আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি ENGLISH
 

শ্রীউপদেশ (দ্বিতীয় খণ্ড)


২। কেন আমরা প্রচারে যাই ?

 

আজকে বহু ভাগ্যের ফলে আমরা এখানে উপস্থিত হয়েছি কিছু ভাগবতকথা, হরিকথা আলোচনা করবার জন্য । মেঘাচ্ছন্ন দিন দুর্দিন নয়—হরিকথা বিহীন দিন হচ্ছে দুর্দিন । আমাদের হরিকথা প্রত্যেক দিন অনুশীলন করতে হবে, প্রত্যেক দিন আচার-আচরণ করতে হবে । মাঝে মাঝে লোক ভাবছে, “আজকে একদিন হরিনাম করলাম কালকে করব না” কিন্তু আজকে খেলে আমাদের কালকেও খেতে হবে—আজকে বাথরুমে গেলে কালকেও বাথরুমে যেতে হবে । গোবিন্দের সেবা প্রত্যেক দিনই করতে হবে । এ ছাড়া কোন উপায় নেই ।

সেইজন্য, আজকে খুবই শুভ দিন কারণ আমরা বহু ভাগ্যের ফলে এখানে এসেছি এবং সাধু-গুরু-বৈষ্ণবগণ খুবই ভাগ্যের ফলে বাড়িতে এসে মিলেন ।

মহান্ত-স্বভাব এই তারিতে পামর ।
নিজ-কার্য্য নাহি তবু যান তার ঘর ॥

(শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, ২/৮/৩৯)

তাঁরা অপরের বাড়িতে যান কী জন্য ? লোকটাকে হরিকথা শোনাবার জন্য । তাঁদের সাহায্য করবার জন্য, তাঁদের মঙ্গলের জন্য সাধু-গুরু-বৈষ্ণবগণ গ্রামে বা বাড়িতে এসে উপস্থিত হন । তাঁরা হরিকথা কৃষ্ণকথা বলবার জন্য আসেন । কৃষ্ণকথা বলে আমাদের কৃষ্ণোন্মুখ, ভগবতোন্মুখে করাতে, এই আশায় সাধু-গুরু-বৈষ্ণবগণ বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে ও অজ পাড়াগাঁয় এসে উপস্থিত হন । কেউ মনে ভাবছেন যে, সাধুগণ বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ান শুধু ভাল খাওয়া-দাওয়ার জন্য কিন্তু সেটা আসল বস্তু নয় ।

আপনারা হয়তো শুনেছিলেন যে, আমাদের শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে শ্রীল কৃষ্ণদাস বাবাজী মহারাজ থাকতেন । মাঝে মাঝে তিনি একটু ঘুরতেও যেতেন । তিনি শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের শিষ্য এবং ভালো কীর্ত্তনীয়া ছিলেন । আমাদের যে কীর্ত্তন গ্রন্থা ‘শ্রীগৌড়ীয় গীতাঞ্জলি’ সেটা প্রথমে রচনা করলেন শ্রীলকৃষ্ণদাস বাবাজী মহারাজ ।

একদিন তিনি মঠে এলেন । আপনারা জানেন যে, সবাই মঠে একরকম হয় না । মঠে আসলেই সাধু হয় না । গুরুমহারাজ বলতেন যে, এই চার প্রকারের লোক মঠে হরিভজন করতে এসে : আর্ত্ত, অর্থার্থী, জিজ্ঞাসু, জ্ঞানী । আর্ত্ত মানে গরিব লোক । অর্থার্থী মানে যারা অর্থ লোভে এসে । জিজ্ঞাসু মানে লোকটা কিছু জানতে চায় । আর যারা জ্ঞানী তারা মঠে এসে কিছু জ্ঞান উপার্জন করবার জন্য । যে সত্যিকারের নিঃশর্ত ভাবে, নিস্কাম ভাবে অনুশীলন করেন, সে ভগবতোন্মুখে হয়ে ভগবদ্ধামে সাধু-গুরু-বৈষ্ণবের সেবা করতে পারে । সবার ভাগ্যে এটা হয় না । মঠে ত অনেক লোকে এসে, অনেক লোকে যায় । অনেক লোকে দীক্ষা নেয়, অনেক লোকে গুরু ছেড়ে দেয় । এই পথে শেষ পর্যন্ত সবাই থাকে না । যেমন প্রাইমারী স্কুলে অনেক ছাত্র ভর্তি হয় কিন্তু হাই স্কুলে উঠলে ছাত্রের সংখ্যা কমে যায়, কলেজে উঠলে আরও কমে যায়, আর শেষে ইউনিভার্সিটিতে উঠলে শুধু দুই-এক জন থাকে । গুরুমহারাজও বলতেন যে, চালুনী দিয়ে ছাঁকলে শেষ পর্যন্ত খুবই কম থাকে, বেশী থাকে না ।

তাই, একদিন শ্রীল কৃষ্ণদাস বাবাজী মহারাজ মঠে এলেন, আর একজন ব্রহ্মচারী ফট করে বলে ফেলল, “এই সাধুটা শুধু খাওয়ার জন্যই আসেন মঠে !” কথাটা শুনে বাবাজী মহারাজ আর খেতে গেলেন না—তিনি বন্ধ ঘরের মধ্যে বসে থাকলেন : “দেখি আমি না খেয়ে থাকতে পারি কি না !” এক দিন, দুই দিন, তিন দিন ধরে তিনি প্রসাদ পেতেন না । তিনি মুখে সব সময় শুধু হরিনাম করতেন কিন্তু না খেয়ে কত দিন থাকা যায় ? শেষ পর্যন্ত তিনি আস্তে আস্তে করে হরিনাম করতেন আর সবাই তাঁকে ঘরে দেখতে গেলেন । তাঁর দুর্বল অবস্থাটা দেখে তাঁকে জোর করে জল ও কিছু ফলের রস খাওয়ানো হল । তারপর যে এই কাজটা করেছে, তাকে অপরাধ ক্ষমা চাওয়ানো হল । তখন বাবাজী মহারাজ প্রসাদ পেলেন ।

সেই ভাবে যাঁরা সত্যিকারের সাধু-গুরু-বৈষ্ণব, তাঁরা খাওয়া-দাওয়ার জন্য কিছু পাওয়ার ভরসায় আসেন না—তাঁরা আসেন আমাদের ময় পামর অধম জীবকে, পতীত জীবকে উদ্ধার করবার জন্য, তাঁদের কৃষ্ণোন্মুখ করবার জন্য । আমরা সবাই এই কৃষ্ণকথা সব সময় বলি এবং কৃষ্ণকথা সব সময় শুনতে ইচ্ছা করি । শ্রীল মধুসূদন গোস্বামী মহারাজ প্রচারে গিয়ে বলতেন, “আমরা কেন বারবার প্রচারে যাই ? কেন উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করি ? কিছু হরিকথা বললে নিজের কিছু মঙ্গল হয় এবং যাঁরা শুনবেন তাঁদেরও কিছু মঙ্গল হয় ।” এটাই আসল বস্তু ।

 

— • • • —

 

 

← ১। ভাগবতধাম : পরমকল্যাণ ও সাধ্যবস্তু ৩। সাধ্যবস্তুর মূল : ছয় বেগ →