শ্রীউপদেশ


সূচনা : আমাদের একমাত্র কৃত্য

ওঁ বিষ্ণুপাদ জগদ্গুরু
শ্রীলভক্তি সুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ কর্ত্তৃক

 

আমরা প্রতি অমাবস্যা তিথিতে আমাদের গুরুমহারাজের শৈলীতে ভগবান গৌরসুন্দর, নিত্যানন্দ প্রভু, গান্ধর্ব্বা-গোবিন্দসুন্দর, গিরিধারীজীউ এবং আমাদের গুরু-বর্গে তাঁদের তৃপ্তির জন্যে একটু বিশেষ ভাবেতে ভোগ-রাগের ব্যবস্থা করে থাকি । শাস্ত্রে বলেছেন :

স্মর্ত্তব্যঃ সততং বিষ্ণুর্বিস্মর্ত্তব্যো ন জাতুচিৎ ।
সর্ব্বে বিধিনিষেধাঃ স্যুরেতয়োরেব কিঙ্করাঃ ॥

(পদ্মপুরাণ)

আমাদের হিন্দুধর্ম্মেতে বহু বিধি-নিষেধ আছে । যে সমস্ত শাস্ত্রীয় অনুশাসন রয়েছে সকলের একটা মূল উদ্দেশ্য আছে—ভগবানকে সবসময় স্মরণ করা । মূল কথা হচ্ছে ভগবানকে ভুলতে হবে না এবং ভগবানকে সবসময়ের জন্য স্মরণ করতে হবে । সেটাই আমরা পারি না, আমাদের অসুবিধা হচ্ছে সেইখানেতে : আমরা নানারকম বিষয়ের মধ্যে নিজে ডুবে আছি এবং সে বিষয়ের মধ্যে থেকে বহুরকমের কাজের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছি । যে ব্যক্তি জন্ম গ্রহণ হয়েছে, তার মৃত্যু আছে, জরা আছে, ব্যাধি আছে, আত্মীয়ও আছে, স্বজনও আছে, দেব আছে—নানারকমের একটা পরিস্থিতির মধ্যে নিজেকে আমরা ঢুকিয়ে নিয়েছি । তার ফলেতে ভগবানে স্মরণ আমাদের কাছে সময় তক্ষুণি ক্ষয়ে পড়েছে কিন্তু আমাদের নিজেদের স্বার্থ যে কতটা ব্যাহত হচ্ছে সেটা আমরা জানি না, যার জন্যেই শাস্ত্রীয় এই সমস্ত অনুশাসনের প্রয়োজন হয়েছে ।

গীতায় ভগবান বলেছেন,

যৎ করোষি যদশ্নাসি যজ্জুহোষি দদাসি যৎ ।
যত্তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ কুরুষ্ব মদর্পণম্ ॥

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, ৯/২৭)

“তোমার সমস্ত এনার্জিটা আমি চাই । তুমি আমার এবং আমি তোমার । এর মাঝখানেতে আর কোনরকম ভাগবাঁটোয়ারার ব্যবস্থা আমি সহ্য করতে পারি না ।” যে অন্য কেউ এর মাঝখান থেকে লুটে খেয়ে নিয়ে বেরিয়ে যাবে, সেও ভগবান সহ্য করতে পারেন না । তাহলে এ কথা বলা হয় এখানে, “যৎ করোষি যদশ্নাসি”—আমি যা খাব, তাও ভগবানকে দিতে হবে, আমি যা করব তাও ভগবানকে দিতে হবে । “যজ্জুহোষি” মানে আমি যা ভগবানের উপাসনার জন্য (সমস্ত ক্রিয়া-কার্য-কর্ম্ম) করব তাও ভগবানকেই দিতে হবে । এমন কি ভগবানের চেষ্টাটা আমরা দেখতে পাই  :  বেদ-বেদান্ত-উপনিষদ সর্ব্বত্র ভগবান আমাদিগকে উপদেশ করে গিয়েছেন যে, তোমরা আমার ভজনা কর, আবার সমস্ত মন্ত্রের মধ্যে নিজেকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন । আমরা দুর্গা পূজাই করি, আর কালী পূজাই করি, আর পিতৃ-শ্রদ্ধাই করি, আর হোম-যজ্ঞই করি প্রভৃতি—সব কিছু ক্রিয়াকলাপের মধ্যে ভগবান । তিনি কিন্তু ওই শেয়ার নিতে রাজি নন । “তাঁর একটাও যে শেয়ার আছে আমি সে তাঁকে দেব,” তাতে তিনি সন্তুষ্ট নন । আমি যা কিছু করলাম “কৃতৈতৎ কর্ম্মফলং শ্রীকৃষ্ণায় সমর্পিতমস্তু” !

একবারেই সবটা গ্রাস করার চেষ্টা । যা কিছু এতক্ষণ ধরে যজ্ঞ করলাম—তাই ব্রহ্মাকে দিলাম, অগ্নিকে দিলাম, বায়ুকে দিলাম, বরুণকে দিলাম, যার যা শেয়ার সকলকে দিয়ে দিলাম—কিন্তু আমি যে রেজাল্টটা পেলাম, সেটা কিন্তু আমার রাখার অধিকার নেই । “কৃতৈতৎ কর্ম্মফলং” এই যে আমি যাঁর যজ্ঞ, ওই যে অনুষ্ঠান আমি করলাম বা যা কিছু করলাম, এর যে একটা ফল, এর যে একটা ভালো রেজাল্ট রয়েছে সেইটার কিন্তু মালিক আমি নয়—”শ্রীকৃষ্ণায় সমর্পিতমস্তু” ।

এইটা যদি করতে পারি তবে এটা কর্ম্ম-মিশ্র ভক্তির অন্তর্গত, তাহলে শুদ্ধভক্তি হবে । শুদ্ধভক্তির তবু কথাই নেই, সেখানে “অল রাইটস রিজার্ভড” (সর্ব্বস্বত্ব সংরক্ষিত)—গুরুমহারাজ বলতেন যে, সবটা ভগবানের জন্যে রিজার্ভ করা আছে এবং তিনি তার মালিক ।

পরমহংস কাকে বলে ? সব জিনিসের মধ্যে যিনি ভগবানের ইন্টারেস্টে দেখেন, তিনি হচ্ছেন পরমহংস । তিনি ভগবানকে দেখেন : যা কিছু করছেন সমস্ত বিষয়ের মধ্যে তিনি ভগবানের প্রাপ্তিটা দেখেন । ভগবানের শেয়ারটা তিনি অনুভব করতে পারেন যে, এটা আমার নয়, এটা ভগবানের । এই অনুভূতিটাই হচ্চেগে পরমহংসের অনুভূতি ।

“যজ্জুহোষি দদাসি যৎ, যত্তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ কুরুষ্ব মদর্পণম্ ।” এই কর্ম্ম-মিশ্র ভক্তি থেকে অনেক উচ্চ স্থায়ী জিনিস হচ্চেগে শুদ্ধভক্তি, সেখানে আর অন্য কাউকে ঢুকতে দিতে রাজি নয়, সেখানে যে দিন-রাত হচ্ছে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে চব্বিশটি ঘন্টা ভগবান নিজের পাওনা-গণ্ডা সব বুঝে নিতে চান এবং সেটা যিনি বুঝ করে দিতে পারেন তিনি হচ্ছেন শুদ্ধভক্ত ।

দেবর্ষিভূতাপ্তনৃণাং পিতৃণাং
ন কিঙ্করো নায়মৃণী চ রাজন্ ।
সর্ব্বাত্মনা যঃ সরণং সরণ্যং
গতো মুকুন্দং পরিহৃত্য কর্ত্তম্ ॥

“যিনি অহংভাব পরিত্যাগপূর্ব্বক সর্ব্বতোভাবে পরমশরণীয় শ্রীহরির শরণাগত হ’ন, তিনি সাধারণ মানুষের ন্যায় দেবতা, ঋষি, ভূতগণ, স্বজন বা পিতৃলোকের কিঙ্কর বা ঋণগ্রস্ত হ’ন না ।”

(শ্রীমদ্ভাগবতম্, ১১/৫/৪১)

এই হচ্ছে শ্রীমদ্ভাগবতের কথা । দেব-ঋষি-পিতৃ এই সকলের কাছেটা আমাদের একটা ঋণ আছে । আজকে মহালয়া, অমাবস্যা—আজকে সমস্ত পিতৃ পুরুষগণ আমাদের উৎপন্নে তাকিয়ে থাকেন । কেন ? আজকের দিনে গঙ্গা জলে কিছু তর্পণ করলে, তারা সকলে পরম তৃপ্তি লাভ করেন এবং স্বর্গপথের আলোক তারা আজকের দিনে দর্শন করবার একটা সৌভাগ্য তাদের হয় । অনেকই অনেকরকম কর্ম্মের দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন দশা প্রাপ্ত হয় ।

অশরীর অবস্থা হলেও তাদের মানসিক একটা ফর্ম (রূপ) রয়েছে । মহামায়ার জগতে যে রয়েছে সেখানে তারা সবসময় বিচরণ করছেন, যম-নিয়ম কর্ম্ম করে গিয়েছেন, সেই সেই কর্ম্মের ফল তারা লাভ করছেন । কেউ হয়তো অপরকে কোনদিন কিছু দান করেননি কিন্তু তাদের আশা এত বেড়ে যায়, বিশেষ করে আজকে অমাবস্যা তিথিতে—সমস্ত আত্মা তাকিয়ে থাকে যে, “আমাদের সন্তানাদি যারা আমাদের বংশতে এসেছে, তারা কখন আমাদিগকে তর্পণ করবে ? কখন তারা আমাদিগকে একটু জল দেবে ?” সেইটা যদি গঙ্গা জল হয় (ভগবানের পাদপদ্ম ধৌত জল), তাহলে গঙ্গার সম্পর্কতে ভগবানের সঙ্গে একটা সম্পর্ক হয়ে যাবে এবং তারা মস্ত বড় লাইট (কিরণ) দেখে সেই লাইটের দিকে ছুটে যেতে পারবেন ।

সবাই জানেন যে, দেবতাদের কাছে আমাদের ঋণ আছে,— দেবতারা আমাদিগকে জল দেন, ফল দেন, খাবার দেন, আমাদের পারমার্থিক আনুকূল্য করেন এবং তারা আমাদের কাছ থেকেও আশা (পূজা-আশা) করেন । ইন্দ্র আমাদিগকে যেমন জল-শস্য ইত্যাদি সমস্ত বন্দোবস্ত করছেন কিন্তু যদি আমরা তাঁর পাওনা না দেই, তাহলে তিনি সন্তুষ্ট হবে না । এবং automatically (স্বয়ংক্রিয়ভাবে) কি হবে ? এমনকি আপনার science (বিজ্ঞানে) বলা হয় যে, “to every action there is equal and opposite reaction” (প্রত্যেকটা ক্রিয়ার একটা প্রতিক্রিয়া আছে), সেইরকম আমরা যখন অপরের কাছ থেকে কিছু নেব, আমরা তখন তাকে কিছু দিতে বাধ্য থাকি । এইজন্য, দেবতারদের কাছ থেকে আমরা যে সমস্ত জিনিস নেই—তাদের আশীর্বাদ থেকে আরম্ভ করে সব কিছু—সেটাও আমরা বিনিময়েতে তাঁদিকে পূজা করতে হবে এবং তাঁদের পাওনাটা তাদিগকে বুঝ করে দিতে হবে । ঋষিদের কাছেও তাই—ঋষিদের কাছে আমরা ঋণী কেননা ঋষিগণ আমাদিগকে শাস্ত্রীয় জ্ঞান দান করে গিয়েছেন । যাঁর থেকে আমাদের পারমার্থিক জীবন অত্যন্ত সম্পন্ন হয়ে ভাগবতপাদপদ্মে সেবা লাভ করি, অতএব তাঁদের কাছেও আমরা ঋণী । পিতৃ-পুরুষগণ আমাদিগকে জন্ম দিয়েছেন, লালন-পালন করেছেন, তাঁদের কাছেও আমরা ঋণী । পিপীলিকা থেকে আরম্ভ করে, চন্দ্র, সূর্য—সকলের কাছেই আমার ঋণের পরিমাণ বেড়ে চলেছে । এ জগতে জীবনধারণের জন্যে আমরা সবসময় ঋণের বোঝা বাড়াতে থাকি । আমি যখন নিঃশ্বাস-প্রস্বাস নিছি, বহু সংখ্যা জীবকে হত্যা করি, তবে আমাদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে ; যখন রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছি, তখন অনেক জীব-জন্তু আমার পায়ে চাপে মারা পড়ে যাচ্ছে । আমি যখন ঘুমাচ্ছি বা খাচ্ছি সেখানেও অনেককে হত্যা করা হচ্ছে—প্রত্যেকের কাছে আমি ঋণগ্রস্ত । এ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটাই মাত্র উপায়—এইজন্যে ভগবান বলেন,

দেবর্ষিভূতাপ্তনৃণাং পিতৃণাং
ন কিঙ্করো নায়মৃণী চ রাজন্ ।
সর্ব্বাত্মনা যঃ সরণং সরণ্যং
গতো মুকুন্দং পরিহৃত্য কর্ত্তম্ ॥

“যিনি অহংভাব পরিত্যাগপূর্ব্বক সর্ব্বতোভাবে পরমশরণীয় শ্রীহরির শরণাগত হ’ন, তিনি সাধারণ মানুষের ন্যায় দেবতা, ঋষি, ভূতগণ, স্বজন বা পিতৃলোকের কিঙ্কর বা ঋণগ্রস্ত হ’ন না ।”

(শ্রীমদ্ভাগবতম্, ১১/৫/৪১)

শ্রীমদ্ভগবদগীতা তাও বলেছেন—একই ধরনের কথা । ভগবান নিজে বলছেন,

সর্ব্বধর্ম্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ।
অহং ত্বাং সর্ব্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥

“সর্ব্বপ্রকার ধর্ম্ম সম্পূর্ণ বিসর্জ্জন দিয়া একমাত্র আমারই শরণ লও । আমি তোমাকে সর্ব্বপ্রকার পাপ হইতে মুক্ত করিব, তুমি শোক করিও না ।”

(শ্রীমদ্ভাগবদগীতা, ১৮/৬৬)

“সমস্ত ধর্ম্ম তুমি পরিত্যাগ কর (ধর্ম্ম বলতে কর্তব্য, duty) ।” এবং তোমার আর যে কিছু চরণ-করণই আছে, সেগুলোও তুমি যদি করতে চাও, তাতে তুমি জীবনে শেষ করতে পারবে না । উপরন্তু এক জায়গায় খাল করতে গিয়ে আর এক জায়গায় উঁচু হয়ে যাবে, আবার এক জায়গায় উঁচু করতে গিয়ে আর এক জায়গায় খাল করতে যাবে । ভগবান বলছেন যে, “আমার capacity (শক্তি) অত্যন্ত বেশি, তুমি আমার শরণাগত হও । তোমার যা কিছু ক্রিয়াকলাপ, কাজ-কর্ম্ম, ভালো-মন্দ আছে, তুমি সবটা আমাকে সমর্পণ করে দিয়ে আমার হয়ে জীবনধারণ কর—তাহলে তোমার কোনরকম ঋণ থাকবে না জগতের কাছে । আর যদি তুমি মনে কর যে, তোমার পাপ হবে (তোমার একটা কর্তব্য ছিল, সেটা করবে না, তাহলে তোমার পাপ হবে), আমি তোমাকে আশ্বাস দিতে পারি যে, তোমার এরজন্যে যা কিছু প্রত্যবায় হবে, এরজন্যে যা কিছু অসুবিধা হবে, সেটা আমি সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিচ্ছি । তোমার যদি কোন পাপ হয়, আমি তোমাকে সে পাপ থেকে মুক্ত করব ; তোমার যদি কোন deficiency (অভাব) আসে, আমি সেখান থেকে তোমাকে নিষ্কৃতি দান করব । তুমি তোমার নিজের ইন্টারেস্টটা না রেখে আমার ইন্টারেস্টে কাজ কর, তোমার সব কাজ সত্যগত লাভ করতে পারবে ।”

দেব, ঋষি, পিতৃর দিকে কভু না রহে ঋণী যে হরিভজন করে । যে সম্পূর্ণ রূপে ভগবানের চরণে আত্মসমর্পণ করে, সে চব্বিশ ঘন্টা তাঁর সেবার জন্য নিজেকে নিযুক্ত করে থাকে ; তার আর পৃথিবীতে কোন ঋণ থাকে না—দেবতাদের কাছেও না, ঋষিদের কাছেও না, পিতৃগণের কাছেও না ।

ভগবানের কাছে সর্ব্বতোভাবে আত্মসমর্পণ করা বা সর্ব্বতোভাবে ভগবানের ইন্টারেস্টে নিজের সমস্ত ইন্টারেস্ট মিশিয়ে দেওয়া থাকে :

তোমার ইচ্ছায় মোর ইচ্ছা মিশাইল ।
ভকতিবিনোদ আজ আপনে ভুলিল ॥

(শরণাগতি, ১২)

এই কথা বলেছেন শ্রীলভক্তিবিনোদ ঠাকুর । “মানস, দেহ, গেহ, যা কিছু মোর আর্পিলুঁ তুয়া পদে নন্দকিশোর” (শরণাগতি, ১১) । “হে নন্দকিশোর ! আমার মন, আমার দেহ, আমার ঘর, বাড়ি, আত্মীয়, স্বজন, বন্ধু, বান্ধব, যা কিছু আছে, সব আমি তোমাকে দিয়ে দিলাম । সম্পদে, বিপদে, জীবনে, মরণে, সর্ব্ব অবস্থাতে আমি তোমার আর তুমি আমার ।” আর একটি গানেও শ্রীলভক্তিবিনোদ ঠাকুর বলছেন, “আমি ত’ তোমার, তুমি ত’ আমার, কি কাজ অপর ধনে” (শরণাগতি, ১৬)—আমি যদি তোমার হয়ে যেতে পারি, automatically (স্বয়ংক্রিয়ভাবে) তুমি আমার হয়ে যাবে এবং তুমি যদি আমার হয়ে যাও, তাহলে আমার কোন অভাব থাকবে না ।

যস্মিন জ্ঞাতে সর্ব্বমিদং বিজ্ঞাতং ভবতি
যস্মিন প্রাপ্তে সর্ব্বমিদং প্রাপ্তং ভবতি
তদ্ বিজিজ্ঞাসস্ব তদেব ব্রহ্ম

“যাঁকে জানলে সব কিছু জানা হয়ে যায়, যাঁকে পেলে সব কিছু পাওয়া হয়ে যায়, সেই বস্তু হচ্ছেগে ব্রহ্ম বস্তু, সেই হচ্ছেগে ভগবান ।” তাই আমার অভাব কিসের ? আমরা শোক করছি, শোকটা কোথা থেকে আসছে ? আমাদের এই জগতে শোচনীয় বস্তু ভয়ও রয়েছে—আমরা কিছু চাই কিন্তু সেটা না পেয়ে আমরা একটা আকাঙ্ক্ষা এবং অতৃপ্তি হয়ে যাই—সেটা বলতে শোক । কিন্তু আমার যদি সব কিছু পাওয়াই হয়ে যায়, তাহলে শোকের কোন কারণ থাকে না । এইজন্যে ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বলেছেন,

অশোক-অভয়, অমৃত-আধার
তোমার চরণদ্বয় ।
তাহাতে এখন বিশ্রাম লভিয়া
ছাড়িনু ভবের ভয় ॥

(শরণাগতি, ১৬)

ভগবান নিজে মুখে যখন বলছেন যে, তোমার সব দায়-দায়িত্ব আমি নিয়ে নিলাম, তখন আমাদের ভাবনার আর কি আছে ? তখন আমাদের দুর্ভাবনা করার কিছু নেই । আমাদের একটাই জীবন কৃত্য, সেটা হচ্ছে—

স্মর্ত্তব্যঃ সততং বিষ্ণুর্বিস্মর্ত্তব্যো ন জাতুচিৎ ।
সর্ব্বে বিধিনিষেধাঃ স্যুরেতয়োরেব কিঙ্করাঃ ॥

(পদ্মপুরাণ)

সমস্ত বিধি, নিষেধ, যা কিছু আছে, এই বলেছেন : ভগবানকে স্মরণে রাখতে হবে, ভগবানকে ভুলতে হবে না ।

আমরা তো গুরুমহারাজের অনুগত হয়ে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসেছি, কিন্তু এটার কোন ইতিহাস করা নেই, এর যা কিছু সেটা গুরুমহারাজই জানেন এবং মহাপ্রভু জানেন যে, আমরা কে কতটা পার্সেন্ট নিষ্কপটে ভগবানকে দিতে পেরেছি, গুরুমহারাজকে আমরা কে কতটা নিজেকে দিতে পেরেছি এবং টেস্ট করে আমাদের ফাইনাল রেজাল্ট আসবে, তখনই আমরা বুঝতে পারব আমাদের কি পরিচয় সত্যিকারের ।

জয় ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্যবর্য্য অষ্টোত্তরশতশ্রী

শ্রীমদ্ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ কী জয় !

 

— • • • —

 

 

← ১৯। নামরহস্যপটল গ্রন্থাগারে ফিরে →

 

সূচীপত্র:
সূচনা : আমাদের একমাত্র কৃত্য
১। ভক্তির অভাব
২। গৃহে আবদ্ধ
৩। মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
৪। জীবকে সত্য দয়া কি ?
৫। ভোগী নই ত্যাগীও নই
৬। শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
৭। ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
৮। ভগবানের চরণে পথ
৯। শান্তির গুপ্ত কথা
১০। শ্রীবামনদেবের কথা
১১। শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
১২। পূজনীয় বিসর্জন
১৩। ভক্ত ও নাপিত
১৪। চকচক করলেই সোনা হয় না
১৫। আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
১৬। দণ্ড মহৎসব
১৭। শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
১৮। মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
১৯। আমাদের একমাত্র উপায়
২০। পবিত্র জীবন
২১। শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
২২। আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥