শ্রীপুরীধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের সথে মিলন

 

আগের যুগে সার্বভৌম ভট্টাচার্য্য বৃহস্পতি ছিলেন । বৃহস্পতি জানতে পেলেন যে, ভগবান গৌরসুন্দররূপে নবদ্বীপে অবতীর্ণ হয়ে তাঁর বিদ্যালীলা বিলাস করবেন, তাই তিনি ইন্দ্র-সভা ছেড়ে দিয়ে এই কলিযুগে সার্বভৌম ভট্টাচার্য্য-রূপে নবদ্বীপের বিদ্যানগরে অবতীর্ণ হয়েছেন । সেখানে তিনি বিদ্যালয় স্থাপন করলেন আর ছেলেদের শিখাতে শুরু করলেন । কিন্তু পরে সার্বভৌম ভট্টাচার্য্য ভাবলেন, “আমি এখানে থাকলে, বিদ্যাজালে ডুবে প্রভুকে ভুলে যাব । বরং আমি এখান থেকে চলে যাব—আমি যদি সত্যিই গৌরদাসের সেবা করতে পারি, তাহলে প্রভু আমাকে কৃপা করে তাঁর কাছে নিয়ে নেবেন ।” তাই মহাপ্রভুর অবতীর্ণ হাওয়ার আগেই তিনি নবদ্বীপ ছেড়ে দিয়ে এখানে শ্রীপুরুষোত্তমধামে এসে গিয়েছেন আর মায়াবাদ শাস্ত্র প্রচার করতে লাগলেন ।

শ্রীপুরীধামে সার্বভৌম ভট্টাচার্য্য ছিলেন জগন্নাথ মন্দিরের পরিচালক । তিনি মন্দিরের সব কিছু দেখাশোনা করতেন কিন্তু তিনি ওইসময় মায়াবাদী ভক্ত ছিলেন (মায়াবাদী মানে তিনি ব্রহ্ম-জ্ঞান মানতেন) । প্রথম তিনি বিশ্বাসও করতে পারলেন না যে, মহাপ্রভু স্বয়ং ভগবান এসেছেন ।

সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের বাড়িতে তাঁর স্ত্রী ও ভগ্নীপতি গোপীনাথ আচার্য্য বাস করতেন । গোপীনাথ আচার্য্য মহাপ্রভুকে দেখে তাঁকে চিনতে পারলেন আর সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যকে বললেন :

“তুমি কি এঁকে চিনতে পারছ না ?”

“মানে ?”

“তুমি বিদ্যানগরে (নবদ্বীপ, মায়াপুরে) থাকতেও—তুমি এঁকে চিনতে পারছ না ? ইনি নীলাম্বর চক্রবর্তীর নাতি আর জগন্নাথ মিশ্রের পুত্র । শচীমাতার গর্ভে আবির্ভূত হয়ে ইনি জগৎপিতা স্বয়ং ভগবান ! এখন ইনি কেশব ভারতীর কাছ থেকে সন্ন্যাস নিয়েছেন আর এঁর নাম হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ।”

সার্বভৌম ভট্টাচার্য্য বললেন, “না, আমার তো ওকে ভগবান বলে মনে হচ্ছে না ।”

“তোমার কৃপা নাই, তাই তোমার মনে হচ্ছে না । আমার কৃপা আছে, তাই আমার মনে হচ্ছে ।”

ঈশ্বরের কৃপা-লেশ হয় ত’ যাহারে ।
সেই ত’ ঈশ্বর-তত্ত্ব জানিবারে পারে ॥

(চৈঃ চঃ ২/৬/৮৩)

ঈশ্বর যদি আপনাকে কৃপা করেন, তাহলে আপনি ঈশ্বরকে জানতে পারবেন । গুরুকে জানা সহজ নয়—যদি গুরু আপনাকে কৃপা করেন, তাহলে গুরুকে জানা যায় । গুরু কৃপা না করলে গুরুকে কখনও জানা যায় না ।

তাই গোপীনাথ আচার্য্য বললেন, “আমার কৃপা আছে, আমি এঁকে চিনতে পারছি ।”

সার্বভৌম ভট্টাচার্য্য বিরক্ত হয়ে বললেন, “যাই হোক, তুমি এখন যাও, প্রসাদ নাও, পরে কথা বলব ।”

এদিকে নিত্যানন্দ প্রভু, মুকুন্দ ও গদাধর (এক গ্রন্থে এইতিনজনটি লেখা হয়, অন্য গ্রন্থে পাঁচজন লেখা হয়) ছুটে ছুটে পুরীতে এসেছিলেন । এসে জগন্নাথ মন্দিরে একটি লোককে জিজ্ঞেস করলেন, “এরকম একজন লোক কেহ এখানে এসেছিলেন, চৈতন্য মহাপ্রভুর নামে ?”

লোকটি তাঁদেরকে বললেন, “নামটা জানি না, কিন্তু একটু আগে একজন এসে মন্দিরের মধ্যে ঢুকতে যাচ্ছিল আর এখানে এসে হঠাৎ করে একবারে চিৎ হয়ে পড়ল, মুখ দিয়ে শুধু ফেনা বেরচ্ছে আর ‘জ-জ-গ-গ’ বলছে ।”

“সে কোথায় আছে ?”

“আমরা ওকে সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছি ।”

সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের বাড়ি এসে ভক্তরা দেখলেন যে, মহাপ্রভু ঘরের মধ্যে শুয়ে ছিলেন । নিত্যানন্দ প্রভু জানলেন মহাপ্রভু অজ্ঞান হয়ে পড়লে কী করতে হয়, তাই তিনি প্রভুর কাছে গিয়ে কানের মধ্যে “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে / হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে” বললেন । আস্তে আস্তে মহাপ্রভু কমল-লোচন খুললেন :

“তোমরা আমায় কোথায় নিয়ে এসেছ ?”—আস্তে আস্তে উঠে তিনি বসলেন—“আমি তো বৃন্দাবনে রাধাকৃষ্ণ লীলা দর্শন করছিলাম আর তোমরা কোথায় আমাকে নিয়ে এসেছ ?!”

তখন সার্বভৌম ভট্টাচার্য্য সবাইকে জগন্নাথ প্রসাদ দিলেন আর গোপীনাথ আচার্য্যকে বললেন, “মামীর বাড়িতে কেউ বাস করছে না, তাই তুমি একে ওখানে নিয়ে যাও । তুমি এর থাকার জন্য সব ব্যবস্থা করে দাও ।”

পরের দিন সার্বভৌম ভট্টাচার্য্য গোপীনাথ আচার্য্যকে বললেন, “এই ছেলে-সন্ন্যাসীর বিনীত-প্রকৃতি দেখে আমার খুব ভাল লাগছে । আমি ভাবছি ও এত অল্প বয়সে সন্ন্যাস নিয়ে কি করে সন্ন্যাস ধর্ম্ম রাখবেন ? তাই আমি ওকে বেদান্ত ও বৈরাগ্যেরমর্গ শিখাতে চাই, তার ফলে ও উত্তম সন্ন্যাসী হয়ে যেতে পারবে ।”

এটা শুনে গোপীনাথ আচার্য্যের মন খারাপ হয়ে গেল । তিনি বললেন, “তুমি কি জান না ও কে ? ও স্বয়ং ভগবান, আমি তোমাকে আগেই বলে দিলাম । তুমি কি করে ওকে শিক্ষা দিতে যাচ্ছ ?”

“কী বলছ তুমি ? আমি দেখছি তুমি সব জান, কিন্তু শাস্ত্রে বলেছে যে, কলিযুগে কোন অবতার নেই, সেইজন্যই ভগবানের নামও হচ্ছে ‘ত্রিযুগ’ ।”

“তুমি সব শাস্ত্র পড়েছ, কিন্তু তুমি কি ভাগবতম্ বা মহাভারত পড়েছ ? সেখানেই লেখা আছে যে, কলিযুগে অবতার আছেই—লীলা অবতার নেই, তবে ভগবান সাক্ষাৎ এসে যুগ-অবতাররূপে । তুমি এত বড় পণ্ডিত কিন্তু তোমার কৃপা-লেশই নেই কারণ ভগবান তোমার বাড়িতেও আছেন, কিন্তু তুমি ওঁকে চিনতে পারছ না । আমি বুঝি, এটা আসলে তোমার দোষ নয়, শাস্ত্রে লেখা আছে যে, কেউ জ্ঞান দ্বারা ভগবানকে বুঝতে পারে না ।”

“তার মানে আমার কৃপা নেই আর তোমার আছে ? তার প্রমাণ কী ?”

“আমি ওঁকে চিনতে পারছি আর তুমি পারছ না, সেইটা হচ্ছে কৃপার প্রমাণ । আমি শাস্ত্র থেকে অনেক প্রমাণ দিতে পারি কিন্তু তোমার হৃদয় মায়াবাদী-ভাষ্য ভর্তি, তাই তোমাকে কিছু বলা যেমন ঊষরভূমিতে বীজের রোপন । ভগবান যখন তোমাকে কৃপা করবেন, তখন তুমি এটা বুঝতে পারবে ।”

রেগে গিয়ে সার্বভৌম ভট্টাচার্য্য বললেন, “তাই না ? যাও, প্রসাদ নিয়ে ওকে নিয়ে এস । আমি নিজে দেখব ! পরে তুমি আমাকে ভাল করে শিখাতে পারবে !”

 


 

← গ্রন্থাগারে ফিরে

 

অনন্তশ্রীবিভূষিত ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংসকুলচূড়ামণি বিশ্ববরেণ্য জগদ্­গুরু শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের পদ্মমুখের হরিকথামৃত


সূচীপত্র:

সূচনা : শ্রীজগন্নাথদেব
মহাপ্রভুর ইচ্ছা ও পুরীতে যাত্রার আরম্ভ
মহাপ্রভুর পুরীতে যাত্রা :
শান্তিপুর
রেমুণা
সাক্ষীগোপাল
ভুবনেশ্বর
ভুবনেশ্বর শ্রীলিঙ্গরাজ
আঠারনালা
শ্রীপুরীধামে :
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের সথে মিলন
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের শিক্ষা
কাশী মিশ্রের কথা
রামানন্দ রায়ের পুনর্মিলন ও প্রকৃতি
ভক্তদের সহিত শ্রীক্ষেত্রে বার্ষিক মিলন
রাজা প্রতাপরুদ্রের প্রতি কৃপা
গোবিন্দ প্রভুর শিক্ষা
দর্শনের আর্ত্তি
শ্রীআলালনাথের কথা
কালিদাসের ব্যতিক্রম
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের প্রসাদে রুচি
“ষাঠী বিধবা হয়ে যাক !”
গঙ্গা মাতা গোস্বামিণী
শ্রীগোপাল গুরুর কথা
শ্রীজগদানন্দ পণ্ডিতের প্রেম
শ্রীলসনাতন গোস্বামীর সঙ্গ
রামচন্দ্র পুরীর কথা
শ্রীপরমানন্দ পুরীর ভক্তিকূপ
দামোদর পণ্ডিতের বিদায়
ছোট হরিদাসের শাস্তি
গুণ্ডিচা-মার্জ্জন লীলা
শ্রীনারায়ণ ছাতায়
চটকপর্ব্বতের কথা
গম্ভীরা—বিরহের জ্বলন্ত ঘর
শ্রীল হরিদাসঠাকুর : নামাচার্য্য শিরোমণি
শ্রীগদাধর পণ্ডিত : মহাপ্রভুর ছায়া
শ্রীরঘুনাথদাস গোস্বামীর শ্রীপুরীধামে আগমন ও ভজন
পরিশেষ

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥