শাশ্বত সুখনিকেতন


তৃতীয় অধ্যায়
যথার্থ জিজ্ঞাসা ও যথার্থ প্রচেষ্টা

 

সাধারণতঃ এই পৃথিবীতে আমাদের ভূমিকা হল এই যে আমরা কর্ম্মী । আমরা হলাম সেই ধরণের মানুষ যারা প্রকৃতিকে ও নিজেদের পারিপার্শ্বিককে শোষণ করছে নিজেদের জন্য ক্ষমতা ও শক্তি সঞ্চয় করার জন্যে । সর্ব্বদাই আমাদের প্রচেষ্টা যতটা সম্ভব শক্তি সঞ্চয় করা যাতে আমাদের দরকার মত এই শক্তিকে আমরা কাজে লাগাতে পারি, যাতে আমাদের সব চাহিদা মেটে, সব প্রয়োজন সিদ্ধ হয় । শুধু তাই নয় ভবিষ্যতের জন্যও আমরা সঞ্চয় করতে চাই । মোটামুটিভাবে বলতে গেলে এই সংসারে আমরা যারা বাস করছি আমাদের প্রকৃতি হল এইরকম । আর যদি কোন সময়ে এই শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টার পথে কোন বাধা আসে তাহলে আমরা মনে করি সেটা খুবই খারাপ অবস্থা । কারণ আমাদের জীবনে লক্ষ্যের পথে তা বাধা সৃষ্টি করছে । কেন না আমাদের জীবনের লক্ষ্যই হল যথাসম্ভব শক্তি বা ধন সঞ্চয় করা । তবুও আমাদের আভ্যন্তরীণ ঐশ্বর্য্যের কি মূল্য সেটা যাতে আমরা মনে রাখি তাই আমাদের এই উপদেশ দেওয়া হয়েছে যে বহির্জগৎ আমাদের তত ক্ষতি করতে পারে না, যত ক্ষতি করতে পারে আমাদের নিজেদের প্রকৃতি । আমাদের নিজেদের প্রকৃতিই আমাদের সবচেয়ে বেশী ক্ষতি করবে, যখন আত্মার জগতে আমাদের যে যথার্থ অস্তিত্ব আছে সেই যথার্থ অস্তিত্বের জন্য ধনসংগ্রহে আমরা অবহেলা করব । এই কথাটা আমাদের বুঝতে হবে ও মনে রাখতে হবে । বহির্জগৎ থেকে যা আসছে তা অত গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ তা কেবল আসে আর যায় । এমন কি এই যে শরীরটা যা বর্ত্তমানে আমাদের সমস্ত চিন্তার কেন্দ্রস্থলে রয়েছে তাও একদিন অদৃশ্য হয়ে যাবে । সুতরাং এই শরীরের সঙ্গে সম্পর্কিত যা কিছু তাদের চাহিদা মেটাবার জন্যে এত সঞ্চয় করার কি কোন প্রয়োজন আছে ? আমার আত্মার ভিতরে যে প্রকৃত আমি আছি তাকে জাগিয়ে তোলাই আমার প্রয়োজন । তাকেই আমাদের খুঁজে বার করতে হবে এবং তার জন্যেই সাহায্য চাইতে হবে । এই ধরণের একটা চেতনার আন্দোলন শুধু সাধুর সঙ্গে যোগাযোগ হলেই সম্ভব হয় । যে দিন কোন সাধুর দর্শন পাব না, যে দিন আমার জীবনের প্রকৃত অর্থ কি, প্রকৃত তত্ত্ব কি তা নিয়ে কোন আলোচনা শুনব না, সেই দিনটাই বৃথা গেল মনে করতে হবে । এ সম্বন্ধে আমাদের সর্ব্বদা সচেতন থাকতে হবে । আমার ভিতরে যে প্রকৃত আমি আছি তাকে যেন আমি যে কোন উপায়ে মনে রাখি, যেন সর্ব্বরকমে মনে রাখি । আমার প্রকৃত স্বরূপকে খুঁজে বার করে আমি যেন আমার প্রকৃত স্বার্থ সিদ্ধ করি । বহির্জগৎ এবং বাহ্যিক পরিবেশ সম্বন্ধে উদাসীন হয়ে অন্তরে যে সত্য আছে, যে ঐশ্বর্য্য আছে তাঁর মধ্যে আমাকে ডুব দিতে হবে । আমার অন্তর্নিহিত সত্ত্বাকে খুঁজে বার করতে হবে, খুঁজে বার করতে হবে সেই জগৎকে যেখানে আমার অন্তর্নিহিত সত্ত্বা বাস করে । আমার সেই ঘর কোথায় আছে, কোথায় আছে আমার সেই সুখনিকেতন, তা আমাকে খুঁজে বার করতে হবে । যেন আমি ফিরে যেতে পারি আমার ঘরে, ফিরে যেতে পারি শ্রীভগবানের কাছে । সেই ঘরে ফিরে যাবার জন্যেই আমাকে সব শক্তি সঞ্চয় করতে হবে, এই প্রবাসে, এই মৃত্যুর দেশে বিচরণ করে বেড়াবার জন্যে নয় । যে কোন মূল্যে এই মৃত্যুর দেশকে ত্যাগ করতে হবে এবং সর্ব্বদা সেই চিরন্তন, নিত্যভূমির সন্ধানে থাকতে হবে । আমি যে সেই শাশ্বতভূমিরই বাসিন্দা তা আমাকে বুঝতে হবে । আমাকে বুঝতে হবে কোথায় আমার ঘর আর কেনই বা তাই আমার নিজের ঘর । “সুখনিকেতন” এর অর্থ কি ? এর অর্থ হল যেখানে থাকার আমার জন্মগত অধিকার আছে আমার সেই প্রকৃত বাসভূমি, আমার সেই আপন গৃহ । আমরা যে এখন আমাদের নিজের ঘরে নেই—সেই সত্যের সম্মুখীন আমাদের হতে হবে, এই সত্যকে স্বীকার করতে হবে । কিন্তু সেই নিজের ঘরকে খুঁজে পাওয়ার জন্যে একটা ব্যাকুলতা যদি আমাদের ভিতরে থাকে, তবে বুঝতে হবে আমরা বড় ভাগ্যবান ।

অন্তরে যে তৃষ্ণা আছে সেই তৃষ্ণা কেমন করে মেটাবো সেইটে জানাই হল সবচেয়ে বড় প্রয়োজন । আমাদের উপলব্ধি যেন এইরকম হয় যে,“এই সংসার এখানে আর আমিও এখানে, কিন্তু এখানে আমার কোন সুখ নেই, সন্তোষ নেই । কি করলে আমার অন্তর্নিহিত সত্ত্বা সুখী হতে পারে ?” আমরা অভাবের মধ্যে আছি, অতএব কি সেই পদ্ধতি যার দ্বারা এই অভাব দূর হতে পারে বর্ত্তমানে আমাদের একটা রক্তমাংসের শরীর আছে, কিন্তু সেই শরীরের সমস্ত খুঁটিনাটি, হাড়গোড়, রক্তমাংস, স্নায়ুতন্ত্র, এসব সম্বন্ধে বিশদভাবে জানার প্রয়োজন নেই । শরীরের মধ্যে যে রক্ত আছে তাঁর প্রকৃতি, গঠন, মিশ্রণ এসব বিশদভাবে জানার আমাদের কোন প্রয়োজন নেই । আমাদের সমস্ত প্রশ্ন, কৌতূহল, অনুসন্ধিৎসা যেন সেইদিকে ধাবিত হয় যেদিকের একমাত্র প্রশ্ন হল, “কে আমি ? কেন এখানে আমি কষ্ট পাচ্ছি ? কেমন করে আমি জানব আমার এই সমস্যার সমাধান কিসে হবে ?” এই হল আমাদের মুখ্য প্রশ্ন আর এই নিয়েই আমাদের চিন্তিত থাকা উচিত ।

“অথাতো ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা”—এখন এই মানব জন্মে, সেই ব্রহ্ম জিজ্ঞাসার সময় হয়েছে, যে জিজ্ঞাসার উত্তর পেলে আমি নিজেকে জানতে পারব । এখন থেকে এই হবে আমার প্রশ্ন—“কোথা থেকে আমি এলাম ? কেনই বা আর কি করে এখানে আমি বেঁচে আছি ? আমার ভবিষ্যৎ কি ?” এই মুখ্য প্রশ্নই এখন অমাদের চিন্তার বিষয় আর আমাদের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে এর উত্তর পেতে হবে । এ কেবল আমার প্রশ্ন নয়, এ কেবল একজনের প্রশ্ন নয়, সমস্ত সৃষ্টির এই প্রশ্ন । সেই হবে যথার্থ প্রশ্ন যখন আমরা সবকিছুর উৎসকে বা আদি কারণকে জানার চেষ্টা করব । তা না হলে শুধু এটা জানা, ওটা জানা, অন্য হাজার জিনিসকে জানার চেষ্টা করা শুধু শক্তির অপচয় । শাস্ত্রীয় অনুসন্ধিৎসার প্রকৃতিই হল এইরকম যে সেখানে প্রশ্ন হল “কোথা থেকে আমি এলাম ? কে আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে ? আমার ভবিষ্যৎ কি ? কেন আমি এখানে স্বস্তি পাচ্ছি না ? আরাম পাচ্ছি না ? কেমন করে আমার তৃষ্ণা মিটবে আর আমার ভিতরে আমি পরিপূর্ণতা লাভ করব ? “সমস্ত প্রশ্ন, সমস্ত কৌতূহল যেন এইদিকে যায় । তা না হলে অযথা কৌতূহল আমাদের একটা রোগ হয়ে দাঁড়াবে । একের পর এক কৌতূহল মনের মধ্যে মাথা চাঁড়া দেবে, যার আর কোন শেষ নেই । তাই আমাদের জানা প্রয়োজন কি প্রশ্ন করতে হবে, আর কোথায় কেমন করে সেই প্রশ্ন জানাতে হবে । তবেই যে শক্তি আমরা ক্ষয় করব তার একটা মূল্য থাকবে, তার অপচয় হবে না ।

সেই অনুসন্ধিৎসাই হল প্রকৃত অনুসন্ধিৎসা যা জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধনের দিকে নিয়ে যায় । সুতরাং আমাদের সমস্ত শক্তিকে সঞ্চয় করে তাকে সেই দিকেই নিয়োগ করতে হবে । এ হল কলিযুগ, তর্ক, বিবাদ, কলহের যুগ । এখন আমাদের একমাত্র সত্যিকারের প্রয়োজন হল সেই সাধুদের সাহায্য নেওয়া যাঁদের জীবন সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত । আর প্রয়োজন হল শ্রীভগবানের দিব্যনাম জপ করা—“সাধুসঙ্গে কৃষ্ণনাম ।” এই পথ থেকে যদি আমরা বিচ্যুত হই তবে প্রত্যেক পদেই ভূল নির্দ্দেশ পাবো ।

সাধুসঙ্গে কৃষ্ণনাম এই মাত্র চাই ।
সংসার জিনিতে আর কোন বস্তু নাই ॥

(শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত)

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সব উপদেশের সারবস্তু আমাদের দিয়ে গেছেন আর অনর্থ নিবৃত্তির জন্য এর চেয়ে ভাল সাহায্য আর কিছু নেই ।

মহাপ্রভু বলেছেন বিনা সাধুসঙ্গে কৃষ্ণনাম জপ করলে আমাদের সাধনপথে অগ্রসর হওয়া খুব কঠিন হবে । তাই এককথায় সাধুঙ্গই হল সব সমস্যার সমাধান । তাই শাস্ত্রের মান অনুযায়ী যাঁর ভগবৎ উপলব্ধি হয়েছে এমন সাধুর পাদপদ্মে যদি আমরা আশ্রয় পাই তখন আমাদের সাধনপথে, সব কিছুই ঠিক ঠিক চলবে । আর সাধুদের রাজাধিরাজ হলেন শ্রীগুরুদেব । যিনি সজ্জনদের রাজাধিরাজ সেই গুরুদেবই আমাদের ঠিক পথে চালিত করবেন, আমাদের নির্দ্দেশ দেবেন । যিনি গুরু হবেন তিনি নিশ্চয়ই আমাদের এমনভাবে চালিত করবেন, এমনভাবে নির্দ্দেশ দেবেন যাতে আমাদের সব প্রয়োজন সিদ্ধ হবে ও আমাদের পরিপূর্ণ সন্তোষ আসবে । তা না হলে আমাদের সমস্ত হৃদয় দিয়ে কাকে আমরা বিশ্বাস করতে পারি আর কার কাছেই বা আমরা সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করতে পারি ? গুরুর কাছেই আমাদের সব অনুসন্ধিৎসার সর্ব্বোচ্চ প্রয়োজন মিটবে ও তাঁর সম্পূর্ণ তৃপ্তি হবে । তাঁর ভিতর দিয়েই উপরের জগৎ থেকে নির্দ্দেশ আসবে । এক ক্রমবিকশিত প্রেমভক্তির জগতের নির্দ্দেশ সেখান থেকেই আসবে । সেই সূক্ষ্মতম দিব্য তরঙ্গের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ করতে হবে, তবেই আমাদের সর্ব্বোচ্চ মঙ্গল হবে । এই হল যথার্থ ধারণা ।

পরিণতিতে, আমাদের সবসময়ই চেষ্টা করা উচিত যে যাঁরা উচ্চতর জগতের উচ্চতর উপলব্ধির অধিকারী, সেই উচ্চতর প্রতিনিধিদের আনুগত্যে যেন আমরা থাকতে পারি । এইভাবেই আমরা জীবনের সূক্ষ্ম ও উচ্চস্তরে পৌঁছাতে পারব । জীবনে নানা স্বার্থের নানা তরঙ্গ আছে, নানারকমের লাভক্ষতি এখানে আছে, কিন্তু যা সর্ব্বোচ্চ তার সঙ্গে যোগাযোগ করাই আমাদের জীবনের লক্ষ্য ।

এটা যেন আমরা বুঝি যে এই সাংসারিক জীবনে কোন মাধুর্য্য নেই । এখানে সবকিছু যে শুধু চর্ব্বিতচর্ব্বন বা বাসী, সে অভিজ্ঞতা তো ইতিমধ্যেই আমাদের ভালভাবেই হয়েছে । তাছাড়া যেখানে জন্ম, মৃত্যু, জরা, ব্যাধি, এই চার শত্রু রয়েছে সেখানে তো সত্যিকারের সুখ থাকতেই পারে না । যেখানেই মৃত্যু আছে সেখানেই কোন সুখ নেই । এইরকম জীবনের স্তরে আমরা সবসময়ে মৃত্যুভয়ে তাড়িত হচ্ছি, তাই এইরকম জীবনে কোন মাধুর্য্য নেই ; সব মাধুর্য্য এই মৃত্যুভয়ে একদম বিনষ্ট হয়ে গেছে । তাই খুব আগ্রহের সঙ্গে , ব্যাকুলতার সঙ্গে আমাদের অনুসন্ধান করতে হবে সেই জায়গায়, যেখানে আমরা চিরকাল বেঁচে থাকতে পারব । একটা উচ্চতর বাসভূমি খুঁজে পেতে হবে, যেখানে আমরা সত্যিসত্যিই বাঁচতে পারি ।

যদ্ গত্বা ন নিবর্ত্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম ।

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, ১৫/৬)

অর্থাৎ “শরণাগত ভক্তগণ যে স্থান প্রাপ্ত হয়ে সেখান থেকে আর প্রত্যাবর্তন করেন না—তাই আমার পরম ধাম ।” শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় বলছেন, “যে স্থানে গিয়ে কেউ আর এই মৃত্যুলোকে ফিরে আসে না, সেই স্থানই হল আমার পরমধাম ।”

আব্রহ্মভুবনাল্লোকাঃ পুনরাবর্ত্তিনোঽর্জ্জুন ।
মামুপেত্য তু কৌন্তেয় পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে ॥

(ভগবদ্গীতা, ৮/১৬)

অর্থাৎ “হে অর্জ্জুন ! ব্রহ্মলোক থেকে আরম্ভ করে অধস্তন সমস্ত লোক অথবা লোকবাসী জীবগণই পুনরাবৃত্তিশীল, কিন্তু হে কৌন্তেয় ! আমাকে প্রাপ্ত হলে পুনরায় জন্ম হয় না ।” শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে এই উপদেশ দিচ্ছেন যে “একটা নিত্য জীবন শুধু আমার পরম ধামেই থাকতে পারে । এখানকার সমস্ত বৃত্তি, এমন কি রাজার আসনও, স্বপ্নের মত ক্ষনস্থায়ী । সুতরাং তুমি যদি এই স্বপ্নের মত ক্ষণিক জীবন থেকে নিস্কৃতি চাও আর সত্যের জগতে প্রবেশ করতে চাও তবে নিজেকে উন্নত করে সেই স্তরে নিয়ে যাও যেখানে তুমি সেই চিন্ময় ধামের, সেই বাস্তব জগতের সন্ধান পাবে । যথা সূক্ষ্ম, অচিন্ত্যনীয়ই হোক না কেন সেই জীবনের স্তর, তবু সেখানেই যাওয়ার চেষ্টা কর, কারণ মৃত্যু তাকে কখনও গ্রাস করবে না । সমস্ত শক্তি একত্রিত করে স্থায়ী কিছু গড়ে তোলার চেষ্টা কর ।বর্ত্তমানে তুমি তোমার শক্তি নিয়োগ করছ এমন কিছুতে যা পর মুহুর্তেই ধ্বংস হয়ে যাবে—এমন চেষ্টা কেবল মূর্খতা ।”

উদ্ধরেদাত্মনাত্মানং নাত্মানমবসাদয়েৎ ।
আত্মৈব হ্যাত্মনো বন্ধুরাত্মৈব রিপুরাত্মনঃ ॥

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, ৬/৫)

অর্থাৎ “বিষয়ে অনাসক্ত মন দ্বারা জীবাত্মাকে সংসারকূপ থেকে উদ্ধার করবে, কখনও বিষয়াসক্ত মন দ্বারা জীবাত্মাকে সংসারে পতিত করবে না । যেহেতু মনই জীবের বন্ধু এবং অবস্থাভেদে আবার সেই মনই শত্রু হয়ে থাকে ।” শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বলছেন যে “একথা মনে রেখো যে তুমিই তোমার বন্ধু । কিন্তু তুমি তোমার শত্রুও বটে । যদি তোমার সত্যিকারের উন্নতির জন্য তুমি যত্ন না নাও তবে তুমি নিশ্চয়ই তোমার শত্রু। কিন্তু তুমি তোমার নিজের বন্ধুও হতে পার আর তুমি তোমাকে যত সাহায্য করতে পার এত সাহায্য অন্য কেউ তোমাকে করতে পারে না ।”

বন্ধুরাত্মাত্মনস্তস্য যেনৈবাত্মাত্মনা জিতঃ ।
অনাত্মনস্তু শত্রুত্বে বর্ত্তেতাত্মৈব শত্রুবৎ ॥

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, ৬/৬)

অর্থাৎ যে জীব নিজের মনকে জয় করেছেন, তার সেই মনই বন্ধু অর্থাৎ বন্ধুর মত হিতকারী ; কিন্তু অজিতমনা ব্যক্তির সেই মনই শত্রুর ন্যায় সর্ব্বদা অপকারে প্রবৃত্ত হয়ে থাকে ।” শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বলছেন যে “যদি তোমার কোন আত্মসংযম থাকে তবে তোমার সমস্ত শক্তি একত্রিত করে তাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত কর যাতে সে বিপথগামী না হয় । তোমার শক্তিকে এমন দিকে চালিত কর যেদিকে তুমি প্রকৃত সমৃদ্ধি, প্রকৃত সাফল্য লাভ করবে । তবেই তুমি তোমার সত্যিকারের বন্ধু হবে । কিন্তু যদি তুমি তোমার সত্ত্বাকে যে নিম্নপ্রকৃতি কেবল শোষণ, কর্ম্মফল ও দুঃখের জগতে বিচরণ করে, সেই নিম্নপ্রকৃতির দ্বারা বশীভূত ইন্দ্রিয়ের দ্বারা চালিত হতে দাও, তবে তুমি অবশ্যই তোমার শত্রু । এইসব বিষয় নিয়ে ভাল করে চিন্তা করে দেখ ।”

ইতি তে জ্ঞানমাখ্যাতং গুহ্যাদগুহ্যতরং ময়া ।
বিমৃশ্যৈতদশেষেন যথেচ্ছসি তথা কুরু ॥

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, ১৮/৬৩)

অর্থাৎ “তোমাকে এই গূঢ় থেকেও গূঢ়তর জ্ঞানের কথা আমি বললাম । একথা অশেষভাবে পর্য্যালোচনা করে তোমার যা ইচ্ছা তাই কর ।” শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বলছেন, “আমি তোমাকে যা বললাম তা খুব গভীরভাবে চিন্তা করে দেখ । তারপর তোমার যা ভাল মনে হয় তাই কর । এই মানবজীবন বড় মূল্যবান । এখন তোমার বিচার করার ক্ষমতা আছে । কিন্তু যদি তুমি কর্ম্মফলের তরঙ্গে ভেসে যাও তবে তোমার সেই বিচার করার শক্তি কেড়ে নেওয়া হবে এবং তখন তোমাকে কোন গাছপালা বা জীবজন্তুর দেহে জন্ম নিতে হবে । তুমি কি নিশ্চিত হয়ে বলতে পার যে তোমার এমন অধোগতি হবে না যে পরের জন্মে তোমার পশুজন্ম হবে না ? এমন আশ্বাস তুমি কোথায় পেয়েছো ?”

এমন নয় যে সমস্ত কর্ম্ম শুধু মৃত্যুর জগতেই সম্পন্ন হয়, সমস্ত প্রগতি শুধু মৃত্যুর জগতেই হয় । শুধু অন্ধকার আর অজ্ঞানতার জগতেই প্রগতি সীমাবদ্ধ নয় । যখন তুমি সেই অন্য জগতের অমৃতময় প্রগতির পথে পা বাড়াবে তখন তুমি বুঝবে যে সেই হল সত্যিকারের প্রগতি ।

ভিতরের সমর্থন থেকে, তোমার হৃদয়ের সমর্থন থেকেই তোমার যথার্থ প্রগতিকে তুমি অনুভব করবে ও তাকে বুঝতে পারবে । এমন নয় যে তোমাকে কোন মিথ্যে আশা দেওয়া হয়েছে আর এক অজানা জায়গায় নিয়ে গিয়ে সেখানে তোমাকে অত্যাচার করা হবে বা তোমার উপর অবিচার করা হবে বা তোমাকে খুন করা হবে । তার কোন প্রশ্নই ওঠে না, সেরকম চিন্তাও করা উচিত নয় । শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে—

ভক্তিঃ পরেশানুভবঃ বিরক্তিরন্যত্র চৈষ ত্রিক এককালঃ ।
প্রপদ্যমানস্য যথাশ্নতঃ স্যুস্তুষ্টিঃ পুষ্টিঃ ক্ষুদপায়োঽনুঘাসম্ ॥

(শ্রীমদ্ভাগবতম্ ১১/২/৪২)

অর্থাৎ, “সুপথ্য অন্ন ভোজনকারীর প্রতিগ্রাসে তুষ্টি, পুষ্টি ও ক্ষুন্নিবৃত্তি ক্রমশঃ হয়ে থাকে, সেইরকম প্রসন্ন ব্যক্তিমাত্রেরই ভক্তি, পরেশানুভবরূপ সম্বন্ধজ্ঞান, এবং অনিত্যবস্তু ও ব্যক্তিতে বিরক্তি এককালে হয় । তাৎপর্য্য এই যে যিনি শুদ্ধভক্তি আশ্রয় করেন, তাঁর হৃদয়ে কৃষ্ণভক্তি, কৃষ্ণসম্বন্ধজ্ঞান এবং ইতর বস্তুতে বিরক্তি একই কালে হয় । জ্ঞান বৈরাগ্য পৃথক তত্ত্ব নয়, সুতরাং তাদের চেষ্টা পৃথক হলে তারা বহির্মুখ হয় । বহির্মুখ জ্ঞান ও শুষ্কবৈরাগ্য খুবই মন্দ । ভক্তিজনিত সম্বন্ধজ্ঞান ও ইতর বৈরাগ্য স্বয়ং উৎপন্ন হয়ে থাকে । যে স্থলে তারা উৎপন্ন হয় না, সে স্থলে ভক্তির অভাব । সুতরাং তাকে কপট ভক্তি বলতে হবে । বৈরাগ্য আত্মার তুষ্টি, সম্মন্ধজ্ঞানে আত্মার পুষ্টি এবং ভক্তিক্রিয়ায় ক্ষুন্নিবৃত্তি, এইরকম তিনটি উপমা প্রদর্শিত হল ।” শ্রীমদভাগবতমের এই বিখ্যাত শ্লোকে এই তত্ত্বটিই ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে যখন আমরা কিছু খাই, তখন আমাদের পাকস্থলীই তার সাক্ষী থাকে, সেখানেই তার প্রমাণ পাওয়া যায় । প্রতি গ্রাসেই সে বলবে, “হ্যাঁ, আমি খাচ্ছি বটে ।” ক্ষুধার তুষ্টি হবে, শরীরের পুষ্টি হবে এবং খাওয়ার যে তৃপ্তি তাও হবে । শরীর পুষ্ট হয়ে বল, বীর্য্য, শক্তি পাবে এবং নিজের ভিতর থেকেও একটা পরিতৃপ্তি অনুভব করা যাবে । শুধু তাই নয়, ক্ষুধার তুষ্টি হওয়ার জন্যে আরও খাওয়ার প্রয়োজন আর থাকবে না । সেইরকম একইভাবে আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনে, ভক্তি অনুশীলন কালে, বহুরকমের লক্ষণ আমরা দেখতে পাবো যার দ্বারা আমাদের প্রগতির প্রমাণ পাওয়া যাবে ।

এখন আমরা এই মানবদেহ ধারণ করেছি ; তাই আমাদের পক্ষে এ বড় অমূল্য সময়, অথচ এই সময়ের অপচয় হচ্ছে । আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান শক্তি আমরা অকাজে ব্যবহার করে নষ্ট করছি । শাস্ত্র তাই বলছেন, “উত্তিষ্ঠিতঃ, জাগ্রতঃ, প্রাপ্য বরাণ নিবোধতঃ” —“তাই ওঠ, জাগ, সেই অমৃতময় জীবনের পথে শুধু নিজেকে নিয়োজিত কোর না, অন্যদেরও ডেকে নাও । অপরকে সাহায্য করলে, অপরের সঙ্গে যোগযুক্ত হলে তুমিও তাদের কাছ থেকে কোন বিশেষ সাহায্য পাবে ।”

আসল কথা হল এই যে কোন উত্তম অধিকারীর আনুগত্যে থেকে আমাদের নিজেদের সেবার কাজে, ভক্তি অনুশীলনের কাজে নিয়োজিত করতে হবে । এই সেবার জীবনে, সেবার কাজে আমরা যেন এতই ব্যস্ত থাকি যে যা কিছু তুচ্ছ ও জড়, তার জন্যে যেন আমাদের কোন সময় না থাকে । বৈষ্ণবসঙ্গে থেকে এইরকম পরিপূর্ণ সেবার জীবন আমাদের পক্ষে খুবই মঙ্গলময় হবে ।

 


 

← ২. সুখনিকেতন ৪. সুবর্ণ সুযোগ →

 

সূচীপত্র:
মুখবন্ধ
১. শোষণ, ত্যাগ ও আত্মনিবেদন
২. সুখনিকেতন
৩. যথার্থ জিজ্ঞাসা ও যথার্থ প্রচেষ্টা
৪. সুবর্ণ সুযোগ
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥