শ্রীপুরীধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


পরিশেষ

 

কালকে আমাদের রথযাত্রা সম্পন্ন হয়ে গেল । আপনারা গুরু-বৈষ্ণবের কৃপায় রথযাত্রা খুব সুন্দর ভাবে, সুষ্ঠু ভাবে কাটিয়ে দিলেন । বহু কষ্ট করে এসেছেন, বহু কষ্ট করে যাচ্ছেন—কিন্তু কষ্ট না করলে ভগবানকে পাওয়া যাবে না । বড় বড় গোস্বামীগণ গাছের তলায় সারা জীবন কাটিয়ে দিলেন আর আপনারা মঠে কয়েক দিনের জন্য এসে পান্ডালের নিচে শুয়ে থাকলেন, জল বৃষ্টি মাথায় পড়ল, লঙ্গরখানার মত প্রসাদ পেলেন—তবু তো সবাই বেঁচে আছেন নাকি ? গুরুমহারাজ বলতেন যে, লোক খেয়ে মরে, না খেয়ে মরে না । আপনারা ভালোমন্দ অনেক কিছু বাড়িতে গ্রহণ করেন কিন্তু এই অল্প দিনের জন্য এসে আপনারা কষ্ট করে ভগবানের জন্য ভগবানের প্রসাদ গ্রহণ করে ছিলেন । সেটা তো খুব বড় ভাগ্যের ব্যাপার ।

আমরা কী উদ্দেশ্যে এই তীর্থ করতে আসি ? জগন্নাথকে রথের উপরে দর্শন করলেন আমাদের কি চক্ষু আছে রথ দর্শন করবার জন্য, বলুন ? ভগবানকে দর্শন করবার মত আমাদের চক্ষু নেই । কিন্তু রথের সামনে গেলে ভগবান আপনাদের দর্শন করতে পেরেছেন । উপরন্তু ভগবান কি শুধু রথের মধ্যেই বসে আছেন ? ভগবান সর্ব্বত্রই আছেন । আপনারা ভাবছেন ভগবান বোধহয় রথের মধ্যে শুধু বসে আছেন বা শুধু মন্দিরে বসে আছেন ? তিনি সারা বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডব্যাপি—তিনি অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল, পাতালেও আছেন ।

অনেকই ভাবছেন, “কালকে ভগবানকে রথের মধ্যে দেখতে পাই নি, আজকে আবার দেখতে যাব ।” কিন্তু আমাদের কি চক্ষু আছে, বলুন ? এক দিন এক সন্ন্যাসী গুরুমহারাজকে বললেন, “মহারাজ, আমি হাপানীয়া ঠাকুরের দর্শন করতে গিয়েছিলাম ।” গুরুমহারাজ তখন বললেন, “উঃ, দর্শন... হে ভাই, আপনার তো চক্ষু আছে, আপনি তো দর্শন করতে পারেন, কিন্তু আমার সেই চক্ষু নেই দর্শন করবার মত ।” সেটা আমাদের বুঝতে হবে যে, আমাদের প্রকৃত চক্ষু নেই, কিন্তু আমাদের হৃদয়েও একটা চক্ষু আছে—যদি আমরা হৃদয়ে ভগবানের কথাগুলো ধরে রাখতে পারব, তাহলে আমরা এখানে বসে দর্শন করতে পারব । যে জগন্নাথের রথের সামনে গিয়েছিলেন, তাঁকে জগন্নাথদেব ঠিক দেখতে পেয়েছেন, যদি চরম আর্ত্তিটা থাকে । যদি আপনাদের হৃদয়ের চক্ষুটা অন্ধ না থাকে, যদি আপনাদের হৃদয়ে চক্ষুটা পরিষ্কার থাকে, তাহলে আপনারা এখানে বসিয়েই জগন্নাথকে দর্শন করতে পারবেন ।

শ্রীলভক্তিসুন্দর গোবিন্দদেবগোস্বামী মহারাজ নিজে রথের ভিড়ে আসতেন না । খুব কম আসতেন, বোধহয় শুধু দুই-একবার । তিনি মাঝে মাঝে বলতেন, “দেখুন, কত লোক পরিক্রমায় আসছেন—গনন করে আর শেষ হয় না ।” পুরীতে অগণন লোক আসে : কেহ ফুর্তি করতে আসে, কেহ পুণ্যর জন্য ঘুরতে আসে । পুরীতে হোটেল ভাড়া নেয়, অনেক অন্যায় কাজ হয়, লোক ঘুরতে এসে এখানে মদ-মাংসা খায় । তারা তীর্থ, ধামকে অপবিত্র করে দিয়ে চলে যায় । আর আপনারা বৈষ্ণবগণ এখানে কী জন্য এসেছেন ? তীর্থটাও চান এবং অপেক্ষা করছেন, “আপনারা আসুন ! আমার ধামে এসে নাম কীর্ত্তন করুন, তাহলে আমিই একটু পবিত্র হয়ে যাই ।”সেইজন্য আপনাদেরকে আমি কীর্ত্তন করতে বলি—ধামে এসে কীর্ত্তন করুন ।

যদি আপনারা ধামে গিয়ে চোখের ব্যায়াম করছেন, তাহলে পারমার্থিক কিছু হল না । বরং .অপরাধ হল । কিন্তু আমি কখনও চাই না যে, আপানদের কিছু ক্ষতি হয়ে যায় । “সেই গুরু গুরু নন যে, আপনাদেরকে সঠিক পথে না আনতে পারতেন ।”

গৌর আমার যে সব স্থানে করল ভ্রমণ রঙ্গে ।
সে সব স্থান হেরিব আমি প্রণয়ি-ভকত-সঙ্গে ॥

মহাপ্রভু যেখানে গিয়েছিলেন, আমি আপনাদেরকে সেই সব জায়গায় নিয়ে গিয়েছি । তার বহিরে কোথাও নয় ।

যারা গুণ্ডিচা-মন্দিরে ভিড়ের জন্য যেতে পারেন নি, তারা বাহিরে থেকে ঝাড়ু দিয়েছেন, বাহিরে থেকে প্রণাম করেছেন । কোন অসুবিধা নেই । কোন সমস্যা নেই । মন খারাপ করার কোন প্রয়োজনই নেই । দূর থেকে প্রণাম করলে, সেটা তো যথেষ্ট, সামনে আসতে হবে না কেননা সেবা করতে হবে, বাঁচতে হবে—ভিড়ের মধ্যে গিয়ে দেহটাকে নষ্ট করে লাভ নেই ।

সেই ভাবে আপনাদের চলতে হবে । সবাই তো “হরিবল”, “হরিবল” করেন, কিন্তু শ্রদ্ধা-ভক্তি-আর্ত্তি অনুসারে ভগবানের ভক্তি হবে । লোক টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত, গাড়ি-বাড়ির পিছনে দৌড়াচ্ছেন—কত দিন থাকবেন আপনারা বলুন ? আপনারা কিছু নিয়ে আসেন নি, কিছু নিয়েও যাবেন না । অত্যাহারও নয়, প্রয়াসশ্চও নয়, প্রজল্পও নয়, নিয়মাগ্রহও নয়, লৌল্যঞ্চও নয়, জনসঙ্গঞ্চও নয় ।

আপনারা সেই পরিক্রমা করে জগন্নাথের কাছে প্রার্থনা করবেন, “হে জগন্নাথ ! এইবার আমায় দয়া কর ! এইবার আমার ক্ষমা কর ।” কত অপরাধ করি, কত কিছু অন্যায় করি—ভগবানের কাছে ক্ষমা চাওয়া তাই কাজ । ভগবান এত দয়ালু, তিনি অত্যন্ত কৃপাশীল কিন্তু যদি গুরুর আনুগত্যে না থাকি, ভগবানের লক্ষণ যদি বুঝতে না পারি, তাহলে আমরা কিছুই বুঝতে পারব না । সেইজন্য, আপনাদের শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপা যদি না থাকে, গুরুপাদপদ্মের কৃপা না থাকে, তাহলে আপনারা কিছুই বুঝতে পারবেন না ।

নিত্যানন্দ প্রভু কি ভাবে কৃপা করতেন ? তিনি লাথি মারতেন ! আপনাদেরকে একটু বকলে আপনারা বলবেন, “আমার এরকম গুরু দরকার নেই ! আমি চাই সেরকম গুরু যে আমাকে ভালবাসবেন ।” কিন্তু ভালবাসাটা কী ? বাচ্চাদের ভালবাসা কি রকম ? বাবা যখন কাজে যাচ্ছে, বাচ্চা শিশু তখন কাঁদছে, “বাবা, তোমার সঙ্গে যাব !” যে বাবা কাজে বেড়িয়ে যাচ্ছে, বুঝতে না পেরে বাচ্চাটা বাবাকে ডিস্টার্ব (disturb) করছে । বাবা কী করে ? চকলেট-খেলনা দিয়ে বাচ্চাকে ভুলিয়ে রেখে চলে যায় । ভগবানের কাছেও এইরকম : ভগবানের কাছে আমরা যদি গাড়ি চাই, বাড়ি চাই, টাকা চাই, পয়সা চাই—ভগবান তখন ওই সব দিয়ে আপনাকে ভুলিয়ে রেখে দিয়ে চলে যাবেন ।

তাই গুরুপাদপদ্মের কৃপায় আমরা সমস্ত জায়গা দর্শন করেছি । জগন্নাথ জগতের নাথ—তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই তাঁর কৃপা হয়ে যায় । কেউ ভাবছেন, “আমি দড়ি টানলাম !” কেউ ভাবছেন, “আমি রথে উঠে গেছি !” “এই করলাম”, “সেই করলাম”—ওগুলা কোন ব্যাপার নয় । জগন্নাথদেব আপনাদেরকে দেখতে পেয়েছেন আর তিনি জানেন যে, আপনারা কত দূর থেকে পুরীধামে এসেছেন তাঁর কৃপা লাভের জন্য । শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর কৃপা যদি আমাদের হয়, তাহলে আমরা কৃষ্ণের কৃপা, জগন্নাথের কৃপা লাভ করতে পারব ।

হেন নিতাই বিনে ভাই রাধাকৃষ্ণ পাইতে নাই
দৃঢ় করি ধর নিতাই পায় ॥

দৃঢ় করে নিতাইয়ের চরণ ধরতে হবে ! বহু যোনি ভ্রমণ করতে করতে আমরা এই মনুষ্য জন্ম লাভ করেছি ।

ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমিতে কোন ভাগ্যবান্ জীব ।
গুরু-কৃষ্ণ-প্রসাদে পায় ভক্তিলতা-বীজ ॥

(চৈঃ চঃ ২/১৯/১৫১)

এই ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমণ করতে করতে কোন ভাগ্যবান জীব যদি গুরু-কৃষ্ণ প্রসাদে ভক্তিলতা-বীজ পেয়ে সেই ভক্তির বীজটা যদি ঠিক মত লালনপালন করে কল্পবৃক্ষ পর্যন্ত করা যায়, তাহলে আমাদের জীবন স্বার্থক হয়ে যাবে । যাঁকে নিত্যানন্দ প্রভু কৃপা করেছেন, তাঁদের কৃষ্ণ কৃপা লাভ হবে । এটা মনে রাখতে হবে ।

আরও একটা কথা হচ্ছে যে, ভক্ত হতে হলে, ভক্তের দাস প্রথম হতে হবে । আমরা মঠে বা এই লাইনে এসেছি ভক্ত হতে নয়—আমাদের ভক্তের দাস হতে হবে । এটা মনে রাখতে হবে । আমরা বৈষ্ণব হতে নয়, বৈষ্ণবের দাস হতে এসেছি ।

ভক্তি কার সবচেয়ে বেশী আছে ? ব্রজগোপীদের । কিন্তু সেই ব্রজগোপীরা কী বলেন ? এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা, মন দিয়ে এটা বুঝতে হবে । গোপীরা বলেন, “আমাদের কিছুই কৃষ্ণভক্তি নেই ! যে ভক্তি প্রহ্লাদ মহারাজের আছে (তাঁর ভক্তি দ্বারা কৃষ্ণ একবারে নরসিংহরূপ নিয়ে চলে এসেছেন !), সেরকম ভক্তি আমাদের হয় না । আমাদের কবে সেরকম ভক্তি হবে ?” ওঁদের এত ভক্তি কিন্তু তাঁরা নিজে বলেন যে, আমাদের কোন ভক্তি নেই ।

যে ভক্ত হয়, তাঁর লক্ষণ হচ্ছে যে, সে কখনও বলবেন না, “আমি বৈষ্ণব হয়ে গেছি !” বা “আমি ভক্ত হয়ে গেছি”, “আমি কিছু বড় হয়েছি”—যে সত্যিকারের বৈষ্ণব হয়, সে ভাবছেন, “আমার কোন যোগ্যতা নেই । আমি অধম পতিত জীব ।” আমরা কীর্ত্তনেও গাই, “যোগ্যতা বিচারে কিছু নাহি পাই তোমার করুণা সার ।” আমাদের এটা সব সময় মনে রাখতে হবে । “আমার কিছু নেই, কিছুু দেওয়ার মত নেই । প্রভু, আমি তোমার দাসের যদি ধূলিকানা হয়ে থাকতে পারি, সেটা তো যথেষ্ট । আমি বড় কিছু হতে চাই না ।”

'আমি ত' বৈষ্ণব', এ বুদ্ধি হইলে
অমানী না হ'ব আমি ।

নিজেকে বৈষ্ণব বলে মনে করলে আমরা অপরকে সম্মান করতে পারব না । শুধু সেবা করতে হবে । “আমি গুরু হয়ে গেছি, আমাকে সবাই সেবা করবে”—সেটা ভুল সিদ্ধান্ত । মহাপ্রভু সেটা নিজেই শিখিয়ে দিয়েছেন : ভগবানই হয়ে তিনি নিজে সেবা করেছেন, তিনি প্রত্যেক জায়গায় গিয়ে হরিনাম প্রচার করেছেন । ভগবান তাঁর নিজের জায়গায় বসে থাকতে পারতেন (নারায়ণ যেমন এক জায়গায় বসে আছেন), কিন্তু আমার গৌরহরি, আমার প্রভু নিজে আচরণ করে সব জায়গায় গিয়ে হরিনাম বিতরণ করেছেন ।

কে কীর্ত্তন করতে পারেন ? কার সেরকম অধিকার আছে ?

দৈন্য, দয়া, অন্যে মান, প্রতিষ্ঠা বর্জ্জন ।
চারিগুণে গুণী হই করহ কীর্ত্তন ॥

দৈন্য হতে হবে । দয়া থাকতে হব । অপরকে সম্মান করতে হবে । প্রতিষ্ঠা বর্জ্জন করতে হবে—কোন নাম, যশ অর্জন করার কোন কিছু দরকার নেই ।

আমরা কেন ধামে যাচ্ছি ? ধামে সেবা করতে । ধামে গিয়ে সেবা কি করে করব ? ঘরের মধ্যে বসে ঘুমানো আর গল্প করা নয় । ঘুম আসতে পারে, আপনারা ঘুমাবেন কিন্তু পাঠ কীর্ত্তন বসে শুনবেন, আরতির সময় ঠাকুরের দর্শন করবেন । আমরা যাচ্ছি তীর্থ যাত্রা করতে নয়—আমরা যাচ্ছি ধামের সেবা করতে ।

তীর্থযাত্রা পরিশ্রম কেবল মনের ভ্রম,
সর্ব্বসিদ্ধি গোবিন্দচরণ ।

শ্রীলভক্তিবিনোদ ঠাকুরও কত সুন্দর করে লেখেছেন :

মন, তুমি তীর্থে সদা রত ।
অযোধ্যা, মথুরা, মায়া, কাশী, কাঞ্চী, অবন্তীয়া,
দ্বারাবতী আর আছে যত ॥
তুমি চাহ ভ্রমিবারে, এ সকল বারে বারে,
মুক্তিলাভ করিবার তরে ।
সে কেবল তব ভ্রম, নিরর্থক পরিশ্রম,
চিত্ত স্থির তীর্থে নাহি করে ॥
তীর্থফল সাধুসঙ্গ, সাধুসঙ্গে অন্তরঙ্গ,
শ্রীকৃষ্ণভজন মনোহর ।
যথা সাধু, তথা তীর্থ, স্থির করি, নিজ-চিত্ত,
সাধুসঙ্গ কর নিরন্তর ॥
যে তীর্থে বৈষ্ণব নাই, সে তীর্থেতে নাহি যাই
কি লাভ হাঁটিয়া দূরদেশ ।
যথায় বৈষ্ণবগণ, সেই স্থান বৃন্দাবন,
সেই স্থানে আনন্দ অশেষ ॥
কৃষ্ণভক্তি যেই স্থানে, মুক্তিদাসী সেইখানে,
সলিল তথায় মন্দাকিনী ।
গিরি তথা গোবর্ধন, ভূমি তথা বৃন্দাবন,
আবির্ভূতা আপনি হ্লাদিনী ॥
বিনোদ কহিছে ভাই, ভ্রমিয়া কি ফল পাই,
বৈষ্ণব-সেবন মোর ব্রত ॥

“থাকা, খাওয়া, ভাল জায়গা পেলাম না”—এটা সব ক্ষুদ্র স্বার্থ । গুরুমহারাজ বলতেন, “বৃহৎ স্বার্থ পাইতে হইলে, ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে হয় ।” ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য আমরা এই জগতে বৃহৎ স্বার্থ কেন হারিয়ে ফেলব ? আপনারা সবচেয়ে বড় স্বার্থ পেতে পারেন : আপনি যেখান থেকে এসেছেন সেখানে যেতে পারেন । নিজের বাড়িতে চলে যেতে হবে ! আমরা বার বার এই সমুদ্রের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছি । মায়াদেবী আমাদের বিষয় সমুদ্রের মধ্যে ফেলে দিলেন আর এখন উপায় কি করে পাওয়া যায় ? আমরা আগে ছাগল, বিড়াল, গরুর জন্ম গ্রহণ করলাম—বিভিন্ন দেশে জন্ম গ্রহণ করে এই সংসার সমুদ্রের মধ্যে পড়ে আছি কিন্তু এই জন্মে আমরা কোন ভাগ্যের ফলে গুরুর কাছে এসেছিলাম । যখন মহাপ্রভু নিজে তাঁর গুরুর চরণে এসে গেছেন, তিনি বলেছেন :

সংসার-সমুদ্র হৈতে উদ্ধারহ মোরে ।
এই আমি দেহ সমর্পিলাঙ তোমারে ॥

(চৈঃ চঃ, ১/১৭/৫৪)

আপনারা সাধু-গুরু-বৈষ্ণবের সঙ্গে পরিক্রমা করতে এসেছেন । আপনারা এই সংসার সমুদ্র হইতে উদ্ধার পেতে পারেন—ভগবানের কাছে নিজের বাড়িতে ফিরে চলুন ! ভগবান আপনাদেরকে ডাকছেন, আপনাদেরকে খুঁজছেন কেননা আপনারা তো তাঁর হারানো সন্তান । আপনাদের পিতার বাড়িতে ফিরে যেতে হবে । সেই জন্য আমরা সাধু-সঙ্গে ধামপরিক্রমায় কৃষ্ণ-কীর্ত্তন করতে করতে এসেছি ।

আপনারা বাড়ি ফিরে যাবেন আর সবাই দুঃখ করে আপনাদেরকে বলবে, “দাদু (বাবা, মা), তুমি পুরীতে গেলে কী নিয়ে এসেছ ?” আপনারা এসে কী নিয়ে যাবেন ? কৃষ্ণপ্রেম ! কিন্তু সেটা ওরা বুঝবে না—বাচ্চা ছেলে কৃষ্ণপ্রেম বুঝবে না, বাচ্চা ছেলে খাওয়া-দাওয়া বুঝবে । আমরাও সেই বাচ্চা ছেলের মত টাকা, খাওয়া, পরা নিয়ে ঝগড়া করছি । আমি দেখেছি যে, কেউ নিজের স্বার্থের চিন্তা করে রাতে ঘুমাতেও পারে না ।

কবে জীবে দয়া হইবে উদয় ।
নিজ সুখ ভুলি' সুদীন-হৃদয় ॥

নিজের সুখটা বিলিয়ে দিয়ে অপরের চিন্তা করতে হবে । “আমার কষ্ট হয় হোক, কিন্তু অপরের যেন কষ্ট না হয়,”—এটাকে বলে দয়া । সেই ভাবে আমাদের চিন্তা করতে হবে ।

নিজের পোষণ কভু না ভাবিব
রহিব ভাবের ভরে ।

“আমি নিজের চিন্তা করব না । আমি ভাল চিন্তা করব ।” কোন চিন্তা করলে হবে না । যদি আপনারা ভগবানের চিন্তা করবেন, ভগবান আপনাদের সব ব্যবস্থা করে দেবেন । কোন চিন্তার কারণ নয় ।

 

জয় শ্রীলগুরুমহারাজ কি জয় ।

 


 

← গ্রন্থাগারে ফিরে

 

অনন্তশ্রীবিভূষিত ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংসকুলচূড়ামণি বিশ্ববরেণ্য জগদ্­গুরু শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের পদ্মমুখের হরিকথামৃত


সূচীপত্র:

সূচনা : শ্রীজগন্নাথদেব
মহাপ্রভুর ইচ্ছা ও পুরীতে যাত্রার আরম্ভ
মহাপ্রভুর পুরীতে যাত্রা :
শান্তিপুর
রেমুণা
সাক্ষীগোপাল
ভুবনেশ্বর
ভুবনেশ্বর শ্রীলিঙ্গরাজ
আঠারনালা
শ্রীপুরীধামে :
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের সথে মিলন
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের শিক্ষা
কাশী মিশ্রের কথা
রামানন্দ রায়ের পুনর্মিলন ও প্রকৃতি
ভক্তদের সহিত শ্রীক্ষেত্রে বার্ষিক মিলন
রাজা প্রতাপরুদ্রের প্রতি কৃপা
গোবিন্দ প্রভুর শিক্ষা
দর্শনের আর্ত্তি
শ্রীআলালনাথের কথা
কালিদাসের ব্যতিক্রম
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের প্রসাদে রুচি
“ষাঠী বিধবা হয়ে যাক !”
গঙ্গা মাতা গোস্বামিণী
শ্রীগোপাল গুরুর কথা
শ্রীজগদানন্দ পণ্ডিতের প্রেম
শ্রীলসনাতন গোস্বামীর সঙ্গ
রামচন্দ্র পুরীর কথা
শ্রীপরমানন্দ পুরীর ভক্তিকূপ
দামোদর পণ্ডিতের বিদায়
ছোট হরিদাসের শাস্তি
গুণ্ডিচা-মার্জ্জন লীলা
শ্রীনারায়ণ ছাতায়
চটকপর্ব্বতের কথা
গম্ভীরা—বিরহের জ্বলন্ত ঘর
শ্রীল হরিদাসঠাকুর : নামাচার্য্য শিরোমণি
শ্রীগদাধর পণ্ডিত : মহাপ্রভুর ছায়া
শ্রীরঘুনাথদাস গোস্বামীর শ্রীপুরীধামে আগমন ও ভজন
পরিশেষ

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥