আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি ENGLISH
 

শ্রীউপদেশ


(১১) শ্রীনৃসিংহদেবের কথা

 

আজকে খুবি শুভ দিন—ভগবান শ্রীনৃসিংহদেবের আবির্ভাব তিথি । ভক্তকে রক্ষা করবার জন্য ভগবান্ আবির্ভূত হয়েছেন আজকের দিনে ।

সমস্ত কিছু ভগবানের ইচ্ছায় হয় ।

হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ আসলে দুই ভাই বৈকুণ্ঠের দ্বাররক্ষক ছিলেন, তাঁদের নাম জয় আর বিজয় । এক দিন যখন নারায়ণ ও লক্ষ্মীদেবী ঘরে বিশ্রাম করছিলেন, জয় আর বিজয় পাহারা দিলেন । তখন ব্রহ্মার চারি পুত্র উলঙ্গ অবস্থায় সেখানে চলে এসেছিলেন । জয় আর বিজয় তাচ্ছিল্য করেছিলেন, “তোমাদের এখানে যাওয়া হবে না ।” যে তাঁরা ব্রহ্মার পুত্র ছিলেন, সে তাঁরা জানতেন না, তাই তাঁরা শিশুদের তাড়িয়ে দিলেন । তখন শিশুর মধ্যে একজন বললেন, “তোমাদের আমরা অভিশাপ দেব ! তোমাদের মর্ত্যে ফিরে আসতে হবে, আর বৈকুণ্ঠে থাকতে পারবে না ।” জয় আর বিজয় অবাক হয়ে গেলেন ।

এই সময় ভিতর থেকে নারায়ণ চেঁচামেচি শুনে বাহিরে চলে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, “কি হয়েছে ?”

জয় আর বিজয় বললেন, “প্রভু, আমরা আপনার দ্বাররক্ষক আর এই ছেলেরা আমাদের আপনার বিশ্রামে বিঘ্ন করতে বললেন । আমরা রাজি হয়ে গেলাম না বলে তাঁরা আমাদের অভিশাপ দিয়ে দিলেন ।”

নারায়ণ তখন বললেন, “তথাস্তু ! ঠিকই হয়েছে । তাই হবে ।”

“সে কী ? আমাদের মর্ত্যে যেতে হবে ??”

“যখন তারা অভিশাপ দিয়েছে, তখন যেতে হবে ।” (সব কিছু ভগবানের ইচ্ছায়ই হয়েছে ।) তখন নারায়ণ তাঁদের এক শর্ত দিলেন, “যদি এই জন্মে এসে আমার সঙ্গে মিত্রতা করবে, আমার পূজা ও সেবা করবে, তাহলে তোমাদের সাত জন্ম লাগবে । আর যদি আমার সঙ্গে শত্রুতা করবে, তাহলে তিন জন্ম লাগবে । কোনটা করবে ?”

“প্রভু, আপনার কাছে তাড়াতাড়ি চলে আসার জন্য আমরা শত্রুই থাকব !”

তখন তাঁরা সত্যযুগে হলেন হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ, ত্রেতাযুগে হলেন রাবণ আর কুম্ভকর্ণ, আর দ্বাপরে হলেন শিশুপাল আর দন্তবক্র—তাঁরা সবসময় কৃষ্ণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন ।

হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ দুই ভাই ছিলেন । সেই দুই ভাই অসুর সবাইকে উৎপাটন করতে শুরু করলেন । কত ভীষণ অত্যাচার তাঁরা করতে লাগলেন ! স্বর্গ থেকে দেবতারা উৎপাত সহ্য করতে না পেরে স্বর্গ রাজ্য থেকে পলায়ন করল । এটা শুনে হিরণ্যাক্ষ আরো বেশি অত্যাচার করতে লাগলেন । তখন ভগবান রেগে গিয়ে শূকররূপ ধারণ করে হিরণ্যাক্ষকে বধ করলেন ।

যে তাঁর ভাই হিরণ্যাক্ষ মরে গেলেন, সেটা হিরণ্যকশিপু শুনে আরো বেশি রেগে গেলেন । তখন কী করলেন ? জঙ্গলে চলে গিয়ে ব্রহ্মার ধ্যান করতে লাগলেন । তিনি না খেয়ে দেয়ে হাজার হাজার বছর ধরে তপস্যা করেছিলেন, তখন ব্রহ্মা তাঁর তপস্যায় খুব খুশি হয়েছেন । অসুরটার কাছে হাজির হয়ে ব্রহ্মা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “বল, তুমি কী বর চাও ?”

“আমি অমরতা চাই ।”

“এটা তো আমার বাহিরে, এটা আমার হাতে নয় । আমার অনেক আয়ু আছে কিন্তু আমারও এক দিন এই দেহ ছাড়তে হবে । আমি এটা তোমাকে দিতে পারব না । আর অন্য কিছু চাও ?”

হিরণ্যকশিপু খানিক ভেবে বললেন, “তখন আমি চাই যে, আমি দিনেও মরব না, রাতেও মরব না ।”

ব্রহ্মা বললেন, “ঠিক আছে ।”

“আমি তোমার কোন সৃষ্ট জীব দ্বারা মরব না ।”

“তাও ঠিক আছে ।”

“আমি আকাশেও মরব না, মাটিতেও মরব না, পাতালেও মরব না ।

“তাও ঠিক আছে ।”

“আমি ঘরেও মরব না, বাহিরেও মরব না ।”

“তাও ঠিক আছে । তুমি যেই বরটা চাও, আমি তোমাকে এই বর দিয়ে দিলাম ।”

ইতিমধ্যে হিরণ্যকশিপু তাঁর স্ত্রী বাড়িতে রেখে গেছিলেন—তাঁর নাম ছিল কয়াধু । যখন ভগবান্ হিরণ্যাক্ষকে বধ করেছিলেন, তখন দেবতারা আবার স্বর্গে ফিরে এল আর এক দিন তারা হিরণ্যকশিপুর বাসস্থানে এসে অসুরের বাড়িটা লণ্ডভণ্ড করলেন । কয়াধুকে একা দেখে তারা ওকে নিয়ে চলে গেলেন হত্যা করতে । মাঝখানে রাস্তায় নারদের সঙ্গে দেখা হল ।

নারদ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা একে নিয়ে কোথায় যাচ্ছ ? মহিলাটার স্বামী এখন ব্রহ্মার ধ্যান করতে জঙ্গলে বসে আছে, তোমরা কোথায় একে নিয়ে যাচ্ছ ?”

“একে মেরে ফেলে দিতে যাচ্ছি ! এর গর্ভে হিরণ্যকশিপুর সন্তান আছে, এ সন্তানটা যদি জন্ম গ্রহণ করবে, তাহলে সেও অসুর হবে । আমরা এটা সহ্য করতে পারব না !”

নারদ তখন তাদেরকে বুঝিয়ে দিলেন, “তোমরা জান না, এর গর্ভে যে সন্তান হবে, সে মহান্ ভক্ত হবে, ও তোমাদেরটি রক্ষা করবে । বরং কাজ করো, মহিলাকে আমার কাছে দিয়ে দাও ।”

তাই কয়াধু নারদের সঙ্গে তাঁর আশ্রমে চলে গেলেন । সেখানেই তিনি ঠাকুরের বাসন মাজা, সব কিছু সেবা, পূজা করতে লাগলেন, আর যখন নারদ প্রত্যেক দিন ভাগবত্ পাঠ করতেন, তখন কয়াধু প্রত্যেক দিন তাঁর হরিকথা শ্রবণ করতেন । ভাগবতে যে শিক্ষাগুলো দিয়েছে, প্রহ্লাদ মহারাজ মায়ের পেটে বসে সেগুলোই শ্রবণ করেছেন আর পরে তিনি বাবাকে আর স্কুলের বালকগণকে সেই শিক্ষা দিতেন ।

কয়াধুর সেবায় খুব খুশি হয়ে নারদ তাঁকে একদিন বললেন, “কয়াধু, তোমার সেবায় আমি খুব খুশি হয়েছি, তুমি কি বর চাও ? বল ।” কয়াধু বললেন, “আমার স্বামী বনে চলে গিয়েছেন ব্রহ্মার ধ্যান করতে । তিনি অসুর কিন্তু তিনি তো আমার স্বামী… আপনি আমাকে এমন বর দেন যেন স্বামী ফিরে না আসা পর্যন্ত আমার সন্তান প্রসব হবে না । এই বরটা আমাকে দেন ।” নারদ রাজি হয়ে তাঁকে ওই বরটা দিয়ে দিলেন ।

এদিকে হিরণ্যকশিপু ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে ফিরে এলেন । এসে তিনি দেখলেন যে, বাড়িটা লণ্ডভণ্ড ছিল—রেগে গিয়ে তিনি হুংকার করে বললেন, “কোথায় গেল আমার স্ত্রী ?!” কেউ তাঁকে বলল, “নারদ মুনি এখানে এসে ওঁকে নিয়ে গেলেন ; আপনার স্ত্রী তাঁর আশ্রমে ।” নারদ গোস্বামীর আশ্রমে গিয়ে হিরণ্যকশিপু স্ত্রীকে নিয়ে চলে বড়ি এলেন । তখন তাঁর সন্তান প্রসব হল । তারা নাম রাখলেন প্রহ্লাদ ।

আস্তে আস্তে প্রহ্লাদ বড় হতে লাগলেন । অসুরদের গুরু ছিল শুক্রাচার্য্য, এবং তাঁর দুই পুত্র ছিল, ষণ্ড আর অমর্ক । হিরণ্যকশিপু ছেলেটাকে তাঁদের কাছে পড়তে পাঠিয়ে দিয়ে আজ্ঞা দিলেন, “সাম-দান-দণ্ড-ভেদ সবগুলো শিক্ষা ওকে দাও—কার সঙ্গে দণ্ড করতে হবে, কার সঙ্গে ভেদ জ্ঞান করতে হবে, এ সব শিক্ষা দেবে ।” কিন্তু যা ষণ্ড-অমর্ক শিক্ষা দিচ্ছে, প্রহ্লাদের ওই সব কিছুই কানে যাচ্ছে না ।

একদিন হিরণ্যকশিপু ষণ্ড-অমর্কে ডাকলেন, “আমার ছেলেটা কি শিখেছে ? ওকে একবার নিয়ে চলে এসো !” প্রহ্লাদ বাড়িতে এলেন, মা তাঁকে নতুন জামা-কাপড় পরিয়ে, সব কিছু করে বাবার কাছে বসিয়ে দিলেন । তখন বাবা ছেলেটাকে নিজের কোলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, তুমি এই স্কুলে পড়লে কি ভালো শিক্ষা পেয়েছ ? তুমি যেটা ভালো শিখেছ, তার মধ্য থেকে একটা সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা বলো ।”

প্রহ্লাদ বললেন, “বাবা, আমি শিক্ষাটা বলব ।” তখন বললেন,

ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ ।
অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্ব্বকারণকারণম্ ॥

এটা শুনলে হিরণ্যকশিপু তাঁকে এবার কোল থেকে ছুড়ে ফেলে দিলেন, “এটা আমার ঘরে শত্রু জন্মিয়েছে !! আমার ঘরে শত্রু হয়েছে !” ষণ্ড-অমর্ককে ডাক করে বললেন, “ও রে ! আমার ছেলেটাকে তোমরা কী শেখাচ্ছ ?!”

ষণ্ড-অমর্ক সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “প্রভু, বিশ্বাস করুন—এসব শিক্ষা আমরা ওকে কোন দিন দেই নি ! কোথা থেকে যে পেয়েছে আমরা বুঝতে পারছি না ।”

হিরণ্যকশিপু তখন তাদেরকে কঠোর নির্দেশ দিলেন, “ভালো করে লক্ষ্য রাখো : তোমাদের স্কুলে অন্য কেউ এসে, কেউ তা শিখিয়ে দেয় !”

“ঠিক আছে ।”

আর প্রহ্লাদ কী করলেন ? যে স্কুলে অসুরগণ ছিল, তাদের দলে নিয়ে এলেন—স্কুলের মাস্টরমশাইটা যা বলতেন, প্রহ্লাদ তাদেরকে উলটো কথা বলতেন ।

আর এক দিন হিরণ্যকশিপু বাড়িতে প্রহ্লাদকে নিয়ে এলেন, আবার জিজ্ঞেস করলেন, “বল্, কি ভালো শিক্ষা শিখেছিস তুই ? মাস্টরমশাইটা কি শিখিয়েছেন ?”

প্রহ্লাদ তখন বললেন, “শ্রবণং, কীর্ত্তনং, স্মরণং, বন্দনং, পাদ-সেবনম্, দাস্যং, সখ্যম, আত্মনিবেদনম…”

“এ কী ??! এসব কী বলছিস ?!”

একবারে হিরণ্যকশিপু রেগে হলেন ! হুংকার দিয়ে বললেন, “কুলাঙ্গার !” আর মনে মনে ভাবলেন, “ওকে যে অবস্থা হয়, একে বধ করতে হবে !”

নানা উপায় চেষ্টা করেছিলেন হিরণ্যকশিপু তাঁর ছেলেটাকে মেরে ফেলতে—জলের মধ্যে ফেলে দিলেন, হতির পায়ের মধ্যে বেঁধে দিলেন, সাপের বিষ দিলেন, আগুনের মধ্যে ফেলে দিলেন, ইত্যাদি । বিভিন্ন উপায় চেষ্ঠা করলেন কিন্তু কিছুতেই তাঁকে মারতে পারচ্ছেন না ! অনেক বহুবার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু বিফল ।

তখন হিরণ্যকশিপু তাঁর লোক ডেকে বললেন, “তোমাদের দ্বারা কিছু হবে না । আমার কাছে ওকে নিয়ে চলে এসো ! আমি ওকে উচিত শিক্ষা দিয়ে দেব !” প্রহ্লাদ তাঁর পাশে এসে বসলেন ।

হিরণ্যকশিপু হুংকার দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুই এই শিক্ষা কোথা থেকে পেয়েছিস ?”

প্রহ্লাদ শান্ত স্বরে বললেন, “বাবা, যাঁর শিক্ষা, সেই আমাকে শিখিয়ে দিয়েছেন ।”

“মাস্টরমশাই বলছেন এটা তার শিক্ষা নয় !” মনে মনে ভাবলেন, “তোমরা মারতে না পারলে, আমি এই ব্যবস্থা নিচ্ছি !” আবার বললেন, “হে কুলাঙ্গার ! বল্, তুই এই শিখা কোথা থেকে পেয়েছিস ? আগুনে পুড়ে মরছিস না, জলের মধ্যে ফেলে দিলে ডুবে মরছিস না, তোকে পাহাড় থেকে ফেলে দিলাম কিন্তু তুই মরলি না ! বলো ! তোকে কে এমন বল দিয়ে দিল ?”

“হে পিতা ঠাকুর ! আপনি যে বলে বলীয়ান, আমিও সেই বলে বলীয়ান । আপনি যেখান থেকে বল পেয়েছেন, আমিও সেখান থেকে পেয়েছিলাম । আপনি ব্রহ্মার কাছ থেকে বল পেয়েছেন আর ব্রহ্মা তাঁর শক্তি কৃষ্ণ থেকে পেয়েছিলেন । আপনি ব্রহ্মার কাছ থেকে বল পেয়ে অহঙ্কারে একবারে মত্ত হয়ে ভুলে গিয়েছেন আপনি বলটা কোথা থেকে পেয়েছেন । সব বল হরির কাছ থেকে ।”

“আঃ ! তুই বারবার ‘হরি’, ‘হরি’ বলছিস, তোর হরি কোথায় আছে ?”

“কৃষ্ণ সর্বত্রই আছেন ।”

“তোর হরি কোথায় থাকে ?”

“হরি কোথায় না থাকেন ?”

“সব জায়গায় আছে ? হরি এই স্তম্ভের মধ্যেও আছে ?”

“হ্যাঁ, এখানেও আছেন ।”

“এখানে আছে তোর হরি ???!”

তখন হিরণ্যকশিপু স্তম্ভে ঘুষি মারলেন—স্তম্ভটা ভেঙ্গে পড়ে গেল আর সেখান থেকে বিশাল চিৎকার বেড়িয়ে গেল ! চিৎকারটা শুনে দেবতারা উপরে ভয়ে কাঁপতে শুরু করল । লক্ষ্মীদেবীকে সবাই বললেন, “লক্ষ্মী, তুমি যাও, প্রভুর হুংকারে এই পৃথিবী লয় হয়ে যাবে !” কিন্তু লক্ষ্মী বললেন, “আমি পারব না । আমি ঠান্ডা নারায়ণে সেবা করি । আমি এখন সেখানে গেলে প্রভু আরো রেগে যাবেন ।”

তখন স্তম্ভ থেকে নৃসিংহদেব (আধনর আধসিংহ) আবির্ভুত হলেন । তাঁকে দেখে হিরণ্যকশিপু খুব উদ্দণ্ড মত্ত হয়ে গেলেন । নৃসিংহদেবও খুব উন্মত্তও হয়ে গেলেন কারণ ভগবান্ জয় আর বিজয় বলেছিলেন, “আমি তোমাদের সঙ্গে লড়াই করব,” তাই সে লড়াইটার কথা তিনি মনে করছিলেন ।

তখন হিরণ্যকশিপুর সঙ্গে নৃসিংহদেবের জোর লড়াই ছিল । সব দেবতারা বলছেন, “হায় হায় ! কী হল ? আমার প্রভু এক্ষুনি হেরে যাবেন ! যদি ভগবান্ হেরে যান…” কিন্তু ভগবান হিরণ্যকশিপুকে হাত থেকে ছুটতে দিয়ে তখনই তাঁকে আবার হাতে ধরলেন আর আবার ফট্ করে ছুড়ে দিলেন—ইচ্ছা করে ছেড়ে দিলেন । দেবতারা ভয় পেয়ে বললেন, “হায় হায় ! প্রভু জয় করবেন ? জয় করবেন না ? প্রভু লড়াই হেরে গেলেন ?!” তখন হিরণ্যকশিপু নৃসিংহদেবের শ্রীঅঙ্গে আঘাত করলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আর সময় না দিয়ে নৃসিংহদেব তাঁকে ধরে তুলে ফেললেন । তারপর নৃসিংহদেব তাঁকে তুলে ঊরুর মধ্যে রেখে (ব্রহ্মা তাঁকে বর দিলেন যে, তিনি মাটিতে মরবেন না, আকাশে মরবেন না, পাতালে মরবেন না, কোন অস্ত্র দ্বারা মরবেন না, ইত্যাদি ।) নখ দিয়ে তাঁর উদরটা ছিঁড়ে ফেলে নৃসিংহদেব নাড়িভুঁড়িটাকে বাহির করে নিজের গলায় পড়লেন !

তারপর প্রহ্লাদ মহারাজকে দেখে তিনি খুব আনন্দ পেলেন । ভগবান বললেন, “প্রহ্লাদ, বাবা, তুমি একটা কিছু বর চাও ?”

প্রহ্লাদ বললেন, “প্রভু, আমি আর কী বর চাইব ? তুমি আমাকে কৃপা করবার জন্য এসেছ । প্রভু, আমি আর কিছু চাই না ।”

“না, কিছু নিতে হবে ।”

“তাহলে এই বর দাও—আমার বাবা তোমার শ্রীঅঙ্গে আঘাত করেছেন, কৃপা কর বাবাকে উদ্ধার করে দাও ।”

“তোমার বাবা আমার অঙ্গ স্পর্শ করেছে । আমার যে কীর্ত্তন করে, আমার যে নাম করে, আমাকে যে একবার দর্শন করে, সে কৃপা পেয়ে চলে যাচ্ছে, আর তোমার বাবা আমাকে স্পর্শ করেছে—সে যখন রাগে লড়াই করে মারামারি খেলায় করলে, তবু আমাকে স্পর্শ করে সে আমার ধাম প্রাপ্ত হয়ে গেছে । তাহলে এটা বর নয় । বল, আর কী বর চাও ? কী বর আমি তোমাকে দিতে পারি ?”

তখন প্রহ্লদ বললেন, “আর কী চাইব ? তোমার যদি কিছু দিতেই হয় আমাকে, তখন এই বর আমি চাই—আমি চাই যেন আমার সব চাওয়া-বাসনাটা কেটে যায় । এই বর দাও, প্রভু ।”

 

এইটা হচ্ছে মূল শিক্ষা । ভগবানের কাছ থেকে চাওয়ার বাসনাটা কেটে যেতে হবে । ভগবানকে নিজের ইন্দ্রিয়তর্পণ করবার জন্য আমরা সবসময় এই চাই, সেই চাই—এইটা বন্ধ করতে হবে ! প্রহ্লাদ মহারাজ, হিরণ্যকশিপু, নৃসিংহদেবের অর্থ হচ্ছে এই যে, লোকে নৃসিংহদেবের কাছে সবসময় বলে, “আমার ছেলে চাকরি হোক,” “মেয়ের বিয়ে হোক,” “শরীর ভালো হোক,” “টাকা-পয়সা হোক”, ইত্যাদি । যে শুদ্ধ ভক্ত, সে প্রার্থনা করে, “ভগবান, আমি তোমাকে একমাত্র প্রার্থনা করি যেন শুদ্ধ ভক্তি আর তোমার চরণে অচলা ভক্তি থাকে, তোমার চরণে যেন রতিমতি থাকে, যেন তোমার করুণায় তোমার জন্য চিরন্তর আমি সেবা করতে পারি ; যেন ভক্তির বিনাশ না হয়, তুমি শুদ্ধ ভক্তির বিঘ্ন বিনাশ করো ! ওই মায়ার কবলে পড়ে যেন আমার কোন ভক্তিতে বিনাশ না হয়, সেইটা তুমি একবার দাও । সেই আমি বরটা চাই, নিজের ইন্দ্রিয়তর্পণের জন্য কিছু চাই নি !”

জয় শ্রীল গুরু মহারাজ কী জয় !

 

— • • • —

 

 

← (১০) শ্রীবামনদেবের কথা (১২) পূজনীয় বিসর্জন →

 

সূচীপত্র:
সূচনা : আমাদের একমাত্র কৃত্য
১। ভক্তির অভাব
২। গৃহে আবদ্ধ
৩। মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
৪। জীবকে সত্য দয়া কি ?
৫। ভোগী নই ত্যাগীও নই
৬। শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
৭। ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
৮। ভগবানের চরণে পথ
৯। শান্তির গুপ্ত কথা
১০। শ্রীবামনদেবের কথা
১১। শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
১২। পূজনীয় বিসর্জন
১৩। ভক্ত ও নাপিত
১৪। চকচক করলেই সোনা হয় না
১৫। আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
১৬। দণ্ড মহৎসব
১৭। শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
১৮। মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
১৯। আমাদের একমাত্র উপায়
২০। পবিত্র জীবন
২১। শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
২২। আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥