আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি ENGLISH
 

শ্রীউপদেশ


(৭) ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা

 

কবে নিত্যানন্দ, মোরে করি’ দয়া,
ছাড়াইবে মোর বিষয়ের মায়া ।
দিয়া মোরে নিজ- চরণের ছায়া,
নামের হাটেতে দিবে অধিকার ॥

“কবে নিতাইচাঁদ করুণা করবেন ? কবে আমার সংসার-বাসনা তুচ্ছ হয়ে যাবে, আমার যে সংসার-আসক্তি আছে, সে আসক্তিটা আমার কবে চলে যাবে ? কবে নিতাইচাঁদ করুণা করবেন আমাকে ? কবে আমি এই সংসার থেকে উদ্ধার হতে পারব ?”

সংসার বলতে কী ? মায়ারূপ সংসার । সংসার থেকে উদ্ধার মানে যে, আপনারা স্ত্রী, পুত্র, ঘর ছেড়ে দিয়ে উদ্ধার পাবেন তা নয় । মায়ারূপ সংসার মানে আপনারা মায়ার সংসারের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে সমুদ্রের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছেন  (“মায়ার বশে, যাচ্ছ ভেসে, খাচ্ছ হাবুডুবু ভাই”) । যে এই মায়ার সংসার থেকে উদ্ধার হয়ে যেতে চায়, তার নিত্যানন্দ প্রভুর কাছে কাঁদতে হবে । নিত্যানন্দ মানে গুরুতত্ত্ব—গুরুদেবের কাছে কাঁদতে হবে । “কবে আমার এই সংসার-বাসনা তুচ্ছ হবে ? আমি কবে গুরু-বৈষ্ণব-ভগবানের সেবা করতে পারব ? কবে আমি ভগবানের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত করতে পারব ?” এটাই সবসময় আমাদের চিন্তা করতে হবে ।

ভগবানের অংশবিশেষ জীবাত্মা আমাদের হৃদয়ের মধ্যে (সবাইয়ের মধ্যেই) আছে কিন্তু আমরা একটু জং (মরিচা) পড়ে গিয়েছি । একটা লোহা যদি কয়েক মাস ধরে বাইরে থাকে, সেই লোহাটার চুম্বক আকর্ষণ করবে না কারণ লোহাটায় জং পড়ে গিয়েছে । জংটা তুললে তুললে তাহলে চুম্বক আকর্ষণ করতে পারবে । কৃষ্ণ আমাদের আকর্ষণ করবেন কিন্তু আমরা অনাদিকাল ধরে কৃষ্ণ-বহির্ম্মুখ হয়ে পড়েছি :

কৃষ্ণ ভুলি' সেই জীব অনাদি-বহির্ম্মুখ ।
অতএব মায়া তারে দেয় সংসারাদি-দুঃখ ॥

(শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত, ২/২০/১১৭)

আমরা এই সংসারের ত্রিতাপ-জ্বালায় জ্বলে পুড়ে মরছি ! আপনারা ভাবছেন যার টাকা আছে তার বুঝি খুব শান্তি আছে আর যার টাকা নাই তার খুব কষ্ট হচ্ছে । ভুল ধারণা । যে লোভি হবে, সে কষ্টও বেশি পাবে । যে জমি-টাকা পেয়েছে, সে ত্রিতাপ-জ্বালায় জ্বলে পুড়ে মরছে—আধ্যাত্মিক যন্ত্রণায় (মানষিক যন্ত্রণায়) ছটফট করছে ।

সুতরাং, আমরা নিজেই নিজের বন্ধু, নিজেই নিজের শত্রু । কে আপনাদের উপকার করতে পারেন যদি আপনারা নিজেকে উপকার করতে না পারেন ? আপনারা যদি ভগবানের দিকে এক পা এগিয়া যান, ভগবান আপনাদের দিকে দশ পা এগিয়া আসবেন ।

যখন যশোদা মা কৃষ্ণকে বাঁধতে গিয়েছেন, তিনি বারবার চেষ্টা করেছেন কিন্তু বারবার দুই আঙ্গুল দড়ি short (কম) পড়ল । মা চেষ্টা করছেন, “আমার ছেলেকে আমি বাঁধ দেবই !” আর কৃষ্ণ ভাবছেন, “মাকে একটা মজা দেখাই ! মা তো আমাকে ছেলেরূপেই সবসময় বাৎসল্য-রসে ভাবে । আমি ওকে একটু দেখাই !” গোপালকে বাঁধতে না পেরে বারবার যশোদা মা আরও দড়ি যোগ করলেন—যতগুলো গোরু আছে (তাঁর বাড়িতে নয়লক্ষ গাভী ছিল !), তিনি সব দড়ি জোড়া দিলেন তবুও গোপালকে বাঁধতে পারছেন না—তিনি বাঁধছেন আর দেখছেন যে, দড়িটা কম ! কী লীলা, দেখুন ! বারবার দড়িটা দুই আঙ্গুল কম পড়ল । মা রেগে গেলেন—সব দড়ি নিলেও কিন্তু কাজ হচ্ছে না । শেষে গোপাল পূর্ব্ব দড়ি দিয়ে বন্ধন স্বিকার করলেন । তিনি ভাবছেন, “মা খুব কষ্ট পাচ্ছে, ওর ঘাম হচ্ছে—আমি ওকে এত কষ্ট দিচ্ছি, এটা ভালো নয় । আমি ওকে আর কষ্ট দেব না ।” তখন গোপাল নিজেকে বেঁধে রেখতে দিলেন ।

এই দুটো আঙ্গুল মানে কী ? একটা আঙ্গুল হচ্ছে ভক্তের চেষ্টা আর একটা আঙ্গুল হচ্ছে ভগবানের কৃপা । আপনাদের যদি চেষ্টা থাকে, তাহলে ভগবান আপনাদেরকে কৃপা করবেন—আপনারা এক পা এগিয়ে গেলে ভগবান দশ পা এগিয়ে আসবেন । সেইজন্য, যদি আমরা গুরু-বৈষ্ণব-ভগবানের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত করতে পারব, তবেই তো আমাদের জীবন পরম ধন্য হয়ে যাবে । কিন্তু বদ্ধজীব এটা বুঝতে পারছে না :

দুর্ল্লভ মানব জন্ম লভিয়া সংসারে ।
কৃষ্ণ না ভজিনু দুঃখ কহিব কাহারে ॥
সংসার সংসার করি মিছে গেল কাল ।
লাভ না হইল কিছু ঘটিল জঞ্জাল ॥
কিসের সংসার এই, ছায়াবাজী প্রায় ।
ইহাতে মমতা করি বৃথা দিন যায় ॥
দিন যায় মিছা কাজে নিশা নিদ্রাবশে ।
নাহি ভাবি মরণ নিকটে আছে বসে ॥
শ্মশানে শরীর মম পড়িয়া রহিবে ।
বিহঙ্গ পতঙ্গ তায় বিহার করিবে ॥

(শ্রীকল্যাণ-কল্পতরু, শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর)

কখনও সেটা কে ভাবে ? যখন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব আমাদেরকে নিয়ে শ্মশানে ফেলে রেখে দেবে, তখন কত পোকা, মাকড়, মশা, মাছি বিহার করবে—কে উদ্ধার করতে পারবে আমাদেরকে তখন ?

 

— • • • —

 

 

← (৬) শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি (৮) ভগবানের চরণে পথ →

 

সূচীপত্র:
সূচনা : আমাদের একমাত্র কৃত্য
১। ভক্তির অভাব
২। গৃহে আবদ্ধ
৩। মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
৪। জীবকে সত্য দয়া কি ?
৫। ভোগী নই ত্যাগীও নই
৬। শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
৭। ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
৮। ভগবানের চরণে পথ
৯। শান্তির গুপ্ত কথা
১০। শ্রীবামনদেবের কথা
১১। শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
১২। পূজনীয় বিসর্জন
১৩। ভক্ত ও নাপিত
১৪। চকচক করলেই সোনা হয় না
১৫। আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
১৬। দণ্ড মহৎসব
১৭। শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
১৮। মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
১৯। আমাদের একমাত্র উপায়
২০। পবিত্র জীবন
২১। শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
২২। আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥