শ্রীপুরীধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


দর্শনের আর্ত্তি

 

আপনারা অনেক পরিশ্রম করে এসেছেন পরিক্রমা করবার জন্য । শুধু মাত্র ভাগ্যের ফলে জগন্নাথ পরিক্রমায় যেতে পারি । শুধু মাত্র ভাগ্যবান জীব শ্রীপুরীধামে জগন্নাথদেবকে রথে দর্শন করতে পারেন—জগন্নাথদেবকে রথে দেখলে, আর পুনরায় জন্ম গ্রহণ করতে হবে না ।

জগন্নাথকে রথে দর্শন করতে হবে কিন্তু দর্শন করার আমাদের সেই ভাগ্য থাকতে হবে—সমস্যাটা হচ্ছে যে, জগন্নাথের দর্শন করবার আমাদের চক্ষু নেই ।

এক দিন আমাকে একজন প্রশ্ন করেছিল, “মহারাজ, জগন্নাথ মন্দিরে গিয়েছি কিন্তু আমি সেখানে অনেক আজেবাজে ছবি দেখলাম । ওই সব ছবি ওখানে কেন ?”

আমি ভাবলাম, “আমি ১৯৯৯ সাল থেকে এখানে আসছি কিন্তু আমার চোখে তা কোন দিন পড়েনি । ও তো বলছে যে, ও সেটা দেখেছে, তখন উত্তরটা দিতে হবে ।” আমি ওকে বললাম, “যারা ওই সব ছবি দেখে, তাদের মন বিকৃত হয়ে যায় আর তারা জগন্নাথ দর্শন করতে পারবে না । যাদের ওই সব দেখে মন বিকৃত না হয়, তাদেরই এক মাত্রা জগন্নাথ দর্শন হয় ।”

তার সম্বন্ধে কোন শাস্ত্রে লেখা নেই, তাই আমি পরে গুরুমহারাজকে বললাম যে, এই রকম প্রশ্ন এসেছিল আর সে রকম জবাব আমি দিয়ে দিলাম । গুরুমহারাজ বললেন, “তোমার সঠিক জবাব হয়েছে ।”

মহাপ্রভুও দেখিয়ে দিলেন সেরকম আর্ত্তি থাকতে হবে ।

যখন তিনি জগন্নাথ দর্শন করতে গেলেন, তিনি জগন্নাথের দর্শন করতে পারলেন না—তিনি সব সময় রাধাকৃষ্ণের দর্শন করতেন । যখন মহাপ্রভু আরতিতে যেতেন, তিনি অনেক পিছনে জগন্নাথ মন্দিরের সামনে গরুড়-স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন । মহাপ্রভু কোন সময় সামনে যেতেন না কারণ তিনি অনেক লম্বা ছিলেন—সামনে গেলে তাঁর পিছন থেকে কেউ কিছু দেখতে পেত না ।

তাই এক দিন একটি মহিলা হঠাৎ করে মহাপ্রভুর গায়ে ধরে দিয়ে উঠে কান্ধে পা রেখেছিলেন । কে কল্পনা করতে পারে কিরকম জগন্নাথকে দেখা আর্ত্তি তার ছিল ! সে চট করে মহাপ্রভুর গায়ে ধরে দিয়ে তাঁর কান্ধে উঠল !

মহাপ্রভু বুঝতে পারলেন কী হয়েছিল কিন্তু কিছু বললেন না । তবু গোবিন্দ, তাঁর সেবক, অবাক হয়ে মহিলাকে বললেন, “আরে তুমি কী করছ ? প্রভু এখানে দাঁড়িয়ে আছেন আর তুমি প্রভুর গায়ের মধ্যে পা দিয়ে উঠছ ?!”

মহাপ্রভু মুখে আঙ্গুল দিয়ে বললেন, “চুপ । ওকে বাধা দাও না ।” যখন আরতি হয়ে গেল, তখন মহাপ্রভু গোবিন্দকে বুঝিয়ে দিলেন, “আমি জানি তুমি কী ভাবছ কিন্তু যেরকম এই মহিলার আর্ত্তি আছে, সেরকম আর্ত্তি জগন্নাথ দর্শন করবার আমার হল না !”

এইরকম মহাপ্রভু শিক্ষা দিয়েছিলেন, সেরকম জগন্নাথদেব দর্শন করবার অর্থী হতে হবে । এমন আর্ত্তি, এমন চক্ষু জগন্নাথদেব দর্শন পাওয়ার জন্য আমাদের নেই ।

অন্ধীভূত চক্ষু যার বিষয় ধূলিতে ।
কিরূপে সে পরতত্ত্ব পাইবে দেখিতে ॥

আমাদের চক্ষু বিষয় ধূলিতে অন্ধ হয়ে গিয়েছে—আমরা কি করে জগন্নাথ দর্শন করব ? জগন্নাথ দর্শন করবার জন্য অনেকই জগন্নাথের রথে উপরে উঠে, দড়ি ধরার জন্য পাগলামি করে, কিন্তু সেটা আমাদের উচিৎ নয়—কোন শাস্ত্রে এসব করার কথা উল্লেখ নেই । আমরা জগন্নাথকে দূর থেকে প্রণাম করি ।

আর একটা কথা হচ্ছে যে, প্রতি বছর জগন্নাথদেবের অসুস্থ লীলা হচ্ছে—এই সময় জগন্নাথ মন্দির বন্ধ হয়ে থাকে আর কেউ তাঁর দর্শন করতে পারেন না । সেই সময় জগন্নাথদেবের দর্শন করতে না পেরে মহাপ্রভু ক্রন্দন করছিলেন, “কোথায় গেলে প্রভুকে দেখতে পাব ?” বুকে বিরহ ব্যাথা পেয়ে তিনি আলালনাথে ছুটে এলেন । এসে মহাপ্রভু দণ্ডবৎ করে শুয়ে পড়লেন আর তাঁর শরীরের নিচে যে পাথর ছিল, সে পাথরটা গলে গিয়েছে ।

ভক্তি দ্বারা পাথরও গলে যায় । সেই রকম আর্ত্তি থাকতে হবে ।

 


 

← গ্রন্থাগারে ফিরে

 

অনন্তশ্রীবিভূষিত ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংসকুলচূড়ামণি বিশ্ববরেণ্য জগদ্­গুরু শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের পদ্মমুখের হরিকথামৃত


সূচীপত্র:

সূচনা : শ্রীজগন্নাথদেব
মহাপ্রভুর ইচ্ছা ও পুরীতে যাত্রার আরম্ভ
মহাপ্রভুর পুরীতে যাত্রা :
শান্তিপুর
রেমুণা
সাক্ষীগোপাল
ভুবনেশ্বর
ভুবনেশ্বর শ্রীলিঙ্গরাজ
আঠারনালা
শ্রীপুরীধামে :
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের সথে মিলন
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের শিক্ষা
কাশী মিশ্রের কথা
রামানন্দ রায়ের পুনর্মিলন ও প্রকৃতি
ভক্তদের সহিত শ্রীক্ষেত্রে বার্ষিক মিলন
রাজা প্রতাপরুদ্রের প্রতি কৃপা
গোবিন্দ প্রভুর শিক্ষা
দর্শনের আর্ত্তি
শ্রীআলালনাথের কথা
কালিদাসের ব্যতিক্রম
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের প্রসাদে রুচি
“ষাঠী বিধবা হয়ে যাক !”
গঙ্গা মাতা গোস্বামিণী
শ্রীগোপাল গুরুর কথা
শ্রীজগদানন্দ পণ্ডিতের প্রেম
শ্রীলসনাতন গোস্বামীর সঙ্গ
রামচন্দ্র পুরীর কথা
শ্রীপরমানন্দ পুরীর ভক্তিকূপ
দামোদর পণ্ডিতের বিদায়
ছোট হরিদাসের শাস্তি
গুণ্ডিচা-মার্জ্জন লীলা
শ্রীনারায়ণ ছাতায়
চটকপর্ব্বতের কথা
গম্ভীরা—বিরহের জ্বলন্ত ঘর
শ্রীল হরিদাসঠাকুর : নামাচার্য্য শিরোমণি
শ্রীগদাধর পণ্ডিত : মহাপ্রভুর ছায়া
শ্রীরঘুনাথদাস গোস্বামীর শ্রীপুরীধামে আগমন ও ভজন
পরিশেষ

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥