শাশ্বত সুখনিকেতন


চতুর্থ অধ্যায়
সুবর্ণ সুযোগ

 

আভ্যন্তরীণ আত্মতুষ্টি বা হৃদয়ের সন্তোষ, যা থাকলে এই দুঃখময় জগতের বর্ত্তমান পারিপার্শ্বিককে উপেক্ষা করা যায়, তা এক অমূল্য সম্পদ । আত্মার জগতের কাছাকাছি এলেই তা পাওয়া যায় ।

প্রকৃত ভক্তি হল অহৈতুকী, ভক্তিই ভক্তির কারণ । ভক্তি অন্য কিছু থেকে আসে না, সে নিজেই নিজের কারণ । যেমন হেগেল বলেছেন সত্য নিজেই নিজের কারণ । কিন্তু সত্য কোন অস্পষ্ট বস্তু নয়, সত্য হল এমন এক তত্ত্ব যার অস্তিত্ব তার নিজের জন্যেই আছে । তা হল অনাদি এবং অতৈতুকী । তা হল নিত্য এবং অন্য কিছু তাকে সৃষ্টি করতে পারে না । ভক্তি থেকেই ভক্তির সৃষ্টি । আমাদের সাহায্য করার জন্যে ভক্তির এইসব সংজ্ঞা আমাদের দেওয়া হয়েছে, যাতে আমরা খানিকটা বুঝতে পারি যে ভক্তি কি বস্তু । অন্য কিছু ভক্তিকে সৃষ্টি করেনি আর ভক্তির অস্তিত্ব নিত্যকালই রয়েছে । কিন্তু বর্ত্তমানে আমাদের ভক্তি ঢাকা পড়ে আছে, সেই ঢাকা খুলে তাকে আবার নতুন করে আবিস্কার করতে হবে । এখন সে এক সম্ভাবনার বীজ রূপে রয়েছে । বাইরে থেকে সাহায্য পেলেই সে ক্রমবিকশিত হয়ে উন্মোচিত হবে । এখন যেন সে ঘুমিয়ে আছে, তাকে ঘুম থেকে তুলে দিতে হবে । অন্যাভিলাষ, কর্ম্ম, জ্ঞান, চঞ্চল, মনের নানা বাসনা, ভোগ ও ত্যাগের ইচ্ছা, জীবনের পরম লক্ষ্যের প্রতি উপেক্ষা—এসবই ভক্তিকে ঢেকে রেখেছে । যদি এসব ঢাকা সরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে ভক্তি আবার তার নিত্যনির্ম্মলরূপে, তার স্বমহিমায় প্রকাশিত হবে ।

এই উচ্চতর সত্যের সঙ্গে সম্বন্ধ থাকা, এর প্রতি আকর্ষণ ও নিষ্ঠা থাকা এ জগতে খুব বিরল । বিশেষতঃ এই বর্ত্তমান যুগে যখন সমস্ত চিন্তাধারা, এমনকি জ্ঞানও শোষণের দিকে যাচ্ছে । জ্ঞান যে এখন শোষণ প্রবৃত্তির দাসত্ব করছে এতেই এ জগতের সর্ব্বনাশ হচ্ছে । আনবিক শক্তি ও এইরকম নানা বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখন এক বিরাট আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । যে কোন মূহুর্ত্তে এই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে । এই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আমাদের এমন এক অবস্থায় এনে ফেলেছে যে, যে কোন মূহুর্ত্তে সবকিছুই এখানে শেষ হয়ে যেতে পারে । এইরকম জ্ঞান তো আত্মহননকারী । জগতে এইরকম জ্ঞানের বৃদ্ধি হওয়ার ফল হল এই যে পরিণামে আমরা আত্মাহত্যার পথে পা বাড়াচ্ছি । শোষণ থাকলেই তার প্রতিক্রিয়া থাকবে । তাই আমরা যদি সকলে সার্ব্বজনীন শোষণের পথকে গ্রহণ করি তবে তার ফল হল প্রলয়, মহাপ্রলয় বা ধ্বংস । যে কোনভাবেই হোক, তা সে অ্যাটম বোমার দ্বারাই হোক বা কোন প্রাকৃতিক দুর্য্যোগের দ্বারাই হোক, প্রলয় অবশ্যই আসবে, তারপর আবার সৃষ্টি হবে এই জগৎ; জন্ম আর মৃত্যু, জন্ম আর মৃত্যু—এই চক্র চলতেই থাকবে । প্রত্যেক জীবের আবার জন্ম হবে আবার মৃত্যু হবে আর এই সৌর জগতেরও আবার সৃষ্টি হবে আবার ধ্বংস হবে, নিরবধি কাল ধরে ।

এই বেড়াজাল থেকে যদি আমরা বেরোতে চাই, তবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার জগৎকে আমাদের ত্যাগ করতে হবে । ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে, এবং উপনিষদেও এর উল্লেখ আছে যে—

ইন্দ্রিয়াণি পরানি আহুঃ

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩/৪২)

অর্থাৎ পণ্ডিতগণ বলেন জড় বিষয় থেকে ইন্দ্রিয়গণ শ্রেষ্ঠ । আমাদের ইন্দ্রিয়রাই এখানে মুখ্যস্থান অধিকার করে আছে, কারণ যদি চোখ, কান, নাক,স্পর্শ অনুভূতি এসব আমাদের চলে যায় তবে এই জগৎটাই আমাদের কাছ থেকে সরে যাবে । আমাদের এই ইন্দ্রিয়গুলো আছে বলেই এই অভিজ্ঞতার জগৎও আছে । সুতরাং অভিজ্ঞতার জগতে ইন্দ্রিয়ের স্থানই প্রধান । তারপর বলা হয়েছে—

ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মনঃ

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩/৪২)

অর্থাৎ সর্ব্ব ইন্দ্রিয় থেকে মন শ্রেষ্ঠ । আর কি এই মনের স্বরূপ ? এ হচ্ছে আমাদের নির্ব্বাচনের বা সঙ্কল্প বিকল্পের প্রবৃত্তি । মন কেবলই বলবে, “আমি এটা চাই, আমি ওটা চাই না ।” কোন কোন জিনিস মন পছন্দ করে আর কোন কোন জিনিস মন অপছন্দ করে, এই হল মনের ধর্ম্ম । মনের স্থান ইন্দ্রিয়ের চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমি যদি অন্যমনস্ক থাকি আর একজন যদি আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যায় তখন আমার পক্ষে এরকম বলা সম্ভব “কই ! আমি তো তাকে দেখিনি, তার কথা শুনতে পাইনি । আমি যে অন্যমনস্ক ছিলাম ।” সুতরাং অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে আছে মন আর তাই সে ইন্দ্রিয়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ । জড়জগতের চেয়ে ইন্দ্রিয় শ্রেষ্ঠ আর ইন্দ্রিয়ের চেয়ে মন শ্রেষ্ঠ, কারণ মন যদি কোন অভিজ্ঞতাকে গ্রহণ না করে তবে ইন্দ্রিয়রা, যারা মনের দরজার মত, তারা সব অকেজো হয়ে যাবে । তারপর বলা হয়েছে ভগবদ্গীতায়—

মনসস্তুপরা বুদ্ধিঃ

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩/৪২)

অর্থাৎ মন অপেক্ষাও নিশ্চয়াত্মিকা বৃত্তিরূপ বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ । আমাদের ভিতরে আরও একটি সূক্ষ্ম বৃত্তি আছে যাকে বলা হয় যুক্তি বা বুদ্ধি, আর কি তার ধর্ম্ম ? মন যখন বলবে, “আমি এটা চাই, এইটা আমি নেব” বুদ্ধি তখন বলবে, “না না ! তুমি এটা নিও না, এতে তোমার ক্ষতি হবে । বরং তুমি ওইটা নাও, ওতে তোমার মঙ্গল হবে ।” এই যে বিচারশক্তি বা নির্ব্বাচনের ক্ষমতা, এ আমাদের মনের চেয়ে এক উচ্চতর বৃত্তি । তারপর বলা হয়েছে ভগবদ্গীতায় যে,

বুদ্ধের্যঃ পরতস্তু সঃ ।

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩/৪২)

অর্থাৎ আবার যিনি বুদ্ধি অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, তিনিই সেই (জীবাত্মা) । এইভাবে আমাদের ভিতরে উপাদানগুলোকে আমরা একে একে খুঁজে নিতে পারি । জড়জগতের চেয়ে ইন্দ্রিয় শ্রেষ্ঠ, ইন্দ্রিয়ের চেয়ে মন শ্রেষ্ঠ, মনের চেয়ে বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ, কারণ বুদ্ধিবৃত্তিমনের চেয়ে বেশী সূক্ষ্ম ও নির্ভরযোগ্য ; আর “বুদ্ধের্যঃ পরতস্তু সঃ”, বুদ্ধিরও উপরে কিছু আছে, সে হল আমাদের আত্মা । আর কি তার প্রকৃতি, কি তার বৈশিষ্ট্য ? সে হল আলোর মত ।

শাস্ত্রে একটি উপমা দেওয়া হয়েছে যে চন্দ্রালোকিত রাত্রে হয়ত আকাশে মেঘ থাকতে পারে যে মেঘ চাঁদকে ঢেকে রেখেছে, কিন্তু সেই মেঘকেও দেখা যাচ্ছে সেই চাঁদেরই আলোতে । বেদ প্রণেতা শ্রীল ব্যাসদেব বলেছেন যে আত্মা হল এই দ্যুতিময় চন্দ্রের মত । অথবা আত্মা হল সূর্যের মত । একটি মেঘ এসে যদি সূর্যকে ঢেকেও দেয় তবু সেই মেঘকেও দেখা যাচ্ছে সেই সূর্যরই আলোতে । সেইরকম আত্মাও হল আমাদের ভিতরে এক আলোকবিন্দু ; আর পটভূমিকায় সেই আলোকবিন্দু আছে বলেই, সেই অনুচেতনা আছে বলেই আমাদের মনের জগৎকে আমরা অনুভব করতে পারি । সেই আলোকে যদি সরিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে সবকিছুই শেষ হয়ে যাবে । মনের জগৎ, বুদ্ধিবৃত্তি বা বিচারশক্তি, আর জ্ঞান অর্জ্জনের বিভিন্ন প্রণালী—এ সবেরই কোন মূল্য থাকবে না যখন এই আলোকে সরিয়ে নেওয়া হবে । এই আলোই হল আত্ম । সে এক আলোকবিন্দু যা এই জগতের আর সব কিছু থেকে বিশেষভাবে পৃথক । আত্মা হল এক অলোর বিন্দু ; এক অনুচেতনা এবং এক জ্যোতির্ম্ময় জগৎ আছে যা শুধু চেতনা দিয়েই তৈরী, আত্মা দিয়ে তৈরী, এমনি করে আবার এক ক্রমবিকাশ আছে ; আত্মা থেকে পরমাত্মার দিকে যাত্রা । যেমন এই জড়জগতে আমরা দেখি আকাশ, হাওয়া, তাপ, জল তারপর মাটি, পাথর—এইভাবে এই জড় অস্তিত্বের মধ্যে একটা ক্রমবিকাশ আছে, সেইরকম সূক্ষ্মতর জগতেও একটা ক্রমবিকাশ আছে ; বুদ্ধি থেকে আত্মা, আত্মা থেকে পরমাত্মা, সেখান থেকে স্বয়ং ভগবান । এইভাবে আধ্যত্মিক জগতের ক্রমবিকাশ অনন্তের দিকে প্রসারিত হয় । এ হল পরমার্থ তত্ত্ব ।

যাঁরা অভিব্যক্তি বাদে (theory of evolution) বিশ্বাস করেন, যে অভিব্যক্তি বা বিবর্ত্তন বাদ শুরু হয়েছিল ডারউইন থেকে, তাঁরা বলেন যে সবকিছু এসেছে জড়বস্তু থেকে । তাঁরা বলেন এমনকি গর্ভের মধ্যেও প্রথমে একটা জড়বস্তু থাকে যেটা ক্রমশঃ বেড়ে ওঠে এবং সেই জড়বস্তু বেড়ে ওঠে বলে ক্রমশঃ জ্ঞানও বেড়ে ওঠে । মোটামুটিভাবে বলতে গেলে তাঁরা মনে করেন যে চেতনা এসেছে বস্তু থেকে । কিন্তু যাঁরা শাস্ত্রের অনুগামী তাঁরা সেকথা মানেন না । তাঁরা বলেন চেতনাই সর্ব্বেসর্ব্বা আর সবকিছু সেই চেতনার সমুদ্রে ভাসছে । এ হল আত্মিক অভিব্যক্তিবাদ বা চেতনার বিবর্ত্তন তত্ত্ব । ডারউইন এর অনুগামীরা জড় বিবর্ত্তনের কথা বলেছেন আর বৈদিক শাস্ত্র বলছেন যে সবকিছুই আত্মিক বিবর্ত্তন বা চেতনার বিবর্ত্তনের আওতায় আসে । যেমন বিশপ বার্কলে বলে একজন ইউরোপীয় দার্শনিক বলেছেন,“এমন নয় যে মনটা জগতের মধ্যে আছে, বরং জগৎটাই মনের মধ্যে আছে ।”

যাঁরা অভিব্যক্তিবাদের বিশ্বাস করেন তাঁরা বলেন শুরুতে ছিল জড়বস্তু । কিন্তু প্রশ্ন হল এই জড়বস্তু কী ? জড়বস্তুও তো একটা বিশেষ ধারণা এবং তা চেতনারই অন্তর্গত, তা চেতনারই এক অংশ । সুতরাং আমাদের মত হল এই যে চেতনাই সবচেয়ে আদি বস্তু । প্রথমে যাই থাকুক না কেন তারও আগে চেতনার অস্তিত্ব ছিল, তা না হলে কোনকিছু সম্বন্ধে কোন ধারণা ও বর্ণনা সম্ভব নয় । তাই বৈদিক তত্ত্ব বলেন যে ব্রহ্ম বা শ্রীভগবানের সর্ব্বব্যাপী নির্ব্বিশেষ নির্গুন নিরাকার তত্ত্বই জীবের আদি কারণ । আর জীবাত্মার উপরে আছেন পরমাত্মা । জড়জগতের সব সমৃদ্ধিহল তামসিক । কিন্তু এর বাইরে আছে এক উজ্জ্বল দিক, এক নিত্যজগৎ যেখানে চিরকাল শ্রীভগবানের কত আনন্দময় লীলা চলেছে—যেন এক সুখ ও আনন্দের সমুদ্রের অনন্ত তরঙ্গের মত ।

এইভাবে আমরা যেন বুঝি যে আমাদের জীবচনের প্রধান কর্ত্তব্য কি, মানবজন্মের বিশেষ তাৎপর্য্য কি আর কিভাবে তার সদ্­ব্যবহার করা যায় । এ জগতের কত রকমের ধর্ম্মীয় মতামত আছে । কিন্তু আমরা তো পরম সত্যের সন্ধানী, তাই সেইসব ধর্ম্মীয় মতের মধ্যে থেকে আমাদের এমন এক সিদ্ধান্ত খুঁজে নিতে হবে যা সবকিছুর সমন্বয় সাধন করতে পারে আর তাঁর জন্যে আমাদের এক তুলনামূলক অধ্যয়ন করতে হবে ।

শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে আমাদের বর্ত্তমান অবস্থান যেখানে সেই অবস্থার বা আশ্রমের যেন আমরা খুব সহজে পরিবর্ত্তন না করি । একটি উপমা দিয়ে বলা যেতে পারে যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি তাঁর সৈনিকদের বলেন “নিজের জায়গাটা ছেড়ে দিও না । বরং নিজের জায়গাটা রাখবার জন্যে প্রাণ দিয়ে দাও ।” কিন্তু যখন সুযোগ আসবে তখন সেই সেনাপতিই বলবেন “এগিয়ে যাও, এগিয়ে যাও ।” সেইরকম শাস্ত্র বলেছেন,“তোমার পূর্ব্বকর্ম্ম অনুযায়ী যেখানে তোমার জন্ম হয়েছে, যে অবস্থায় তুমি বর্ত্তমানে আছ সেই অবস্থাটা ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা কোর না, তাহলে তোমার অধোগতি হওয়ার সম্ভবনা আছে ।” কিন্তু সেই একইসঙ্গে যখন কোন যথার্থ সুযোগ আসবে তখন সেই শাস্ত্রই বলবেন, “এগিয়ে যাও, এগিয়ে যাও ।” সেইরকম শাস্ত্র বলেছেন, “তোমার পূর্বকর্ম্ম অনুযায়ী যেখানে তোমার জন্ম হয়েছে, যে অবস্থায় তুমি বর্ত্তমানে আছ সেই অবস্থাটা ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা কোর না, তাহলে তোমার অধোগতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে ।” কিন্তু সেই একইসঙ্গে, যেখন কোন যথার্থ সুযোগ আসবে তখন সেই শাস্ত্রই বলবেন, “এগিয়ে যাও, এগিয়ে যাও পরমসত্যের দিকে । প্রগতির পথে পা বাড়াও ।” তাই ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে, “তোমার পূর্বকর্ম্ম অনুযায়ী যে অধিকার তুমি পেয়েছ, যে ধর্ম্ম তোমার হয়েছে, তাকে সহজে ছেড়ে দিও না, বরং তার জন্যে মৃত্যুকে বরণ করে নাও ।” কিন্তু তারপর আবার কৃষ্ণ বলছেন—

সর্ব্বধর্ম্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ।

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১৮/৬৬)

অর্থাৎ, “সর্ব্বপ্রকার ধর্ম্ম সম্পূর্ণ বিসর্জ্জন দিয়ে একমাত্র আমারই শরণ নাও ।” শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জ্জুনকে বলছেন যে “যখনই সুযোগ পাবে কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যাওয়ার, তখনই যে কোন মূল্যে সেই সুযোগ তুমি অবশ্যই গ্রহণ করবে ।” এ হল বিপ্লবী পন্থা । একদিকে আছে বৈধী পন্থা আর একদিকে বিপ্লবী পন্থা । বিপ্লবী পন্থা হল এই যে সমস্ত রকমের ঝুঁকি নিয়ে পরমসত্যের দিকে এগিয়ে যেতে হবে আর যেহে তু এই মানবজন্ম তারই সুবর্ণ সুযোগ দেয় তাই সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্যে যা কিছু করা প্রয়োজন তাই করতে হবে । শুধু এই মানবজন্মেই আমাদের বিচারশক্তি ব্যবহার করার ও নিজের মতামতে চলার সুযোগ আছে । এই সুযোগ যদি আমরা ছেড়ে দিই আর তারপর পশুজন্ম বা বৃক্ষজন্ম পাই তবে কেউই বলতে পারে না যে কবে আবার আমরা এরকম স্বাধীন ও স্বেচ্ছাধীন মতে জীবন কাটাতে পারব । সেইজন্য এই মানবজীবন খুব তাৎপর্য্যপূর্ণ, আর শুধু ইন্দ্রিয়তর্পনদ্বারা, শুধু আহার-নিদ্রা-ভয়-মৈথুন—এইরকম পশুপ্রবৃত্তির দ্বারা তার অপচয় করা উচিত নয় । যদি আমরা পশুজন্মও পাই বা যেখানেই আমরা যাই না কেন, পাখী বা কীটপতঙ্গ যাই হয়েই জন্মাই না কেন, এই ইন্দ্রিয়তর্পনের সুযোগ আমরা সবসময়ই পাব । কিন্তু আত্মাকে বিকশিত করার সুযোগ, আধ্যাত্মিকতার অনুশীলন করার সুযোগ জীবনের যথার্থ উদ্দেশ্য সাধন করার সুযোগ, এই মানবদেহ ছাড়া আর কোথাও পাব না । সাধুসঙ্গে এই সমস্ত তত্ত্ব বিশদভাবে আলোচনা করা যায় । এইভাবে আমরা নিজের জীবনে উন্নতি করতে পারি আর নিজেকে বাঁচাতে পারি । কিন্তু এই মানবজন্ম পেয়ে যদি আমরা এ সুযোগ হারাই তাহলে বুঝতে হবে যে আমরা আত্মহত্যা করলাম বা তার চেয়েও খারাপ কিছু করলাম । যে এই মানবজন্ম পেয়ে নিজেকে যথার্থভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করে না, নিজেকে সম্পূর্ণভাবে চিরকালের জন্য উদ্ধার করে না, সে আত্মাহত্যাই করে ।

 


 

← ৩. যথার্থ জিজ্ঞাসা ও যথার্থ প্রচেষ্টা গ্রন্থাগারে ফিরে →

 

সূচীপত্র:
মুখবন্ধ
১. শোষণ, ত্যাগ ও আত্মনিবেদন
২. সুখনিকেতন
৩. যথার্থ জিজ্ঞাসা ও যথার্থ প্রচেষ্টা
৪. সুবর্ণ সুযোগ
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥