আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি প্রণামী ENGLISH
 

শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠের সম্পর্কে

শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ কি ও তাঁর বৈশিষ্ট্য

শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ কি ও তাঁর উদ্দেশ্য, প্রচার্য্য-বিষয় বা বৈশিষ্ট্যের কথা জগতে বোঝাইতে হইলে যেরূপ সুদুরূহ ব্যাপার, প্রচলিত ভাব-ধারায় বিভাবিত ও অনুপ্রাণিত বিশ্বের তাহা আংশিকভাবে উপলব্ধি করাইবার চেষ্টাও ততোধিক গুরুতর কার্য্য । কিন্তু এই মঠের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য্য ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেব গোস্বামী মহারাজ ও তাঁর স্থলাভিষিক্ত সেবাইত আচার্য্য ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেব গোস্বামী মহারাজ ও তাঁর মনোনীত বর্তমান সভাপতি আচার্য্য ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের পথ অনুসরণ করে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা শুদ্ধভাবে আচার-প্রচারের মাধ্যমে ভারতসহ সারা পৃথিবীতে বদ্ধ জীবকে উদ্ধারের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন ।

বিশ্বব্যাপী শ্রীচৈতন্য মঠ ও গৌড়ীয় মঠের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য্য ভগবান শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত গোস্বামী ঠাকুর প্রভুপাদ সারা পৃথিবীতে মহাপ্রভুর বাণী প্রচারের জন্য যে যে দিকপাল আচার্য্যগণকে সাথে পেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেব গোস্বামী মহারাজ ছিলেন প্রকৃত সংস্কৃত পণ্ডিত ও মহা উপদেশক । শ্রীল শ্রীধর মহারাজ ১৯২৬ সালে তাঁর গুরুদেব শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের চরণাশ্রয় প্রাপ্ত হন । শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজের খুব দৃঢ় পাণ্ডিত্য ও অন্যান্য বৈষ্ণবীয় গুণ দেখে ১৯৩০ সালে তাঁকে সন্ন্যাস প্রদান করেন । শ্রীল শ্রীধর মহারাজের রচিত শ্রীপ্রভুপাদপদ্ম-স্তবকঃ “সুজনার্ব্বুদরাধিতপাদযুগং” ইহা সকল ভক্তগণের কাছেই অত্যন্ত প্রিয় এবং সকল গৌড়ীয় মঠে ইহা কীর্ত্তন করা হয় । শ্রীল শ্রীধর দেব গোস্বামী মহারাজের রচিত “শ্রীমদ্ভক্তিবিনোদবিরহদশকম্” দেখে শ্রীল প্রভুপাদ অত্যন্ত আনন্দ লাভ করেছিলেন । আপনারা সকলেই জানেন শ্রীল প্রভুপাদের অপ্রকটের পূর্ব মুহূর্তে শ্রীল শ্রীধর মহারাজের মুখে “শ্রীরূপমঞ্জরীপদ” এই কীর্ত্তনটি শুনে শ্রীল প্রভুপাদের হৃদয় স্পর্শ করেছিল ।

শ্রীল প্রভুপাদের অপ্রকটের পর শ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হয়ে বৃন্দাবনে চলে গেলেন । তিনি নন্দ গ্রামের নিকট পবন সরোবরে অবস্থান করেছিলেন । সেই সময় তিনি শ্রীল প্রভুপাদ ও শ্রীমতি রাধারাণীর নিকট থেকে আকাশবাণী প্রাপ্ত হয়েছিলেন । শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে “রূপ-রঘুনাথের কথা প্রচার করে আপনাকে বদ্ধ জীব উদ্ধার করবার জন্য রেখে আসছিলাম, আর আপনি কিনা নির্জনে ভজন করবার জন্য বৃন্দাবনে চলে এলেন”। সেই আকাশবাণী পেয়ে এক মুহূর্ত দেরি না করে শ্রীল শ্রীধর মহারাজ শ্রীনবদ্বীপ ধামে শ্রীকোলদ্বীপের অন্তর্গত শ্রীকোলের গঞ্জে চলে এলেন । তথায় গঙ্গাতীর নিকটবর্তীর স্থানে একটি কুঁড়ের ঘর স্থাপন করে তার নাম দিলেন শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ । সেটা ১৯৪১ সাল । তখন থেকেই শ্রীল প্রভুপাদের অনেক শিষ্যবর্গ শ্রীল মহারাজের নিকট আসতেন । তার মধ্যে অনেেকই শ্রীল মহারাজের নিকট সন্ন্যাস মন্ত্রে দীক্ষিত হন ।

ইস্কন প্রতিষ্ঠাতা আচার্য্য ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী মহারাজ যখন বিভিন্ন দেশে প্রচারে ছিলেন তখন তাঁর শিষ্যগণ জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে “আপনার পরে আমরা কার কাছে হরিকথা শ্রবণ করব” ? তার উত্তরে শ্রীল স্বামী মহারাজ বলেছিলেন যে “শ্রীল শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ আমার শিক্ষাগুরু এবং প্রকৃত বৈষ্ণব ও পণ্ডিত । তোমরা যদি তাঁর নিকট গিয়ে হরিকথা শ্রবণ কর, তাহলে তোমরা পারমার্থিক জগতে অনেক উন্নতি লাভ করিতে পারিবে এবং আমিও আনন্দিত হইব ।” এর পর থেকেই প্রচুর প্রাচ্য পাশ্চাত্য দেশের ভক্তগণ শ্রীল শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজের শরণাগত হয়েছেন ।

১৯৪৭ সালে শ্রীল ভক্তিসুন্দর দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীল গুরুমহারাজের চরণে আশ্রয় নেন । প্রথমে ব্রহ্মচর্য্য দীক্ষা নেওয়ার পর তাঁর নাম হয় শ্রী গৌরেন্দু ব্রহ্মচারী । ব্রহ্মচর্য্য অবস্থাতেই শ্রীল গুরুদেব শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের অনেক সেবাকার্য্য করে শ্রীল শ্রীধর মহারাজকে অনেক সহযোগিতা করেছেন । ১৯৮৫ সালে শ্রীল শ্রীধর দেব গোস্বামী মহারাজ শ্রীগুরুপাদপদ্মকে সন্ন্যাস প্রদান করেন এবং তাঁর নাম শ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেব গোস্বামী দিয়ে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের সমস্ত ভার অর্পণ করেন । ১৯৮৮ সালে শ্রীল গুরু মহারাজের অপ্রকটের পর থেকে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের ১৩০টি শাখা স্থাপন করে শ্রীচেতন্য বাণী প্রচার করেছেন । ১৯৯২ সালে শ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীল গুরুদেবের চরণে আশ্রিত হন । প্রথমে গুরুদেবের কাছ থেকে আশ্রয়প্রাপ্ত হয়ে তাঁর ব্রহ্মচর্য্য নাম হয় শ্রীবিনোদ রঞ্জন ব্রহ্মচারী । সেই থেকে তিনি গুরুদেবের আদেশ পালন করে ভারতে ও পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন প্রান্তে শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের শাখা বৃদ্ধি প্রাপ্ত করেন । ১৯৯৯ সালে শ্রীল গুরুদেব তাঁর প্রতিভা দেখে সন্ন্যাস প্রদান করেন। তাঁর সন্ন্যাস নাম হয় শ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ । তিনি শ্রীল শ্রীধর মহারাজের অনুপ্রেরণায় ও শ্রীল গুরুদেবের প্রবল ইচ্ছায় তিনি নবদ্বীপস্থিত শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের গোবিন্দ কুন্ড সংস্কার করে শ্রীগিরিরাজ মন্দির ও শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি একচক্রায় শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর আবির্ভাব স্থানে শ্রীগৌরনিত্যানন্দের শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন । তারপর ২০০৯ সালে শ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেব গোস্বামী মহারাজ তাঁর শুভার্বিভাব দিনে সমস্ত দেশী-বিদেশী ভক্তগণের সম্মুখে শ্রীভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজকে শ্রীমঠের পরবর্তী আচার্য্য সভাপতি হিসাবে ঘোষণা করেন ও মনোনীত করেন । ২০১০ সালে শ্রীল গুরুদেবের অপ্রকটের পর অদ্যাবধি তিনি প্রবল চেষ্টায় শ্রীগুরুদেবের আর্শীবাদে তিনি দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় মঠ স্থাপন করে শ্রীল গুরুদেবের ইচ্ছা পূরণ করে যাচ্ছেন ।

নিম্নে শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের অসম্পূর্ণ ভাবে দিক দর্শন করিবার চেষ্টা হইল ।

১। জগতে যে-সকল প্রতিষ্ঠান আছে, শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ তাহাদের অন্যতম বা তাহাদের প্রতিযোগী কিংবা তাহাদের সহিত প্রতিযোগিতা-মূলক তুলনায় আপনাকে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ বলিয়া দাবী করে না, কারণ জগতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই ন্যূনাধিক হয় ধর্ম্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষাভিসন্ধি, না হয় ভক্তির নামে মনোধর্ম্মের প্রচারকরূপে আত্মপ্রকাশ করিয়া থাকে ।

২। শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ অহৈতুকী ভগবদ্ভক্তির অনুশীলনকারী প্রচারক । জগতে অহৈতুকী ভক্তির অনুশীলনের নামে মিছাভক্তির অনুশীলন বা ভক্তির বাহ্যভাণের অনুষ্ঠান-সমূহের যে অভাব আছে, তাহা নহে; সেইরূপ ভক্তির অভিনয় ও তাহার নেপথ্যে অন্যাভিলাষ বা ধর্ম্মার্থকাম-মোক্ষ বাসনার যে তাণ্ডব হইতেছে, তাহা হইতে সুরক্ষিত হইবার জন্যই উহাদের স্বরূপ বিশ্লেষণ পূর্ব্বক শুদ্ধভক্তির দূর্গের পরিখা নির্ম্মাণ করা—শ্রী মঠের একটি বৈশিষ্ট্য ।

৩। শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ ভক্তিকে দেহ বা মনের বৃত্তিবিশেষ জ্ঞান করেন না । ভক্তিকে সর্ব্বোপাধি-রহিত কৃষ্ণনিষ্ঠ আত্মার অপ্রতিহতা, অহৈতুকী, স্বাভাবিকী, নিত্য বৃত্তি বলিয়া উপলব্ধি করেন । অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ‘ভক্তি’ শব্দটি স্বীকার করেন, এমন কি কেহ কেহ ভক্তিকে মৌখিকভাবে চতুর্ব্বর্গ হইতে শ্রেষ্ঠও বলেন; কেহ বা কর্ম্ম-জ্ঞান-যোগাদির সহিত ভক্তিকে সমান অর্থাৎ উহাদেরই অন্যতম উপায় বিশেষ মনে করেন; কেহ বা মৌখিকভাবে কর্ম্ম-জ্ঞানাদি হইতে ভক্তির শ্রেষ্ঠত্বও স্বীকার করেন; কিন্তু তাঁহারা সকলেই ভক্তিকে ন্যূনাধিক মনেরই বৃত্তিবিশেষ বলিয়া জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বরণ করিয়া লন । শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ ভক্তির সহিত অন্যান্য মনোবৃত্তির কোনপ্রকার জোড়া-তালি দিতে বা আপোষ করিতে প্রস্তুত নহেন ।

৪। মনোধর্ম্মের গোঁড়ামি ও তিক্ত অভিজ্ঞতার পুত্ররূপে তথাকথিত সমন্বয়বাদ যে ‘প্রচ্ছন্ন গোঁড়ামির ধর্ম্ম’ বা ‘যথেচ্ছ ধর্ম্মবাদ’ সৃষ্টি করিয়াছে, সেইরূপ কোন প্রকার গোঁড়ামির প্রচারও শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের বার্ত্তা নহে । অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাস্তব সত্যকে ‘সত্য’ বলিলে, “একমেবাদ্বিতীয়ম্” পরব্রহ্মকে ‘অদ্বিতীয়’ বলিলে “ন তৎসমশ্চাভ্যধিকশ্চ দৃশ্যতে”—শ্রুতিমন্ত্রানুসারে পরমতত্ত্বকে ‘অসমোর্দ্ধ (যাহার সমান বা যাহা হইতে বড় কেহ নাই) বলিলে, পুত্রের একমাত্র পিতাকে ‘ইনিই পিতা, অপরে পিতা নহে’, সতীর ‘ইনিই পতি, অপরে আমার পতি নহে’ বলিলে, পুত্রের একমাত্র পিতাকে ‘ইনিই পিতা, অপরে পিতা নহে”, সতীর ‘ইনিই পতি, অপরে আমার পতি নহে’ বলিলে অপরের নিকট বা সাধারণের নিকট ঐসকল ব্যক্তির ঐরূপ উক্তিকে ‘গোঁড়ামি’ বা ‘দাম্ভিকতা’ বলিয়া যাহা মনে হয়, তাহা অতত্ত্বজ্ঞতা অর্থাৎ সম্বন্ধ-জ্ঞানের অভাব-বোধক । শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ এই বাস্তব সত্যনিষ্ঠাকে লোকপ্রিয়তা ও জনমতের যূপকাষ্ঠে বলি দিতে প্রস্তুত নহে ।

৫। শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ বহির্ম্মুখ জনমতের সেবক নহেন, কিন্তু পরমেশ্বরের একান্ত জনগণের অভিমতের সেবক । শ্রী মঠের বিচারে প্রকৃতি-জনমত সত্যের দিঙ্নির্ণয়ের কম্পাস নহে, পরন্তু অপ্রাকৃত কৃষ্ণজনমতই সত্য নির্ণয়ের একমাত্র যন্ত্র । প্রকৃতিজনমত-প্রাধান্যের যুগে শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের এই সত্যনিষ্ঠাটি তাঁহাকে স্বতঃই জগতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান হইতে বিশিষ্ট করিয়া রাখিয়াছে ।

৬। অনর্থনিবৃত্তি অর্থাৎ এই জগতের অসুবিধা হইতে মুক্তি পর্য্যন্ত ফল লাভের কথাই শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের ভাণ্ডারের শেষ কথা নহে । অনর্থনিবৃত্তির পরে অর্থ-প্রবৃত্তি অর্থাৎ জাগতিক সর্ব্ববিধ অসুবিধা যে জন্য দূরে করা, সেই পরম প্রয়োজনের অনুশীলনের জন্য যত্নই মঠের মূল উদ্দেশ্য । কৃষ্ণ-প্রীতির প্রস্রবণ উন্মুক্তির জন্য মুক্তির প্রয়োজন । মুক্ত হইয়া কৃষ্ণপ্রীতির অফুরন্ত ও উত্তরোত্তর বর্দ্ধনশীল রাজ্যে প্রবেশ করাই মঠের উদ্দেশ্য ।

৭। অস্বচ্ছ গুরু অর্থাৎ যিনি শিষ্য্যের সম্মুখে দাঁড়াইলে শিষ্য তাঁহার মধ্য দিয়া কৃষ্ণ দেখিতে পারেন না, অর্থাৎ যিনি কৃষ্ণের প্রতিবন্ধকরূপে মধ্যপথে কেবল বঞ্চনা করিবার জন্য কপট বেশে উপস্থিত হন, সেইরূপ গুরু গ্রহণ করিয়াও বা শিষ্যের কল্পনার দ্বারা সংস্কার ও সৃষ্ট গুরু (?) নাম মাত্রে স্বীকার অথবা গুরুপাদপদ্মকে “ভগবান্” ও “ভক্তের” মধ্যপথে একটা অনাবশ্যক তৃতীয় ব্যাপার বিবেচনা করিয়া তাঁহাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করিয়াও অভীষ্টসিদ্ধি হয়, এইরূপ যে সকল কল্পনা ধর্ম্মের বাজারে প্রচ্ছন্ন বা অপ্রচ্ছন্নভাবে প্রচলিত হইয়াছে, শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ তাহাতে বাধা প্রদান করেন । গুরুপাদপদ্মের বরণ না হইলে এবং সেই গুরুপাদপদ্ম সম্পূর্ণ স্বচ্ছ না হইলে পতিত অনাশ্রিত জীব কখনও ভগবৎপদাশ্রিত হইতে পারে না,—এই সত্যের ঐকান্তিক ভাবে প্রচারও শ্রী মঠের একটি বৈশিষ্ট্য ।

৮। হরিকথা প্রচার করিতে হইলে আচার আবশ্যক এবং সেই আচার শাস্ত্রীয় সদাচার হওয়া উচিত । যে-সকল স্থানে কলি বাস করে—দ্যূত, পান, বৈধ স্ত্রী-আসক্তি বা অবৈধ স্ত্রী গ্রহণ, পশুবধ, ভোগের জন্য অর্থাসক্তি বা ভোগার্থ অর্থাদির প্রাপ্তি হইল না বলিয়া কামিনী-কাঞ্চনের প্রতি বিরাগ,—এই সকলই কলির সহচর । ভোগবৃদ্ধিতে যে কোন বস্তুর সঙ্গই যোষিৎ সঙ্গ । যাহারা ঐরূপ যোষিতের সঙ্গ করে, আর যাহারা প্রচ্ছন্নভাবেই হউক বা স্পষ্টভাবেই হউক একমাত্র অধোক্ষজ কৃষ্ণের সেবা ব্যতীত হৃদয়ে অন্য কোন প্রকার অভিলাষ পোষণ করে বা উহাকে বহুমানন করে বা উহাদের সহিত কৃষ্ণসেবাকে সমান মনে করে, তাহাদের সঙ্গই—অসৎসঙ্গ । জগতে যদি এই প্রকার লোক অধিক সংখ্যক থাকে, এমন কি, শতকরা প্রায় শতজনও থাকে, তথাপি তাহাদের সঙ্গ হইতে কৌশলে স্বতন্ত্র ও সতর্ক থাকিয়া নিজের ও পরের নিত্য উপকারের জন্য অপ্রাকৃত শ্রীহরির সেবানুশীলন ও হরিকথার প্রচারময় জীবন-যাপনই সদাচার-গ্রহণ । এই সদাচার গ্রহণে কোন প্রকার আপোষ য়া গোঁজামিলের আবিলতা প্রবেশ না করাইয়া একান্তভাবে সদাচারের অনুসরণই শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের বৈশিষ্ট্য ।

৯। ধ্যান, ধারণা, তপঃ, ব্রত, কর্ম্ম, ধর্ম্ম, (পাপ বা পুণ্য), লোকরঞ্জন বা লোকের পরামর্শানুসারে ধর্ম্মের অনুষ্ঠানগুলিকে কাটিয়া ছাঁটিয়া সংস্কার করা কিংবা সামাজিক রাজনৈতিক কোন প্রকার আন্দোলনকে পরমার্থের বাহক করিয়া লওয়া বা প্রচ্ছন্নভাবে মিশ্রিত, তন্মধ্যে প্রবিষ্ট বা তদন্তর্ভুক্ত করিয়া জাগতিক কোন না কোন প্রকার সুবিধাবাদের অন্বেষণ শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের প্রচারে নাই । একমাত্র স্বরাট্ লীলা-পুরুষোত্তম কৃষ্ণের সর্ব্বেন্দ্রিয়ের সার্ব্বকালীন সুখানুসন্ধানের চেতনের বৃত্তিকে প্রকাশ করাই শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের প্রচার্য্য বিষয় ।

১০। কৃষ্ণ কবিকল্পনার বস্তু নহেন, কৃষ্ণ ইতিহাসের পরীক্ষণীয় মরণশীল পাত্র নহেন, কৃষ্ণ রূপক, আধ্যাত্মিক বা তাত্ত্বিক ভাব বা পদার্থবিশেষ নহেন, কৃষ্ণ মানসিক সান্ত্বনা মাত্র নহেন, কৃষ্ণ লম্পটগণের আদর্শ নহেন, কৃষ্ণ আই, পি, সির আসামী নহেন, কৃষ্ণ সাময়িক পূজার পাত্র মাত্র নহেন । মানব-কল্পিত ঐরূপ কৃষ্ণের ভজন (?) প্রচার শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের প্রচার নহে । কৃষ্ণ নিখিল কাব্যের মূল নায়ক, তাঁহার আনখকেশাগ্র অপ্রাকৃত কাব্যের চরম আদর্শ, যাবতীয় যুক্তি, বিচার ও ইতিহাস কৃষ্ণের পদনখশোভার আরতি করিতে পারিলে ধন্যাতিধন্য হয়, কৃষ্ণ অমরগণের অমৃত স্বরূপ, নিখিল বাস্তব রূপরাশি কৃষ্ণের পদনখচ্ছটায় আলোকিত, সমস্ত সান্ত্বনা ও শান্তি কৃষ্ণদাস্যের অতি আনুষঙ্গিক প্রাথমিক যাত্রী, কৃষ্ণলীলা জগতের লাম্পট্য দূর করিবার জন্য পরমতত্ত্বের নিরঙ্কুশ স্বেচ্ছাময়তা প্রচারকারিণী, কৃষ্ণ স্বরাট্ লীলা পুরুষোত্তম, কৃষ্ণ নিত্যগণের মধ্যে পরমনিত্য—এইরূপ কৃষ্ণের অনুশীলন-প্রচারই শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের উদ্দেশ্য । আরতি করিতে পারিলে ধন্যাতিধন্য হয়, কৃষ্ণ অমরগণের অমৃত স্বরূপ, নিখিল বাস্তব রূপরাশি কৃষ্ণের পদনখচ্ছটায় আলোকিত, সমস্ত সান্ত্বনা ও শান্তি কৃষ্ণদাস্যের অতি আনুষঙ্গিক প্রাথমিক যাত্রী, কৃষ্ণলীলা জগতের লাম্পট্য দূর করিবার জন্য পরমতত্ত্বের নিরঙ্কুশ স্বেচ্ছাময়তা প্রচারকারিণী, কৃষ্ণ স্বরাট্ লীলা পুরুষোত্তম কৃষ্ণ নিত্যগণের মধ্যে পরমনিত্য—এইরূপ কৃষ্ণের অনুশীলন-প্রচারই শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের উদ্দেশ্য ।

১১। শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠকে যেন অনেকে সংস্কারক (Reformer) বলিয়া ভুল না করেন । শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ সংস্কারকও নহেন বা নূতন-মত-প্রবর্ত্তকও নহেন, পরন্তু সনাতনের পুনঃসংস্থাপক । বৈষ্ণবধর্ম্ম নিত্য ও সনাতন, কাল তাহাকে সৃষ্টি করে নাই, ইতিহাস তাহার আদি গণনা করিতে পারে নাই । যে ধর্ম্মকে ইতিহাস ও কাল তাহার অধীন করিয়াছে, তাহা নিত্য বৈষ্ণব ধর্ম্ম নহে, নৈমিত্তিক মনোধর্ম্ম মাত্র । সেই সর্ব্বাদি ও অনাদি নিত্য আত্মধর্ম্মেরই প্রচারক শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ । নিত্য ও সনাতনকে কাটিয়া ছাঁটিয়া, কমাইয়া বাড়াইয়া সংস্কার করা যায় না । সনাতন আত্মধর্ম্ম লোকের বহির্ম্মুখতার নিকট যুগে যুগে অস্তমিত বা লুপ্ত হয়, তাহা যুগে যুগে পুনরাবিষ্কার করাই আত্মধর্ম্ম করাই আত্মধর্ম্ম প্রচারক আচার্য্যগণের অবদান । এইজন্য শ্রীমদ্ভাগবতে ভাগবতধর্ম্ম-সম্বন্ধে উল্লেখ দৃষ্ট হয় ।

১২। বহু সম্প্রদায়ের কেহ কেহ শ্রীমদ্ভাগবতকে ঐতিহাসিক কালের অন্তর্গত, বেদসংহিতা ও উপনিষদের পরবর্তীকালের রচিত কেহ বা ব্রহ্মসূত্রকার বেদব্যাস হইতে ভাগবতাকার ব্যাসের পার্থক্য, কেহ বা শ্রীমদ্ভাগবতকে আধুনিক কোন ঐতিহাসিক লেখকের পঁুথিমাত্র বলিয়া মত প্রকাশ করেন । বস্তুত শ্রীমদ্ভাগবতের ‘পুরাণোর্কোহধুনোদিত’ “ধর্মস্তু সাক্ষাদ্ ভগবৎপ্রণীতং ন বৈ বিদুঋষয়ো নাপি দেবাঃ, ধর্ম্মঃ প্রোঙ্খিত কৈতবোহোত্র পরমো নির্ম্মৎসরাং সতাং”, নিগমকল্পতরোর্গলতিং ফলং সর্ব্ববেদান্ত সারং হি শ্রীমদ্ভাগবতেমিষ্যতে প্রভৃতি শ্লোক আলোচনা করিলে জানা যায় যে, আজ প্রাতঃকালে আমরা যে সূর্য্য দর্শন করিয়াছি, তাহা আমাদের নিকট নূতন বা অমুক সনের বা অমুখ তারিখের জন্মগ্রহণ করিয়াছে মনে হইলে বস্তুত সূর্য্য নিত্য, সনাতন ও স্ব-প্রকাশ । সূর্য্যই কালচক্র বিধান করিতেছে, কালের মধ্যে সূর্য্য সৃষ্ট হয় নাই । যুগে যুগে শ্রীমদ্ভাগবতের অবতার বিভিন্ন ব্যাসের হৃদয় ও লেখনীর মধ্যে প্রকাশিত হইয়াছেন । সেইজন্য শ্রীমদ্ভাগবত বলিয়াছেন, ভাগবত ধর্ম্ম সাক্ষাৎ ভগবানের সৃষ্ট । ইহা ঋষি বা দেবতার সৃষ্ট নহে—তাহা বেদের পরিপক্ক ফল, সমস্ত নিম্মৎসর সাধুগণের সেবিত । সেখানে মোক্ষাবি সন্ধিরূপা কপটতা পর্য্যন্ত নিরস্ত হইয়াছে । বেদের শিরোভাগ শ্রুতিসকল নিত্য যাঁহার আরতি করেন, সেই ভগবান্নামের অনুশীলনই ভাগবৎ ধর্ম্মের একমাত্র বিষয় । সেই নামই প্রণবের প্রস্ফুটিত রূপ । প্রণব বেদমাতা গায়ত্রীর মূল বা বীজস্বরূপ । সেই বীজ হইতেই ভাগবত ধর্ম্মরূপ নিগম কল্যাণ কল্পতরু পল্লবিত হইয়াছে এবং তাহা হইতে যে অমৃত ফল ফলিয়াছে তাহাই নিম্মৎসর সাধুগণ শ্রৌত-পরম্পরায় জগতে লইয়া আসিয়াছেন । স্বয়ং ভগবান হইতে ব্রহ্মা, ব্রহ্মা হইতে নারদ, নারদ হইতে ব্যাস, ব্যাস হইতে শুক বা মাধ্বাচার্য্য এবং ক্রমে ক্রমে শ্রীচৈতন্যদেব তদুনগ গোস্বামীগণ যে ভাগবত ধর্ম্ম বিতরণ করিয়াছেন, তাহাই শ্রৌত-পরম্পরার খাতে শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ বরণ করিয়াছেন । শ্রীচৈতন্যদেব স্বয়ং প্রেমামরতরু হইয়াও অসমোর্দ্ধ মালিরূপে সর্ব্বত্র সেই ফল বিতরণ করিয়াছিলেন । এই ফলের রসাস্বাদন এবং নিখিল বিশ্বে তাহার বিতরণের নামই বাস্তব সত্যের যথার্থ প্রচার ও যথার্থ জীবে দয়া ।

‘ভারত ভূমিতে মনুষ্য জন্ম হৈল যার ।
জন্ম স্বার্থক করি কর পর-উপকার ।’ (চৈঃ চঃ)

শ্রীচৈতন্যের এই আদেশ বাণী—এই শ্রৌত পরম্পরায় লাভ করিয়া শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ এই প্রচার ব্রত বরণ করিয়াছেন ।

শ্রীচৈতন্যের ভবিষ্যৎ বাণী, “পৃথিবীতে যত আছে নগরাদি গ্রাম । সর্ব্বত্র প্রচার হইবে মোর নাম । (চৈঃ ভাঃ)

এই বাণী সফল করিবার জন্য শ্রীমঠের ব্রহ্মচারী, সন্ন্যাসী ও সদাচারী গৃহস্থ ভক্তগণ প্রতি গৃহে গৃহে যাইয়া প্রচারকার্য্য চালিয়ে যাচ্ছেন । এই মঠ বিশ্বের সর্ব্বত্র শ্রীচৈতন্যের ভুবনমঙ্গল নাম, ধাম ও কামের প্রচার করিতেছেন । বিভিন্ন আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রত্যেকের মানবের হৃদয়ে জীবন্ত মঠ অর্থাৎ হরিকীর্ত্তন নিকেতনে পরিণত করিবার জন্য আচার প্রচারময় প্রযত্ন, সদাচার প্রবর্ত্তন, প্রত্যেক জীবের নিকট শাস্ত্রের সু-সিদ্ধান্ত সমূহ কীর্ত্তন, ভক্ত ও ভগবানের স্মৃতি উৎসবাদির প্রবর্ত্তন, নগর সংকীর্ত্তন, গৌড়মণ্ডল, ব্রজমণ্ডল, ক্ষেত্রমণ্ডল ও বিভিন্ন ভগবতধাম সমূহ পরিক্রমা প্রভৃতি অনুষ্ঠানের দ্বারা শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ জীবের নিত্য মঙ্গল বিধানের সর্ব্বোতভাবে চেষ্টা করিতেছেন । সর্ব্বপ্রকার অসৎসংগ বর্জ্জন পূর্ব্বক সাধুসঙ্গ, নাম সংকীর্ত্তন, ভাগবত শ্রবণ, মথুরাবাস, শ্রদ্ধায় শ্রীমূর্ত্তির সেবন—শ্রীমন্ মহাপ্রভুর কথিত এই শ্রেষ্ঠ পঞ্চাঙ্গ সাধন শ্রীমঠে সর্ব্বাঙ্গীন সুষ্ঠভাবে অনুষ্ঠিত হইতে দেখা যায় ।

১৩। ‘জীব-সেবা’ ও ‘জীব-দয়া’ শব্দ দুইটি লইয়া অনেক সময়ই সাধারণ্যে নানপ্রকার ভ্রমের উদয় হইয়া থাকে । অনেকেই ‘সেবা’-শব্দের যে প্রচলিত অর্থ জানেন বা অনুভব করেন, তদ্দ্বারা ‘সেবা’র প্রকৃত সার্থকতা সম্পন্ন হয় না । ‘সেবা’ অর্থে সেব্যের সুখ বা প্রীতি-বিধান । সেব্য ও সেবকের মধ্যস্থানে সেবা বর্ত্তমান । সেবা নিত্য না হইলে সেবকের সেবার নিত্যত্ব থাকে না, আবার সেবকও নিত্য না হইলে তিনিও নিত্যকাল সেবা করিতে পারে না, আর ‘সেবা’ নিত্য না হইলে সেবক সেব্যকে সাময়িক ভাবে বৃথা ছলনা করেন মাত্র । পৃথিবীতে আমরা অধিকাংশই ন্যূনাধিক অনাদি-বহির্ম্মুখ জীব, কেবল যুগে যুগে দুই একজন মহাপুরুষ আমাদের ন্যায় বহির্ম্মুখ জীবকে উদ্ধার করিবার জন্য জগতে আসেন, সুতরাং বহির্ম্মুখ জীবের সেবা অর্থাৎ তাহাদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি-বিধানের দ্বারা তাহাদের বহির্ম্মুখতা বৃদ্ধি বা তাহাদের প্রতি হিংসা ও অকরুণাই করা হয় । এ জন্য সমগ্র শ্রীভাগবত সাহিত্যে বা শ্রীচৈতন্যদেবের সিদ্ধান্তে বা ভাগবতধর্ম্মে তথাকথিত ‘জীবসেবা’ কথার অস্তিত্ব নাই । ‘বৈষ্ণব-সেবা’ ‘হরিসেবা’ বা ‘জীবে দয়া’ কথাই হইতে পারে; কারণ বৈষ্ণব হরির প্রতি সর্ব্বদাই উন্মুক্ত, তাঁহারই অহৈতুকী সেবায় রত, সেইরূপ বৈষ্ণবের যে-কোনরূপ সেবা করিলে তদ্দ্বারা হরিসেবাই হয় । বহিন্মুখ জীবের নিকট হরিকথা কীর্ত্তন করিয়া তাহার প্রতি নিত্য দয়া প্রদর্শন করাই পরোপকারের শ্রেষ্ঠ আদর্শ । ক্ষুধার্ত্তকে অন্নদান, বসনহীনকে বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান, আর্ত্তকে সান্ত্বনা দান, অশিক্ষিতকে পার্থিবশিক্ষা দান প্রভৃতি দ্বারা যে উপকার বা দয়া করা হয়, তাহা অতীব তাৎকালিক । ঐরূপ সাময়িক উপকারলব্ধ বদ্ধ জীব পুনরায় ক্ষুধাগ্রস্ত ও বস্ত্রের অভাবে পতিত হয় । রোগী রোগবিশেষ হইতে মুক্তি লাভ করিলেও অন্য প্রকার রোগ বা মানসিক অশান্তিতে আক্রান্ত হয়, অথবা সুস্থ হইয়া সমাজেরই কোন বিশৃঙ্খলা-কারক পাপকার্য্যে নিযুক্ত হয়, পার্থিব শিক্ষা লাভ করিয়াও কাম, ক্রোধ, হিংসা, দ্বেষ, এমন কি পশুচিত আদর্শ হইতেও হীন কুকর্ম্মে লিপ্ত হইয়া থাকে । শারীরিক বল সঞ্চয় করিয়া নানা প্রকার অসৎপথে ও পাশব-বল প্রয়োগে রুচি-বিশিষ্ট হয়; কিংবা হয়ত’ কোন আধিদৈবিক আধিভৌতিক বা আধ্যাত্মিক তাপের দ্বারা এক মুহূর্ত্তের সমস্ত সাময়িক লাভ হইতে বিচ্যুত হইয়া পড়ে । এজন্য সর্ব্বাগ্রে প্রত্যেক জীবের চেতনকে উদ্বুদ্ধ করিবার উপযোগী পারমার্থিক শিক্ষা-দীক্ষা এবং তদনুকূলে জীবন যাপন করিবার জন্য যে যে প্রয়োজন, তাহা স্বীকার করিলেই ব্যষ্টি ও সমষ্টিগত মঙ্গল হইতে পারে । শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ সেইরূপ ‘জীবে দয়া’র ভার গ্রহণ করিয়াছেন । চেতনের প্রতি দয়া কর, তাহা হইলে অচেতনেরও নিরর্থকতা হইবে না—ইহাই শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের বাণী; কিন্তু সর্ব্বাগ্রে কেবল অচেতনের প্রতি দয়া দেখাইতে দেখাইতেই সময় নষ্ট করিয়া ফেলিলে চেতনরাজ্যে প্রবেশের আর সময় থাকিবে না ।

১৪। দেহাত্মধর্ম্মে অধিকতর আকৃষ্ট ও আত্মধর্ম্মী হইতে বঞ্চিত হইবার জন্য “শরীরমাদ্যং খলু ধর্ম্ম সাধনম্”—বাক্যের অনেক কদর্থ প্রচারিত আছে । ভাগবতধর্ম্ম প্রচারকারী শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের মূলমন্ত্র “তুর্ণং যতেত ন পতেদনুমৃত্যু যাবন্নিঃশ্রেয়সায়, বিষয়ঃ খলু সর্ব্বতঃ স্যাৎ”; নৃদেহমাদ্যং সুলভং, প্লবং সুকল্পং গুরুকর্ণধারম্ ময়ানুকূলেন নভস্বতেরিতং পুমান্ ভবাব্ধিং ন তরেৎ স আত্মহা ।” চেতনশরীরের বিকাশ-সাধনই সর্ব্বাগ্রে কর্ত্তব্য । তাহাই প্রত্যেক জীবের পরম ধর্ম্ম । এই শরীর থাকিতে থাকিতে যাহাতে আত্মানুশীলনের পূর্ণতা সাধন করা যায়, তদ্বিষয়েই সর্ব্বাগ্রে যত্ন করা প্রয়োজন, কারণ এইরূপ স্থূল শরীর ত’ সকল জন্মেই পাওয়া যাইবে, কিন্তু হরিভজনের উপযোগী ও সুযোগ্যপূর্ণ মানব জন্ম বহুকষ্টে ও বহু ভাগ্যফলেই লাভ হয় । এইরূপ “ভজনের মূল” নরদেহ প্রাপ্ত হইয়া যে-ব্যক্তি আত্মমঙ্গলের জন্য আচার্য্যের নিকট অভিগমন না করে, সে ব্যক্তি নিশ্চয়ই আত্মঘাতী । আপাত-প্রতীয়মান ও সাময়িক সৃষ্ট অসংখ্য কর্ত্তব্যের দিকে না তাকাইয়া সেই একমাত্র মূল কর্ত্তব্য হরিসেবানুশীলনের জন্য যত্নই সর্ব্বাগ্রে কর্ত্তব্য । যাঁহারা প্রকৃত মঙ্গল চাহিবেন না, যাঁহারা আপাত প্রত্যক্ষকেই বড় মনে করেন, তাঁহারাই অগ্রে শরীরচর্চ্চা ও পরে আত্মানুশীলন, অগ্রে জগতের, পার্থিব দেশের বা সমাজের সুবিধা, আর ভবিষ্যতের জন্য আত্মরাজ্যের—প্রকৃত নিত্য স্বদেশের সন্ধান মূলতুবী রাখেন; আর যাঁহারা আত্মার নিত্য স্বভাব যে নিত্যকালীয় হরিসেবা, তাহাকেই পরম শুভপ্রদ মনে করেন, তাঁহারা “শুভস্য শীঘ্রম্ অশুভস্য কালহরণম্”—এই নীতি অনুসারে সর্ব্বশুভপ্রদ হরিসেবারই কর্ত্তব্যতা সর্ব্বাগ্রে স্থির করিয়া থাকেন । শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ তুলনামূলক নিরপেক্ষ আত্মস্থবিচারে হরিসেবাকেই পরম শুভপ্রদ বলিয়া সকল কর্ত্তব্যের সর্ব্বাগ্রণী কর্ত্তব্যরূপে সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত করিয়াছেন ।

১৫। অনেকের ধারণা—যাঁহারা গায়ে বিভূতি মাখিতে পারেন, জটা বল্কল ধারণ করিতে পারেন, জগতের যাবতীয় ব্যবহার্য্য দ্রব্য ভোগি-সমাজের জন্য গচ্ছিত রাখিয়া বনচারী, বাতাহারী, ফলাহারী দিগম্বর মূর্ত্তিতে সাজিতে পারেন, তাঁহারাই ধার্ম্মিক বা পরমসাধু! কিন্তু শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ইহাই লক্ষ্য করিবার বিষয় যে, ‘খট্টাভঙ্গে ভূমিশয্যা’-নীতি বা বিষয়-সমূহ পরিত্যাগ করিলেই বিষয়ের সার্থকতা বা পরিত্যাগকারীর মঙ্গল হয় না । যিনি পরিত্যাগ করিলেন ও যাহা পরিত্যক্ত হইল—এই উভয়ের নিত্য মঙ্গল ও সর্ব্বোৎকৃষ্ট সার্থকতা কিরূপভাবে হইতে পারে, সেই প্রণালীর অনুসন্ধান করা কর্ত্তব্য । বিষয়কে ছাড়িয়া দিলে ভোগিসমাজ বিষয়ের ভাগ আরও প্রচুর পরিমাণে প্রাপ্ত হইয়া একদিকে যেমন নিজ অমঙ্গল বরণ করিবে, তদ্দ্বারা অপরদিকে বিষয়ের যথাস্থানে প্রয়োগেও বাধা জন্মাইবে । এজন্য শ্রী মঠ সমস্ত বিষয়কে, যিনি সমস্ত ভোগের মালিক অর্থাৎ সমস্ত বিষয় যাঁহার, তাঁহার সেবায় নিয়োগ করিয়া বিষয়ের সার্থকতা সম্পাদন করেন । ইহা দ্বারা বিষয়ীগণেরও মঙ্গল হয় অর্থাৎ তাঁহাদের নিকট গচ্ছিত ভগবানের সম্পত্তি যে-কোন ভাবে ভগবানের সেবায় নিযুক্ত হওয়ায় তাঁহারা সেবোন্মুখী সুকৃতি লাভ করেন, তাঁহাদের হরিসেবা-বৃত্তি উন্মেষিত হইবার পথ পরিষ্কৃত হয়; আবার অন্যদিকে বিষয়ের দ্বারা যাহা সাধিত হওয়া প্রয়োজন, সেই প্রয়োজনও সর্ব্বতোভাবে সিদ্ধ হইয়া থাকে অর্থাৎ বিষয়ভোগের মধ্যে যে কুফল ও বিষয়ত্যাগের মধ্যে যে মঙ্গলময় ফল হইতে বঞ্চিতাবস্থা রহিয়াছে,—ঐ উভয় ভাব পরিত্যাক্ত হইয়া বিষয়ের সুষ্ঠু নিয়োগে যে পরমমঙ্গলজনক ফল উৎপন্ন হইতে পারে, তাহাই লাভ হইয়া থাকে । হরিসেবায় নিযুক্ত হইলেই বিষয় পরম ফল প্রসব করে । অপরদিকে বিষয় ত্যাগ করিয়া ত্যাগী যে নিরিন্দ্রিয় ও নিশ্চেষ্ট হইয়া বসিয়া থাকিয়া আত্মহত্যা করিতে ছিলেন, সেই আত্মহত্যা হইতেও নিষ্কৃতি পাইয়া বিষয়কে যথার্থ কার্য্যে নিযুক্ত করিবার অবসর পাওয়া যায় । তাই শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ বর্ত্তমান যুগের বিজ্ঞানের যাবতীয় অবদান, যথা—ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, ফেসবুক, টেলিফোন, বৈদ্যুতিকযান, বিমান, মুদ্রাযন্ত্র, বিদ্যুৎ এমন কি যে সকল ভোগোপকরণ ভোগীর সেবায় বিষয়ময় ফল প্রসব করে, তাহাদিগকেও হরিকথা প্রচারে নিযুক্ত করিয়া উহাদের সার্থকতা সাধন করিয়াছেন । অর্থ অনর্থের মূল, কিন্তু শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ অর্থকে পরমার্থ প্রচারে নিয়োগ করিয়াছেন । সৌধমালা, অট্টালিকা প্রভৃতিকে বিলাস-ব্যসনের জন্য চিরসংরক্ষিত না করিয়া উহাদিগকে হরিকথা-কীর্ত্তনের সভা-সমিতি-অধিবেশনের স্থান করিয়াছেন । শ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেব গোস্বামী মহারাজ ও শ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেব গোস্বামী মহারাজ এই যে শ্রী মঠের অট্টালিকা বা উচ্চচূড়াযুক্ত মন্দির নির্ম্মাণ করিয়া দিয়াছেন, তাহা আচার্য্যের নিয়ামকত্বে কিরূপ কার্য্যে নিযুক্ত হইয়াছে, সকলেই প্রত্যক্ষ দেখিতে পাইতেছেন । এই অট্টালিকায় স্বয়ং ভগবান্ (শ্রীশ্রী গুরু-গৌরাঙ্গ গান্ধর্ব্বা গোবিন্দ সুন্দর জীউ) অধিষ্ঠিত রহিয়াছেন । কেবল নাম মাত্র অধিষ্ঠিত থাকিলে হয়ত’ তাঁহাকে দাঁড় করাইয়া অনেক কিছু ভোগের উপায়ন সংগৃহীত হইতে পারে, কিন্তু শ্রী মঠাচার্য্য তাহার প্রশ্রয় দেন নাই । তিনি আচার ও প্রচারময় হরিকীর্ত্তনকারীর হরিকীর্ত্তনে শ্রী মঠকে সর্ব্বক্ষণ মুখরিত রাখিবার জন্য অনুক্ষণই অনুপ্রেরণা প্রদান করিতেছেন । তাই শ্রী মঠের এই সভামণ্ডপের নাম ‘সারস্বত-শ্রবণ-সদন’ অর্থাৎ এই স্থান শ্রীচৈতন্যবাণীর শ্রবণাগার । এখানকার বৈদ্যুতিক আলোকের দ্বারা কৃষ্ণের পদনখশোভা ও সাধুগণের পদনখশোভা দৃষ্ট হয় । এখানকার বৈদ্যুতিক আলোকের দ্বারা বেদ, ভাগবত, গীতা, শ্রীচরিতামৃতের বাণী-সমূহ পাঠ ও ব্যাখ্যা হয় । এখানকার বৈদ্যুতিক পাখা হরিকথা-শ্রবণে সমাগত সজ্জন-মণ্ডলীর ও হরিকথা কীর্ত্তনকারীর সেবা করিয়া থাকে । শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠের মোটরযান দ্রুতগতিশীলতার দ্বারা সময়ের বিক্রম অনেক পরিমাণে হ্রাস করিয়া অল্প সময়ের মধ্যে বহুস্থানে হরিকথা প্রচার ও হরিসেবার অনুকূল কার্য্যসমূহ করিয়া থাকে । অথবা যাঁহারা হরিসেবা করেন, তাঁহাদের কার্য্যে-নিযুক্ত হইয়া পরোক্ষভাবে হরিসেবাই সাহায্য করে । শ্রী মঠের দ্বাররক্ষক হরিকথা-শ্রবণে সমাগত ব্যক্তিগণের এবং হরিসেবার সম্পত্তি সংরক্ষণের জন্যই নিযুক্ত আছে । অর্থাৎ বহির্ম্মুখ চক্ষে বিষয়ীর বিষয়ভোগের ন্যায় যাহা কিছু প্রতীয়মান হয়, তাহা ও তদ্ ব্যতীত যাহা কিছু বিষয়ের উপকরণরূপে ভবিষ্যতেও সৃষ্ট হইবে, তৎসমুদয়কে নিরর্থকভাবে বৃথা ত্যাগ না করিয়া তদ্দ্বারা আচার্য্যে নিয়ামকত্বে হরিকথা প্রচার, হরিসেবানুশীলন করিলেই সেই সকল বস্তুর সার্থকতা ও বিশ্বের মঙ্গল হইতে পারে, ইহাই হাতেকলমে প্রদর্শন করা শ্রী মঠের বৈশিষ্ট্য । তাই শ্রীচৈতন্যের-শ্রীরূপের এই দুইটি বাণী প্রচারের মূলসূত্ররূপে নিম্নে দেওয়া হল ঃ

প্রাপঞ্চিকতয়া বুদ্ধ্যা হরিসম্বন্ধিবস্তুনঃ।
মুমুক্ষুভিঃ পরিত্যাগো বৈরাগ্যং ফল্গু কথ্যতে ॥
অনাসক্তস্য বিষয়ান্ যথার্হমুপযুঞ্জতঃ ।
নির্ব্বন্ধঃ কৃষ্ণসম্বন্ধে যুক্তং বৈরাগ্যমুচ্যতে ॥

 

 

← ফিরে

 

 

 

সাধুসঙ্গের সর্ব্ব শ্রেষ্ঠ ফল
'যে গৌড়ীয়া-বৈষ্ণবগণ শ্রীরূপানুগ-ধারায় আচরণ করেছেন, তাদেরকে বাদ দিয়ে কিছু হতে পারে না । এই লাইনের বাহিরে গেলে আমাদের কোন কাজ নয় । কিন্তু এখানে একটা সমস্যা আছে । বহু ভাগ্যের ফলে আমরা এই মানব জন্ম লাভ করেছি কিন্তু খাওয়ার লোভে, অর্থের লোভে, মুক্তির লোভে, ভুক্তির লোভে, ভোগ-বাসনার জন্য আমরা এই সাধন-ভজনের ফল অবলম্বন করতে পারি না ।'

      

 

      

 

 

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥