![]() |
|||||||
| |||||||
|
|||||||
|
শ্রীউপদেশ (১৮) মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
শ্রীল রঘুনাথদাস গোস্বামির বারো লাখ মুদ্রা ইনকাম (উপার্জন) ছিল, তিনি অপ্সরার মত সুন্দরী স্ত্রী পেয়েছিলেন কিন্তু সব কিছু ছেড়ে দিয়ে তিনি পানিহাটিতে চলে এলেন । যখন পানিহাটিতে উৎসবটা শেষ হল, তখন নিত্যানন্দ প্রভু গাছের তলায় বসলেন আবার রঘুনাথ তাঁর চরণে এসে দণ্ডবৎ করলেন । নিত্যানন্দ প্রভু তখন তাঁর মাথার উপর পা তুলে দিয়ে বললেন, “কৃষ্ণ কৃপা করেছেন যাঁরে, তাঁরে কে বান্ধিয়া রাখিতে পারে ? কৃষ্ণ যাঁকে কৃপা করছেন, তাঁকে কেউ বেঁধে রাখতে পারে না ! যাও, এবার তুমি চলে যাও ।” তখন শ্রীল রঘুনাথদাস গোস্বামী মহাপ্রভুর কাছে চলে গেলেন আর এবার মহাপ্রভু তাঁকে বললেন, “আয়, রঘুনাথ, চলে আয় । তোকে আজকে আমি সেবা দিচ্ছি !” সেবা না পেলে কৃপা হয় না । গুরু মহারাজও বলতেন : যাঁর সেবা আছে, তাঁর কৃপা আছে । আমরা এখানে পানিহাটির মহৎসবে প্রতি বৎসর আসি কিসের জন্য ? বৈষ্ণবগণের সেবা করবার জন্য । লোককে প্রসাদ দিতে হবে, তাহলে এই ভক্ত-সেবা দিয়ে আমাদের কৃপা হবে । সেবা না করলে ভগবানকে লাভ হয় না, আর সেবা হলেই কৃপা হয়ে যায় । এইভাবে শ্রীল রঘুনাথদাস গোস্বামী মহাপ্রভুর কাছ থেকে কৃপা ও সেবা পেয়েছিলেন—তার আগে তিনি বারবার তাঁর কাছে গিয়েছেন কিন্তু বিফল । শেষ পর্যন্ত জানেন তাঁর কি অবস্থা ছিল ? শ্রীল রঘুনাথ দাস গোস্বামী বড় জমিদারের পুত্র ছিলেন । যখন তিনি বাড়ি ছেড়ে দিয়ে মহাপ্রভুর কাছে চলে গেলেন, তখন তাঁর বাবা তাঁকে প্রত্যেক মাস চারশো টাকা পাঠাতেন । বাবা ভাবতেন, “আমার ছেলেটা আশ্রমে চলে গেছে, ঠিকমত খেতে পায় না…” কিন্তু রঘুনাথদাস গোস্বামী কি করতেন ? ওই পয়সা দিয়ে সবাইকে বৈষ্ণব-সেবা দিতেন । মহাপ্রভু জানলেন যে, রঘুনাথ বৈষ্ণব-সেবা করতেন কিন্তু তিনি ভাবতেন এটা ভালো জিনিস নয় । কেন ? কারণটা বৈষ্ণব-সেবা দ্বারা তাঁর অহঙ্কার হয়ে যাচ্ছিল, “আমার বাবার টাকা দিয়ে লোককে খাওয়াছি !”—এটা দ্বারা তাঁর অহঙ্কার হয়ে যাচ্ছিল, প্রতিষ্ঠা হচ্ছিল । রঘুনাথ বুঝতে পারলেন যে, মহাপ্রভুর পছন্দ হচ্ছিল না, তারপর তিনি বাবাকে বললেন, “আর টাকা পাঠিও না । আমি নেব না ।”
বিষয়ীর অন্ন খাইলে মলিন হয় মন । (শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত, ৩/৬/২৭৮)
মঠ মন্দির দালান বাড়ীর না কর প্রয়াস । (শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ৯/২৯) যদি অর্থ না থাকে তখন কি করবেন ?
অর্থ নাই তবে মাত্র সাত্ত্বিক সেবা কর । (শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ৯/৩০) আপনাদের অর্থ না থাকে তো কী হয় ? আপনাদের জল আছে, আপনাদের তুলসী আছে, সেই দিয়ে আপনারা গোবিন্দকে হৃদয়ে ধারণ করেন । টাকার কিছু দরকার নেই । সেইরকম শ্রীল রঘুনাথদাস গোস্বামী চারশো মুদ্রা টাকা ফেরত দিলেন এবং আরো কোন টাকা নিতেন না । এক দিন মহাপ্রভু স্বরূপ দামোদরকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার ? রঘুনাথ তো আরো নিমন্ত্রণ করছে না ?” স্বরূপ দামোদর বললেন, “প্রভু, ওর মনে কী হচ্ছে আর টাকা নিচ্ছে না ।” এটা শুনে মহাপ্রভু খুব আনন্দিত হয়ে বললেন, “শেষ ! ওর সব বিষয় কেটে গেল !” এইরকম আমাদের বিষয় ছাড়তে হবে, বিষয়ের অসক্তি থাকতে হবে । প্রকাশানন্দ সরস্বতী এক শ্লোক লেখেছেন, আপনারা শ্লোকটা শুনলে হাসবেন আর মর্মার্থটা বুঝবেন । যখন লোকাল ট্রেনে চাপেন, ওই ট্রেনে পায়খানা নেই । আর যদি পায়খানা চাপে আপনাদের কী অবস্থা হয় ? খুব করুণ অবস্থা ! আপনারা ভাবছেন, “কোথায় পায়খানায় যাব ? পায়খানা চেপে রাখতে পারছি না, কি কষ্ট !” খুব কষ্ট ! আর যখন পায়খানা হয়ে গেল, তখন শান্তি পেলেন । সেইরখম টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত এগুলোর প্রতি আসক্তি যখন ছেড়ে দেবেন তখন শান্তি লাভ করবেন আর যত ধরে রাখবেন, ততই অশান্তি আসবে । আপনাদের যেটা দরকার, প্রযোজন, সেইটা গ্রহণ করবেন—যেটুকু জীবন বাঁচাবার জন্য, খাওয়া-পাওয়ার জন্য যা কিছু দরকার, সেইটুকু আপনাকে গ্রহণ করতে হবে । এর বেশি আপনাদেরকে দরকার নেই । তা ছাড়া আপনারা শান্তি লাভ করতে পারবেন না । “আরো চাই, আরো চাই, আরো চাই”—অত্যাহার (বেশি খাব), প্রয়াস (বেশি সঞ্চয় করব), প্রজল্প (বেশি কথা বলব)—ওগুলো ভক্তির প্রতিকূল, এগুলো বন্ধ করতে হবে । এটা সব মহাপ্রভু শ্রীল রঘুনাথদাস গোস্বামীকে বলেছেন । আর কী শিক্ষা তিনি দিয়েছেন ?
“গোরার আমি, গোরার আমি” মুখে বলিলে নাহি চলে । (শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ৮/৬) খালি আমরা বলি, “আমি মহাপ্রভুর ভক্ত, মহাপ্রভুর ভক্ত, মহাপ্রভুর ভক্ত !” কিন্তু মহাপ্রভুর আচার-বিচার নিচ্ছি না । আমরা লোক দেখায়ে তিলক করেছি কিন্তু :
লোক দেখান গোরা ভজা তিলক মাত্র ধরি । (শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ৮/৭) “গোরা ধরে চুরি !” গোরা জানেন আপনারা চোর ! লোক দেখান গোরা ভজা—এটা করলে হবে না । সেইজন্য, আপনাদের সবসময় ভগবানের চিন্তা করতে হবে । এক মুহুর্তের জন্য ভগবানকে ভুলে গেলে চলবে না, এক মুহুর্তের জন্য কৃষ্ণকে ভুলে গেলে চলবে না । সবসময় কৃষ্ণের চিন্তা করতে হবে । কৃষ্ণকে যদি পেতে চান মহাপ্রভুর ভক্ত হতে হবে—গৌর বাদ দিয়ে কৃষ্ণ ভজন হয় না, আর নিতাই বাদ দিয়ে গৌর ভজন হয় না । নিত্যানন্দ প্রভু বললেন, “আয়, চোর ! তুই চোর ! আমাকে বাদ দিয়ে তুই মহাপ্রভুর কাছে গিয়েছিস, তবু কৃপা হয়েছে কি ?” বারবার শ্রীল রঘুনাথদাস গোস্বামীকে মহাপ্রভু ফেরত দিতেন । শেষে নিত্যানন্দ প্রভু বললেন, “এবার তুই এসে সমস্ত বৈষ্ণবগণের সেবা করেছিস—যাও এবার ! এবার তোর মায়ার বন্ধন মুক্ত হয়ে গেল !” এই মায়ার সংসার ছাড়তে হবে ! আমরা যে এখানে এসেছি, সবাই একই পরিবারের লোক—কার পরিবার ? কোন সংসারের লোক আমরা ? কৃষ্ণের সংসার । কৃষ্ণের সংসারে যোগদান করে আমরা কৃষ্ণের সংসারের মানুষ হয়েছি । আমরা মায়ার সংসারের মানুষ নই । “অমুক চৌধুরীর, কবিরাজের বা দাস পরিবারের বউ নয়—আমি কৃষ্ণের পরিবারের বউ (মেয়ে, সন্তান, ছেলে, ইত্যাদি) !” সেই পরিবারে আমার অংশ গ্রহণ করতে হবে । সেই পরিবারের অংশ গ্রহণ করলে ভগবান্ যেখানে থাকেন, সেখানে আপনারা পৌঁছাতে পারবেন এবং সেখান থেকে আর ফিরে আসতে হবে না । বৈকুন্ঠ থেকেও জীব ফিরে আসতে পারে । জয় আর বিজয় দুই বৈকুণ্ঠের দ্বাররক্ষক । ব্রহ্মার সন্তানের প্রতি অপরাধ করে ফেললে তারা তাদের কাছ থেকে অভিশাপ পেয়েছিলেন যে, তাদের বৈকুন্ঠ থেকে মর্ত্যে ফিরে আসতে হল । আর এক দেবতার শিশু দুর্বাসা মুনির জটা কেটে দিল—এই অপরাধের ফলে তার কুমিররূপে জন্মা গ্রহণ করতে হল । এটাই হচ্ছে অপরাধের ফল । সেইজন্যই বৈষ্ণব-অপরাধ, সেবা-অপরাধ, নাম-আপরাধ, ধাম-অপরাধ সবসময় বর্জন করবেন । অনেকই অনেক কিছু করেন কিন্তু ফল পাচ্ছেন না কারণ নাম-অপরাধ তা বেশি করেন । সেইজন্য আপনাদের চরণে এই আমাদের প্রার্থনা—নাম-অপরাধ, বৈষ্ণব-অপরাধ, সেবা-অপরাধ, ধাম-অপরাধের সবসময় আপনাদের চিন্তা করতে হবে ।
— • • • —
|
সূচীপত্র: সূচনা : আমাদের একমাত্র কৃত্য ১। ভক্তির অভাব ২। গৃহে আবদ্ধ ৩। মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে ৪। জীবকে সত্য দয়া কি ? ৫। ভোগী নই ত্যাগীও নই ৬। শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি ৭। ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা ৮। ভগবানের চরণে পথ ৯। শান্তির গুপ্ত কথা ১০। শ্রীবামনদেবের কথা ১১। শ্রীনৃসিংহদেবের কথা ১২। পূজনীয় বিসর্জন ১৩। ভক্ত ও নাপিত ১৪। চকচক করলেই সোনা হয় না ১৫। আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ? ১৬। দণ্ড মহৎসব ১৭। শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব ১৮। মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ? ১৯। আমাদের একমাত্র উপায় ২০। পবিত্র জীবন ২১। শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান ২২। আমার শোচন |
||||||
| বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥ | |||||||
|
© Sri Chaitanya Saraswat Math, Nabadwip, West Bengal, India. For any enquiries please visit our contact page. { ফোনে আপডেট পেতে WhatsApp গ্রুপে যোগ দিন } |
|||||||