগবানের সেবা করছেন—নিত্য কীর্ত্তন করছেন, নিত্য ভোগ লাগাচ্ছেন । ভগবান্ শাস্ত্রে বলে দিয়েছেন যে, “নিত্য প্রীতি সহকারে যে ভক্ত আমাকে কিছুই দিতে না পেরে অন্ততঃ আমাকে বক্ষে ধরে এক ফোঁটা গঙ্গাজল আর একটা তুলসীপাতা দেয়, আমি তার ঋণ শোধ করতে পারি না । সেই ভক্তকে আমি নিজেকে দিয়ে দেই । আমি সেই ভক্তের কাছে বিক্রি হয়ে যাই ।” ভগবানও বিক্রি হয় ! কার কাছে ? ভক্তের কাছে । প্রীতি সহকারে সেবা করলে, তুলসী গঙ্গাজল দিয়ে সেবা করলে, সেই ভক্তের কাছে ভগবান্ বিক্রি হয়ে যান । ভগবানকে কেনা যায়, তবে কোটি কোটি টাকা দিয়ে নয়, কোটি কোটি পয়সা দিয়ে নয়, দারুণ বিল্ডিং দ্বারা নয় । কোন জিনিস দিয়ে ভগবানকে কিনতে পারবেন না । কিন্তু ভগবান্ বলেছেন যে, “ভক্ত যদি আমাকে একটা ফোঁটা গঙ্গাজল আর তুলসী পাতা দেয়, তাহলে আমি তার কাছে বিক্রি হয়ে যাই ।” উদরবেগ । উদরবেগটা কী ? এটা হচ্ছে খাই খাই করা । সব সময় খাই এবং জিহ্বার লালসা । এক্ষুনি পেট ভরে ভাত খেয়ে নিলাম—আর কিছু খাবার দরকার নেই, কিন্তু কেউ আমার কাছে একটা পছন্দের জিনিস নিয়ে এলে (যেমন আমি রসগোল্লা খেতে ভালবাসি আর কেউ আমাকে রসগোল্লা দিয়ে দিলে) আমি এটা লোভের জন্য খাই । তারপর আর একটা পছন্দের জিনিস যদি আমার সামনে আসে, আমি আবার সেটা মুখে দিয়ে দেই । এটা হচ্ছে উদরবেগ : সব সময় খাই খাই করা । উপস্থবেগ । এটা আপনারা বুঝতেই পারছেন । উপস্থবেগটা হচ্ছে স্ত্রী-পুরুষের যে সংযোগ সেটা বেড়ে বেশি লালসা, স্ত্রীর প্রতি অত্যাসক্তি । এটাকে বলা হচ্ছে উপস্থবেগ । স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা থাকলে সেটা খারাপ নয়, কিন্তু অত্যন্ত ভোগের বাসনা থাকলে সেটা ভাল নয় । এটা শাস্ত্রে বলেছেন ।
— • • • —
|
|||||||