![]() |
|||||||
| |||||||
|
|||||||
|
শ্রীউপদেশ (১০) শ্রীবামনদেবের কথা
আপনারা বামনদেবের কথা শুনেছেন । ভগবানের দশটা অবতার আছে : নৃসিংহ অবতার, বামন অবতার, বরাহ অবতার, কূর্ম অবতার, মৎস্য অবতার, কল্কি অবতার, রাম অবতার, বুদ্ধ অবতার, পরশুরাম অবতার, কৃষ্ণ অবতার । স্বর্গলোকে যেখানে দেবতারা থাকে, সেখানে রাজা হচ্ছেন ইন্দ্রদেব । ভগবান্ দেবতাগণকে স্বর্গরাজ্য দিয়েছিলেন কিন্তু দেবতারা স্বর্গরাজ্য পেয়ে অহঙ্কারে ভগবানকে ভুলে গিয়েছে । তাই তাদের কী দশা হয়েছে সেটা আপনারা জানেন : তাদের স্বর্গরাজ্য থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছে । ভগবানের ইচ্ছায় অসুরগণও হয়—অসুরগণ দেবতাগণকে উৎপাত করে শেষে স্বর্গ থেকে বিতাড়ণ করে দিল । তারপর ভগবান নিজে অবতারণা করে (জন্ম গ্রহণ করে) অসুরগণকে নিধন করলেন । স্বর্গে অদিতি ও তাঁর স্বামী কশ্যপ ঋষি ছিলেন । অদিতি চিন্তা করলেন, “আমার দেবপুত্রগণ সমস্ত স্বর্গরাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে পড়েছে,—হে প্রভু ! তোমার ইচ্ছায় এ সব হচ্ছে । আমরা অনেক অন্যায় করেছি—দেবতারা অহঙ্কারে মত্ত হয়ে গিয়েছিল আর এইকারণে অসুররা সব শেষ করে দিয়েছে, সব স্বর্গটাও দখল করে নিয়েছে । প্রভু ! তুমি একটু ব্যবস্থা করে দাও—তুমি নিজেই আবির্ভুত হও !” তখন, তাঁর প্রার্থনা শুনে ভগবান অদিতির গর্ভেই বামনরূপে আবির্ভুত হলেন । এদিকে দৈত্যরাজ ছিলেন বলি মহারাজ (‘দৈত্য’ মানে তিনি অসুর ছিলেন) । এক দিন যে সব অসুররা পরাজিত হচ্ছে (সবাই মরে যাচ্ছে) দেখে বলি মহারাজ ভাবলেন, “আমাকে বিরাট যজ্ঞ করতে হবে ।” অনেক অনেক ব্রাহ্মণ নিয়ে বিরাট যজ্ঞ করতে গিয়ে দৈত্যরাজ বলি মহারাজ ঘোষণা করলেন, “যেই অঞ্চলে যত ব্রাহ্মণরা আছে, সবাই এই দিন আসবে । আমি সবাইকে দান দেব—যে যা চাইবে, তাকে তাই দিয়ে দেব ।” এই ঘোষণা করার পর ব্রাহ্মণরা সব সেই লোভে বলি মহারাজের যজ্ঞ স্থানের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন । হঠাৎ ব্রাহ্মণগণের নজরে পড়ল একজন অসাধারণ বটুবামন : একজন ছোট ব্রাহ্মণ (সেটা ছিল বামনদেব, স্বয়ং ভগবান, অদিতির পুত্র) । তিনি একটা ছাতা নিয়ে আরামভাবে যাচ্ছেন । তাঁকে দূর থেকে দেখে সবাই ভাবল, “আরে ! ছাতা হেঁটে যাচ্ছে !” কৌতূহলী হয়ে ওরা তাঁর সঙ্গে হেঁটে চেষ্ট করল কিন্তু পারল না—অবাক হয়ে ভাবল, “কী ব্যাপার ? জোরে এসেও ওঁকে কেউ ধরতে পারছে না !” এইভাবে শেষ পর্যন্ত বামনদেব বলি মহারাজের যজ্ঞ স্থানে এসে হাজির হলেন । বামনদেব যজ্ঞ স্থানে আসা মাত্রই সবাই অবাক হয়ে গেল—যজ্ঞের যে অগ্নি (ঘির আগুন) ছিল, বামনদেবের এত বেশি তেজ ছিল যে তাঁর তেজে আগুনটা নিবু-নিবু হয়ে প্রায় নষ্ট হয়ে গেল ! (তিনি ভগবান্ তো !) তখন বলি মহারাজ বামনদেবকে বললেন, “বটুবামুন, আপনি নিশ্চয় আমার কাছে দান নিতে এসেছেন ।” বামনদেব বললেন, “হ্যাঁ । দান নিতে এসেছি ।” “কী চান আপনি ? যা চান, তাই দেব ।” “হ্যাঁ, আপনি অনেক কিছু দিতে পারেন কিন্তু আমি বেশি চাই না । শুধু ত্রিপাদভূমি চাই । আমি তিনটা পা রাখব এবং ওই তিনটা পা রাখার মত আমি জায়গা চাই ।” বলি মহারাজ অবাক হয়ে বললেন, “সে কী ? মাত্র এত টুকরো চান ? আপনার ত্রিপাদভূমি দিয়ে কী হবে ? আপনি তাতে ঘর করে থাকতে পারবেন না । আধুলি জমি দিয়ে কী করবেন ? আপনি জানেন আমি কে ? আমি ত্রিলোকপতি—আমি আপনাকে জম্বুদ্বীপ কিংবা স্বর্গের অর্ধেক দিতে পারি ! আপনি অন্য কিছু চিন্তা-ভাবনা করে বলুন ।” “না, আমি ছোট বামুন । আমার পা ছোট, চাওয়াটাও ছোট । আমি বেশি চাই না—ওই ত্রিপাদভূমি আমাকে দিলেই হবে । তাই আপনি কথা দেন ?” তখন বলি মহারাজ বললেন, “ঠিক আছে । আমি রাজি, ত্রিপাদভূমি দেব কিন্তু আপনি আমার কাছে এই ত্রিপাদভূমি নিয়ে আবার অন্যের কাছে দান চাইবেন না—আমার কলঙ্ক হবে, আমি বিরাট রাজা এখানকার ।” “ঠিক আছে ।” তখন বলি মহারাজ কথা দিলেন, “আমি আপনাকে ত্রিপাদভূমি দেব ।” এদিকে উপস্থিত সন্ন্যাসীর মধ্যে একজন গুরু ছিলেন । দেব-দেবতা-গুরুর গুরু হচ্ছেন বৃহস্পতি আর দৈত্য-গুরুর গুরু হচ্ছে শুক্রচার্য্য । সেই দৈত্যগুরুর গুরু শুক্রচার্য্য যজ্ঞ-স্থানের পাশে বসেছিলেন । এসে তিনি বলি মহারাজকে কানে কানে বললেন, “বলি, তুমি কি করছ ? তুমি কথা দিয়ে দিলে ?! ত্রিপাদভূমি দিয়ে দেবে ?! তুমি জান না ও কে ? বলি, ও স্বয়ং ভগবান্ ! ও অদিতির গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেছেন দেবতাগণকে রক্ষা করবার জন্য আর অসুরগণকে নিধন করবার জন্য—ও ছলনা করে তোমার কাছে দান নিয়ে ত্রিপাদভূমির নাম করে সব নিয়ে নেবে আর তোমার তখন কিছুই থাকবে না ! তোমার থাকার জায়গাই থাকবে না—তুমি ওকে দান দেবে আর পরে তোমার কিছু থাকবে না ! কথা ফিরিয়ে নাও !” বলি মহারাজ বললেন, “না, আমি একজন ব্রাহ্মণকে কথা দিয়ে দিয়েছি । আর যদি ইনি ভগবানই হন, তাহলে এর চাইতে বড় দাতা কোথায় পাব ?” শুক্রচার্য্য বললেন, “তুমি, বলি মহারাজ, বাচ্চা ছেলে । তুমি ছোট মানুষ, তুমি কিছু বোঝ না । দান-সম্পত্তি রাখা হওয়ার জন্য মিথ্যা কথা বলতে হয়, ছলচাতুরী করতে হয় । তুমি কথা ঘুরিয়ে নাও ।” কিন্তু বলি মহারাজ রাজি হলেন না, “গুরুদেব, যে আপনি বলছেন তা আমি করতে পারি না ।” বলি মহারাজ গুরু ত্যাগ করে দিলেন । তখন দেখছেন যে, গুরু ত্যাগ করার বিধি আছে—
গুরুর্ন স স্যাৎ স্বজনো ন স স্যাৎ, (শ্রীমদ্ভাগবত, ৫/৫/১৮) “ভক্তিপথের উপদেশদ্বারা যিনি সমুপস্থিত মৃত্যুরূপ সংসার হইতে মোচন করিতে না পারেন, সেই গুরু ‘গুরু’ নহেন, সেই স্বজন ‘স্বজন’-শব্দবাচ্য নহেন, সেই পিতা ‘পিতা’ নহেন অর্থাৎ তাঁহার পুত্রোৎপত্তি-বিষয়ে যত্ন করা উচিত নহে, সেই জননী ‘জননী’ নহেন অর্থাৎ সেই জননীর গর্ভধারণ কর্তব্য নহে, সেই দেবতা ‘দেবতা’ নহেন অর্থাৎ যে সকল দেবতা জীবের সংসারমোচন অসমর্থ, তাঁহাদিগের মানবের নিকট পূজাগ্রহণ করা উচিৎ নহে, আর সেই পতি ‘পতি’ নহেন অর্থাৎ তাঁহার পাণিগ্রহণ করা উচিত নহে ।” যেই গুরু আপনাদেরকে প্রবৃত্তি মার্গের উপদেশ দেন, সেই গুরু ত্যাগ করার বিধি আছে । এখানে বলি মহারাজ গুরু ত্যাগ করে দিলেন—তিনি গুরুদেবের কথা শুনলেন শুনলেন আর শেষে বললেন, “না । আমি আপনার কথা শুনব না । যা ব্রাহ্মণ চান, সেটা আমি ওকেই দেব ।” তখন বলি মহারাজ কমণ্ডলু হাতে নিলেন আর “ওঁ বিষ্ণু” বলে জল ঢাললেন কিন্তু জলটা পড়ল না । তাঁর গুরু শুক্রচার্য্য যোগ-বলে বলি মহারাজকে আটকাবার জন্য কমণ্ডলুর মধ্যে ঢুকে পড়লেন—তিনি যোগী ছিলেন তাই ঢুকতে পারলেন । তার ফলে জলটা বের হচ্ছে না । তখন বলি মহারাজ ঝাড়ুর কাঠি নিয়ে কমণ্ডলুর মুখে খোঁচা দিলেন । খোঁচা দিয়ে তখন শুক্রচার্য্যের চোখটা অন্ধ হয়ে গেল । শাস্ত্রে কী বলা আছে ? যে ভগবানের সেবায় বিঘ্ন ঘটায়, তার একটা অঙ্গহানি হয়ে যায় । এটা শাস্ত্রের কথা । শুক্রচার্য্য ভগবানের সেবায় বিঘ্ন ঘটায় কাজেই তার চোখ অন্ধ (অঙ্গহানি) হয়ে গেল । এইজন্য তার নাম ‘কানা শুক্র’ হয়ে গেল । সেইভাবে, বলি মহারাজ আবার “ওঁ বিষ্ণু, ওঁ বিষ্ণু” বলে জল ঢাললেন আর ত্রিপাদভূমি বামনদেবকে দিয়ে দিলেন । সঙ্গে সঙ্গে বামনদেবের দেহ এত বড় হয়ে গেল—তিনি জম্বুদ্বীপ ও সব বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড একটা পাদে নিয়ে নিলেন । আর একটা পাদ তুলে দিলেন স্বর্গে—স্বর্গটাও নিয়ে নিলেন । সবাই অবাক হয়ে গেল, “এটা কী ? তিনি সব নিয়ে নিলেন !” তারপর বলি মহারাজ দাঁড়িয়ে বললেন, “প্রভু, আপনি এসেছেন, আমি বুঝতে পারি নি—” বামনদেব বললেন, “তুমি বুঝতে পারবে পরে, আগে তোমার কথা রাখো ! তুমি কথা দিলে যে আমাকে ত্রিপাদভূমি দিয়ে দেবে কিন্তু আমি মাত্র দুপাদভূমি পেয়েছি । একটা পা রেখেছি এখানে আর একটা পা তুলে দিয়ে স্বর্গ নিয়ে নিচ্ছি—দুপাদভূমি আমি পেয়েছি, আর একটা পাদভূমি আমি কোথা পাব ? আর একপাদভূমি দাও ।” বলি বললেন, “প্রভু, আমার আর কিছুই নাই । আপনি দুপাদ দিয়ে সব নিয়ে নিয়েছেন, আমি কোথায় কী পাব ?” বামনদেব আবার জিজ্ঞেস করলেন, “ভালো করে দেখো, তোমার আর কিছু আছে কিনা ?” “না, প্রভু, আমার আর কিছুই নাই । আপনি সবই দেখতে পারছেন, আপনি সব তো নিয়ে নিয়েছেন ।” বলি মহারাজের বুদ্ধিমতী স্ত্রী ছিল, তাঁর নাম বিন্ধ্যাবলি । বিন্ধ্যাবলি ওখানে বসে সব শুনেছিলেন আর তাঁর স্বামীকে বললেন, “আরে ! শুনো !” কানে কানে এসে বললেন, “তোমাকে প্রভু বারবার বলছেন, ‘তোমার আরো কিছু নাই ? আরো কিছু নাই ? আরো কিছু নাই?’ আর তুমি ‘না, না’ করে যাচ্ছ, ‘না, না’ করে যাচ্ছ । তুমি সব দিয়ে দিলে—কিন্তু নিজেকে দিয়েছ ?” বলি মহারাজ রাজি হয়ে গেলেন, “তাই তো ! দেই নি !” তখন বলি মহারাজ প্রভুর চরণে সাষ্টাঙ্গে পড়ে গিয়ে বললেন, “প্রভু, এবার আমি আমার নিজেকে দিচ্ছি ।” (এটা হচ্ছে শরণাগতি : “তুমি আমার, আমি তোমার ।”) তখন বামনদেবের নাভি-পদ্ম হইতে একটা পা বেরিয়ে এল আর ওই পা ভগবান্ বলি মহারাজের মাথার উপরে রাখলেন । বামনদেব তাঁর চরণ বলি মহারাজের মাথায় রাখলেন । তখন বামনদেব বললেন, “তুমি তোমার কথা রেখেছ । আমি এবার সন্তুষ্ট । তোমার দান তুমি আমাকে দিতে পেরেছ আর আমি যা পেয়েছি সেটা নিয়ে সন্তুষ্ট । এখন কিন্তু, বলি, একটা কথা হচ্ছে ।” “কী কথা, প্রভু ?” “এতক্ষণ আমি ছিলাম গৃহীত আর তুমি ছিলে দাতা, এবার কিন্তু আমি হব দাতা আর তুমি হবে গৃহীত !” “না, প্রভু, আপনি নিজের চরণ কৃপা করে আমার মস্তকে দিয়েছেন, আমি আর কিছু চাই না ।” “না, তোমাকে কিছু নিতে হবে !” জোর করে বামনদেব বলি মহারাজকে বৈকুন্ঠে সুতলপুরী দিয়ে দিলেন (যেখানে নারায়ণ থাকেন) আর বললেন, “তুমি ওখানে গিয়ে থাকবে প্রহ্লাদ মহারাজের সঙ্গে, আর আমি ওই সুতলপুরীর পাহারা হব ।” তখন ভগবান্ পাহারাদার হয়ে গেলেন আর তাঁর ভক্ত ওখানকার বাসিন্দা হয়ে গেলেন । তাহলে ভগবানের নিলয় কোথায়, বলুন ? ভগবান এতো দয়ালু ! তিনি সব কিছু আমাদেরকে দিয়েছেন তবু আমরা বলি, “আমরা কিছু পাইনি !” “আমাদের কিছু নাই ।” ভগবান্ আমাদেরকে চলতে দিয়েছেন, খাবার দিয়েছেন, কথা-বল দিয়েছেন, তবু আমরা সবসময় ভাবি যে, আমরা কিছু পাই নি—সবসময় তাঁর দোষ দেই ।
— • • • —
|
সূচীপত্র: সূচনা : আমাদের একমাত্র কৃত্য ১। ভক্তির অভাব ২। গৃহে আবদ্ধ ৩। মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে ৪। জীবকে সত্য দয়া কি ? ৫। ভোগী নই ত্যাগীও নই ৬। শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি ৭। ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা ৮। ভগবানের চরণে পথ ৯। শান্তির গুপ্ত কথা ১০। শ্রীবামনদেবের কথা ১১। শ্রীনৃসিংহদেবের কথা ১২। পূজনীয় বিসর্জন ১৩। ভক্ত ও নাপিত ১৪। চকচক করলেই সোনা হয় না ১৫। আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ? ১৬। দণ্ড মহৎসব ১৭। শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব ১৮। মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ? ১৯। আমাদের একমাত্র উপায় ২০। পবিত্র জীবন ২১। শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান ২২। আমার শোচন |
||||||
| বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥ | |||||||
|
© Sri Chaitanya Saraswat Math, Nabadwip, West Bengal, India. For any enquiries please visit our contact page. { ফোনে আপডেট পেতে WhatsApp গ্রুপে যোগ দিন } |
|||||||