![]() |
|||||||
| |||||||
|
|||||||
|
শ্রীউপদেশ ২২। আমার শোচন
শ্রীল গুরুপাদপদ্মের কৃপায়, গৌরহরির কৃপায় আপনারা সুষ্ঠু ভাবে, সুন্দর ভাবে, কোন বিঘ্ন ছাড়াই ধামপরিক্রমা সমাপ্ত করেছেন । প্রতি বৎসরের মত এই বছরও ধামপরিক্রমা আজকে সমাপ্ত করেছেন । গুরু, ধামের কৃপা ছাড়া, ধামবাসী-বৈষ্ণবগণের কৃপা ছাড়া, ধামেশ্বর মহাপ্রভুর কৃপা ছাড়া, নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপা ছাড়া, সবাই এই ধামপরিক্রমা সমাপ্ত করতে পারেন না । সবাইয়ের দ্বারা ধামপ্রিক্রমা হয় না । এইটা সব সময় মনে রাখবেন । আজকে গৌরাবির্ভাব তিথির অধিবাস, আমাদের খুবই আনন্দের দিন কিন্তু মাঝখানে আবার নিরানন্দ হয়ে যায় । কেন না ? আপনারা এই পরিক্রমা করেন ব্যাসদেব গোস্বামী, শুকদেব গোস্বামী, ব্রহ্মা, শিবাদি, সমস্ত ভক্তগণের সঙ্গে, গৌরহরির সঙ্গে, নিত্যানন্দ প্রভুর সঙ্গে, গুরুপাদপদ্মের সঙ্গে, বৈষ্ণবগণের সঙ্গে, কত দেব-দেবতার সঙ্গে—আপনারা কেউই সেটা বুঝতে পারছেন না, আমরাও বুঝতে পারছি না । পরিক্রমার সময় কত দেব-দেবী এই ধামপরিক্রমা করতে স্বর্গলোক থেকে এখানে চলে আসে—ব্রহ্মালোক থেকে ব্রহ্মা চলে আসেন, শিবলোক থেকে শিব চলে আসেন, ব্যাসদেব গোস্বামী, শুকদেব গোস্বামী ইত্যাদি—এঁরা সবাই এই ধামপরিক্রমা করতে আসেন । স্বয়ং ভগবানের লীলা-ভূমি, এই লীলা-ক্ষেত্র তারাই পরিক্রমা করতে আসেন কিন্তু আমরা এই সাধারণ চক্ষু দ্বারা সেটা বুঝতে পারি না, সেটা জানতেও পারি না । কিন্তু সবচেয়ে দুঃখের কথা এটাই যে, আপনারা এই ধামপরিক্রমা করে ভাবছেন, “কখন চলে যাব ?” অনেকে মধ্যম পরিক্রমা করে বিকালেই বেরিয়ে গিয়েছেন—পরিক্রমা শেষ না করে তিন দিন করে আজকে বলেন, “তিন দিন থাকলাম, এখন বাড়ি চলে যাই ।” অনেকে চলে যাচ্ছেন কিন্তু পরিক্রমাটা সম্পূর্ণ হয় না, সেটা তাঁদের দুর্ভাগ্য… এই দিনটাকে প্রভুপাদ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর সব সময় বলতেন, “নবদ্বীপ ধামপরিক্রমার পরে, জগন্নাথ মিশ্রের আনন্দ-মহোৎসবের পরে অনেকেই গঙ্গা পেরিয়ে আবার তারা মায়ার জগতে চলে যায় !” এক বছর যে দিন সবাই চলে যাবেন—সেই দিন সবাই প্রভুপাদকে দেখা করে, একটু প্রণাম করে চলে যাবেন কিন্তু ওই বার প্রভুপাদ দেখা দিচ্ছেন না । প্রভুপাদ খুব কষ্ট পাচ্ছেন—দরজার আড়ালে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে চোখের জল ফেলছেন ! প্রভুপাদ বলতেন, “আপনারা ধামপরিক্রমা করলেন, আপনাদের সঙ্গে একটা সম্বন্ধ সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা আপনারা ভুলে যাবেন না তো !” এই জগতের পিতা, মাতা, ভাই, বোন, এইসব সম্বন্ধ দুদিনের সম্বন্ধ কিন্তু গুরুর সঙ্গে শিষ্যের সম্বন্ধটা হয়েছে, সেটা জন্ম-জন্ম-অন্তরের সম্বন্ধ । সেইটা যে বুঝতে না পারে, সে সত্যিকারের গুরু হতে পারে না, সে সত্যিকারের শিষ্য হতে পারে না । এটা সব সময় আপনাদের মনে রাখতে হবে । সম্বন্ধ-জ্ঞানটা বুঝতে হয়, সম্বন্ধ-জ্ঞানটা জানতে হয় । সম্বন্ধ-জ্ঞানটা সাধারণ এই বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখলে হয় না, বাহ্যিক দৃষ্টিতে বুঝতে পারা যায় না । সেইভাবে, ওই দিন সবাই খুঁজে বেড়াচ্ছেন, “প্রভুপাদ কোথায় গেলেন ?” ঘরে তাঁকে খুঁজে পাচ্ছে না । শেষে কেউ দেখলেন বাথরুমের দরজা খুলে ছিল—সেখানে ঢুকে দেখতে পেলেন, বাথরুমের দরজার আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রভুপাদ কাঁদছেন । সবাই তাঁকে ধরে নিয়ে এসে নিজের চেয়ারে বসিয়ে দিলেন । তখন প্রভুপাদ বললেন, “আপনারা এতদিন পরিক্রমা করলেন, কৃষ্ণের সংসারের সদস্য হয়ে থাকলেন আবার এখন এই মায়ার জগতে চলে যাচ্ছেন, মায়ার বন্ধনে পড়ে যাচ্ছেন ! সেই মায়ার জগৎ থেকে আমরা দ্বারে দ্বারে ভক্তগণকে পাঠিয়ে আপনাকে কৃষ্ণের পরিবারে সদস্য করলাম, আবার আপনারা সেই মায়ার জগতে চলে গিয়ে ভগবানকে ভুলে যাবেন না ত ! আমাকে ভুলে যাবেন না ত ! আমার সঙ্গে যে সম্বন্ধটা হয়েছে, সে সম্বন্ধটা ভুলবেন না ত !” শ্রীল শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজও বলতেন, “লোকে পরিক্রমা করতে আসল, যার যার ঘরে চলে যাচ্ছে এটা আবার প্রভুপাদের সঙ্গে সম্বন্ধ ছাড়া আর কষ্ট কী আছে ?” আপনারা অনুভব করতে পারলেন যে, প্রভুপাদ কত গুহ্যের কথা বলেছেন, কত অন্তরঙ্গ সম্বন্ধের কথা বলেছেন । এটা সাধারণ ব্যক্তিরা কখনও বুঝতে পারেন না । এটাকে বলা হয় বিরহ ।
যখন কৃষ্ণ বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরা এবং দ্বারকায় চলে গেলেন, ব্রজগোপীরা তখন চোখের জলে, নাকের জলে সব কিছু একাকার করেই কৃষ্ণের জন্য শুধু হাহাকার করছেন । যাঁকে দেখতে পারছেন, তাঁরা কৃষ্ণকে দেখতে পেলেন । বৃক্ষকে জড়িয়ে জড়িয়ে তাঁরা বললেন, “এই পথ দিয়ে গিয়েছে ! এই য়ে পায়ের নূপুরগুলো পড়ে আছে ! প্রভু কি আমাদের ভুলে গেল ? এত নিষ্ঠুর ! ও কি আমাকে মরে রাখতে পারল না ! ও কি আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেল ! ও এত নিষ্ঠুর ! ওকে আমরা এত ভালবাসি, ওকে ছাড়া কিছু জানি না, ওকে ছাড়া কিছু বুঝতে পারি না কিন্তু ও আমাদেরকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেল !” সেইভাবে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন সন্ন্যাস গ্রহণ করে পুরীতে ছিলেন, তিনি তখন সে বিরহ আস্বাদন করতেন । একে বলা হয় বিপ্রলম্ভ-লীলা, বিরহ-লীলা । বিরহ দিয়ে আনন্দটা বেশী পাওয়া যায়—সংযোগে আনন্দ পাওয়া যায় না, সংযোগের চাইতে বিয়োগে আনন্দটা বেশী । সংযোগে আনন্দটা ক্ষণস্থায়ী আনন্দ কিন্তু বিয়োগের যে আনন্দ সেই আনন্দ ক্ষণে ক্ষণে বা মুহূর্তে মুহূর্তে আপনারা ভাব করতে পারবেন । যদি কৃষ্ণের সঙ্গে সত্যিকারের সম্বন্ধ হয়, গুরুর সঙ্গে সম্বন্ধ হয়, তাহলে আপনারা সব বুঝতে পারবেন । সেইভাবে, এই সম্বন্ধ-জ্ঞানের কথা আপনাদের ভালো করে বুঝতে হবে । সে রামানন্দের সংবাদ যদি আপনারা পড়েন, তখন দেখতে পাবেন যে, এটা অত্যন্ত উচ্চতম মার্গের কথা ।
আজকে আপনারা দেখলেন যে, চাঁপাহাটিতে গিয়ে সেখানে আমরা গীতগোবিন্দ কীর্ত্তনটা করলাম না । গীতগোবিন্দ থেকে “দেহি পদপল্লবমুদারম্” সেই জয়দেব-পদ্মাবতীর কথা এখানে আমরা বললাম, আমি এখানে বুঝতে পেরেছি কিন্তু সেই জয়দেবের বিরহের কথা কাকে বলব, কাকে শুনাব ? কে বুঝতে পারবে, বলুন ? জয়দেব গীতগোবিন্দ রচনা আরম্ভ করেছিলেন অন্য জায়গায় নবদ্বীপে কিন্তু ওখানে শেষ করতে পারলেন না । পরে তিনি চম্পাহাটিতে থাকতেন আর সেখানে বসে গিতগোবিন্দ রচনা করেছেন । এক দিন চম্পাহাটিতে বসে গীতগোবিন্দ রচনা করতে গিয়ে তিনি ভুলে গিয়েছেন পরের লাইটা কী । মনে কিছু রাখলে না । তাই তিনি তাঁর স্ত্রী পদ্মাবতীকে বললেন, “আমি গঙ্গায় স্নান করতে যাচ্ছি, আমার জন্য একটু প্রসাদের ব্যবস্থা করে রাখো ।” ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ তখন সেখানে সেই জয়দেব সেজে চলে এসে বললেন, “পদ্মাবতী, প্রসাদ হয়েছে ?” “হ্যাঁ, তুমি তো বলেছ স্নান করে এসে প্রসাদ পাবে—প্রসাদ পেয়ে নাও ।” প্রসাদ পেয়ে তখন কী তিনি করলেন ? জয়দেব যেখানে বসে গীতগোবিন্দ রচনা করলেন, ভগবান্ সেই ঘরে ঢুকে গেলেন আর গীতগোবিন্দের শ্লোকটা শেষ করলেন । তারপর তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন । একটু পরে আসল জয়দেব বাড়ি এসে বললেন, “পদ্মাবতী, আমার প্রসাদ কোথায় ?” পদ্মাবতী অবাক হয়ে বললেন, “কী বলছ ? তুমি তো এই মাত্র প্রসাদ পেয়ে আবার ঘরে ঢুকলে । ঢুকে তুমি কী লেখা লিখি করছিলে ।” জয়দেব বললেন, “সে কী ? আমি তো আসি নি এখানে !” তখন ঘরের মধ্যে গিয়ে দেখতে পেলেন সেই লেখা “দেহি পদপল্লবমুদারম্” (“তোমার চরণকমল আমার মস্তকে বিন্যস্ত কর”) । সেই রচনা সেখানে পড়ে আছে । ভগবান্ নিজে এসে লিখে দিয়ে চলে গেলেন । রাধারাণীর সম্বন্ধে কি লিখতে হবে, কৃষ্ণ নিজেই সেইটা লিখি দিয়েছেন ।
এই সব সম্বন্ধটা ভুলে গেলে চলবে না । এই সম্বন্ধ দুইদিনের সম্বন্ধ নয় । শুধু দীক্ষা নিয়ে চলে গেলাম, গুরুর চিন্তা করতে পারলাম না, কিন্তু বুঝতে হবে : গুরুকে কী দিতে পেরেছি ? গুরুর জন্য কতটা ভালবাসতে পেরেছি ? গুরুর জন্য কতটা করতে পেরেছি ? সেইটা সব সময় আপনাদের চিন্তা করতে হবে ।
দীক্ষাকালে ভক্ত করে আত্মসমর্পণ । (শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত, ৩/৪/১৯২) দীক্ষা মানে দিব্য-জ্ঞান । যাঁরা সেই করে তারাই আত্মসম, তাঁদেরকে নিজের আত্মার সম ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ মনে করেন । আপনাদের সব সময় সেই চিন্তা করতে হবে, এই রকম ভাবটা আসতে হবে । সেই ভাবটার জন্যই, সেই লীলা করবার জন্যই শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু এসেছিলেন । যদি আপনারা রাধা-বিরহ শুনবেন, তাহলে বুঝতে পারবেন, তাঁর কী বিরহের জ্বালা ।
বাঁশি বারণও মানে না, কথা যে শুনে না, কৃষ্ণও বলেন, “ওরে সুবল ! আজকে তো বলরাম নেই, আজকে আমি আর গো চারণে যাব না !” বলরামও সে দিন বললেন, “আজকে তো কৃষ্ণ নেই, আজকে আমি আর গো চারণে যাব না !” সেই বিরহ বুঝতে হবে, সেই বিরহ কথার চিন্তা করতে হবে । ভগবানের নিজের জন গুরুপাদপদ্মকে ভুলে গেলে চলবে না । আমরা মীরাবাইয়ের মত ভজন করি না—শুধু ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ’ করা আমাদের লাইন নয় ।
রাধা-ভজনে যদি মতি নাহি ভেলা । রাধা ভজন যদি করতে না পারি, কৃষ্ণ ভজন করে কিছু হবে না । শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভুর বিনা গৌরকে পাওয়া যাবে না, শ্রীগুরুপাদপদ্ম বাদ দিয়ে কৃষ্ণকে পাওয়া যাবে না ! গুরু বাদ দিয়ে ভগবানকে ভজন করলে কিছু হবে না । এই সব সময় চিন্তা করতে হবে ।
— • • • —
|
সূচীপত্র: সূচনা : আমাদের একমাত্র কৃত্য ১। ভক্তির অভাব ২। গৃহে আবদ্ধ ৩। মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে ৪। জীবকে সত্য দয়া কি ? ৫। ভোগী নই ত্যাগীও নই ৬। শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি ৭। ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা ৮। ভগবানের চরণে পথ ৯। শান্তির গুপ্ত কথা ১০। শ্রীবামনদেবের কথা ১১। শ্রীনৃসিংহদেবের কথা ১২। পূজনীয় বিসর্জন ১৩। ভক্ত ও নাপিত ১৪। চকচক করলেই সোনা হয় না ১৫। আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ? ১৬। দণ্ড মহৎসব ১৭। শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব ১৮। মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ? ১৯। আমাদের একমাত্র উপায় ২০। পবিত্র জীবন ২১। শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান ২২। আমার শোচন |
||||||
| বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥ | |||||||
|
© Sri Chaitanya Saraswat Math, Nabadwip, West Bengal, India. For any enquiries please visit our contact page. { ফোনে আপডেট পেতে WhatsApp গ্রুপে যোগ দিন } |
|||||||