আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি ENGLISH
 

শ্রীউপদেশ


(৮) ভগবানের চরণে গতি

 

দিন যায় মিছা কাজে নিশা নিদ্রাবশে ।
নাহি ভাবি মরণ নিকটে আছে বসে ॥
সংসার সংসার করি মিছে গেল কাল ।
লাভ না হইল কিছু ঘটিল জঞ্জাল ॥
কিসের সংসার এই, ছায়াবাজী প্রায় ।
ইহাতে মমতা করি বৃথা দিন যায় ॥

(শ্রীকল্যাণ-কল্পতরু, শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর)

দিন তো চলে যাবে । সময় ফুরিয়ে আসবে, তখন চলে যেতে হবে কিন্তু কতটা গুরু-বৈষ্ণব-ভগবানের সেবা আমরা করতে পারব বা পেরেছি ? কতটা ভগবানের সেবার দিকে নিজেকে নিযুক্ত করতে পারলাম ? সেইটা সবসময় চিন্তা করতে হবে ।

জীবে দয়া, নামে রুচি, বৈষ্ণব-সেবা ।
ইহা বহি সনাতন নাহি আর ধর্ম্ম ॥

কৃষ্ণবহির্মুখ-জীবকে এই পথে কি করে আনতে হয় ? কৃষ্ণবহির্মুখ-জীবের জন্য ভক্তগণ চেষ্টা করেন যেন লোক এই পথে এসে হরি-গুরু-বৈষ্ণবের সেবা করতে পারবে । সবাইয়ের মুখে কৃষ্ণনাম আসতে পারেন না—“‘কৃষ্ণনাম’ করে অপরাধের বিচার, কৃষ্ণ বলিলে অপরাধীর না হয় বিকার” (শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত, ১/৮/২৪) । অপরাধীরা (যারা নাম-অপরাধ করে) হরিনাম শুনলে তাদের চিত্তে কখনও বিকার আসে না । সেইজন্য সেবা-অপরাধ, বৈষ্ণব-অপরাধ, নাম-অপরাধ, ধাম-অপরাধ দূরে বিসর্জন করতে হয় ।

আমরা সবসময় সকল বেলা উঠে কীর্ত্তন করি :

ভক্তি-অনুকূল মাত্র কার্য্যের স্বীকার ।
ভক্তি-প্রতিকূল ভাব-বর্জ্জনাঙ্গীকার ॥

(শরণাগতি, শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর)

ভক্তি-অনুকূল ও ভক্তি-প্রতিকূল মানে কী ? অত্যাহার, প্রয়াসশ্চ, প্রজল্প, নিয়মাগ্রহ, লৌল্যঞ্চ, জনসঙ্গঞ্চ । অত্যাহার মানে বেশি খাওয়া ; প্রয়াসশ্চ মানে বেশি সঞ্চয় করা ; প্রজল্প মানে কৃষ্ণকথা বাদ দিয়ে অন্য কিছু চিন্তা, অন্য ভাবনা করা, অন্য লোকের সঙ্গে প্রজল্প করা ; নিয়মাগ্রহ মানে যা ভক্তির অনুকূল তা করা আর যা ভক্তির প্রতিকূলটা তা বিসর্জন না করা ; আর জনসঙ্গঞ্চ মানে কৃষ্ণবহির্মুখ লোকের সঙ্গ করা । এইগুলো “ষড়ভির ভক্তির বিনশ্যতি”—এই ছয়টা ভক্তির বাধা দেয় । যেটা ভক্তির প্রতিকূল (লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলা, তাদের সঙ্গ করা, ইত্যাদি), সেটা আপনাদেরকে বিসর্জন বা বর্জ্জন করতে হবে । না করলে ভক্তি আস্তে আস্তে বিনষ্ট হয়ে যাবে ।

ভগবানকে পেতে হলে, ভগবানকে জানতে হলে, ভক্তের সেবা করতে হবে । যদি কৃষ্ণকে পেতে চান, যশোদা মা ও নন্দ মহারাজের সেবা করতে হবে—তাঁদের সেবা করলে কৃষ্ণকে পাওয়া যাবে । কৃষ্ণকে নিমন্ত্রণ করলে কৃষ্ণ আসবেন না কিন্তু যশোদা মাকে নিমন্ত্রণ করলে তিনি কৃষ্ণকে কোলে তুলে নিয়ে আসবেন । সেইরকম ভগবদ্ভক্তের সেবা করলে ভগবানকে পাওয়া যায় । ভগবান নিজে বলেছেন, “যদি কেউ বলে ‘আমি কৃষ্ণভক্ত’, সে আমার ভক্ত নয় কিন্তু যদি কেউ বলে ‘আমি কৃষ্ণভক্তের ভক্তের ভক্তের ভক্ত’, সেই আমার ভক্ত ।”

“ছাড়িয়া বৈষ্ণব-সেবা নিস্তার পায়েছে কেবা”—বৈষ্ণবসেবা ছেড়ে দিয়ে কেউ নিস্তার পেতে পারে না ।

যে চৌষট্টির প্রকার ভক্ত্যঙ্গ আছে, তার মধ্যে নয়টা হচ্ছে শ্রেষ্ঠ । ওই নয়টার মধ্যে মুখ্য পাঁচটা (সাধুসঙ্গ, নামসঙ্কীর্ত্তন, ভাগবত-শ্রবণ, মথুরা-বাস, শ্রদ্ধায় শ্রীমূর্ত্তির সেবন) । আর তার মধ্যে মূল শ্রেষ্ঠ হচ্ছে নামসঙ্কীর্ত্তন । “নিরপরাধে নাম লৈলে পায় কৃষ্ণপ্রেমধন” (চৈঃ চঃ ৩/৪/৭১) । নিরপরাধে নাম করলে কৃষ্ণপ্রেমধন লাভ করতে পারবেন । কিন্তু নিরপরাধে নাম করতে হবে—অপরাধ-যুক্ত হয়ে হরিনাম করলে কাজ হবে না ।

অসাধুসঙ্গে ভাই কৃষ্ণনাম নাহি হয় ।
নামাক্ষর বাহিরায় বটে তবু নাম কভু নয় ॥

(শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ৭/১)

দুধ খেলে পুষ্টি হয় কিন্তু দুধের মধ্যে সাপ যদি মুখ দেয় সে দুধটা খেলে লোক মৃত্যুমুখে পতিত হয় । এখানেও সেইরকম । হরিনাম শুনলে লোকের পরম মঙ্গল হয়, কিন্তু অবৈষ্ণবের মুখে হরিনাম বা হরিকথা শুনলে আমাদের পরম ক্ষতি হয়ে যাবে । সেইজন্য সাধুসঙ্গে কৃষ্ণনাম করতে হবে । আপনারা সেই হরিনাম মহামন্ত্র নিয়েছেন কিন্তু সেই মন্ত্রের নিয়ে ক্রীড়া করবেন না । হরি-গুরু-বৈষ্ণবের চরণে শরণাপন্ন হলে (হরি-গুরু-বৈষ্ণবের চরণে শরণ নিলে) সংসারের মধ্যে আবদ্ধ থাকবেন না ।

সংসারে বসবাস করতে হবে অতিথির ন্যায়, গৃহে আসক্তি-চিত্তে নয় । বাড়িটা আমি তৈরি করতে পারি কিন্তু আমি চির জীবন সেখানে থাকব না । যদি আমার ঘর-বাড়িতে আসক্তি-চিত্ত আছে, তাহলে আমার অন্ধতমঃ তামসীক যোনিতে প্রবেশ করতে হবে । গৃহ তৈরি করে লোক ভাবছে, “হায়, আমার বৃদ্ধ পিতা-মাতা, শিশু-সন্তান, ভার্যা আমার বিনা সব অনাথ ও দুঃখিত হয়ে যাবে ! জীবনযাপন কি ভাবে করবে ?” এই প্রকার গৃহ-অভিলাষে অতৃপ্তচিত্ত, অসন্তুষ্ট ও মন্দ-বুদ্ধি ব্যক্তি পুত্র-কন্যা সর্ব্বদা ধ্যান করে এবং মৃত্যুর পর অন্ধতমঃ অতি তামসীক যোনিতে প্রবেশ করে ।

এটা শ্রীমদ্ভাগবতের কথা কিন্তু যাওয়াটাই তো মুশকিল । গুরুমহারাজ বলতেন শীতকালে আপনারা এক পুকুরের কাছে আসেন স্নান করবার জন্য আর মনে মনে ভাবছেন, “পুকুরে ডুব দেব ? না ! ঠাণ্ডা লাগছে, স্নান করব না !” পুকুর ঘিরে হেঁটে গিয়ে ভাবছেন, “নামব কি না ? নামব না । নামব কি না ? নামব না…” যদি আপনারা গামছাটা জলে ছুড়ে ফেলে দেন, তখন গামছাটা ধরার জন্য পুকুরের মধ্যে লাফ দিয়ে পড়তে হয় । এখানেও এইরকম—মনটাকে ছুড়ে ফেলে দিতে হবে । এই জন্মে মানুষ্যজন্ম লাভ করেছেন কিন্তু কত কষ্ট মানুষ করছে—“বুড়ো কাল আমাকে কে দেখবে ? বুড়ো কাল আমার কী হবে ? আমার এ সব সহ্য হয় না । খাওয়া-দাওয়া কে দেবে ?” এ সব চিন্তা ছেড়ে দিয়ে গুরু-বৈষ্ণবের সেবা করতে হবে ।

আমার মঙ্গল যদি আমি না দেখি, আমার মঙ্গলটা অন্যজন কে দেখবে ? আমার উপকার যদি আমি করতে না পারি, আমার উপকার অন্য কে করতে পারে ? আমি নিজেই নিজের বন্ধু, নিজেই নিজের শত্রু ।

আমি বলি না যে, যাদের ছেলে-মেয়ে বড় হয় নি, ছেলে-মেয়ে ছেড়ে দিতে হবে । তাদেরকে ছেড়ে দিয়ে যাওয়া যায় না, আপনারা বাড়িতে হরিনাম করতে পারেন । কিন্তু যাদের ছেলে-মেয়ে বড় হয়েছে, তাদের সংসারে আবদ্ধ হয়ে থাকার কোন প্রয়োজন নেই । গুরুদেব কত আশ্রম তৈরি করে রেখে গিয়েছেন, তবু আমরা সেই গৃহমেধী হয়ে সংসারে আবদ্ধ হয়ে পড়ে থাকব আর কি ।

মায়াজালে বদ্ধ হ’য়ে, আছ মিছে কাজ ল’য়ে ।
এখনও চেতন পেয়ে, রাধামাধব-নাম বল রে ॥

(শ্রীগীতাবলী, শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর)

মায়া জালের মধ্যে বদ্ধ হয়ে নিজের মিছে কাজ করে বসে আছি, তখন মৃত্যুর পর ওই অন্ধতমঃ অতি তামসীক যোনিতে প্রবেশ করতে হবে । আমার কথা যদি বিশ্বাস না করছেন, আমি বই নিয়ে এসেছি—শ্রীমদ্ভাগবত থেকে উদ্ধৃত করে বলে দিচ্ছি ।

“স্ত্রী, পুত্র, দারা, পরিবার, এ দেহ পতন হলে কী হবে আমার ?” এই দেহ পতন হয়ে গেলে আমার কি থাকবে আর, বলুন ? সেইজন্য বারবার সাধু-গুরু-বৈষ্ণবগণ আপনাদের বাড়িতে আসেন । কত ভাগ্য আপনাদের । আপনারা কীর্ত্তন করেন, “কর মরে আত্মসাথ” :“প্রভু, আমাকে আত্মসাথ করে নিয়ে যাও !” সাধুরা (যদি সেটা প্রকৃত সাধু হয়) আপনাদের টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত নিতে আসেন না—আপনাদের আত্মসাথ করে নিতে আর গুরু-গোবিন্দের সেবায় লাগিয়ে দিতে আসেন । সেই চিন্তা-ভাবনা করতে হবে ।

 

— • • • —

 

 

← (৭) ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা (৯) শান্তির গুপ্ত কথা →

 

সূচীপত্র:
সূচনা : আমাদের একমাত্র কৃত্য
১। ভক্তির অভাব
২। গৃহে আবদ্ধ
৩। মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
৪। জীবকে সত্য দয়া কি ?
৫। ভোগী নই ত্যাগীও নই
৬। শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
৭। ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
৮। ভগবানের চরণে পথ
৯। শান্তির গুপ্ত কথা
১০। শ্রীবামনদেবের কথা
১১। শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
১২। পূজনীয় বিসর্জন
১৩। ভক্ত ও নাপিত
১৪। চকচক করলেই সোনা হয় না
১৫। আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
১৬। দণ্ড মহৎসব
১৭। শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
১৮। মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
১৯। আমাদের একমাত্র উপায়
২০। পবিত্র জীবন
২১। শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
২২। আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥