শ্রীভক্তিরক্ষক হরিকথামৃত


১১ । মানব জীবনের কর্ত্তব্য

 

     আমি সর্ব্বপ্রথম আমার শ্রীগুরুপাদপদ্মের অভিন্নবিগ্রহ সতীর্থ বৈষ্ণবগণের বন্দনা করি এবং সভাস্থ সজ্জনবৃন্দকে আমার অভিনন্দন জ্ঞাপন করি ।
     আমার জীবন সম্বন্ধে অনেক কথাই আজ আমার কানে উপস্থিত হল । এতে অনেক বিষয়েরই দিগ্দর্শন আছে এবং সেটা প্রশংসা মুখেই বর্ণনা করা হয়েছে । ভগবদনুসন্ধানেই জীবনের সফলতা । আমরা সকলেই সুখের অনুসন্ধান করছি । সেটি সুশৃঙ্খলিত ভাবে করা হলেই ভগবানের অনুসন্ধান,—কৃষ্ণের অনুসন্ধান হয়ে যায় । পণ্ডিতগণ এবং পণ্ডিত শ্রেষ্ঠ আচার্য্যগণ বেদান্তের ‘ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসা’কেই জীবনের সর্ব্বাপেক্ষা বড় কাজ বলে জানিয়েছেন । শ্রীচৈতন্যদেব সেই ব্রহ্মজিজ্ঞাসাকে একটু গভীরভাবে প্রকাশ করে শ্রীকৃষ্ণানুসন্ধানের কথা বলেছেন ।
     ব্রহ্ম বা কৃষ্ণ কি ? না—সুখের স্বরূপ, রসের স্বরূপ, আনন্দ স্বরূপ । আমরা যে যেখানে আছি সকলেই সেই সুখের কাঙ্গাল এবং সর্ব্বক্ষণ সুখই অনুসন্ধান করছি । অর্থ চাইলেও যেমন অর্থ পাওয়া যায় না, অর্থ অর্জ্জনের জন্য যথাযথ চেষ্টা করতে হয়, সেই প্রকার সুখ চাইলেই সুখ পাওয়া যায় না, তার জন্য যথাযথ প্রচেষ্টার প্রয়োজন । সুখের রকমারী পরিচয় আছে । শ্রেষ্ঠ ও সর্ব্বাধিক সুখ যদি পেতে হয় তা হলে সেই প্রকার বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে তার অনুসন্ধান করতে হবে । সেইটি পর পর জৈমিনীর ধর্ম্ম জিজ্ঞাসা আর ব্যাসদেবের বেদান্তের ব্রহ্মজিজ্ঞাসা আর শ্রীচৈতন্যদেবের কৃষ্ণানুসন্ধান এই পর্য্যায়ে উপস্থিত হয়েছে । জৈমিনীর ধর্ম্ম-জিজ্ঞাসায় কার্য্যকে প্রধান বলা হয়েছে । যেহেতু সাক্ষাৎভাবেই আমরা নিজের কর্ম্মের ফল ভোগ করি । সুতরাং ভাল কর্ম্ম করলে পরে ভাল ফল পাবে । অতএব জৈমিনী বলছেন—কর্ম্মেরই উপাসনা করা, কর্ম্মেরই শরণাপন্ন হওয়া দরকার । কর্ম্মই আমাদিগকে রক্ষা করবে । কিন্তু আরও সূক্ষ্মবিচারে দেখা গিয়েছে যে কর্ম্মের ফল কর্ম্মকর্ত্তার কাছে নাও আসতে পরে, যদি ঈশ্বরস্বরূপ একজন প্রযোজক না থাকেন । সেটিও জৈমিনী দর্শনে স্বীকৃত হয়েছে । সেইটিই ক্রমশঃ পূর্ত্তিলাভ করেছে বেদান্তের ব্রহ্ম জিজ্ঞাসায় । ‘অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা’ । শ্রীব্যাসদেব জ্ঞানিগণের নিকট যে বিচার উপস্থিত করেছেন, সেইগুলি বেশ সুষ্ঠুভাবে সুসজ্জিত করে যুক্তিমূলকভাবেতে প্রকাশ করেছেন বেদান্তেতে ।
     বেদান্তে সেই সুখ বা পরমোৎকৃষ্ট রসের সর্ব্বাধিক প্রাপ্তির বিষয়ই আলোচিত হয়েছে । কিন্তু বেদান্ত জ্ঞানের সাহায্যে রস অনুসন্ধান করতে গিয়ে খানিকটা সাপ্রেষ্ট-ভাবেতে ডিল্ করতে বাধ্য হয়েছেন । কেবল ত্যাগের সাহায্যে যে সুখ, সে সুখ সম্যক্ নয় । যেমন ব্যাধির যন্ত্রণা হতে মুক্তিলাভ করলেই সেটা পূর্ণ স্বাস্থ্যের সুখানুভব নয়, সেইপ্রকার, কেবল নশ্বর মৃত্যুময় জগতের হাত থেকে নিষ্কৃতি বা মুক্তির দ্বারাতেই আমরা প্রকৃত সুখের অধিকারী হতে পারি না । যেটুকু সুখানুভব হয় সেটুকু অতি সামান্য । এই জন্য ব্রহ্মেতে লীন হয়ে সুষুপ্তিবৎ সমাধিতে এক ধরণের সুখের আস্বাদনের কথা বলা হলেও সেখানে জ্ঞান, জ্ঞেয়, জ্ঞাতা প্রভৃতির সম্যক্ পরিচয় না থাকায় সেটা অব্যক্ত, অসমাপ্ত বা অপরিস্ফুট অবস্থা ছাড়া কিছু নয় । কিন্তু সেই পূর্ণ-সুখ-স্বরূপ বস্তুকে আস্বাদনের জন্য বৈষ্ণবগণ একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত পন্থার কথাই বলেছেন । যাতে ভোগের দ্বারা সুখ এবং ত্যাগের দ্বারা সুখ “ত্যাগাৎ শান্তিঃ” এই দুটিকে অতিক্রম করে সেবা নামক বস্তু বা ভক্তির সাহায্যে উচ্চতর বস্তুর অনুশীলন করা যায় । তাঁরা এই কথা জানিয়েছেন,—ভোগ—ত্যাগ, ত্যাগ—ত্যাগ এই দুটির যদি আমরা ধারণা করিতে পারি তবে সেবা কাকে বলে সেই জিনিষের অনুভব সম্ভব হবে ।
     আমাদের স্বাভাবিক যা ষ্টেটাস্, যা আমাদের স্বরূপ, তদপেক্ষা উচ্চতর বস্তুর যদি সঙ্গলাভ করতে হয়, তা হলে তার অধীন হয়ে আমাদিগকে অগ্রসর হতে হবে । এটা খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমরা বুঝতে পারি । সুতরাং সেবার সাহায্যেই আমরা উচ্চতরলোকে যেতে পারি । আমাদের স্বরূপ খানিকটা ব্রহ্মলোকেতেই অবস্থিত এই প্রকার বলা হয়েছে এবং এইখানেই শেষ করা হয়েছে মুক্তিবাদিদের যা কিছু কথা । কিন্তু শ্রীমদ্ভাগবতে ব্যাসদেব একটা নূতন বিচারধারার অবতারণা সুপরিস্ফুট করলেন, যা অন্যান্য শাস্ত্রেতে অপরিস্ফুট ভাবেতে ছিল । সেটি কি ? না—

“আত্মারামশ্চ মুনয়ো নির্গ্রন্থা অপ্যুরুক্রমে ।
কুর্ব্বন্ত্যহৈতুকীং ভক্তিমিত্থম্ভূতগুণো হরিঃ ॥”

     হরি নামক বস্তু, ব্রহ্মের অপর পারেতে তাঁর অধিষ্ঠান । তাঁর এমন মাহাত্ম্য, এমন মাধুর্য্য যে যাঁরা আত্মারাম, জড়ারাম পরিত্যাগ করে আত্মারামত্বে অবস্থিত, তাঁদের চিত্তকে অহৈতুকী ও অপ্রতিহত ভাবেতে আকর্ষণ করে থাকেন । চতুঃসন, শুকদেব গোস্বামী, বিল্বমঙ্গল ঠাকুর প্রভৃতি দৃষ্টান্তে ও তাঁদের উপদেশেতে আমরা এই প্রকার জগতের সন্ধান পাই । রামানুজ মধ্বাচার্য্য প্রভৃতি মধ্যযুগীয় আচর্য্যগণও বেদান্তের ভাষ্যেতে সেই তত্ত্বের সন্ধান দিয়েছেন ।
     সেই বেদান্তের পরমভাষ্যস্বরূপ শ্রীমদ্ভাগবত গ্রন্থকেই সমগ্রবেদের প্রপক্ব ফল বলে ব্যাসদেব যে বর্ণনা করেছেন, সেই জিনিষটিই আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন শ্রীচৈতন্যদেব । “সর্ব্ববেদেতিহাসানাং সারং সারং সমুদ্ধৃতম্” শ্রীব্যাসদেব তাঁর শেষ গ্রন্থেতে সমস্ত বেদ-ইতিহাসের সার সংগ্রহ করে এক জায়গায় দিয়ে গিয়েছেন । “নিগম-কল্পতরোর্গলিতং ফলং” । সেটি বেদরূপ কল্পবৃক্ষের সুপক্ব গলিত ফল । স্বাভাবিকভাবেতে বৃক্ষের যেটা দেয়, সেই জিনিষটি ভাগবতরূপে বেদ দিয়েছেন । গায়ত্রীর অর্থের সঙ্গে তার সমার্থকতা দেখা যায় । সেইটিই হচ্ছে আমাদের স্বাভাবিক প্রাপ্তি বা উদ্দিষ্ট বস্তু । তা সেই জিনিষই পাওয়া দরকার এইকথা শ্রীচৈতন্যদেব বলে গিয়েছেন । বর্ত্তমান যুগে বাইরের ধর্ম্মজগতের নানা রকমের যে ধারণা রয়েছে, সেই সব গুলিকে দূরীভূত করে শ্রীব্যাসদেবের শেষ দান শ্রীচৈতন্যোদ্দিষ্ট শ্রীমদ্ভাগবতের কথা জগতের মঙ্গলের জন্য শ্রীগৌড়ীয়মঠাচার্য্যপাদ সমগ্র পৃথিবীব্যাপী বিস্তার করে গিয়েছেন এবং তাঁরই অনুগত প্রচারকগণ তাঁদের শ্রীগুরুপাদপদ্মের অনুগত্যে অদ্যাপিও সেই প্রকার চেষ্টাবিশিষ্টা সাধারণ অজ্ঞ লোকের বিচারেতে এইসব বিষয়ের বেশী মূল্য না থাকতে পারে, যেহেতু অন্নচিন্তা চমৎকার । অন্নবস্ত্রের অভাবেতেই সকল বিব্রত বোধ করছে । তাতে অনেকেই মনে করবে যে ধর্ম্মচিন্তা ও ভগবদনুশীলন বা ভগবদনুসন্ধানের সময় কোথায় ? কিন্তু এ বললে তো আমরা সমস্যার সমাধান করতে পারবে না । দরিদ্র ব্যক্তি হলেও যেমন তার খাওয়াতেই সব অর্থ ব্যয় করলে চলে না , তার মধ্যে কিছু অংশ চিকিৎসার, কিছু অংশ বিদ্যার্জ্জনের এবং অন্যান্য শুভকার্য্যেও ব্যয় করতে হয়, তেমনি আমাদের যা সময় হাতে আছে, তার মধ্য হতেই আমাদিগকে পরমার্থ-চিন্তা করতে হবে । অর্থাৎ সমগ্র জীবনের এবং জন্ম জন্মান্তরের সমাধান হয় যাতে সেই বিষয়ে সময় ও উদ্যম ব্যয় করতে হবে । তা যদি না করতে পারি তবে আমরা ঠক্ব ।

“কর্ম্মণাং পরিণামিত্বাদাবিরিঞ্চাদমঙ্গলম্ ।
বিপশ্চিং নশ্বরং পশ্যেদদৃষ্টমপি দৃষ্টবৎ ॥”

     শ্রীমদ্ভাগবতে বলেছেন,—আমরা তো অতি ক্ষুদ্র । আমাদের আর কতটুকুই বা পুঁজি, স্বয়ং ব্রহ্মা যিনি এই সমগ্র জগতের স্রষ্টা, তিনি পর্য্যন্ত অমঙ্গলের অধীন । কেন ?—যেহেতু কর্ম্মার্জ্জিত বিষয়ের প্রতি নির্ভরশীল । এই ব্রহ্মাণ্ডকে তিনি সৃষ্টি করেছেন । তিনি এত বড় একটা প্রকাণ্ড অধিকার পেয়েছেন, তথাপি তাঁর জীবনটাও এই নশ্বর বস্তুর আপেক্ষিকতায় বর্ত্তমান । এই জন্য তাঁর স্থান পর্য্যন্ত এই ত্রিতাপ পৌঁছে গিয়েছে । সেখানেও অমঙ্গল । ব্রহ্মাকেও মৃত্যুবরণ করতে হয় এবং সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে তাঁকেও মৃত্যুর মুখে প্রবেশ করতে হয় ।
     অতএব আমরা যদি মৃত্যুঞ্জয় হতে চাই তাহলে এই শিক্ষাই আমাদিগকে অবলম্বন করে চলতে হবে । কর্ম্মের দ্বারা অর্জ্জিত অর্থ, ধর্ম্ম এবং কাম, এর পরিণাম বুঝে এর অতীত প্রদেশের সম্পত্তি অর্জ্জনে চেষ্টিত হতে হবে । আসলে সেইটিই আমাদের সকলের কমন্ চেষ্টা হওয়া উচিত । আমরা মূর্খ হতে পারি, বিদ্বান হতে পারি, দরিদ্র হতে পারি, ধনী হতে পারি, যে কোন অবস্থাতেই থাকি না কেন আমাদের সব সময়েই মূল সমস্যা সমাধানের জন্য চেষ্টিত হওয়া উচিত ।
     শাস্ত্রেতে পুনঃ পুনঃ বলেছেন—এই মনুষ্যজন্ম পেয়ে যদি আমরা সেই সমস্যা সমাধানের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে না পারি তবে আমরা প্রকৃতই আত্মঘাতী ।

“নৃদেহমাদ্যং সুলভং সুদুর্ল্লভং
প্লবং সুকল্পং গুরুকর্ণধারম্ ।
ময়ানুকূলেন নভঃস্বতেরিতং
পুমান্ ভবাব্ধিং ন তরেৎ স আত্মহা ॥”

     শাস্ত্রের বহু স্থানেতেই এই কথা বলা হয়েছে । যদি তোমার এই দুর্ল্লভ জন্মের সার্থকতা সম্পাদন করতে না পার, তবে জেনো যে তুমি নিজেকে হত্যা করছ । তুমি যেসব কাজেতে এখন নিযুক্ত আছ, এসব কাজ যে কোন জায়গায় হবে । পশু, পক্ষী, কীট, পতঙ্গ—যেখানে যাবে জন্ম হবে । সর্ব্বত্রই এই বিষয়ে রসের আস্বাদন পাবে । বরং মনুষ্য জন্মের চেয়ে আরও ভালভাবেও পেতে পার । ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের পরিচালনের যোগ্যতা অনেক জন্মেরই বেশী আছে । চক্ষুর দৃষ্টি অনেক পক্ষীর বেশী আছে । এই প্রকার বিভিন্ন বিষয়ে অধিকার রসাস্বাদন সম্ভাবনা অন্যত্র রয়েছে, কিন্তু মনুষ্য জীবনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে আত্মজ্ঞানের অনুশীলন কর । নিজের অনুসন্ধান কর । আমি কে ?আমি কোথায় ? আমার কিসে মঙ্গল হয় । যেমন যারা ডোগ্লা জাতীয় তারা উপস্থিত ভাবনা করে ‘আজ কি খাব ?’ কিন্তু যাঁরা একটু বিচক্ষণ, তারা ভবিষ্যতের চিন্তা করে । তারা ভাবে কাল কি খাব ? সেই প্রকার যাঁরা হুঁসিয়ার ব্যক্তি—তাঁরা কাল, পরশ্ব তৎপরশ্ব প্রভৃতির চিন্তা করে থাকেন । আর সাধুগণ উপস্থিত যদৃচ্ছালাভে সন্তুষ্ট থেকে ভবিষ্যতের—জন্ম-জন্মান্তরের জন্য চিন্তা করেন । আমরা সকলেই জানি—এজ্ সিওর্ এজ্ ডেথ্—মৃত্যুর চেয়ে এজগতে নিশ্চিত আর কিছু নয় ।

“অহন্যহনি ভূতানি গচ্ছন্তি যম-মন্দিরম্ ।
শেষাস্থিরত্বমিচ্ছন্তি কিমাশ্চর্য্যমতঃপরম্ ॥”

     যুধিষ্ঠির মহারাজের এই প্রকার আশ্চর্য্যের সম্বন্ধে যে ধারণা এবং তিনি যা বলেছিলেন, সেটা আমাদের অনেকেরই বিদিত । কিন্তু সে বিষয়েতে আমরা অনবধানযুক্ত অবশ্যম্ভাবী জিনিষ যেটা আসবে আমরা সে বিষয়ের প্রতিকারের কোন চেষ্টাই করছি না এইটাই আশ্চর্য্য । অতএব আমরা নিজের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করছি । নিজের ইন্টারেষ্ট্ নিজে নষ্ট করছি । অতএব এই অবস্থার হাত হতে নিষ্কৃতি পাওয়া দরকার । এই অবস্থায় কেবল সাধুগণ আসেন আমাদের দ্বারে । আমাদের দ্বারা তিরষ্কৃত, লাঞ্ছিত এবং অনেক প্রকারে অপমানিত হয়েও বা দুর্ব্যবহার পেয়েও তাঁরা উপযুক্ত অভিভাবকের মত আমাদের মঙ্গলচিন্তাই করে থাকেন । আমাদের স্বরূপোদ্বোধনের যত্ন করে থাকেন । আত্মজ্ঞান প্রদান করে থাকেন ।

“তব কথামৃতং তপ্তজীবনং
কবিভিরীড়িতং কল্মষাপহম্ ।
শ্রবণমঙ্গলং শ্রীমদাততং
ভুবি গৃণন্তি তে ভূরিদা জনাঃ ॥”

          ভাগবত বলেছেন—যাঁরা সেই ভগবানের কথামৃত দান করেন, তাঁরাই প্রকৃত দাতা । তাঁরাই ‘ভূরিদা’ । ভূরি মানে প্রচুর । প্রচুর পরিমাণে দান কে করে ? আমরা মনে করি,—অন্নদান, বস্ত্রদান, ঔষধদান প্রভৃতি দানই খুব বড় দান । কিন্তু তা নয় । সর্ব্বশ্রেষ্ট দান হচ্ছে ভগবানকে দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা । তা কি করে পাওয়া যায় ? না—সাধুগুরুর আনুগত্যে ভগবচ্চরণে শরণাগত হলেই তা পাওয়া যায় । তিনি শরণাগতকে রক্ষা করেন । তিনি সব জায়গাতেই আছেন । তাঁর নাম আশ্রয় করে ডাক্বার যে সহজ পন্থা সেইটি গুরুরূপী ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীমদ্ভাগবত হতে প্রকাশ করে দিয়ে সকলকে ব্যাপকভাবে জানিয়ে দিলেন । একদিক দিয়ে অত্যন্ত সহজ কিন্তু চরম আন্তরিকতার প্রয়োজন । ফাঁকি দিলেই ফাঁকে পড়তে হবে । আন্তরিকভাবে সেই ভগবানের নাম গ্রহণের দ্বারাই আমরা সর্ব্বস্বার্থ লাভ করতে পারি ।

“কলিং সভাজয়ন্ত্যার্য্যা গুণজ্ঞাঃ সারভাগিনঃ ।
যত্র সংকীর্ত্তনেনৈব সর্ব্বস্বার্থোঽপি লভ্যতে ॥”
“কৃতাদিষু প্রজা রাজন্ কলাবিচ্ছন্তি সম্ভবম্ ।
কলৌ খলু ভবিষ্যন্তি নারায়ণ-পরায়ণাঃ ॥”

     যাঁরা সারগ্রাহী, তাঁরা কলিকাল কবে আসছে বলে অপেক্ষা করে থাকেন; যেহেতু ঐ সময় যদি জন্ম গ্রহণ করতে পারি তো হরিনামরূপী ভগবানের কৃপাবলে আমি বহু উচ্চ অবস্থায় চলে যেতে পারবো । খুব সহজ পন্থায় চরম জিনিষ—ব্রজরস পাবার সৌভাগ্যলাভ করবো ।
     আমরা আজ এই গৌরমণ্ডলের মধ্যে এইস্থানে উপস্থিত আছি । এখানে আমাদের সুযোগ আছে । সেই শ্রীমন্মহাপ্রভুর এবং শ্রীমদ্ভাগবতের এবং ভগবান বেদব্যাসের (যিনি শাস্ত্রদাতাদের মধ্যে সর্ব্বশ্রেষ্ট, বিশ্বের সমস্ত লেখকদের মধ্যে যাঁর স্থান সর্ব্বোচ্চে আধুনিক সাহিত্যিকগণও সেটা স্বীকার করেন, সমগ্র পৃথিবীতে যাঁর দ্বিতীয় নাই সেই ব্যাসদেবের) সর্ব্বশ্রেষ্ট দান আমাদের নিকট শ্রীমদ্ভাগবত রূপে প্রকাশিত । শ্রীমদ্ভাগবতে তিনি কি দিয়েছেন ? যা তিনি অন্যান্য জায়গায় দিতে পারেন নাই, সেইবস্তু দিয়েছেন । তাঁর গুরু নারদের দ্বারা তিরস্কৃত হয়ে তিনি সমস্ত শাস্ত্রের একটা রি-এড্জাষ্ট্মেন্ট দিয়ে শ্রীমদ্ভাগবতকে প্রকাশ করে গিয়েছেন । রস কি বস্তু, আনন্দ কি বস্তু, সুখ কি বস্তু, তার পরিচয় দিয়ে গিয়েছেন । মুক্তগণের অনুশীলনের বস্তু দিয়ে গিয়েছেন । রোগীর পথ্য তো অন্যান্য শাস্ত্রেই দেওয়া আছে । কিন্তু সুস্থ রোগমুক্ত ব্যক্তির কি খাদ্য, কি অনুশীলন করবেন, কি আস্বাদন করবেন, কি নিয়ে দিন কাটাবেন,—সেই কৃষ্ণলীলা—ভগবৎলীলার কথা বলে গিয়েছেন । আর সেইটি জন্মযোগী, জন্মত্যাগী,—ত্যাগেতে যাঁর সিদ্ধি অবিসংবাদিতরূপে প্রতিষ্ঠিত—সেই শুকদেবকে বেছে নিয়ে তাঁরই মুখ দিয়ে বলিয়েছেন ।

বিক্রীড়িতং ব্রজবধূভিরিদঞ্চ বিষ্ণোঃ
শ্রদ্ধান্বিতোঽনুশৃণুয়দথ বর্ণয়েদ্যঃ ।
ভক্তিং পরাং ভগবতি প্রতিলভ্য কামং
হৃদ্রোগমাশ্বপহিনোত্যচিরেণ ধীরঃ ॥

     ‘হৃদ্-রোগম্’ অর্থাৎ আমরা সকলেই যে হার্টডিজিজ্ এ সাফার্ করছি । হৃদ-রোগটা কি ? না—কাম । কাম অর্থাৎ বাসনা । সহস্র সহস্র কামনা—বাসনা ।

“সহস্রমিচ্ছতি সতি সহস্রীং লক্ষমীয়তে ।
লক্ষাধিপস্ততো রাজ্যং রাজ্যস্তৎ স্বর্গমীয়তে ॥”

     আমরা যতই পাই তাতে তৃপ্তি হয় না । আরও চাই আরও চাই করি । এইটিই হোল হৃদ্রোগ । এর চিকিৎসা কি ? না সব ভগবানেতে অর্পণ । অর্থাৎ সব ভগবানের । আমার কিছু নয় । আমিও তাঁরই । এই কন্সেপ্সনেতে আমরা যদি নিজেকে এড্জাষ্ট করতে পারি । তা হলেই আমরা প্রকৃত মুক্তি লাভ করবো ।
     ভাগবতের সংস্কৃতি—

“শ্রীমদ্ভাগবতং পুরাণমমলং যদ্বৈষ্ণবানাং প্রিয়ং
যস্মিন্ পারমহংস্যমেকমমলং জ্ঞানং পরং গীয়তে ।
যত্র জ্ঞানবিরাগভক্তিসহিতং নৈষ্কর্ম্ম্যমাবিষ্কৃতং
তচ্ছৃন্বন্ সুপঠন্ বিচারণপরো ভক্ত্যাবিমুচ্যেন্নরঃ ॥”

     ভাগবতের মুক্তির স্বরূপের বিলক্ষণ বৈশিষ্ট্য আছে । তাতে পজেটিভ্—কেবল ডেষ্ট্রাক্টিভ্ নয়—কনষ্ট্রাক্টিভ্ বস্তু প্রদান করা হয়েছে । এজগতে আমরা যে রস আস্বাদন করছি—ড্র করছি—এর ঠিক্ পজেটিভ্ জগৎ একটা রয়েছে । এটা সেই মূল জগতের বিকৃত প্রতিফলন মাত্র । আমাদের প্রকৃত সম্বন্ধ সেই জগতের সঙ্গে । সেই সম্বন্ধে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সেখানকার রস আহরণ করা প্রয়োজন । ভোগবুদ্ধিই এই অলীক জগতে বসবাসের কারণ । যেমন যদি অপরের সম্পত্তি জাল দলিলের দ্বারা নিয়ে আমি ভোগ করি, তা হলে চরমে দাগা পেতে হয়, সেই প্রকার একটা ভুল ধারণার উপরেতে যে আমাদের অধিকার স্থাপন করে আমরা তা হতে সুখ পেতে চাচ্ছি, সেটা সবই মায়া । মায়া—মা যা; সেটা যা নয় তাকে তাই মনে করে সেখান থেকে আশা ভরসার ধোকা পাওয়া । সত্যিকারের আমি যা, সেই স্থানেতে অবস্থিত হয়ে—যে সুখ আমাদের স্বাভাবিক ভাবেই স্বরূপের সম্পত্তি—সেই সুখ বা রসের জন্য চেষ্ঠা করতে বলে গিয়েছেন । “মুক্তির্হিত্বান্যথারূপং স্বরূপেণ ব্যবস্থিতিঃ” । সেই রস হচ্ছে ভগবদ্রস । কৃষ্ণলীলারস । কৃষ্ণের লীলা দেখে তাতে নিজের সুখ অনুভব করা । কর্ম্মের মুক্তি তো বটেই, ‘ভক্তি সহিত-নৈষ্কর্ম্ম্যমাবিষ্কৃতম্’ । সেবার সঙ্গে নিষ্কাম । কেবল ত্যাগ নয় । মূল পজেটিভ্ জিনিষ রয়েছে তাতে,—শ্রীভগবৎসেবা । ভগবান রসস্বরূপ । তিনি জ্ঞানস্বরূপ—তিনি আনন্দস্বরূপ । সুতরাং আমাদের জ্ঞানবৃত্তির চরিতার্থতা সেখানে মিলবে এবং আমাদের সর্ব্বোপরি যে সর্ব্বোত্তমা বৃত্তি, রসাস্বাদনপর আকাঙ্খা—সেটা তাঁর সান্নিধ্যে সুষ্ঠু চরিতার্থতা লাভ করবে । সুতরাং এই বিষয়ে যে চেষ্ঠা সেইটিই হোল পজেটিভ্ লাইন্ । তদ্ব্যতীত অন্যান্য যা কিছু এন্গেজ্মেন্ট্ সবই বিপদসঙ্কুল—স্বার্থহানিকর । সব সময়ে উল্টাদিকে আকর্ষণ করে আমাদের বাস্তব সম্ভাবনা হতে আমাদিগকে বঞ্চিত করছে । সাধু সাবধান ! আমরা সকলেই নিজেকে সাহায্য করতে চাই আন্তরিকভাবে—এতে কোন সন্দেহ নাই কিন্তু এমন পারিপার্শ্বিকতার প্রলোভনের চাপে আমরা পড়েছি যে আমাদের সে কাজটা আমরা করতে পারছি না । যেমন নাবালক মালিক দুষ্ট কর্ম্মচারিদের পাকে পড়ে সুবিধা করতে পারে না, সেই প্রকার একটু যাদের কাণ্ডজ্ঞান মুকুলিত হয়েছে, সেইরূপ বদ্ধজীবের চেষ্টাটাও অনেকটা এই প্রকার অসুবিধাগ্রস্ত । তাদের আত্মার কর্ম্মচারীরূপী যে মন, ইন্দ্রিয় প্রভৃতি রয়েছে তারা আত্মাকে দাবিয়ে রেখে নিজেরা প্রভু হয়ে সেই আত্মার স্বার্থহানি করছে । সেই জন্য অন্য আর একজন সৎ মেজর্ প্রপ্রাইটারের সঙ্গে এই মাইনর্ প্রপ্রাইটারের যদি একটা যোগযোগ হয়, তা হলেই তার প্রকৃত ইন্টারেষ্ট সংরক্ষিত হতে পারে । সেই প্রকার যে সমস্ত মায়িকজ্ঞান আমাদিগকে বঞ্চনা করছে, আমাদেরই ভেতরে বাস করে আমাদের রক্ত খেয়ে আমাদের অনিষ্ট করছে, এমন যে সব … আইডিয়াস্—সেই গুলোক সাধুর কাছ থেকে বল লাভ করে দাবিয়ে দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে ।

ন তে বিদুঃ স্বার্থগতিং হি বিষ্ণুং
দুরাশয়া যে বহিরর্থমানিনঃ ।
অন্ধা যথান্ধৈরুপণীয়মানা
স্তেঽপি স্বতন্ত্রামুরুদাম্নিবদ্ধাঃ ॥

     স্বার্থের গতি হচ্ছে শ্রীবিষ্ণুপাদপদ্ম । য এদং বিশ্বং ব্যাপ্নোতি । তিনি অধোক্ষজ বস্তু । আমাদের ইন্দ্রিয় জ্ঞানের অতীত তত্ত্ব হচ্ছেন বিষ্ণু । তাঁর পাদপদ্ম ছাড়া আর যা কিছু অনিত্য বস্তু সমস্তই আমাদের স্বার্থহানিকর ।আমি ৪২ বৎসর আগে এখানে যে প্যারাফ্যার্নেলিয়া দেখেছিলাম তার কতটুকু অংশ এখন অবশিষ্ট আছে ? যেটা রয়েছে সেটাও অনেক বিকৃত এবং সে সব লোক ‘যয়েদং ধার্য্যতে জগৎ’ এই সম্পত্তি, এই গ্রাম এবং এখানকার ব্রহ্মণ্যধর্ম্মের যাঁরা মাষ্টার, এই সমস্ত সমাজ ও মনুষ্যদের নিয়ে খেলা করতেন—আজ তাঁরা কোথায় ? তাঁদের প্রায় সকলকেই আজ দেখতে পাচ্ছি না । সুতরাং আরও কিছুদিন পরে বা যে কোন সময় আমরাও ঐ অবস্থায় যাব, আবার নূতন সেট্ আসবে, অতএব এই প্রকার যে কালপ্রবাহ চলছে আমরা কোথায় তার স্রোতে ভেসে চলে যাচ্ছি । অতএব এর একটা কূল পাওয়া দরকার এবং সেটা অবুঝের কাজ নয় । প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ । গীতায় ভগবান বলেছেন,—

‘জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি-দুঃখদোষানুদর্শনম্’

     জন্ম, মৃত্যু, জরা এবং ব্যাধি এর মধ্যে যে দুঃখ আছে এই জিনিষটা যারা অনুভব করে, তাদের বুদ্ধিই প্রকৃত সাত্বিক বুদ্ধি—শ্রেষ্ঠ বুদ্ধি । যেমন ভাল রাডার্—এতে সূক্ষ্মানুসূক্ষ্ম জিনিষও ধরা পড়ে, তেমনি তাঁদের ফাইন্ ইন্টেলক্টেতেও প্রকৃতির এই খেলা ধরা পড়ে যায় এবং তার প্রতিকারও তাঁরা করতে চেষ্টা করেন ।
     সুতরাং এই পারিপার্শ্বিকতাই নিত্য নয় । এর অনুভব কর্ত্তা যে আত্মা সেই আত্মাই নিত্য বস্তু । সেই নিত্যবস্তুরও উপযুক্ত পারিপার্শ্বিকতা আছে । ব্যাক্ টু গড্ ব্যাক্ টু হোম্—প্রকৃতপক্ষে আত্মা—চেতনের প্রকৃত ঘর বাড়ী সেই চিন্ময়লোকে ।

গুরুপাদপদ্মে রহে যাঁর নিষ্ঠা ভক্তি ।
ব্রহ্মাণ্ড তারিতে সেই ধরে মহাশক্তি ॥

 


 

← ১০. সর্ব্বাবস্থায় ভগবানের
কৃপাদর্শনেই প্রকৃত সুখ লাভ
১২. ভগবানের সঙ্গে যোগাযোগের উপায় →

 

সূচীপত্র:

শ্রীশ্রীগুরু-গৌরাঙ্গ-প্রণতি
নম্র নিবেদন
প্রণতি-দশকম্
শ্রীগুরু আরতি-স্তুতি
শ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ সম্পর্কে
১। আত্মতত্ত্ব ও ভগবৎ-তত্ত্ব
২। জীবের চরম প্রাপ্তি
৩। সমস্যা ও সমাধান
৪। পরমার্থ লাভের পন্থা
৫। বন্ধন মুক্তির উপায়
৬। বৈষ্ণব জীবনে আনুগত্য
৭ । ধর্ম্ম শিক্ষা ও বিশ্বাস
৮ । শ্রীশরণাগতি
৯ । বজীবের স্বাধীন ইচ্ছার নিশ্চয়াত্মক স্বার্থকতা
১০ । সর্ব্বাবস্থায় ভগবানের কৃপাদর্শনেই প্রকৃত সুখ লাভ
১১ । মানব জীবনের কর্ত্তব্য
১২ । ভগবানের সঙ্গে যোগাযোগের উপায়
১৩ । আগুন জ্বালো, বাতাস আপনি আসবে
১৪ । মা মুঞ্চ-পঞ্চ-দশকম্


PDF ডাউনলোড (26.7 Mb)
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥