শ্রীপুরীধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


শ্রীলসনাতন গোস্বামীর সঙ্গ

 

মহাপ্রভু সনাতন গোস্বামী এবং রূপ গোস্বামীকে বৃন্দাবনে থাকতে বলেছিলেন আর যেহেতু তাঁরা খুব দুঃখিত হয়ে পড়লেন যে, তাঁরা প্রভুর দর্শন কোন সময় পাবেন না, সেহেতু মহাপ্রভু তাঁদেরকে বললেন অন্ততপক্ষে রথের সময় পুরীতে আসতে । তাই তাঁরা শ্রীপুরীধামে আসতেন ।

যখন সনাতন গোস্বামী বৃন্দাবন থেকে শ্রীপুরীধামে যাচ্ছিলেন, তিনি মাঝে মাঝে না খেয়ে যাচ্ছিলেন, মাঝে মাঝে জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে যাচ্ছিলেন, তার ফলে তাঁর গায়ে ভীষণ কণ্ডু ব্যাধি হয়ে গেল—সমস্ত গা থেকে রস পড়ত । এই অবস্থায় তাঁর মন খারাপ হয়ে গেল, তিনি ভাবলেন, “আমার সব গা পঁচে গেছে, এই দেহ দ্বারা আমি আর কোন সেবা করতে পারব না । যদি আমি মরে যাই, তাই ভাল হয় ।”

মহাপ্রভুকে তিনি কিছু বললেন না, কিন্তু তিনি হরিদাস ঠাকুরকে (যাঁর ঘরে তিনি থাকতেন) বললেন, “আমি শ্রীপুরীধামে এসেছি কিছু সেবা করবার জন্য, কিন্তু আসলে এটা উল্ট হয়ে যাচ্ছে—এই দেহ সেবায় লাগাতে না পারলে আমি দেহটা রথের চাকার নিচে ফেলে দিয়ে আত্মহত্যা করব ! যদি জগন্নাথদেবের দর্শন পেয়ে আমি প্রভুর শ্রীমুখ দেখে দেহ ছেড়ে দেব, সেটাই আমার পরম কল্যাণ হবে ।”

একটু পরে যখন মহাপ্রভু হরিদাস ঠাকুরের কাছে এসেছিলেন, তিনি হঠাৎ করে সনাতন গোস্বামীকে বললেন, “সনাতন, তুমি কী ভাবছ যে, এই দেহ তোমার সম্পত্তি ? এটা তোমার সম্পত্তি নয়—তোমার দেহ আমারই নিজ ধন ! তুমি এই দেহটা নষ্ট করবে না ।

দীক্ষাকালে ভক্ত করে আত্মসমর্পণ ।
সেইকালে কৃষ্ণ তারে করে আত্মসম ॥

(চৈঃ চঃ ৩/৪/১৯২)

“যখন তুমি শরণাপন্ন হয়ে গেলে, তখন তুমি আমার কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করে সব কিছু আমাকে দিয়ে দিয়েছ আর এখন তুমি আমার জিনিস নষ্ট করতে যাচ্ছ ?! তোমার কি লজ্জা নেই ? উপরন্তু দেহ-ত্যাগ তমোধর্ম্ম—তুমি কি ভাবছ যে, তুমি দেহ ত্যাগ করে দিয়ে কৃষ্ণ প্রাপ্ত হবে ? সত্য হল, আমি কোটিবার দেহ ত্যাগ করব কিন্তু ভক্তি ছাড়া কৃষ্ণ-প্রাপ্ত্যের উপায় কোন নেই । তাই আমার শেষ কথা হচ্ছে যে, এই দেহ তোমার দেহ নয়, এটা আমার দেহ আর তুমি এটাকে বিনষ্ট করবে না ।”

সনাতন গোস্বামী লজ্জা পেয়ে বললেন, “প্রভু, এই দেহ তো পচা হয়ে গেছে... আমি কি করে এর দিয়ে সেবা করব ?”

“এটা তোমার ব্যাপার নয় । আমি তোমার দেহ দ্বারা অনেক সেবা করব । তুমি বৃন্দাবনে প্রচার করবে ও বহু গ্রন্থ লিখবে । আমি এই সম্পত্তি তোমার কাছে রাখলাম আর তুমি একে অপব্যবহার করছ !” তখন মহাপ্রভু হরিদাস ঠাকুরকে বললেন, “হরিদাস, তুমি ভাল করে ওকে দেখ, যেন ও কিছু অন্যায় করে না !”

এ সব কথা বলে মহাপ্রভু জোর করে সনাতন গোস্বামীকে আলিঙ্গন করলেন । মহাপ্রভু প্রতি দিন সনাতন গোস্বামীকে দেখে তাঁকে আলিঙ্গন করলেন, আর সনাতন গোস্বামী প্রতি বার আপত্তি দিতেন, “আমার এত বড় অপরাধ হয় ! প্রভু, আমার দেহ সব পচা—তুমি আমাকে স্পর্শ করলে, আমারই অপরাধ হয় । আমি সব সময় দূরে থাকতে চাই আর তুমি আমার কাছে সব সময় এসে আলিঙ্গন কর ।” কিন্তু মহাপ্রভু তাঁর কথা না শুনে সব সময় তাঁকে আলিঙ্গন করতেন । আর সেই সময় যখন মহাপ্রভু তাঁকে আলিঙ্গন করলেন, হঠাৎ করে সনাতন গোস্বামীর দেহ সোনার মত হয়ে গেল আর সব কণ্ডু ব্যাধি বিদূরিত হয়ে পড়ল !

মহাপ্রভু বললেন, “আমি তোমাকে স্পর্শ করি আমারই কল্যাণের জন্য ! তোমার দেহ স্পর্শ করলে আমি পবিত্র হয়ে যাই । আসলে কৃষ্ণ এই কণ্ডু ব্যাধি পাঠিয়ে দিলেন আমাকে পরীক্ষা করবার জন্য—যদি আমি নিরস্ত হয়ে যেতাম, তাহলে আমারই অপরাধ হত ।”

আর এক দিন মহাপ্রভু সনাতন গোস্বামীকে পরীক্ষা করলেন । সেই দিন তিনি দুপুর সময় তাঁকে যমেশ্বর টোটায় আসতে বললেন । (গদাধর পণ্ডিতের যেখানে সেবিত টোটা-গোপীনাথ-বিগ্রহের মন্দির আছে, তার পাশে এক বাগান বা ‘টোটা’ আছে, সেই বাগানের নামই হচ্ছে যমেশ্বর টোটা ।) যমেশ্বর টোটায় পৌঁছাতে সনাতন গোস্বামীকে জগন্নাথদেবের মন্দিরের পাশে যেতে হল কিন্তু তিনি কখনও সেখানে যেতেন না কারণ সেখানে জগন্নাথদেবের সেবকগণ এদিকে সেদিকে সব সময় যান আর তিনি কখনও চাইতেন না যে, তাঁরা হঠাৎ করে যে-কোনভাবে তাঁকে স্পর্শ করবেন । তিনি সব সময় নিজেকে নিচু ও অধম বিচার করতেন ।

তাই তিনি সমুদ্রতীরে বালুকাপথ দিয়ে যমেশ্বর টোটায় হেঁটে হেঁটে আসতেন, কিন্তু মধ্যদিনের সময় বালি তো আগুনের মত গরম ! তার ফলে সনাতন গোস্বামীর পায়ে অনেক ভীষণ ফোসকা পড়ে গেল কিন্তু আনন্দিত হয়ে যে, প্রভু তাঁকে ডেকেছিলেন, তিনি কিছু টের পেলেন না ।

যখন তিনি যমেশ্বর টোটায় পৌঁছে গেলেন, মহাপ্রভু তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “সনাতন, তুমি কোন রাস্তা দিয়ে চলে এসেছ ?”

“সমুদ্রতীর দিয়ে ।”

“তুমি ওখানে কি করে যাচ্ছিলে ? বালুকা তো এত গরম ! তুমি এটা কি করে সহ্য করতে পেরেছ ?”

“আমি তো কিছু টের পেলাম না—আমি মোটেই জানি না যে, আমার ফোসকা পড়ে গেছে ।”

“তুমি সিংহ-দ্বারের রাস্তা দিয়ে কেন গেলে না ? শীতল সিংহ-দ্বারের রাস্তা গিয়ে যদি আসতে, তাহলে কোন অসুবিধা হত না ।”

“আমার সিংহ-দ্বারের পাশে যাওয়ার কোন অধিকার নেই, প্রভু । ঠাকুরের সেবকগণ যদি আমার গায়ে লেগে যাবে বা আমাকে দেখতেই পাবেন, আমার সর্ব্বনাশ হবে । সেই জন্য আমি ঘুরে ঘুরে বালুকাপথ দিয়ে যাই ।”

শুনে মহাপ্রভু খুশি হলেন আর সনাতন গোস্বামীকে আলিঙ্গন করলেন ।

যখন জগন্নাথদেবের রথ আর উল্ট রথ শেষ হয়ে গেছে, সনাতন গোস্বামী জগদানন্দ পণ্ডিতকে বললেন, “আমাদের তো যাওয়ার সময় হয়ে গেছে । তোমরা খুব ভাগ্যবান যে তোমরা প্রভুর কাছে সব সময় থাকতে পার । কিন্তু আমি তো কত দূরে থাকি—রথ হয়ে গেল, উল্টা রথও হয়ে গেল, আমাকে চলে যেতে হবে ।...”

জগদানন্দ পণ্ডিত দেখলেন যে, মহাপ্রভু সব সময় সনাতন গোস্বামীকে এত বেশী আদর করতেন, তাই তিনি তাঁর প্রতি কিছু হিংসা করতেন । যখন সনাতন গোস্বামী বলে দিলেন যে, তাঁকে চলে যেতে হবে, জগদানন্দ পণ্ডিত সহজে বলে ফেললেন, “হ্যাঁ, রথটা হয়ে গেছে, তোমার যাওয়ার সময় হয়ে গেছে—তুমি এখানে আছ কেন ? যাও ।”

আসলে এটা বলতে তাঁর অধিকার নেই । চৈতন্য মহাপ্রভু মালিক হন আর জগদানন্দ পণ্ডিত সেবা—তাঁর সেটা করার অধিকার নেই । সেটা শ্রীলসনাতন গোস্বামীকে বলে তিনি মর্যাদা লঙ্ঘন করেছিলেন ।

তখন সনাতন গোস্বামী কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে মহাপ্রভুর কাছে এসে বললেন, “প্রভু, আমার তো সময় হয়ে গেছে বৃন্দাবনে যেতে হবে । জগদানন্দ পণ্ডিতও বলছেন আমার সময় হয়ে গেছে, আমার যেতে হবে...”

শুনে মহাপ্রভু রেগে গেলেন, “কী ?! কালকের বটুয়া জগা এই কথা বলেছে ? ওকে ডেকে নিয়ে এস !” যখন জগদানন্দ পণ্ডিত এসে সামনে বসেছিলেন, তখন মহাপ্রভু তাঁকে বললেন, “তুমি জান সনাতন গোস্বামী কে ? তাকে আমিও শ্রদ্ধা করি আর তুই তাকে চলে যেতে বলেছিস ?! সনাতন গোস্বামী আমাকেও শিক্ষা দেন । তিনি সব কিছু ত্যাগ করে দিয়ে বৃন্দাবনে কত কষ্ট করে আছে আর তুমি তাঁকে বলছ তুমি এখানে আছ কেন ? তোকে এ অধিকার কে দিয়েছে ?”

এই কথা শুনে জগদানন্দর পণ্ডিত মাথা নিচু করলেন আর সনাতন গোস্বামী মাথা নিচু করে চোখের জল ফেললেন । একজনকে বকলে অন্য কারও কি চোখ দিয়ে জল পড়ে ? মহাপ্রভু জগদানন্দকে বকা ঝকা করলেন কিন্তু কে কাঁদতে লাগলেন ? সনাতন গোস্বামী ।

সনাতন গোস্বামী চোখের জল ফেলে বললেন, “প্রভু, তুমি আমাকে কোন দিন বক নি । হে জগদানন্দ, তোমার মত এত ভাগ্যবান আর কেউ নেই ! প্রভু তোমাকে দিচ্ছে মিষ্টি আর আমাকে দিচ্ছে তেতো । আমি এত ভাগ্যবান হতে পারলাম না—প্রভু আমাকে কোন দিন বকা দেয় নি ।”

সেটা আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে । গুরুর বকা খাওয়া কত ভাগ্যের কথা—এটা সহজে কেউ বুঝতে পারে না ।

সেই ভাবে শ্রীলসনাতন গোস্বামী পুরীধামে আসতেন আর আমাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য অনেক লীলা করেছিলেন ।

 


 

← গ্রন্থাগারে ফিরে

 

অনন্তশ্রীবিভূষিত ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংসকুলচূড়ামণি বিশ্ববরেণ্য জগদ্­গুরু শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের পদ্মমুখের হরিকথামৃত


সূচীপত্র:

সূচনা : শ্রীজগন্নাথদেব
মহাপ্রভুর ইচ্ছা ও পুরীতে যাত্রার আরম্ভ
মহাপ্রভুর পুরীতে যাত্রা :
শান্তিপুর
রেমুণা
সাক্ষীগোপাল
ভুবনেশ্বর
ভুবনেশ্বর শ্রীলিঙ্গরাজ
আঠারনালা
শ্রীপুরীধামে :
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের সথে মিলন
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের শিক্ষা
কাশী মিশ্রের কথা
রামানন্দ রায়ের পুনর্মিলন ও প্রকৃতি
ভক্তদের সহিত শ্রীক্ষেত্রে বার্ষিক মিলন
রাজা প্রতাপরুদ্রের প্রতি কৃপা
গোবিন্দ প্রভুর শিক্ষা
দর্শনের আর্ত্তি
শ্রীআলালনাথের কথা
কালিদাসের ব্যতিক্রম
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের প্রসাদে রুচি
“ষাঠী বিধবা হয়ে যাক !”
গঙ্গা মাতা গোস্বামিণী
শ্রীগোপাল গুরুর কথা
শ্রীজগদানন্দ পণ্ডিতের প্রেম
শ্রীলসনাতন গোস্বামীর সঙ্গ
রামচন্দ্র পুরীর কথা
শ্রীপরমানন্দ পুরীর ভক্তিকূপ
দামোদর পণ্ডিতের বিদায়
ছোট হরিদাসের শাস্তি
গুণ্ডিচা-মার্জ্জন লীলা
শ্রীনারায়ণ ছাতায়
চটকপর্ব্বতের কথা
গম্ভীরা—বিরহের জ্বলন্ত ঘর
শ্রীল হরিদাসঠাকুর : নামাচার্য্য শিরোমণি
শ্রীগদাধর পণ্ডিত : মহাপ্রভুর ছায়া
শ্রীরঘুনাথদাস গোস্বামীর শ্রীপুরীধামে আগমন ও ভজন
পরিশেষ

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥